Skip to main content

Full text of "Jharkhander Rishi Purbo Khanda"

See other formats


রা শুগর্হ্ধাকি 


কঠোর লাধনাসিক্ধ খাযির দীর্ঘ পরিক্রমার পরিপ্রেক্ষিতে 
প্রেম ভক্তি বিশ্বীম ও ঈশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠার সার্থক অবদান 


পূর্ব-খণ্ড 


কে হত্যা 


শ্রীগুরু লাইব্রেরী 
কলিকাত। 


প্রকাশক £ 
শ্রীভুবন মোহন মজুমদার, বি, এস্‌, সি, 
শ্ীওরু লাইব্রেরী 

২*৪ কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, 
কলিকাতা--৬ 


প্রচ্ছদপট : 
প্রীত্রজেন্দ্র কুমার চৌধুরী 


মুদ্রক £ 

শ্রীসত্যপ্রসন্ন দত্ত 

পুর্বাশা! লিঃ, ৫৪ গণেশচন্ত্র এভিনিউ 
কলিকাতা-১৩ 


প্রথম মুদ্রণ : 
কাতিক, ১৩৬৩ 


প্রচ্ছদপট মুদ্রক £ 
মোহন প্রেস 

২, করিশ চার্চ লেন 
কলিকাতা-_-৯ 


লক প্রস্ততকারক : 

ট্যাণ্ডার্ড ফটো এনগ্রেভিং কোং 
১ রযানাথ মজুমদার ট্রাট 
কলিকাতা--৯ 


দাম তিন টাকা 


দেবঘর-সন্নিহিত কুণ্ডা দেবীনিবাসে অবস্থিতি-কালে 
স্বকীয় অনুভুতির অন্থসরণে 
এই মহামানবের সাধনা-সিদ্ধ দীর্ঘ জীবনায়ন 
কথা-সাহিত্যে রূপায়ন করিতে 
সাহিত্য-ধর্মী লেখককে যিনি 
প্রেরণা দিয়! ধন্য করিয়াছিলেন 
সেই ব্বনামধন্য সিদ্ধ মনীষি 
নিত্য-ধামে অধিচিত থষির 
সর্বজন শ্রদ্ধেষ শিষ্য ও উত্তবসাধক 
শ্রীপ্রীমোহন। নন্দ ব্রহ্মচারী 
মহারাজের করকমলে 
মহাপুকষেব অবদান-মগ্ডিত 
স্ুপবিত্র লীল-কুন্ুমটি 
গভীর শ্রদ্ধা সহকারে 
লমর্পিত হইল | 


লেখকের কথা 


উপনয়নের পর দণ্তী-ঘর থেকেই সত্যের : সন্ধানে তুগমপথে পরিক্রমাকারী 
পরম পথিকতেব শৈশব কৈশোব ও যৌবনের ছূর্জয় সাধনা অবলম্বনে রচিত 
দিব্য কাহিনীটির উপব এখানেই উপস্থিত ফাঁড়ি টানা হযেছে । এই দীর্থ 
উপাখ্যানটি পবিক্রমাকাবী তাপসেরর এ“ঝাড়খণ্ডে ধধি-বূপে” প্রতিষ্ঠার 
ঘটনাবহুল পটভুমিকা বা পুর্ধাভাস মাত্র । এই মহামনীষীর প্রো ও পরিণত 
বয়সেব জীবনাদর্শও অমৃতময় অবদানের অভিজ্ঞান শ্বরূপ উত্তর খওটি প্রস্তুতির 
পথে। কাহিনীটি 'সংহতি' পত্রিকায় ধারাবাহিক রূপে প্রকাশিত হয়। 


৪২, বাগবাজার স্রীট, কলিকাতা | বিনীত 
কাতিক, ১৩৬৩ পীমনিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 


এই লেখকের কতিপয় বিখ্যাত গ্রন্থ__ 


রাণী লক্ষ্্ীবাই ( ঝাঁসীর বাণী ) 
পরমপুরুষ শ্রীরামকুষ্ ও ভাব অস্বতবাণী 


স্বয়ংসিদ্ধা আদি পর্ব 
প্রথম পৰ 

দ্বিতীয় পর্ষ 

স্বয়ংবর। 

কন্যাপীঠ 

আধুনিকা 

বিজয়িনী 

রাগিনী 

জাতিল্মর 

অগ্রগামী 

গোটা মানু 

দুই*ভাই 

অপরাভিতা 

মহাজাতি সংঘ 
পেশোয। বাজীরাও । নাটক ) 
বাসীর রাণী (নাটক ) 


৩. 


চা 


9|* 
81৯ 
তা, 
৩| 
৩॥ * 
নি 
৪ 
8-, 
২0 


১৪ 


প্রথম পৰ 
অবতরুণিক! 


পরমপুরুষ শ্রীপ্রীরামকঞ্চ পরমহংসদেব তখন দেহত্যাগ করেছেন। কিন্ত 
তার কাহিনী ও অম্ুতবাণী দেশের সবত্র ক্রমে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে। মুগ- 
প্রবর্তক মহামানবের আবিভাব পার্ধক হয়েছে--একদা তার আহ্বানে যাঁর! 
সাড়া দিয়ে দক্ষিণেশ্বরের তপোবনে এসেছিলেন কৌতুহলী হয়ে, তারপর 
ভুলভবস্তর সন্ধান পেয়ে সংসাবাশ্রমের সম্পর্ক ছিন্ন করে পরম গুরুত্গনে পরম 
পুরুষের সেবায় আত্ব-নিয়োগ করেছিলেন, মহাপুরুষের মহাপ্রস্থানের পর 
উ্রারাই ভার অবদান-মাহাস্্য প্রত্যক্ষদশী শিস্ত এবং বিশ্বাসী ভক্তব্ূপে সমাজের 
সকল স্তরে প্রচারে অবহিত হয়েছেন । ধুপের কোন চিহ্ন নেই, কিন্ত ভার 
অপরূপ স্ত্ুগন্ধে জনমন মুগ্ধ । এমন সহজ সরল ভাষায় আধ্যাড্িক কথা এর 
আগে আার কেউ বলেন নাই | ধর্ম নিয়ে কিসের কলহ--পব ধর্ম সমান তার 
মতে। আর কি জোরালো যুক্তি দিয়ে তিনি তার কথা প্রতিপন্ন করেছেন! 
যে ঈশ্বরকে পাবার জন্তে যুগ যুগ ধরে মানুষ কত ভাবে কত কঠোর সাঁধন। 
করে এসেছে, ঈশ্বরতত্ব উপলব্ধি করবার জন্য কত প্রস্থ পাঠ করেছেন, ঈশ্বর 
আছেন কি নেই--এই নিয়ে কত তক চলে এসেছে, কিন্ত ইনি এক কথায় 
তেজদ্রপ্ত কে জানিয়ে দেন--হ্যা, ঈশ্বর আছেন ; ইচ্ছা! করলে তাকে দেখা 
যায়, পাওয়। যায়, তার সঙ্গে কথা ব'লে মলের সকল সংশয় দুর করা যায়। 
শুধু মুখের কথা নয়, কভার পরম শিষ্ত উচ্চশিক্ষিত অগামান্ত প্রতিভাশালী 
জড়বাদী নরেন্রনাথের সংশয় দুর করতে সমর্থ হয়েছিলেন বলেই, জড়বাদী 
নরেন্দ্র ঈশ্বরবাদী বিবেকানন্দ বপে গুরুর প্রসাদে প্রতীচ্যের নানাস্থানে 
ভারতীয় সংস্কৃতির মাহাত্ব্য প্রচার করে বিশ্বের নমস্য হতে পেরেছিলেন | 

ঈশ্বরান্ুভুতির রীতিমত একটা আলোড়ন তুলে ঠ|কুর শ্রীরামরুষ যখন 
মহাপ্রস্থান করলেন, দেশের শিক্ষিত সমাজ, মধ্যবিত্ত অবস্থাপন্ন গৃহী গোষ্ঠী 
এবং বিশিষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তিশানলী অবস্থাপপ্নদের মধ্যেও চাঞ্চল্যের একটা 
সাড়া পড়ে যায়। যাঁর ঠাকুরের কথা শুনেছেন, অথচ কোনদিন দক্ষিণেশ্বর 
ভপোবনে বা কলকাতায় ভার অবস্থিতিকালে কোনও ভক্তের আলয়ে উপনীত 


ধাড়খণ্ডেয় গধি 


হয়ে তাকে দর্শন করে ধনু হবার সুযোগ পান নি--কারাই মলে মলে দাকণ 
অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন । এত বড় এক মহাপুরুষ--স্বয়ং আচার্য কেশব 
সেন, বিজয়কষ গোস্বামী, ঈশ্বরচন্দ্র বিষ্ভাসাগর), বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ মদীধীরা 
যাকে দর্শন করে, আলাপ করে, শ্রীমুখের বাণী শুনে জ্ঞান সঞ্চয় করেছিলেন, 
কারাই কেবল বঞ্চিত রহে গেলেন ! যাই হোক, সেই থেকে সাধু পুরুষদের 
প্রতি এই শ্রেণীর শিক্ষিত বাঙালীব বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা নিবিড় হয়ে ওঠে । ফলে, 
উনবিংশ শতাজীর স্বর্ণযুগে এদেশে যেমন শিক্ষা সংস্কৃতি ও কষ্টিসম্পম বহু কতী 
মনীষী প্রতিষ্ঠাপম্ন হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন, ভেমনই অসাধারণ 
আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন ধর্মসাধক মহাপুকষদেবও প্রাত্রভাব ঘটেছিল। তারাও 
সময়োপযোগী উপদেশাম্বত বর্ণ কনে জাতিকে সত্যোপলব্ধির সুযোগ দিলেন । 
পরমহংস শ্রীরামককষ্চ ও স্বামী বিবেকানন্দের অনবদ্য অবদান অবলম্বন 

করেই যেন দেশ ও জাতির প্রয়োজন বুঝে আবিভভত হলেন পরমপুকুষ 
শ্রীপ্রীবালানন্দ ব্রহ্মচারী । দিব্যকান্তি সৌম্যমৃতি প্রসন্ন হাস্যমুখ অপুর্ব 
তেজ:পুঞ্ত কলেবর এই মহাতাপসটিকে দেখলেই পবমপুকষ পরমহংস শ্রীন্রীঠাকু 
রামকৃষদেবের যতি মানসপটে ফুটে ওঠে । অতি বড নাভ্তিকের উদ্দেশ্যে 
তার ঈশ্বরানুভৃতি সম্বন্ধে সহজ সরল ভাবময বথাগুণপি শুনলেই দক্ষিণেশ্বর 
তপোবনে ভক্তগণ পরিবেষ্টিত ঠাঁকুরেন অমুতবাণী কর্ণপটাহে ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে । 
এই মহাতাপস বালানন্দ ঠাকুরও একদ) এক অবিশ্বাসী উচ্চ শিক্ষিত উচ্চপদে 
অধিষ্ঠিত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে বলেন : 

“ভগবান অবশ্য হায় । মনুস্ত চেষ্টা করনেসে ভগবান-কে। সাথ্‌ 

ভেট হোগা, ইসমে কোই সংশয় নেহি হ্ায়, কুচ্ছ সংশয় নেই 

হায় | হাম ভগবানকে|। সাথ আপকেো। পরিচয় করায় দেনে 

সেকেগা, পরস্ত হামকো যুক্তি লে কর্‌ আপকে| জরুর পরিশ্রম 

করনে পড়েগা 1৮ 
অবিশ্বাসী শিক্ষিত পদস্থ অনুসন্ধিৎ্সুর মুখের উপর এই ভাবে দুস্বরে ভগবান 
সন্বন্ধে উপলব্ধিমূনক কথা বলতে পেরেছিলেন বলেই, কালক্রমে সেই উদ্ধত 
ব্যক্তির দন্ত চর্ণ হয়েছিল, অস্তনিছিত অবিশ্বাস কুহেলিকার মত ছিন্ন ভিন্ন হয়ে 
তার অন্তর যধ্যে ঈশ্বর বিশ্বাসের হ্বীপ প্রোজ্খল হয়ে উঠেছিল | 

কঠোর জড়বাদ একদা এই বাঙল। দেশে সংশয়াবাদের ঘুর্ণাবর্তে পড়ে যখন 


অবতর়ণিকা ৩ 


প্রত্যক্ষাভীত পরমার্থকে অস্বীকার করে ধর্মভীরু বিশ্বাসীদের উদ্দেশে তীক্ষ- 
স্ববে প্রশ্ন তুলেছিল--'কোথায় তোদের ঈশ্বর? ইন্দ্রিয়াতীত অপ্রত্যক্ষ 
ঈশ্বরকে কোন্‌ প্রমাণে আমর! স্বীকার করব ?” তখন অবিশ্বাসীদের এ বট 
প্রশ্নের উত্তরে উপেক্ষিত ঈশ্বরবাদকে পুনঃপ্রতিষ্টিত করবার উদ্দেশ্টে জীবস্ত 
মন্ব উচ্চারিত হয়েছিল যুগাবতার পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের উদাত্ত কঠ থেকে। 
তিনিও এই ভাবে দর স্বরে বলেছিলেন সেদিন : 

“হ্যা, ঈশ্বর আছেন | খুব ব্যাকুল ছয়ে কাদলে ভাকে দেখা 

যায়| মাগ ছেলের জন্যে লোকে এক ঘটি কাদে, টাকার জন্থে 

দোকে কেদে ভাসিয়ে দেয়, কিন্ত ঈশ্বরের জন্যে কে কাদে? 

ডাকার মত ডাকতে হয়। নিশ্বাস চাই, বিশ্বাস চাই, জ্বলজ্য 

বিশ্বাস | এমন বিশ্বাস চাই মে,_-কি, ভগবানের নাম করেছি, 

আমার আবাঁর পাপ? বিশ্বাসের চেয়ে জিনিস নেই ।” 

ঠাকুর গারমিকৃষ্ণের অনেক পুধবতাঁ হযেও তার তিরোধানের কিছু পরে 
ঠাকুর বাঁলানন্দ ব্রন্মচারীর প্রাতৃভাব হয়েছিল এই ধাওল] দেশে এবং সত্য গাথা 
বলতে কি, বাঙালী ভক্তবৃদ্দই তার মহিম। মাহাআ্বের পরিচয় পোয়ে পরযোত্সাছে 
তার নাম প্রচারে উৎসাহী হয়েছিলেন | ঠাকুর আীরামক্রঞ্জেন পুর্ববতাঁ হলেও 
অপেক্ষাকৃত বিলম্বে তার আত্বগ্রকাশের কারণ হচ্ছে, দুম পর্বত-সঙ্কুল ভীষণ 
নর্শদা-কাস্তারে প্রায় পঞ্চাশ বধকাল ধরে তিনি কণোর তপস্যা ও নদ 
পরিক্রমায় লিগ ছিলেন | তপঃ সিদ্ধিন পর লোকালয়ে তার আবির্ভাব ঘটে । 
অষ্টাদশ শতাব্দীর গ্রথমাংশে ইতিহাস-প্রসিদ্ধ উচ্জয়িনী নগরে অদাচারী 

নিষ্ঠাবান সারম্বত ব্রাহ্মণ বংশে ইনি আবিভুত হন। তখনো ইংলগেশরী 
ভিক্টোরিয়া স্বহন্তে ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করেন নাই--জবরদস্ত ইট 
ইণ্ডিয়া কোম্পানীর আল চলেছে । কোম্পানীর স্বৈরাচারী কর্মচারীদের 
প্রচণ্ড প্রভাপে সমগ্র ভারতের যেন থরহরিকম্প অবস্থা! একটির পর 
একটি ভারতীয় স্বাধীন রাষ্ট্রগুলিকে ছলে বলে কৌশলে সাঁধভৌম বৃটিশ 
শক্তির প্রভাবাধীনে এনে কুখ্যাত বড়লাট ডালহৌসি সারা ভারতে শিহরণ 
তুলেছেন। তথাপি, মধ্যভারতে মাবাঠা শক্তির কিছুট] প্রভাব প্রতিপত্তি 
. তখনো ধিকি ধিকি জ্বলছিল-_-একেবারে নির্বাপিত হয় নাই । মহারাজাধি- 
রাজ বিক্রমাদিত্যের সমৃদ্ধ রাঁজধানী উজ্জয়িনী এই সময় সিঙ্ধিয়! সয়ফায়ের 


৪ ঝাড়খণ্ডের খষি 


বাজ্যাঙ্গের অন্তভুর্তি হয়েছে । গোয়ালিয়র এই প্রদেশের রাজধালীর মধ্যাদা 
পেলেও পুণ্যসলিল! সিপ্রা ও দ্বাদশ লিঙ্গের অন্ততম মহাকালের অধিষ্ঠান- 
ক্ষেত্রপে উজ্জয়িনী তার প্রাচীন নাম-গৌরব অক্ফুগ্ন রেখেছে । স্বধর্মনিষ্ঠ 
সারস্বত ত্রাঙ্মণকুলেব প্রভাবে উজ্জয়িনী তখনো প্রতিষ্ঠাপন্ন । এই নগরীর 
একাংশে সারস্বত ব্রাক্মণপল্লী | স্থানীয় এক বিশিষ্ট ও মধ্যবিত্ত অবস্থাপন্ন 
ব্রাহ্মণের ঘরে বালানন্দজী জন্মগ্রহণ করেন । পরমপুরুষ পরমহংসক্ধপে 
বিখ্যাত হবার আগে শৈশব ও কৈশোর জীবনে তিনি যেমন “গদাধর” নামে 
পরিচিত ছিলেন, বালানন্দজীও তেমনি শৈশবে প্পীতান্বর” নামে জনপ্রিয় 
এবং শৈশবকালীন দুঃসাহস, দুষ্টবুদ্ধি ও হঠকারীতার অন্থ প্রতিবাপী মহলে 
কুখ্যাত হয়ে ওঠেন। আশ্চধ্য যে, বাল্যকালে ভুতির খাল ও বুধুই 
মোড়লের শ্মশান প্রভৃতি ভীতিপ্রদ ছর্গমস্বানে গদাধরের অবাধ বিচরণের 
সঙ্গে উজ্জয়িনীর নিভৃত ও নিষিদ্ধ ভীষণ স্থানগুলিতে পীভান্বরের অকুতোভয়ে 
পরিক্রমণের সৌসাদৃশ্বের কাহিনী শুনলে চমতকুত হতে হয়। 


বাল্যলীল। 


এক 


মহাপুরুষদের শৈশবকালের খেলা-ধুলা, আঁচার-ব্যবহার, পড়াশোনা 
প্রভৃতি প্রত্যেক ব্যাপারেই কিছু না কিছু বৈচিত্র্য দেখা যায় ; এবং সেইজন্য 
সেগুলি বাল্য বা শৈশব-লীলাব্বপেই অভিহিত হয়ে থাকে | গদাধরের 
বাল্য-লীল! সম্পর্কে প্রতিটি কাহিনী বৈচিত্র্যমর ও কৌতুহলোদীপক এবং 
সেগুলি সর্বজনবিদিত ও স্পবিচিত। পীতাম্বরের বাল্য-জীবনের কাহিণী- 
গুলির মধ্যেও এমনি বৈচিত্রোর নিদর্শন পাওয়] যায়| 

গীতান্বর যখন আট বছরের শিশু, তখন থেকেই তাকে নিয়ে উদ্বেগজনক 
পরিস্থিতির উদ্ভব হতে থাকে । এমনি ভার সরধালসুন্দর প্রিয়দর্শন আকৃতি 
যে, দেখ! মাত্র তাকে কোলে তুলে নেবার আগ্রহ অদম্য হয়ে ওঠে। কিন্ত 
বালক সহজে কাউকে ধরা দিতে চান না, খাদ্য বা খেলনার প্রলোভন 
দেখিয়েও পীতাম্বরকে বাব্য করা কঠিন। অথচ, শাস্ত্র পুরাণের কথা গল্পের 
মত করে বলতে আরম্ভ করলে তখন তাকে অতি সহজেই কাছে পাওয়া 
যায়। বালক শিজেই কখকের কাছে এসে অতি শাত্ত শিষ্ট ছেলের মত গল্প 
গনতে বসেন । পক্ষাত্তরে, পাঠাভ্যাসে শিশুর অনাস্থা ও অমনোযোগিতা 
অভিভাবকদের চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে । পড়ার কথা বললেই তাকে 
অত্যন্ত গম্ভীর হতে দেখ! ঘায়: পাঠের জন্য বেশী পীড়াপীড়ি করলেই বালক 
সহসা এমনি অতকিতভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে আত্মগোপন করেন যে, 
অন্নুপন্ধান করে বাড়ীতে ফিরিয়ে আনতে অভিভাবকবর্গকে হিমসিম খেতে 
হয়। বালকের ছুঃসাহমও বিস্ময়কর--বড় বড় গাছের চুড়ায় উঠে শাখায় 
শাখায় লাফালাফি দাবাদাবি করে বলিষ্ঠ বয়স্ক তরুণদের মনেও আতঙ্কের 
সঞ্চার করেন। দিলীর মত উজ্জয়িনী নগরেও প্রাচীন যুগের বছ ধ্বংসস্তপ 
বিভীষিকার সত্যটি করে থাকে । প্রেতের ভয়ে তাদের ব্রিসীমায়ও কেউ 
যেতে সাহস পায় না। কিন্তু সেই সব স্তপ মধ্যে জীর্ণ অট্টালিকাগুলি বালক 
গীতা্ধরের পরম প্রিয় স্থান__নির্ভয়ে একাকী সেই ভগ্রস্তপের মধ্যে প্রবেশ 
করে জীর্ণ অট্টালিকাগুলির কক্ষে কক্ষে তাঁকে পরিভ্রমণ করতে দেখে অতি 


৬ ঝাড়থগ্ডের খানি 


বড় সাহসী ব্যকিদেরও হৃদকম্প হয়, অথচ বালক গীতাম্বর দিব্য নিবিকার-_ 
তয় ডরের চিহুও তার চোখে মুখে দেখা যায় না। 

বালক পুত্রের এই সব আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে মা নর্মদ] দেবী প্রায়ই 
আক্ষেপ করেন ; ছেলে আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মাবলে, আর যে পাৰি 
না ঠাকুর ! 

পীতাণ্রের মাতার নাম ননদ দেবী-_সারস্বত দ্বিজবংশের নিষ্ঠাবতী 
বিধবা । পিতার সংসারেই তিনি প্রতিপালিতা। পিতা! দামোদর প্রতিবাসী 
পুরুষোত্তম নামক স্ববর্নিষ্ঠ শীস্ত্রজ্ঞ সচ্চরিত্র সুদর্শন যুবাঁর হাতে আদরিণী 
কন্যা নর্ধদাকে সম্প্রদান করেছিলেন | কিন্ত পীতাঞ্ধর যখন তিন বছরের 
শিশু, সেই সময় মহাকালের আহ্বানে জামাত পুরুষোভ্ম সাধনোচিত ধামে 
মহাপ্রস্থবান করেন। শ্বশুরকুলে অন্য কোন অবলম্বন না থাকায় একমাত্র পুত্র 
পীতান্বরকে নিয়ে পিতার আহ্বানে কণ্ঠ পিতৃভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। 
পিতার সংসারেও ব্বদ্ধ পিতা ভিন্ন অন্য পরিজনও ছিল না। নর্মদা দেবী 
ভেবেছিলেন, এ ব্যবস্থায় বৃদ্ধ পিতার পরিচধ্যা এবং ক্ারই তত্বাবধানে 
পুত্রের পাঠাভ্যাস নুটুভাবেই চলবে । কিন্ত কশ্তার যত্বে পিতার পরিচর্ধ্যা 
যথাযথভাবে সম্পন্ন হতে থাকলে ও, দৌহিত্রের পাঠাভ্যাস সম্পর্কে মাতামহের 
প্রচেষ্টা সার্থক হবার পশ্খে পদে পদে বিঘ্ব ঘটতে লাগল | কিছুতেই তিনি 
গীতান্বরকে পাঠাভ্যাস মনোযোগী করতে মমর্থ হলেন না। বালক 
পাঠশালার ছায়াও মাড়াতে চান না, পড়ার ভরে পাশির়ে বেডানো যেন তার 
একটা অভ্যাসে পরিণত হয়। ফলে, বালক পাতান্বরকে নিঘে মাতামছ, 
না ও পাড়ার প্রতিবাসীদের মধ্যে যেন একটা লুকোচুরি খেলা ৮»লতে থাকে । 
ওদিকে বালকের জিদও ক্রমশঃ সহর সীমা অতিক্রম কখে। 

মাতামহের ক্ষোভ-সারস্বত ত্রাঙ্গণ বংশের আন্তান, ভগবতা সরস্বতা 
মাতার ত্যজ্য পুত্র হয়ে পিতৃকুল 'ও মাতৃকুলের কলক্কস্বরূপ হবেন, এ যে 
ধারণাতীত ব্যাপার! অথচ পীতাম্বরকে পড়ীর জন্য বললে বা পীড়াপীড়ি 
করলে, তিনি অধোবদনে নিকুত্তর থাকেন, একটি বর্ণও তার মুখ দিয়ে 
নির্গত হয় না, পুন: পুনঃ জিজ্ঞাসিত হলে শুধু ধীরে ধীরে ধাড়াটি নেড়ে 
ইঙ্গিতে জ্ৰানিয়ে দেন যে, পাঠাভ]াস তিনি করবেন না_-পাঠশাল|য় 


যাবেন না। 


বালালীলা ৭ 


এই সুত্রে একদিন স্বদ্ধেরও ধেষ্যচ্যুতি ঘটল। তিনি পীতান্বরকে কঠোর 
কঠে তিরস্কার করে জানিয়ে দিলেন; আজও তুমি যদি পাঠশালায় না 
যাঁও, তোমাকে আর আমাদের গৃহে স্থান দেওয়া! হবে না। মূর্খ ছেলেকে 
কুলাঙ্গার জেনেই আমর] ত্যাগ করব । 

বালক পীতাশ্বর স্থিরভাবে দাড়িয়ে মাভামহের রূঢ় কথাগুলি শুনলেন ; 
তারপর নীরবে ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে গেলেন । মাতামহ ভাবলেন, 
এবার পীতাম্বর নিশ্চয়ই পাঠশালায় যাবেন। কিন্তু অপরাহ্নে পীতআম্বরকে 
বাড়ী ফিরতে না দেখে তার মনে সন্দেহ প্রবল হলো । তৎক্ষণাৎ সংবাদ 
নিয়ে জানলেন যে, অন্যান্য দিনের মত এদিনও পীতাশ্বর পাঠশালায় যান 
নাই। 

তিনি গম্ভীরমুখে অস্তঃপুরে গিয়ে কন্তা নর্মদাকে বললেন £: ওগনেছ মা, 
তোমার ছেলে আজও পাঠশালায় যায় নি, আর-_এখনে। পরাস্ত তার ফেরবার 
নামও নেই | কোথায় গিয়ে সারাদিন কাটালো কে জানে? 

নর্মদ1! দেবী কপালে করাঘাত কবে বললেন ত আমার পোড়া বরাত! 
ভগবান এমন সোনারষ্াদ ছেলে দিলেন, কিন্তু ম! সরস্বতী ও-ছেলেকে পায়ে 
ঠেললেন । বামুনের ঘরে এমন মূর্খ ছেলে দেখলে দশজনে বলবে কি? কত 
বলি, মন্ত্র পড়ানোর যত কত উপদেশ দিই, কিন্ত কিছুই যেছেলে কানে 
নেয় না বাবা ৷ 

বৃদ্ধ দামোদর শম্মা বলেন: আগাদের কত আশা ভরসার ধন এই 
ছেলে ; রাজপুত্রের মতন চেহারা, আক্েেল বিবেচনারও কমতি নেই ; কিন্তু 
পড়ার কথ! উঠলেই মুখ নীচু করবে, আর তুলবে না। 

ওদিকে দেখতে দেখতে রাত হরে এলো, কিন্তু তখনও পধ্যস্ত পীতান্বরের 
ফেরবার নামও নেই | তখন পিতা পুত্রী উভয়েই অস্থির হয়ে উঠলেন । 
বৃদ্ধ তখন প্রতিবাসীদের কাছে ধর্ণা দিয়ে পড়লেন, আরম্বরে বললেন : 
আমাদের পীতুকে পাওয়া যাচ্ছে না। পাঠখালায় যাবার জন্য নিষ্ঠুরের মত 
তিরস্কার করেছিলায, সেই অভিযানে সে কোথায় চলে গেছে_ তোমরা বাপু 
সন্ধান করে দেখ। 
' প্রতিবাসীর1ও ঘটনাটি জানতেন | ভার বললেন £ দেখুন শন্মা ঠাকুর, 
আপনার! কেবল নাতীর এ্দিকটাই দেখছেন--০স পড়াশোনা] পছন্দ করে 


৮ ঝাড়খণ্ডের খধি 


না। পাঠশালায় যায় না। কিন্ত তার যে কত গুণ, সে সব-কি লক্ষ্য করেন 
নি? এই বয়সে তার আপন পর জ্ঞান নেই, কেউ কোন বিপদে পড়লে, 
পীতাম্বর নিজের শক্তির ওজন না বুঝেই তাকে বিপদ মুক্ত করবার জন্য 
ইটে যায়। পরের উপকার করবার সুযোগ পেলে আর সে কিছু চায় না। 
এমন ছেলে কেউ কখনে। দেখেছে? ভারপর মনে ভয় ডর নেই, সত্যিই 
ও অদ্ভুত ছেলে । আর, এমন কি বয়স হয়েছে যে পড়াশোনার জন্তে এত 
গঞ্জনা দেওয়া? এমন ত দেখা গেছে আমাদের সমাজে--উপনয়ন সংস্কার 
পর্য্যন্ত ছেলে পড়াশোনায় মন দেয় নি, কিন্তু তারপর সে ছেলের বিদ্ধের 
দৌড় সবাইকে অবাক করে দিয়েছে | 

বদ্ধ তখন অন্তপ্তের মত কাতর কঠে প্রতিবাসীদের উদোশে অনুরোধ 
জানাতে থাকেন : আমি এখন আমার ভুল বুঝছি । তোমর! আমার গীতুকে 
থুজে আনো, আর কখনে!। আমি তাকে পড়াঁর জন্তে তিরস্কার করব না। 

কিন্তু সেই রাতে নগরের নানাস্থানে অনুসন্ধান করেও পীতাম্বরের সন্ধান 
পাওয়া গেল না। গ্াদের বার্থতাঁর কথা শুনে পিতা পুত্রী উভয়েই শোকে 
অভিভূত হয়ে আর্তনাদ করতে লাগলেন । প্রতিবাসীরা অবশ্য প্রবোধ 
দিতে থাকেন: অধৈধ্য হবেন মা, সকাল হোক-_আমরা তাকে খুঁজে 
আনবই | কেঁদে ত কোন লাভ নেই। 

পরদিন প্রত্যুষেই প্রতিবাসীরা দাযোদর শশ্মার ব!ডীতে সমবেত হয়েছেন । 
তাদের মধ্যে পীতাণ্বরের অন্থসন্ধান সম্বন্ধে পরামর্শ চলেছে । অন্তঃপুরে 
পিত। পুত্রী ম্বৃতকল্প অবস্থায় পড়ে আছেন, সার! রাত্রি তারা জলম্পর্শও করেন 
নাই | পল্লীর কতিপয় মহিল1] এসে তাদের পরিচধ্য। করছেন ; এমন সময় 
বাহিরে বছ কণ্ঠের মিলিত হ্ধ্বনি উঠল: পাওয়া গেছে, পীতান্বরকে 
পাওয়] গেছে । 

তখন উঠি-পড়ি অবস্থায় তারাও বাহির মহলে ছুটলেন। 

তখন দেখা গেল, কতিপয় ক্কষাণ কর্তৃক পরিবোষ্টীত হয়ে এবং তাদেরই 
একজনের ফাধে চড়ে পীতাগ্বর বাড়ীর আঙ্গিনায় উপস্থিত | সেই কৃষাণটিই 
নধিনয়ে বলল * তাজ্জব কাঁও কর্তা! ভোরের সময় আমর] নদীর কিনার! 
দিয়ে ক্ষেতের দিকে যেতে যেতে দেখতে পেনুম--দাদ৷ ঠাকুর জঙ্গলের 
মধ্যে খানিক তফাতে পোড়ে। ভুতের বাড়ীর ছাদের উপরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। 


বাল্যলীল' ৯ 


আমর] ত ওনারেই ভূভ ভেবে ভয়ে চিল্লাতে থাকি । তখন দাদাঠাকুর যেন 
বাতাঁসে ভর করে সেই বাড়ী থেকে বেরিয়ে আমাদের সামনে এসে হাসতে 
হাসতে বললেন_ আমি ভুত নই, তোমাদের দাদ গাকুর , সারারাত এ 
বাড়ীতে কাটিয়েছি । এদিকে, দাদাগাকুর রাগ করে বিবাগী হয়ে গেছেন, 
একথ! আমরাও ত শুনেছি, তাই এনারে সাথে করে এনেছি । এখন 
দাদাঠাকুরকে সুধাও ত ভুতের বাড়ীতে কেমনে একাটি রাত কাটালেন। 

তখন সমবেত সকলেই জানবার জন্য ব্যগ্র হয়ে ওঠেন_ এই বয়সে 
এতটুকু ছেলে কি করে ভুতের ভিটেয় রাত কাটিয়ে এল! সীপ্রা নদীর 
বাকের কাছে জঙ্গলের মধ্যে জীর্ণ বাড়ীখানা জনসাধারণের কাছে ভুতের 
আস্তানা বলে ভীতিপ্রদ ছিল। দিবাভাগেও কোন সাহসী ব্যক্তি ওর কাছ 
ঘেসে যেতেও কুণগ্ঠিত হন। সেই বাড়ীতে পীতাম্বর একলা রাত কাটিয়ে 
এসেছেন গুনে মা] ও মাতামহ দুজনেই শিউরে উঠলেন ভয়ে । 

স্নেহের নাভীকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বৃদ্ধ বললেন: করেছ কি 
দাদু । ভুতের বাডীতে সারারাত ছিলে? ভয় করেনি? 

হাসিমুখে নিভাঁক বালক উত্তর করলেন £ আমাব ত ভয় ডর নেই 
দাদ্ব! সারারাত একাটিই ভ ছিলুম সেখানে, কিন্তু কৈ ভুতের দেখা! ত পেলুম 
না। একটা ভুতও ভয় দেখাতে এলো! না তো দাহ ! 

নিভাঁক বালকের কথায় সকলেই চমত্কৃত। দাহ ভখন গাঢস্বরে 
বললেন: আর আম তোয়াকে কোনদিন বকবো না দাদ্ব, তুমি আর এমন 
করে যেখানে সেখানে লুকিয়ে থেকে আমাদের ভাবিযো না। তোমার জন্তে 
আমর! সারারাত খাইনি, ঘুমাইনি, তা জান? 

গীতান্বরও গন্তীর মুখে বললেন: মিছামিছি আমাকে বোকলে আমার 
মনেও বড় কষ্ট হয় দাঁদু, তাই তখনই চলে যাই-__যেখানে দুই চক্ষু আমাকে 
নিয়ে যায় | 

মা নর্শদা দেবী এই সময় এগিয়ে এসে বললেন £ তাহলে তুই কি 
ঠাওরেছিস সে-কথা বল্‌? বামুনের ছেলে হয়ে পড়াশোনা] যদি না করবি, 
তবে কি সম্প্যাসী হয়ে সংসার ছেঁড়ে চলে যাবার মতলব করেছিস্‌ ? 

বিদ্রুপের সুরে ম! যে কথ৷ বললেন, বালকের কানে কি সেই কথাগুলি 
ঝংকার তুলে সত্যের সন্ধান দিল ? 


১০ ঝাড়খণ্ডের খাবি 


সেইদিন অপরাহ্ছে দামোদর কন্তাকে ডেকে বললেন : দেখ মা, আমি 
স্থির করেছি শীঘ্রই গীতুর উপনয়ন দেব, তাহলে ও সংযত হবে। 

এমনি সময় বালক পীতান্বর সর্ধবাঙে ছাই মেখে, একটি নেটি পৰে ও 
হাতে একট] কমণলু নিয়ে পরামর্শরত মা ও মাতামহের সামনে এসে 
দাড়ালেন। প্রাণাধিক পীতাম্বরের এই অপরূপ বাল-সন্যাসী মৃতি দেখে 
উভয়েই স্তভাবে তার দিকে চেয়ে রইলেন । গীতান্বর, তখন হাসিমুখে 
মাত|র পানে তাকিয়ে বললেন : মায়ী! দেখু, হাম তোসাধু হো গিয়া। 

দাদুর মনে তখনে। উপনয়নের কথাগুলি সুস্পষ্ট হয়ে ভাসছিল | সেই 
কথাস্থত্রে তিনিও সহাশ্যে বলে উঠলেন হ এক মাসের মধ্যেই আমি 
তোমাকে সাধু বানিয়ে ছাড়ছি দাদু ! 


তুই 

দাদুর প্রচেষ্টার প্রচুর অর্থবায়ে গীতাম্বরের উপনয়ন-অনুষ্ঠান নিবিদে 
সুসম্পন্ন হলো । মুখিত মন্তক দণ্ডধারী গৌরকান্তি বাল-্রন্মচারীর আননে 
এক দিব্য জেোতি ফুটে উঠল। পীতান্বর তখন ন'বছর বয়সে পদার্পণ 
করেছেন । 

দাতু ব্রন্মচারীর মুখের দিকে চেয়ে সহাশ্যে বললেন £ কেমন দাঢু, কিরকম 
সাধু বানিয়েছি বল? 

ব্রক্মচারীর প্রসন্ন আননে হাসির একটু ক্ষীণ রেখা ফুটে উঠল মাত্র, কোন 
উত্তর তিনি করলেন না। কিন্তু দণ্ডী ঘরে প্রবেশ করবার সঙ্গে সঙ্গেই 
বালকের আশ্চর্য পরিবতন দেখে সকলেই অবাক হয়ে গেলেন । পাঠাভ্যাসে 
ধার থোটেই মনোযোগ ছিল না, সন্ধ্যা বন্দনার দিকে তার একান্ত আগ্রহ ও 
গিবিড় নিষ্ঠা দেখে এবং তার মুখে বিশুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ শুনে বিজ্ঞ 
ব্যক্তিদের যনে প্রশ্ন উঠল--একি কাণ্ড । তবেকি এটা ওর সহজাত সংস্কার ? 
পাঠশালার পাঠে ধার মন কোনদিন নিবিষ্ট হয় নি, শাস্রগত আচার পালনে 
সার এত নিষ্ঠ। আন্তরিকতা ও আগ্রহ--যেন এ একটা রহস্টময় ব্যাপার । 

দাঁচুও নিখীক দৃষ্টিতে সন্ধ্যা-বন্ধনা-রত ত্রঙ্গচারীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন । 
পুরোহিতের উক্তির সঙ্গে সঙজে পুরোহিতের অপেক্ষা বিশুদ্ধ ও ম্িদ্ধ স্বরে এই 
শিশুর মুখে সন্ধ্যা মন্ত্র উচ্চারণ শুনে দাছু সন্ধ্যা-বন্দলার শেষে উচ্ছুসিত কণ্ঠে 


বাল্যলীল। ১১ 


বললেন * একি হলে দাতু ৷ ব্রক্ষচারী হবার সঙ্গে সঙ্গে সব যে পালটে গেল 
দেখছি ! এমন বিশুদ্ধ উচ্চারণ কে তোমাকে শেখালে দাহ? 

তথাপি ব্রহ্মচারীর মুখে কথা নেই, হাতের একাটি আঙ্ল তুলে গৃহ-কোণে 
রক্ষিত শালগ্রাম শিলাকে দেখিয়ে দিলেন | দাছু বুঝলেন, ব্রহ্মচারী যজ্ঞোপবীত 
গ্রহণের সঙ্গেই বাক্‌-সংযমে অভ্যন্ত হচ্ছেন ; তাঁই কথায় উত্তর না দিয়ে ইঙ্গিত 
করে জানিয়ে দিলেন__শালপ্রাম শিলার মব্যে যে ভগবান বিরাজ করেন, তিনিই 
তাকে ওদ্ধভাবে উচ্চারণ শক্তি দিয়েছেন । দাদুর অস্তর আনন্দে বিহ্বল 
হয়ে উঠল । 

এইভাবে দণ্তী-ঘরে ত্রিরাত্রি অতীত হলো। চতুর্থ দিন প্রত্যুষে নর্শদ'- 
বক্ষে দণ্ড বিসর্জন দেবার কথা | কিন্তু দণ্ডাথরের দিকে তাকাতেই দেখ! 
গেল, ঘর শুন্ত-_-দণ্ড নেই, ত্রক্ষচারী নেই, কেবলমাত্র কম্বলের আসনখানির 
উপর গৈরিকবর্ণের ঝুঁলিটি পড়ে আছে । 

ব্রক্মচারীর জননী নগদ ঠাকুরাণী আকুলকণঠে চীত্কার করে উঠলেন : 
একি হলো? গীতু কোথায় গেল? আজ যে তার দণ্ড ভামাবার দিন | 

দাদু খবর শুনে ছুটে এলেন ; তাইত, এ যে অদ্ভুত কাণ্ড! ঝুলি রেখে 
ওধু দওটি নিয়েই ব্রহ্মচারী দণ্ডীঘর থেকে এই প্রত্যুষে বেরিয়ে গেছেন ! তার 
বুকের ভিতরটা ঝাত করে উঠল । 

তখনি চারদিকে সন্ধান চলল | নর্ধদ] তীরে লোকজন ছুটস, আত পাতি 
করে আগেকার মত চারদিকে খোঁজাখু জি করতে লাগল পল্লীর মকলে। কিন্তু 
ব্রঙ্গাচারীর কোন সন্ধানই পাওয়া গেল মা | 

এইভাবে সারা উজ্জয়িনী নগরে এবং নগরের উপকণ্ঠবতাঁ অঞ্চলগুলিতে 
যখন পীতান্বরের অনুসঞ্জান চলেছে, সেই সময় নগর থেকে অনেকখানি দুরে 
তূর্গম বনপখ ধরে এক বাল-ত্রন্ষচারী ত্রতপদে এগিয়ে চলেছেন | তার মস্তক 
মুণ্ডিত, তেজোদপ্ত তন্ু, উভয় বাহমূলে স্বর্ণ বলয়, গসায় হেম হার, যুগল কর্ণে 
স্বর্ণবৌলী, পরণে গেরিক বাস, মুখে হাপি, ভাতে আচার্ধা দত্ত দীর্ঘ দণ্ড | 

ভ্রানোদয়ের পর শেশবকালেই পীতান্বর মাতামহের মুখে নমদা-পরিক্রমণের 
গল্প শুনতেন । এই নশরদাপারক্রমা সাধু জীবনের এক ছুঃসাধ্য ব্যাপার । 
শত শত ক্রোশ বিস্তৃত এই তুর্গয নর্নদা-ঝাড়ী। হুর্গম গভীর জঙ্গলকেই ঝাড়ী 
বঙ্গ] হয়। এক একটি ঝাড়ী বহু দুর বিস্তীর্ণ এবং এক একটি নামে বিখ্যাত। 


১২ ঝাড়খণ্ডের থষি 


যেমন--অমরকণ্টক বা মহারণ্য, ওঁকার, শুলপানি। এই সব মহাবনের নাস 
শুনলেই গৃহীর বুক ভয়ে কেঁপে ওঠে । কিন্ত লোকের বিশ্বাস যে, নিষ্ঠার 
সঙ্গে নিয়ম মত এই জঙ্গলগুলির প্রত্যেকটি আগাগোড়া ভ্রমণ করে সমুদ্র 
পর্যপ্ত গেলেই নর্মদা নর্দীকে প্রদক্ষিণ করা হয়। ধারা সিদ্ধ পর্যটক, তারা 
আবার করেন কি-_মহাবনের যে যে অংশ ত্যাগ করে এসেছেন অন্ত দিক 
ধরে, একবার প্রদক্ষিণের পর তারা আবার সেই অংশগুলি পরিক্রমা আরম্ভ 
করেন, তারপর সেই সেই অংশ দিয়ে অন্য পথে অন্য দিক অবলম্বন করে 
এগিয়ে যান যতক্ষণ ন1 নর্নদা। নদীর কুলুকুলু ধবনিতে স্নেহের আহ্বান শুনতে 
পান। নদীর দর্শন পেলে তখন আর আনন্দ ধরে না, নর্মদা মায়ীর নামে 
জয়ধ্বনি তুলে ছুটে যান পুণ্যতোয়া নদীরূপিনী মাতৃবক্ষে আশ্রয় নিয়ে 
অবগাহন করে ধন্য হতে। তারপর নদীব গতির সঙ্গে সঙ্গে সাগর পর্যন্ত 
গিয়ে পরিক্রমা শেষ করেন। 

বালকের বয়স যত বাড়তে থাকে, তার মনে কেবলই এই পরিক্রমার কথাটা 
স্পট হয়ে ওঠে । পুরাণের গল্পের মত সাধুদের এই পরিক্রমার গল্পও 
চিত্তাকর্ধক হ'য়ে তাকে কৌতুহলী করে তোলে । তিনি লক্ষ্য করেছেন, 
নর্দদা-পরিক্রমণকারী সাধুসম্তদের কি সন্মান, তাদের কি স্থন্দর আকৃতি, যেন 
সাক্ষাৎ মহাদেব ! উৎফুল্ল হয়ে বালক তার মাতামহকে কত প্রশ্ন করেন ঃ 
আচ্ড1 নানাজী, (ও অঞ্চলে ছেলেমেয়ের! মাতামহকে নানাজী বলে সম্বোধন 
করে-_পিতামহকে বলে বাপুজী ) তুমি কেন নর্ধদা মায়ীকে পরিক্রমা! কর নি? 

বৃদ্ধ গম্ভীর হয়ে বলেন £ সে ভাগ্য আমার কোথায় দাদ্ু, তাহলে কি আজ 
আর গৃহী হয়ে তোমাদের নিয়ে ঘর সংসার করতাম? নদ] যায়ীর দয়া না 
হলে ও কাজটি কেউ করতে সাহস পায় ন! দাদু ! 

বালক গীতাঞ্ধর শুধান : কেন নানাজী ? 

দ্ধ তখন পরিক্রমার ব্যাপারটি স্নেহের নাতীকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে 
দেন--কাঁজটি কত কঠিন। এই যে সুন্দর মনোরম নগরটি দেখছ দাত, 
আমর! যেখানে জন্মেছি, ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ও বিশিষ্ট পুরীগুলির মতন এটিও 
একাটি পুণ্যভুমি। সেকালে এর নাম ছিল অবস্তিকা, একালে এর নাম 
হরেছে উজ্জ্িনী । এই ভুমিকে ধন্য করেছেন সলিলরূপিশী দেবী নর্দা। 
একৈ যেঁকে শত শত ক্রোশ বেয়ে এ নদী সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে । হু'পাশে 


বাল্যলীল! ১৩ 


নিবিড় বন, এত ভীষণ আর গভীর যে, ষুগ যুগ ধরে মহাবন নামে খ্যাত হয়ে 
এসেছে : আর এ বনই হচ্ছে এই প্রদেশ ও নদী নর্ধদার গৌরব ও সম্পদ। 
লোকজনপুর্ণ সম্বদ্ধ নগরের চেয়ে এই বনভুমির উপরেই নদীমাতার অধিক স্নেহ 
ও অন্থুবাগ | এই বন ভেঙে যে সব ভক্ত তার উদ্দেশে এগিয়ে যায় ভক্তি সম্বল 
করে, তিনিও ন্ষেহময়ী মায়ের মূত্তি ধরে সঙ্কটের সময় তাদের সাহায্য করেন-__ 
বাধ। বিপত্তি দুর করে দেন। 

বালক পুনরায় প্রশ্ন করেন : তুমি কি করে জানলে নানাজী ? 

বৃদ্ধ বলতে থাকেন : যেসব ভাগ্যবান নর্ধদা পরিক্রমা করে সিদ্ধিলাভ 
করেছেন তাঁদের কাছেই শুনেছি । নিঃসম্বল অবস্থায় এই পরিক্রমা আরল্ত 
হয়, পায়ে হেঁটে যাওয়া! চাই, রোদে বৃষ্টিতে মাথায় ছাতা কিপ্বা পায়ে পাত্ুক! 
দেবার নিয়ম নেই। যেতে যেতে গাছের তলায় কিম্বা কোন পাহাড়ের 
গুহায় আশ্রয় নিতে পারা যায়--তাও রাঁতটুকুর জন্য । রাত্রি এলেই নর্মদ! 
নদী যেদিকে সেটি অনুমান ক'রে--নদীর দিকে মুখ রেখে বিশ্রাম করতে 
হবে। যেখানে হিংত্র পশুর ভয়, গাছে উঠে ভার ভালে বসে রাত্রিবাস ন' 
করে নিস্তার নেই। খুব প্রতু্যুষে উঠেই আবার বনযাত্রা। পথে যদি 
ছোট খাটে নদী পড়ে, পার হবার জন্যে ডিঙ্গি বা নৌকায় উঠলে পরিক্রমা 
পণ্ড হয়ে যাবে-হয় জপ বেয়ে হেঁটে, নাহয় সাতার কেটে নদী পার হতে 
হবে। যদি কাছাকাছি লোকালয় পড়ে, সেখানে গিয়ে আশ্রয় বা আতিথ্য 
গ্রহণ করবার রীতি নেই । বনের মধ্যে ফল মূল যা পাওয়া যায়_-তাই 
গ্রহ করে ক্ষুষ্নিবৃত্তি করতে হবে। তবে বনবাসিনী বন্যা নারারা সময় 
সময় গাভী দোহন করে এনে পরিক্রমাকারীদের তৃপ্ধ পান করিয়ে আনন্দ 
পান। অনেকের ধারণা, দেবী নর্মদার প্রতি ভক্তি রেখে যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে 
পরিক্রম। আরম্ভ করেন, দেবীর কৃপা থেকে তার) কোন দিনই বঞ্চিত হন 
না--ক্ষুধায় তৃষ্তায়, আপদে বিপদে দেবী নর্ধদাই নাল! প্রকারে কোন না 
কোন মৃত্তি ধরে সঙ্কট মোচন করে থাকেন । 

মাতামহের মুখে এ-সব কথা শুনতে শুনতে বালকের অন্তর আনন্দে পুলকিত 
হয়ে ওঠে । ভাবেন--দেবী যখন এত দয়াময়ী, একাপ্র মনে ভার নাম লিয়ে 
তাকে প্রদক্ষিণ করতে বেরুলে, তিনি যখন আপদ বিপদে সহায় হন, তখন 
লোকে কেন এ কাজে এগিয়ে যান না? হঠাৎ একটা কথা মনে উঠতে তিনি 


১৪ ঝাড়খণ্ডের ধবি 


পুনরায় প্রশ্ন করেন £ আচ্ছা নানাজী, বনে বনে যুয়ে নদী-মায়ীর তীরে 
গিয়ে তার মঙ্গে সাগর পধ্যস্ত গেলেই সাধনার কাজ হয়ে গেল--আর 
তাকে ধ্যান ধারণ! সাধনা তপম্বা কিছুই করতে হবে লা? বারে! এড 
সহজে সাধু যখন হওয়া যায়, তখন-- 

বৃদ্ধ সহাস্যে বলেন : কাজা যত সহজ ভাবছ দাত্ব, তা নয়! আগেই ভ 
বলেছি, শুধু একটি বার ঘুরে এলেই গ্রিক পরিক্রমা হয় না। নদী-মায়ীর 
তীরের দিক থেকে কোন একটি স্থান থেকে ভ্রমণ আরম্ভ করে বরাবর সমস্ত 
বনভুমি ভেদ করে যেখান থেকে নদীর উৎপত্তি হয়েছে, সে পর্য্যস্ত আগে 
যাওয়া চাই । 

বালক অমনি সাহে জিজ্ঞাস] করেন £ কোথা থেকে নর্মদা মায়ীর উৎপত্তি 
হয়েছে-সে কথা ত আমাকে বলনি নানাজী? সে-_- কোথায়? 

বৃদ্ধ বলেন : সে স্থানটির নাম হচ্ছে অযরকণ্টক--বনে পর্বতে মিশে 
স্বানটি এত দুর্গম যে, অনেক কষ্ট সহা কবে আর মায়ীর কপা পেলে তবে 
যাওয়া যায় । এইখালেই নর্শদ] নদী পার হয়ে অন্য তীর ধরে আর সব 
বনভুমির সঙ্গে নদী-মায়ীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে নদীর গতির সঙ্গে 
সমুদ্র দর্শন করতে হয়--সেখানে নদ নদী সমুদ্রের সঙ্গে মিশেছেন। 
ব্যাপারটি মুখে বলতে খুবই সহজ দাছু, কত ক্ষণই বা সময লাগে, কিন্তু 
এই পরিক্রমাটি ঠিকমত করতে হ'লে চারাটি বছর ফেটে যায়--তার আগে 
হয় না। তারপর. এতে মোটামুটি পরিক্রমা হলে! বটে, কিন্তু বিশাল বনভুমির 
সমস্ত অংশই যে দেখা হলো--একথা বল! যায় না। তাই, এভাবে পরিক্রমার 
পর--তআঁরও যে সব তুর্গম স্থান রয়েছে, সেগুলিও দেখে শুনে সমস্ত নর্মদ। 
অঞ্চলকে নখদর্পণে দেখতে পান- এমন সাধুও দু একজন দেখা গেছে। 
আর, তুমি যে ধ্যান ধারণ সাধনা তপস্যার কথা বলছ, এই পরিক্রমার সে 
সঙ্গেই দেবীর দয়ায় ওগুলিতে সিদ্ধি পাওয়া যায বলে শুনেছি। ধার এই 
পরিক্রমার পর সিদ্ধি লাভ করে সাধু হয়েছেন, তাদের মুখেই শুনেছি 
দাদু --বনের গাছপাল1, আকাশ, বাঁতাস, নদী, ঝরণা, পাহাড় পর্ববত--এক 
কথায় কোঁলাহলময় নগরের বাইরে অরণ্যময়ী প্রকৃতি দেবীর কাছ থেকেই 
জারা পান শিক্ষা । সেই স্বাভাবিক শিক্ষা থেকে যে জ্ঞান সঞ্চার হয়, তাতেই 
ভারা ধন হম। তাকপর দীক্ষারও অভাব হয় না, দেবীর এমন পয়৷ যে, 


বালালীঙগ ১৫ 


সেই ত্ুগ্ম বনেই যোগা গুরু এসে দীক্ষা দিয়ে সিদ্ধির পথে ঠেলে দেন। 
সেইজন্যেই নর্ধদা] পরিক্রমা করে যাঁরা লোকালয়ে আসেন, তাদের তখন 
সর্যসিদ্ধি লাভ হয়েছে । তাই এ পরিক্রমাই সাধনার একটা মন্ত বড় উপলক্ষ । 
কিন্ত দাত্ু-_-কাজটি থুবই কঠিন, আমাদের মত গৃহীদের পক্ষে ছুঃসাধ্য। 
আমর] এর গল্প গুনেই আনন্দ পাই। 

কিন্তু অল্পভাষী গন্তীর প্রক্কৃতি বালক পীতান্বর মাঁতাঁমহের কাছে আুকঠিন 
নর্মদা-পরিক্রমা-প্রসঙ্গ শুনে শুধুই গল্পের আনন্দে অভিভুত যে হননি-- শোন! 
কথাগুলি তার মনের মধ্যে প্রবিটু হয়ে সেই সময়ে সেই বয়সেই তাকে 
প্রলুৰ করত, নর্দা তীরবতাঁ হুর্গম অরণ্যানী হাতছানি দিয়ে তাকে 
ক্রমাগতই আহ্বান আাণাত এবং এইজন্যই অধ্যয়নে প্রচলিত পাঠাভ্যাসে 
কার চিত্ত আক্কষ্ট হ'ত না, পরিজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ কি তখন 
তা উপলব্ধি করেছিলেন? তখন থেকেই বালক মযণে মনে সঙ্কল্ন করেন, 
স্যোগ বা ফুরমদ পেলেই দেবা নর্রদা মায়ীকে মনের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করে 
তারই উদোশে এই কঠিন পরিক্রমায় একদিন বেরিয়ে পড়বেন । সকলেই 
ত বয়ংপ্রাণ্ত হয়ে শিক্ষালাভ করে এই পরিক্রমায় প্রবৃত্ত হন, তিনি হবেন 
বয়সের দিক দিয়ে ব্যতিক্রম--শৈশবেই নমদা পর্নিক্রমা কবে দেবীকে তুষ্টা 
করবেন, এক পরিক্রমার পর আর এক পরিক্রম! চালাবেন, ভার শৈশব, 
কৈশোর, যৌবন তার পরও অতিক্রান্ত হবে এই পরিক্রমায় । বালকের কল্পনায় 
যেন সমপ্র নর্নদা প্রদেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে । আরও ভাঁবেন, সাধুর ত বলেছেন, 
পরিক্রমার পথে স্বয়ং প্রকতিই নান! ভাবে শিক্ষার লঙ্গে জ্ঞান দান করে থাঁকেন, 
তবে কেন তিনি পাঠশালার অসার শিক্ষায় ল্গু হয়ে শৈশবেই মনকে বিকৃত 
করবেন! 

কে আনে তখন, বালকের এই মনোবিকার এবং পাঠাভ্যাসের প্রতি 
ওদাসীন্তের মূলে কি অভিপ্রায় প্রচ্ছম রয়েছে । বালক যে সুযোগের প্রতীক্ষা 
করছিলেন, উপনয়ন সংস্কারের পর সেই মাহেজ্রক্ষণটি উপস্থিত হলো। 
উপনয়নের পর দণ্তী-্ঘর থেকেই বালক পীতাগ্র সবার অলক্ষ্যে তার উদ্দেশ্য 
সাধনের পথে পদক্ষেপ করলেন । 

উদ্জয়িনীর প্রান্তে নর্শদার যে তীর, সেখানেই নদী মাতৃকার উদেশে প্রণাম 
করে বাল-জ্রক্সাচারী পরিক্রমার কঠোর সঙ্কল্লে ব্রতী হলেন । সহস। বালকের 


১৬ ঝাড়খণ্ডের ধাষি 


অন্তরে এক দিব্য ভাবের সঙ্ধার হলো। ভার গর্ভধারিণী জেহময়ী জননীর 
নামও নর্দা দেবী, সম্মুখেও রয়েছেন সর্ধসন্তাপহারিণী পতিতপাবনী 
সলিলরূপিনী আোতম্বিনী নর্শদা। ভাবাদ্র নয়নে তিনি ধ্যানমগ্র অবস্থায় 
উপলদ্ধি করলেন যে, এরা উভয়েই সমান--উভয়েই একাত্বরূপে তার 
অন্তরকে উত্ভতািত করেছেন। মাতৃজঠর থেকে নির্গত হয়ে এতদিন তিনি 
গর্ভধারিনী মায়ের স্মেহপাশে আবদ্ধ ছিলেন, এখন সেই মাতাই তাকে 
বিবিধ জ্ঞানদানের উদ্দেশ্টে মমতাময়ী মাতৃমৃতিতেই তাকে আহ্বান করছেন। 
এ অবস্থায় মহামায়ী নর্শদাই তার জননী নর্ধদামায়ীর শোকদ্ুঃখ সব মোচন 
করে অজ্ঞান বালকের মনস্কামন! পুর্ণ করবেন | 


বাল ত্রক্ষচারীর মনে হলো, ভার প্রার্থনা ব্যর্থ হবে না। দেবী নর্শদ। 
নিশ্চয়ই জননী নর্দার মনে শাস্তি দান করবেন | মনে মনে তৃপ্তিলাভ করে 
তিনি ক্রমশ: নগরের উপকণ্ঠ থেকে অরণ্যপথে প্রবেশ করলেন । 

জুর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পরে পথচারী ব্রক্মচারীর পিছন থেকে আহ্বান 
এলো £ ওহে ব্রহ্মচারী, দাড়াও : কথা আছে। 


তিন 


ব্রহ্মচারী পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলেন__আন্াাজ একশো গজ তফাত 
থেকে ভদ্রবেশধারী এক পথিক তাকে আহ্বান করছেন। হৃষ্টপুট নধর 
আক্কৃতি, পরণে শুত্রবস্ত্র, গায়ে পিরাণ ও তার উপর উত্তরীয়, পায়ে পাদুকা, 
মাথায় একট! রঙ্ষিন কাপড়ের পাগড়ি, বয়স চল্লিশের মধ্যে | উজ্জয়িনীর 
ভদ্র নাগরিকদের বেশভুষা | কিন্ত তীক্ষ দৃর্টিতে লোকটিকে চেয়ে চেয়ে 
দেখেও মনে হলে! না যে, তিনি পুর্বপরিচিত । তথাপি, লোকটি যখন কথা 
বলবার জন্য তাঁকে দাড়াতে বলেছেন, উচিত ভেবেই তিনি গমনে বিরত 
হয়ে থামলেন । 

একটু পরেই সেই লোকটি নিকটে এলেন। দৃষ্টি তার বালকের 
দিকে--তার কমনীয় অঙের স্বর্ণালঙ্কারগুলি বুঝি তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চক্ষু ছুটিকে 
লুন্ধ করে তুলেছিল । প্রথমেই তিনি বিজ্ঞের মত ভক্ি করে বললেন: 
তোমাকে দেখেই মনে হচ্ছে নতুন অ্রঙ্গচারী | 


বালালীল! ১৭ 


্রক্মচারীও তংক্ষরণীৎ তার সংশয় ভঞ্জন করবার উদ্দেশ্যে বললেন হ্যা, 
দণ্তীঘর থেকেই আমি সপ্ত বেরিয়ে এসেছি ! 

ভদ্রলোক একথার পর ভ্রকুঞ্কিত করে শুধোলেন ; বুঝেছি, দণ্ড 
ভাসাতে চলেছ। কিন্তু নগরের ঘাট ছেড়ে এই নিবিড় জঙ্গলে সেধিয়েছ 
কেন? এখান থেকে নদী তো অনেক দুরে | 

ব্রহ্মচারী গম্ভীর মুখে বললেন : দণ্ড ভাঁসাবার ইচ্ছ। থাকলে নগরের ঘাটেই 
যেতাম, সঙ্গেও লোকজন বাঁজন] বায থাকত । কিন্তু দণ্ড ভাসাব-ন। বলেই 
জঙ্গলে সেধিয়েছি। শুনিছি, উপনয়নের পর যজ্ঞের দণ্ড জলে ন ভাসিয়ে 
তাকেই সম্বন করে বেরিয়ে পড়াই হচ্ছে প্ররুত ব্রক্ষচারীর বিধি | কিন্তু 
সংসার ছেড়ে সকলে তো৷ আর ব্রহ্মচারী হতে পারে না, তাই দণ্ড জলে ভাসিয়ে 
আবার ঘরে ফিরে যায়, গৃহী হয় । 

ব্রক্ষচারীর কথায় ভদ্রলোকের তুই চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে উঠল । বিস্ময়ে 
তিনি বললেন £ তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, শোনা কথায় বিশ্বাস করে 
কবোৌঁকের মাথায় তুমি দণ্তীঘর থেকে পালিয়ে এমেছ-_-আর গ্বহে ফেরবার মতলব 
নেই। কিন্তু বাপু, আমার এত বয়স হয়েছে এ পর্যাস্ত কোন ছেলেকে 
উপনয়নের পর দণ্ডীঘর থেকে এভাবে দণ্ড হাতে করে পালাতে দেখিনি । 
দণ্ডীঘর থেকে বেরিয়ে দণ্ডী না ভাসিয়ে ব্রহ্মচারী হয়েছে, এমন ছেলেও নজরে 
পড়ে নি। তবে যাদের কথ! শুনি, সে হচ্ছে নিছক গল্প কথা--চোখে দেখা 
নয়। ছেলেমানুষ ভুমি এ সব কথা শুনে ঝৌকের মাথায় বেরিয়ে পড়েছ, 
এখন বাড়ী ফিরে চল। আমি বরং তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে পৌছে 
দিতে রাজী আছি। 

এসব কথ! শুনতে শুনতেই ব্রক্ষচারীর স্ুকোমল মুখখানি শক্ত ' হয়ে 
উঠছিল। ভার কথ! শেষ হতেই তিনি বললেন : এই সব কথা শোনাবার 
জন্যেই কি আপনি আমাকে দ্রাড়াতে বলেছিলেন? আপনি ভুল বুঝেছেন, 
ঝোঁকের মাথায় আমি তো আসিনি-নর্দা মায়ী আমাকে ডেকেছেন, আমি 
ভারই ডাক শুনে বেরিয়ে এসেছি । বেলা হয়ে যাচ্ছে, আপনি আমাকে আর 
বাধ! দেবেন লা। 

কথাগুলি তাড়াতাড়ি বলেই ব্রক্ষচারী সামনের দিকে ফিরতেই ভদ্রলোক 
বাধা দিয়ে বললেন : তুমি বললে কি আমি বাধা না দিয়েই থাকতে পারি ? 

হ 


১৮ ঝাড়খণ্ডের ধষি 


যা কখনে। হয্স লা, কেউ যা করে না, তুমি ছোকর। সেই অসাধ্য সাধনে 
চলেছ! এ যে আত্মহত্যার সামিল । আমার চোখের উপর ব্রাক্মণের ঘরের 
ছেলে মৃত্যুর মুখে এগিয়ে চলেছ দেখে কি আমি কখনো! স্থির থাকতে পারি। 
আমার এখন কর্তব্য হচ্ছে, তুমি যদি আমার সঙ্গে ফিরতে না চাও, তাহলে 
জোর করে তোমাকে বাধা দেওয়া_চৌকিদার ডেকে কোতোয়ালীতে ধবে 
নিয়ে যাওয়া। তারপর, তোমার গায়ে যে সব সোনার গহনা রয়েছে, 
এগুলোই তো তোমার মস্ত হৃশমন হয়ে দাড়িয়েছে সে কথা ভেবেছ কি? এই 
গহনার লোভেই দত্্যুর। তোমাকে প্রাণে মেরে ফেলবে । এসব জেনেও 
আমি কি চুপ করে থাকতে পারি ? 

শেষের কথাগুলি শুনেই ব্রক্মচারীর মনটিও যেন দ্বলে উঠল। গায়ের 
গহনাগুলোর কথা এতক্ষণ তার মনে ওঠেনি । তাহলে তিনি সঙ্ষে করে 
আনতেন না--দণ্ডীঘরেই সব ছেড়ে ছুড়ে আরে! সহজ হয়ে আসতেন । এখন 
যাত্রা পথে প্রতিবন্ধক স্বরূপ এই লোকটির মুখে গহনাগুলির কথা শুনে তিনি 
ঠার বাল্য বুদ্ধিতেই উপলব্ধি করলেন যে, যত গোল এগুলির জন্তই । তার 
চোখে এগুলি যতই অসার ও অকিঞ্চিংকর হোক না কেন, এই সংসারী 
মানুষটির পক্ষে নিশ্চয়ই এসব ছু্ঘভ পদার্থ । এখন এরাই তার যাত্রাপথের 
বাধ দুধ করে দিকৃ। মুহুর্ত মধ্যে মনে যনে এই চিন্তা করেই ত্রঙ্গচারী সেই 
ব্যক্তিকে বললেন 2 দেখুন, আমার অভ্যাস হচ্ছে, যোটি ধরি-_সেইটি শেষ 
করে ফেলা । যে অঞ্চল্ল নিয়ে আমি বেরিয়েছি, কেউ আমাকে তা থেকে 
নিবৃত্ত করে ফেরাতে পারবে না| কেননা--নর্ধদাযায়ী আমার সহায় | তবে, 
আমার গায়ের গহনাগুলোর জন্তে আপনি যখন এত ভাবনায় পড়েছেন, আমি 
বর্‌ং তারই বিহিত করে দিচ্ছি | 

এক নিশ্বাসে কথাগুলে৷ বলেই নিভাঁক বালক কর্মচারী একটি একটি করে 
সর্ধাল্গের অলঙ্কারগুলি খুলে বাধাদানের ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান স্তভিত মাহুষটির 
সামনে বনভুমির আর মাটির উপর অকিঞ্ধিংকর পদার্থের মত অবহেলার সঙ্গে 
ত্যাগ করেই ভ্রতপদে চলে গেলেন। 

নগরের সুখ-দুঃখ লোভ-লাঁলসা, অভাব-অসচ্ছলতার পরিবেশে যে ব্যক্তির 
পুর্ণ যৌবনফাল অতিক্রান্ত হয়েছে, স্বার্থের দিকটাই যে লোক বরাবর লক্ষ 
ফরতে অভ্ন্ত, একটা অসৎ উদ্দেশ্বের প্রেরণাই যাকে অলঙ্কারধারী বাল- 


বালালীল!' ১৯ 


্রক্মচারীর অনুসরণে বনপথে আকর্ষণ করেছিল, সেই অপরিচিত ব্যক্তির 
আল অভিপ্রায়টি যেন জেনে তারই মশ্ুখে এভাবে তাকে অঙ্গের মূল্যবান 
অলঙক্কারগুলি অকাতরে ত্যাগ করে বন মধ্যে প্রবেশ করতে দেখে, আগস্তকের 
পক্ষে অতি বিস্বয়ে . স্তব হয়ে থাক কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। কিছুক্ষণ এই 
অন্ভুত ত্রক্গচারীর যাত্রা-পথের দিকে চেয়ে থেকে নাগরিক ভদ্রলোকটি ভুমি 
থেকে মূল্যবান অলঙ্কারগুলি একটি একটি করে তুলে নিজের উত্তরীয় 
বসনে বেঁধে ফেললেন । তারপর এইভাবে আকশ্মিক অর্থপ্রাপ্তি ভগবানেরই 
অভিপ্রেত ভেবে নগরের দিকে ত্রত পদচালন। করলেন। চলতে চলতে তার 
মনে কেবলই প্রশ্ন জাগতে লাগল--কে এই বালক | আমার মনের গোপন 
তথ্যটুকু সে কি করে বুঝতে পারল ? 

উত্তরকালে অসংখ্য ভক্তের অন্তনিহিত বাসনা অন্তর্ধামীর মত যিনি জ্ঞাত 
হয়ে তাদের কামন] পুরণে সহায় হতেন, সাধনার-পথে পদক্ষেপের গ্রথম 
প্রভাতে অনুসরণকারী লুন্ধ পান্থের আকাঙক্ষা মনে মনে উপলব্ধি করে 
চরিতার্থতার সুযোগ প্রদানের বোধ হয় এই স্থুচনা ! 

ওদিকে সারাদিন ধরে সহর ও সহরতলির বিভিন্ন স্বানে--যেখানে যেখানে 
বাসক পীভাম্বরের গতিবিধির সম্ভাবনা, তন্ন তন্ন করে অন্সন্ধানের পর সন্ধ্যার 
সময় ব্যর্থমনোরথ হয়ে বাড়ীর ও পল্লীর সকলেই ফিরে এলেন। ব্রক্ষচারীর 
দণ্তী-বিসর্জন উপলক্ষে বাড়ীতে কোথায় আনন্দোৎসব হবে, নৃতন ত্রদ্ষচারীকে 
পৰিবেটন করে আত্বীয় পরিজন গ্রীতিভোজের আনন্দ উপভোগ করবেন, 
সে সবই নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়ে গেল । যাঁর জন্য আনন্দ ও উৎসব, সেই 
আনন্দময় শিশু সগ্য-ব্রক্ষচারী পীতা্বরের অস্তর্ধনে যত কিছু উদ্যোগ আয়োজন 
সবই পণ্ড হলো । 

বৃদ্ধ দাত ভেবে স্থির করতে পারেন না, কেন এমন অঘটন ঘটালেন 
ভক্তবৎসল সর্ধসস্তাপহারী আনন্দময় মহাকাল মহেশ্বর ! তিনি যে উজ্জয়িশীর 
অধিষ্ঠাতা দেবতা | এই অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হবার পুরে নিষ্ঠার সঙ্গে তার 
আরাধনা করে অন্তরে আনন্দের আভাষ পেয়ে তবে না তিনি শুভকার্যে ব্রত 
হয়েছিলেন! নিবিদ্বেই সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছিল ; স্বয়ং সবিতা 
যেন অগ্রিদেবতার সংযোগে যজ্ঞস্থলে আবিভু ত হয়ে দিব্য প্রকাশের মধ্য 
দিয়ে পদে পদে শুভস্ুচনার আভায দিয়েছিলেন ; ভবে কেন এমন বিদ্বাট 


০ থাড়খণ্ডের খাধি 


ঘটল! কোথায় গেল তাঁদের পরম গ্রীতি ও স্নেহের ছুলাল 'পীভাম্বর-_ 
চোখের সামনে পুক্তীভুত আধারের আবরণ টেনে দিয়ে কোথায় লুকাল সেই 
চোখের আলো ! 

ছেলের অতীত কথ সব স্মরণ করে আকুল কে জননী নর্শদার কি 
মমন্তদ বিলাপ! আক্ষেপ করে বলতে থাকেন: কি কুক্ষণেই আমি তাকে 
বলেছি্লাম,-.সাধু হয়ে বেরুবার মতলবেই কি এমনি করে পালিয়ে পালিয়ে 
বেড়াচ্ছিস ? আমার সেই কথাই কি সে সার বুঝে নিল? নইলে সেই দিনই 
সর্ধাঙ্গে ছাই ভল্ম মেখে আমার সামনে এসে কেন বললে-_মায়ী, দেখু 
হাম তো সাধু হো গিয়া! 

বৃদ্ধ বললেন: কি ক্ষণে যে কি কথা হয়, আমরা তা বুঝি না। তখন 
দার কথা শুনে আমোদ পেয়ে হেসেছিলাম আমরা, কিন্ত অন্তধ্যামী 
মহাকাল তার খাতায় সেটা টুকে নিয়েছিলেন। সেই থেকে আমাকে সে 
এমন সব কথা জিজ্ঞেস করেছিল, এ বয়সে কোন ছেলের যনে যেগুলো 
ওঠবার কথা নয়। তন্ন তন্ন করে আমার কাছ থেকে সে বারবার নমর্দা 
অরণ্যের খবর জিজ্রেস করেছি'ল। সাধুরা কি করে সে বনে যায়, গেলে 
কি হয়, লে অরণ্য কত বড়, কোথায় তার গোড়া, আর কোথায় শেষ__ 
এমনি নানান, কথা। তখনই আমার বুঝা উচিৎ ছিল, দাহ এ সব জানতে 
চায় কেন? এখন আমি বেশ বুঝতে পারছি মা, সে শহরে নেই--তাহলে 
সারাদিন এত লোকের চোখে ধুলো দিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারত না। 

নধদ| দেবী আকুলকঠে বললেন £ আমারও এই ভয় হয় বাবা, হয় 
তো সে মনে মনে এই মতলব করে দণ্তী-ধর থেকেই দণ্ড হাতে করে 
বিবাগী হয়ে গেছে! হয়তো বাবা__ 

পরের কথাটা মনে উঠতেই মুখে আটকে গেল। অশ্রমুখী হয়ে 
পিভার মুখের পানেই বদ্ধ দ্বাষ্টিতে চেয়ে রইলেন। বৃদ্ধ তখন গাঢম্বরে 
বললেন £ যা ভাবছ, হয় তো তাই সত্য হয়েছে মা, দাহ তার তুর্জয় 
সাহস নিয়ে নর্দার গহনেই প্রবেশ করেছে! 

ব্যাপারটির ভীষণতা উপলব্ধি করে উভয়েই আতঙ্কে শিউরে উঠলেন--. 
উভয়ের মুখ থেকেই একটা চাপা স্বর দীর্ঘশ্বাসের মত শ্বসিয়ে উঠল। 

নর্দার গহন বন-_কি সনু, 





এ 
এ 


রি এ পা রি 
১৫ 6 85১৯, / শি /৭৮ 


বালালীলা ২১ 


যে বনের নাম শুনলেই ভয়ে বুক টিপ টিপ করে, কেউ ওর ত্রিসীমায় 
ঘেঁষে না, পিতু আমার লেইখানে-__উ: ! আর যে ভাবতে পারিনে বাবা! 

বদ্ধ বললেন : ভেবে বা কেঁদে কি হবে মা, তাকে তো ফেরাতে 
পারবে না। আগে তো! এ চিন্তা মাথায় আমেনণি মাঁ_তাহলে সবাই মিলে 
বনেই সেধুতাম। এখন কোন রকমে রাতটা কাটিয়ে কাল ভোরেই সবাই 
মিলে বনযাত্রার ব্যবস্থা করব, যেমন করে পারি তাকে খঁজে বার 
করবই | তুমি মা সন্ধ্যার পুজাহ্নিক সেরে কিছু মুখে দাও। 

খাওয়ার নামে নমর্দা দেবী হাউ হাউ করে কেদে ওঠেন। আজ 
যে দণ্ড ভাসিয়ে বাড়ী ফিরে পীতুকে নিয়ে এক সঙ্গে সকলের ভোঙন 
করবার কথা। সেই পীতুর অন্তর্থানে সবই পও হয়েছে। ফল মিষ্টি দিয়ে 
কোন রকমে গৃহ-দেবতার ভোগ নিবেদন কর] হয়েছে । কিন্ত গৃহবাসী 
সকলেই অভুক্ত আছেন, এমন অবস্থায় অন্ন জল মুখে রুচে না-_ ক্ষুধাতৃষ্ও 
মনে বেদন৷ জানায় না। নূতন ব্রহ্ষচারীকে ছেড়ে কি করে ভার] ভোজনে 
বসবেন । যাই হোক, প্রতিবাসীর! এসে একাভ্ত যত্তববে ও আগ্রহে কোন 
প্রকারে এদের অনশন ভঙ্গ করালেন। তাঁরা সকলেই প্রতিশ্রুতি দিলেন, 
প্রত্যুষেই নর্দার বনে সদলবলে প্রবেশ করে ব্রহ্মচারী পীতাম্বরের অন্বেষণে 
প্ররভ হবেন। 

শয্যার আশ্রয় নিয়েও নর্ধদ1] দেবী মনে শান্তি পেলেন ন1। পুত্র 
পীতু সম্বন্ধে কত চিন্তাই তাঁকে ক্রিষ্টা ও অভিভুতা করে তুলল। গ্ৃহ 
মধ্যে তিনি শয্যায় শয়ন করে আছেন, আর তার পীতু হয়ত রাতের 
আধারে দুর্গম জঙ্গলে গাছের তলায় আশ্রয় নিয়েছে--বনের হিংম্র পত্তরা 
তার আশেপাশে ঘুরে বেডাচ্ছে সেখানে । কে তাকে রক্ষা করবে? তারপর, 
পীতুর গায়ে রয়েছে যৌতুকের জেবর-_ খাটি সোনার অলঙ্কার । লুঠনকারী 
নরপশুরা আঁতিপাতি করে শিকার সন্ধান করে বেড়ায়। গীত তাদের 
নজরে পড়লে, কি হবে? রাক্ষসরা কি তাকে-- 

আর ভাবতে পারেন না নর্ধদা দেবী | প্রাণাধিক গীতুর সুন্দর মুখখানি 
মনোমুকুরে ফুটে উঠতেই কেঁদে ফেললেন, সেই কান্নার আবেগে চোখের 
পাতাগুলিও বুঝি সারাদিনের উদ্বেগ-শ্রাস্ত অবস্থায় ধীরে ধীরে যুদে এলো। 
সেই অভিভুত অবস্থাতেই তার ক থেকে অস্ফুটভাবে আর্তধবনি উঠল £ 


২২ ঝাড়খণ্ডের থাষি 
তুমিই রক্ষা কর মা নর্নদে। পীতু যে নির্ভয়ে তোমার কোলে গিয়েছে-_ 
তুমিই মা হয়ে তাকে দেখো, তার সঙ্গে থেকো ক্ষুধায় তৃষ্তায় আপদে ধিপদে 
সহায় হয়ো মা! 

মাতৃ-হৃদয়ের স্নেহমমত] দরদ সব নিংড়ে প্রাণভর! আকুতি মিনতি নিঃশেষ 
করে সমস্তই বুঝি এক সঙ্গে নদীরূপা মহামায়ীর উদ্দেশে পমর্পণ করে তিনি 
হলেন রিক্তা | এর আগে এমন করে কখনে। তিনি পরমেশ্বরীর উদ্দেশে 
অন্তরের প্রার্থন! নিবেদন করেন নি। প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গেই ভার শোকমথিত 
অন্তর যেন সহস! লঘু হয়ে এল, নেই সঙ্গে কে যেন বীণা-বিনিন্দিত স্বরে তার 
সেই আকুল প্রার্থনার উত্তর দিলেন। কি মিষ্ট সেম্বর! সার! জীবনে তেমন 
মধুব কণ্ঠধ্বনি তার কর্ণযুগল স্পর্শ করে নি। সেই অপুব্ণ ধ্বনির সঙ্গে যেন 
একখানি অভয়পাণি উদ্যত হয়ে তাকে আশ্বাস দিল £ ভয় কি--আমি ত আছি। 
তুমি যে মা, আমিও ত তাই। তোমার পীতু যে আমারো ছেলে-__-আমারই 
আহ্বানে সে এসেছে আমার কোলে | তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার। 

নর্মদা দেবীর মনে হলো! যে, সেই অপুবর্ঁ অভয়বাণীর সঙ্গে সঙ্গে অপরূপা 
ক মাতৃমূতি সুম্প ঞ্ভাবে ভার সম্মুখে আবিভুর্তী হলেন। ত্কার রূপের 
আলোকে ধরখানি যেন ,ঝলমল করে উঠল! পরক্ষণেই কমনীয় দক্ষিণ 
হাতখানি তুলে আহ্বানের ভঙ্গিতে সেই মুতি বললেন : এসো । 

তেমনি স্মধুর স্বর, কিন্ত এমনি তার আবর্ষণী শক্তি যে চুম্বক-স্প্‌ ট লৌহের 
মত তাকে তড়িতবেগে তখনি শয্যা ছেড়ে উঠতে হলো। মুখে বাক্য নেই, 
কথ৷ বলবার শক্তিও বুঝি হারিয়ে ফেলেছেন । টলতে টলতে মূতির অন্থুসরণ 
করে তিনি চললেন । 

ঘরের বাইরে এসে দেখেন, দরজ। উনুভ্ত রয়েছে-_কে যেন খুলে রেখেছে । 
সেই মুক্ত দ্বার দিয়ে পলীর পথে নেমে পড়লেন নর্মদা দেবী । পরিচিত পথ, 
জন-প্রাণীরও অস্তিত্ব নেই। সমপ্র অঞ্চলাটি যেন অন্ধকারের বিরাট গহ্বরে 
ধ্যানমগ্র যোগীর মত সমাধিমগ্র | 

পল্লীপথ থেকে ক্রমে নগরীর আলোকিত রাজপথে উপনীত হ'লেন। 
সারি সারি অরম্য হর্নরাজি, পথের স্থানে স্থানে আলোক শ্তম্ত । পথের সংযোগ- 
স্বলে হয়ত কোনি নৈশ প্রহরী অধ+স্তিমিতনেত্রে বনে বসে দুলছে । এ ছাড়া 
স্বনমানবের আর কোন নিদর্শন নেই! রাজপথ অতিক্রম কবে ক্রমশ: নর্দদা 


বালাদীলা ্‌ | ২৩ 


দেবী তার অগ্রবাতিনী নারীমূত্ির অন্থদরণে এক আলোকহীন অপরিচিত্ত 
অঞ্চলে প্রবেশ করলেন । সাপের মত একে বেঁকে দীর্ঘ পথটি কত পল্লীর 
ভিতর দিয়ে কত অঞ্চলকে প্রদক্ষিণ করে শেষে জনপদের উপকণ পার হয়ে 
বনের সঙ্গে মিশেছে । 

মৃতি এ পর্যন্ত অগ্রবন্তিনী হয়েই চলেছেন , নর্ধদা দেবী বরাবর নীরবে 
তাকেই অন্নুসরণ করছিলেন ছ্বিধাহীনচিত্তে । কিন্তুবন মধ্যে প্রবেশ করেই 
মৃতি সহসা অর্বশ্য হলেন | নর্মদর্দেবী তখন ব্যগ্র দৃষ্টিতে তার পথপ্রদশিকা 
মৃতির উদ্দেশে সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন বনমধ্যে চতুদিকে দৃষ্টি সঞ্চালন করতে 
লাগলেন। সঙ্গে সঙ্গে দিনের আলো ফটে উঠল। সেই আলোকে নর্ধদা 
দেবী সবিস্ময়ে দেখলেন-__মু্ডিত মস্তক এক বালক চলেছে সেই বনপথে : 
তার পরণে পটবস্ত্র, কর্ণে কুণুল, সর্বাঙ্গে অলঙ্কার, হাতে দণ্ড। আনন্দে 
নর্মদ] দেবীর সর্ববাঙ্গ কণ্টকিত হয়ে উঠল, আবেগকম্পিত কষ্ঠে ডাকলেন : 
পীতান্বর! পাতু! বাবা আমার | 

কিন্ত পাতুর মুখে কথ নেই মাতৃ আহ্বানে কোন সাডাই দিলেন না, 
বুঝি সে আহবানবাণী তাঁর কর্ণে প্রবেশ করে নাই । মাতার মনে জাগল 
অভিমান । যার সন্ধানে গৃহ ছেড়ে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে এই গহন বনে 
প্রবেশ করেছেন, তাঁর সাড়া পেয়ে সেই ম্নেছের সন্তান পীতু ফিরেও তাকাল 
না! কিন্ত পুত্রের প্রাতি মায়ের অভিমানের স্থিতি কতক্ষণ ? মনের অভিমান 
সবলে বুকে চেপে এখন তিনি সম্তানকে কোলে নেবার জন্য ব্যাকুল হয়ে 
উঠলেন । এমনি সময়, আর এক ঘটনা তাকে স্তন্তিত করে দিল। তিনি 
চোখ ছুটি কপালের দিকে তুলে দেখলেন-_সেই বনপথের একাংশে ভদ্রবেশ- 
ধারী এক প্রৌঢ ব্যক্তির সম্যুখে দাড়িয়ে তার পুত্র পীতু গায়ের অলঙ্কারগুলি 
একাটি একটি করে খুলে দিয়ে দ্রতপদে গভীর বনের দিকে ছুটছে। 

মায়ের মনে হলো, যাক সব অলঙ্কার! গীতু দান করতে ভালবাসে, 
করুক দান-_তাতে কি হয়েছে? কিন্ত পীতৃকে তো তিনি ছেড়ে যেতে 
পারবেন না! পুত্রকে ধরবার উদ্দেশ্যে এবার ব্যাকুল হয়ে তার কাছে চিনি 
ছুটে যাবার জন্য পা বাড়ালেন। কিন্তু কে যেন অর্বশ্য হাতে তার ছুই 
পায়ে শিকল বেঁধে দিয়েছে- প্রাণপণ চেষ্টা করেও তিনি পদযাত্র অগ্রসর 
হতে পারলেন না। এ অবস্থায় পুত্রকে উদ্দেশ করে চীৎকার করতে উদ্যত 


২৪ ঝাড়খণ্ডের থাষি 


হলেন, কিন্তু কও বুঝি স্তৰ হয়ে গেছে--একটি কথাও নির্গত হলো ন]। 
ওদিকে তার চোখের উপর পুত্র গীতান্বর গভীর বনমধ্যে তখন ক্ষিপ্রপদে 
এগিয়ে চলেছে। 

এই বিমুঢ অবস্থা কি নিদারুণ বেদনাদায়ক! পুত্র বিচ্ছেদ-বেদনাতুরা 
বেপধুমান1 মাতার পুত্রকে নিবারণ করবার কোন শক্তিই নেই | না উঠছে 
এগিয়ে যাবার জন্ত পা, ন৷ ফুটছে ব্যাকুল ক থেকে একটি কথা । 

সহস| এক অপ্রত্যাশিত ঘটন] সমস্ত সমস্যার সমাধান করে দিল। সেই 
উদ্‌ল্াস্ত অবস্থায় বনমধ্যে দীড়িয়ে থেকে তিনি এবার অবাক বিস্ময়ে দুই চক্ষু 
বিস্কারিত করে দেখলেন-_পুর্বের পথপ্রদণিকা নারীমৃতি সহসা বনপথে 
অগ্রগামী পীতান্বরের সামনে এসেই সন্বেহে তাকে কোলে তুলে নিলেন। 
তারপর তিনি নর্দদা দেবীর দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে চেয়ে পুর্ববৎ মধুর কে 
বললেন ; তোমার ছেলে আমার কোলে উঠেছে-_কিসের ভয় ? আমিও যে 
তোমারই মত মা-_আমি যে নদ]! 

বিপুল আনন্দে এতক্ষণ পরে নর্দা দেবীর বুকখান। ছলে উঠল, পুত্রের 
এই পরম সৌভাগ্য তাকেও যেন অপুর্ব এক পুলকে অভিভুত করে দিল। 
হাত হু'খানি যুক্ত করে তিনি সেই মঙ্গলময়ী মাতার উদ্দেশে কি যেন বলবার 
জন্য বেপমান কঠে সর্বশক্তি প্রয়োগ করলেন। কিন্তু বাণী নির্গত হলে! 
না, তাঁরই কানে বাজল ম্রেহময় বৃদ্ধ পিতার কণ্ঠের সন্মেহ স্বর : 
নরা্দা-_ম]| 

পরিচিত শ্বরের প্রভাবে নর্ধদ1 দেবীর অভিভূত অবস্থার অবসান হলো । 
অবাক বিস্ময়ে বিহ্বলভাবে তিনি দেখলেন, নিজের ঘরে শয্যাত্তেই তিনি 
শুয়ে আছেন__দ্বারদেশ থেকে পিতা ডাকছেন : ওঠ মা, আমর] গীতুর 
সন্ধানে নর্দার অরণ্যে চলেছি । 

ধড়মড় করে শযা! ছেড়ে উঠে নর্মদা দেবী কম্পিত কঠে বললেন £ না, 
না বাবা, আর সেখানে যাবার প্রয়োজন নেই । 

পবিস্ময়ে পিতা জিজ্ঞাসা! করলেন ; কেন মা? কি হলে? 

গাঢ়স্বরে নর্দা দেবী বললেন £ পীতুকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব 
না খাবা! সে চলেছে মা-নর্দার ডাকে তারই উদ্দেশ্যে | দেবী নর্্দা 
ডাকে কোলে তুলে নিয়ে আমাকে অভয় দিয়েছেন । আমি দিব্য দৃষ্টিতে সে 


বাল্যলীলা ২৫ 


দ্বশ্য দেখেছি বাবা, দেখে নিশ্চিন্ত হয়েছি, পীতুর জন্তে আর আমার ভয় 
ভাবন। কিছুই নেই । 


চার 


ওদিকে বাল-ব্রহ্মচারীর গতির বিরাম নেই। অঙ্গের অলঙ্কারগুলি লু 
পাস্থের সম্মুখে ত্যাগ করে সেই যে তিনি নর্ণদার উদ্েশে পদচালনা করেছেন, 
কোথাও তার ছেদ পড়েনি । পশ্চাতের পদচিহৃগুলি ক্রমেই অদ্বশ্য হচ্ছিল, 
বালকের দৃষ্টি শুধু সম্মুখে__ভুলেও একটিবার পিছনে সে দৃষ্টি পড়েনি কিনা 
পথশ্রমের ক্লান্তি তার শ্রান্ত চরণদুটিকে অল্প একটু অবসরও দেয়নি । 

্রন্মচারীর দু সঙ্কল্প, নর্শদার পুত বারী স্পর্শ করবার পুর্বে কোথাও বিশ্রাম 
করবেন না, ক্ষুধা তৃষ্ণকে প্রশ্রয় দিবেন না। প্রখর মধ্যাহ্ন মাথার উপর 
দিয়ে চলে গেল, দুর্গম বনপথে অনভ্যন্ত কোমল ত্বুটি পদ কণ্টকাঘাতে ক্ষত 
বিক্ষত, তথাপি তার জক্ষেপ নেই | মাঁঝে মাঝে শুকর, ভলুক প্রভৃতি ছু' 
একটি বন্য শ্বাপদ বিত্যুদ্বেগে বালককে অতিক্রম করে গেল, এক সময় একটা 
চিতাবাঘ এই মুণ্ডিতমস্তক গৈরিকবাস ও দণ্ধারী অপুর্ব বনচারীর দিকে 
সচকিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করেই সন্িহিত ঝোপের মধ্যে শ্রবেশ করল; তথাপি 
বালকের মুখে আতঙ্কের ছায়| পড়ল না অন্তর মধ্যে অধিস্বাপিত্তা মাতৃরূপা 
নর্নদা মৃতি স্মরণ করে তারই ধ্যানমগ্র হয়ে তিনি চলেছেন--পামনের দিকে 
নদীকে উদ্দেশ করে একইভাবে এগিয়ে চলেছেন । 

যে অনুভুতির অন্থসরণ করে ত্রঙ্মচারীর এই বিরামহীন যাত্রা, দিনাস্তে 
তা সার্ক হলে! । নিরবচ্ছিন্ন নিবিড় অরণ্যশী্ দিয়ে অস্তমিত সুর্ধের ঘ্রান 
স্বর্রশ্মির সঙ্গে পুণ্যসলিল! নর্মদার রজত-বেখাটির সংযোগে যে অপরূপ 
দ্বশ্যের উদ্তব হয়েছিল, ত্রহ্মচারীর মুগ্ধ দ্বষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট হতেই ক থেকে 
উললাসের সুরে ধ্বনি উঠল-_'জয় মা নর্দে' ! উন্মন্তের মত তিনি সেই 
দিকে অগ্রসর হলেন । 

তীরবতাঁ বিক্ষিপ্ত উপলখণ্ড এবং অন্যান্ত প্রতিবন্ধক অতিক্রম করে 
অবশেষে ব্রহ্মচারী সেই বন্ুবাঞ্চিতা তটিনী নর্ধদার পুপ্যসলিল স্পর্শ করে, 
সেই সঙ্গে প্রতপ্ত মুণ্তিত মস্তকটির উপর পুণ্যবারি সিঞ্চন করে যেন সারাদিনের 
ক্লান্তি ও শ্রাস্তি মোচন করতে করতে ধীরে ধীরে নর্দা বক্ষে নিমগ্ন হচ্ছেন | 


২৬ ঝাড়খণ্ডের থাষি 


অমনি বালকের মনেও আকাজক্ষা জাগল, অবগাহন স্ান করে পরিতৃপ্ত 
হতে। সঙ্গে কৌপিন ও উত্তরীয় বসন থাকায় শানে অস্ুবিধ। 
ঘটল না। ক্সানান্তে পথশ্রমে ক্রাস্ত ও অনশনে শুফ মুখখানিও 
যেন তৃপ্তির আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। এমন সময় মনে 
পড়ে গেল, ত্রম্মচাৰীর কর্তব্য মধ্যাহ্নের সন্ধ্যাবন্দন। কিছুই যে হয় নাই। 
তার ইচ্ছা হচ্ছিল, অঞ্জলি ভরে নর্দার নির্চল স্ষিপ্ধ বারি পান করে তা 
দুর করবেন। কিন্ত অসমাপ্ত মধ্যাহৃকত্যের ক্রটি সেই মুহুর্তে ব্রহ্মচারীকে 
এমনি অধৈর্ধ করে তুলল যে, তার প্রভাবে ক্ষুৎপিপাস। যেন প্রবল ল্বোতের 
মুখে তৃণখণ্ডের মত ভেসে গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ কর্তব্য পালনে অবহিত 
হলেন, উদাত্ত কণ্ঠে আব্বত্তি করতে লাগলেন : 

অসতো মা সদগময় | 

তমসা মা জ্যোতির্ময় । 

মৃত্যামাহম্বতঙগময় 

আবিরাবি ম এধি। 

রুদ্র যতে দক্ষিণং মুখং। 

তেন মাং পাহি নিত্য:-_- 

সন্ধ্যা বন্দনার পর ত্রহ্মচারীর দ্বাটি সহসা নদীর উপকুল থেকে উপরের 
দিকে পড়তেই তিনি সবিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। এ পধ্যন্ত দী্থ পথ 
পরিক্রমায় হু' চারটি বন্ত অন্ত ভিন্ন কোন মনুষা-মূতি তার চোখে পড়েনি। 
কিন্ত একেবারে দিনের শেষে নদী তীরে তিনি এই প্রথম দেখলেন-_স্দর্শন 
এক প্রো! নারী গ্রীতি-প্রসন্ন-মুখে তাকে লক্ষ্য করছেন, তাঁর সঙ্গে রয়েছে 
স-বৎসা! এক পয়স্বিণী ধেন্ু। হৃষ্টপুষ্ট বাছুরাটি মাতৃদুগ্ধ পান করে আনন্দে 
ছুটাছুটি করছে-_-তার মুখ থেকে হ্ুধের ফেনা তখনে৷ নিশ্চিহ্ন হয়নি | 
আানান্তে সন্ধা। বন্দনার পর শুচিতা অনুভবের পরেই এভাবে স-বৎসা ধেন্গু 
ও মাতৃসমা নারী দর্শন করে ব্রহ্মচারীও নিজেকে ধন্য মনে করলেন। কিন্তু 
তিনি বুঝতে পারলেন না, এমন নির্ভন বসতিবিহীন স্থানে ধেন্্ নিয়ে 
মহিলাটি কার প্রতীক্ষা করছেন, আর--তাঁর দিকেই বা এমন লেহপুর্ণ দৃষ্টিতে 
তাকিয়ে রয়েছেন কেন ? 
কিন্ত সেই নারীই বালক-মনেক সমস্যা দ্ূর করে দিলেন। তিনিই 


ধালালীলা ২৭ 


বললেন: আমাকে এখানে এভাবে দেখে তুমি বাছ। খুবই আশ্চর্য হয়েছ 
মনে হচ্ছে। আমি অনেকক্ষণ হলো এসেছি, গোরুকে জল খাইয়েছি, 
নর্শদ1 মায়ীকে রোজকার বরাদদ এক লোটা হুধ দিয়েছি, তুমি আহিক 
করছিলে-_কিছুই ওসব দেখনি ; তাই ত আমিও উপরে এসে তোমার জন্তেই 
দাড়িয়ে আছি। 

ব্রহ্মচারী বললেন হ আমার জন্তে দাঁড়িয়ে আছ? কেন ম1? 

নারী উত্তর করলেন; তোমার আহক দেখছিলুম বাবা! তোমার 
মত ছেলেত এখানে কখনো দেখিনা, আক্ত দেখে ভারি আনন্দ হুলো]। 
তোমার সঙ্গে দুটো কথা না বলে কি যেতে পারি বাবা ? 

বালকের চিত্ত আনন্দে যেন নেচে উঠল; মনে পড়ল, ম্মেহময়ী মায়ের 
কথা । তারই মত নির্গল স্বেহে এই অপরিচিতাও যেন তাঁর দেহ মন 
ভ।রয়ে দ্দিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন ব্রহ্মচারী প্রচুর ব্যগ্রভাবে : তুমি কোথায় 
থাক মা? 

নারী বললেন £ এইখানেই । দেখছ না__গোরু বাছুর নিয়ে বেবিয়েছি । 
বললুম তো আগেই, রোজ এই পময় এসে হুধ ছুয়ে আগে এ বেটিকে- 
যার কাছে তুমি দাড়িয়ে আজ বাছা, ওর মুখে ঢেলে দিই। গোরুর বাঁটে 
এখনো ঢের হুধ আছে, তুমি খাবে? 

ব্রহ্মচারী বললেন : আহক সেরে আমি ভাবছিলাম, আঁচলা ভরে জল 
খাব। আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে কিনা! 

নারী সহান্গভুতির সরে বললেন : তোমার মুখ দেখেই বুঝেছি বাঁছা__ 
সারাদিন খাওয়া হয়নি, মুখখান] শুকিয়ে গেছে_-আহা । উপরে উঠে এসো 
বাবা, জল খেতে হবে না-_ছুধ খাবে । লঙ্দা কি? মনে কর আমি 
তোমার মা। 

্রক্মচারী বললেন £ দুধের আশ! ত আমি করি নি, তাই ভেবেছিলুম 
জল খেয়েই 

অন্ুযোগের সুরে নারী এবার বললেন ; বোকা ছেলে কোথাকার । 
জলে ন1 হয় পিয়াসাই কাটল, কিন্ত ক্ষুধা? জল খেয়ে কি ক্ষ্ধাকে ঠেকান 
যায়? কিন্তু দুধ যে ক্ষুধা তৃষ্জ| দুটোই আসান করে| উঠে এসে! বাব! ! 

অগত্যা ক্রক্মচারীকে সে ত্সেহের আহ্বান স্বীকার করে উপরে উঠে 


২৮ ঝাড়খণ্ডের ধষি 


আসতে হলে । নারীও আর কোন কথ] না বলে লোটা্টি পেতে দুধ 
ত্ুইতে বমে গেলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই পাত্রটি দুধে ভরে গেল। 
সেই ধারোঞ দুধে পুর্ণ পাত্রটি ত্রক্মচারীর হাতে দিয়ে গাঢ় স্েহের সুরে নারী 
বললেন * খাও বাবা, সবটুকু খাওয়। চাই কিন্ত; যদি আরও খেতে পার, 
আবার ছুয়ে দেব। 

ত্রক্মচারীর মনে হলো, গৃহে মায়ের কাছে বসেই যেন তার দেহের 
শাসনাধীনে রয়েছেন । তেমনি মধুর স্ষেহ, সেই সঙ্গে মৃত শাসন--কোন 
প্রভেদ নেই । যেন ত্তার গর্ভধারিণী জননী এই নারীর মৃতি ধরে 
ক্ষুৎ-পিপাসাভুর সম্ভানকে পরিতৃপু করতে উপস্থিত! 

লোটার দুধ সবটুকুই নারীর ন্সেহের শাসনে পান করতে হলো; পুনরায় 
দুগ্ধ দোহনের প্রয়োজন হলে! না। পানান্তে তৃপ্ত হয়ে ব্রহ্মচারী বললেন £ 
মায়ী, আমার ক্ষুধা তৃষা! সব মিটিয়ে দিলে তুমি । কিন্ত আমি তোমার 
ধরণ কি দিযে শোধ করব, আমি যেরিক্ত, নিস্ব। 

নারীর চোখে-মুখে পুনরায় লেহের শাসন ফুটে উঠল । একটু খরস্বরে 
বললেন £ আরে বোক] ছেলে। মায়ী বলে, আবার দেনা! পাওনাব কথা 
তুলে মায়াকে কষ্ট দিতে হয়? মায়াদের তে! এই ধন্ম। যেমন 
নর্মদা-মায়টর জলে দুধ টালি, তেমনি এখানে কাউকে দেখলে তাকেও 
দুধ খাইয়ে তৃপ্তি পাই । আচ্ছা! বাছা, আযি এখন চলি। তুমিও যখন 
নর্দা মায়ীর পরশ পেয়েছে আর ভাবনা নেই | পথের সম্ধানও এবার 
মিলবে বাছ্‌। ! 

কথাগুলি ন্েহের স্তরে বলে ক্রক্মচারীর প্রফুল্ল মুখখানির পানে আর 
একবার নিগ্ধদৃ্টিতে চেয়ে ধেন্থ নিয়ে নারী বনের দিকে চললেন ॥ বৎসাটিও 
চঞ্চন ভঙ্গিতে ভার অন্গুসরণ করল। 

্রশ্মাচারীও নিবদ্ধ দ্বাটতে সেই দিকে চেয়ে রইলেন । এতক্ষণে তার 
মনে প্রশ্ন জাগল--এ নারী কে? তাইত, পরিচয় ত কিছু দিলেন না, আর 
তিনিও ত ভাল করে জিজ্ঞাসা করেন নি! তৎক্ষণাৎ কি ডেবে তিনি সবলে 
মনের কৌতৃহল্কে দমন করে সংযত হলেন; তার বিবেক যেন এই সময় 
তাকে সতর্ক করে দিল-__ সংসারের সকল বন্ধন ও প্রলোভন ত্যাগ করে 
যাকে অনির্দিষ্ট পথে পাড়ি দিতে হচ্ছে, তার পক্ষে কারও সম্বন্ধে কোন- 


ধালযলীল। ২৯ 


রকম কৌতুহল প্রকাশ করা উচিৎ নয়| যে দেবীর উপর নির্ভর করে 
এই দুস্তর পরিক্রমা যাত্রা-সবই তার লীল! ভেবেই স্থির থাকতে হবে । 
নয় বছর বয়স্ক বাঁলক-মনের এই তিতিক্ষা কি বিস্ময়াবহ ! অতংপর 
যাত্র।র জন্ত ক্রক্মচারী দণ্ডটি হাতে নিয়ে উপলাকীর্ণ পথে যেই পদার্পণ 
করেছেন, অমনি তাঁরই পরিচিত ও নিত্য-পঠিত বেদবাণী পশ্চাদ্ধতাঁ বনভুমি 
হতে বাযুপ্রবাহে সঞ্চারিত হয়ে তার কানে ঝঙ্কার তুলল £ 
অগ্রেনয় স্ুপথা রায়ে অল্মান্‌ 
দেব বয়ুনানি বিদ্বান্‌ । 
যুযোধধ জ্যহর্যণমেনে! 
ভুয়িষ্টং তেনয্‌ উক্ভিং বিধেম । 
উতৎকর্ণ হয়ে স্থিরভাবে ফ্রাড়িয়ে ব্রদ্চারী উদাত্ত কের এই বেদবাণী 
শুনতে লাগলেন । তবেকি নির্ভন বনপথে দেবীর প্রসাদে কোন পধ্যটক 
তার পথের সাধী হতে আসছেন ? মনে তত্ক্ষণাৎ সেই স্নেহময়ী নারীর 
কথা__-পথের সন্ধানও এবার মিলবে বাছ।! 
সেই সন্ধান দিতেই কি কোন সহায়ক আসছেন সাথী হবার উদ্দেশ্যে? 


পাচ 


বালকের অন্থমান অবিলম্বেই সত্যে পরিণত হলে।। তিনি দেখতে 
পেলেন-_পরম স্ন্দর ও শ্রীমান, দণ্ডকমণ্ডলুধারী দীর্ঘান্কতি এক তরুণ ত্রক্মচারী 
অদুরবতাঁ বনভুমির ভিতর দিয়ে নর্নদাতীর লক্ষ্য করে ক্ষিপ্রপদে এগিয়ে 
আসছেন | আগন্তক ত্রঞ্গচারীও বালক ব্রক্ষচারীকে লক্ষ্য করেছিলেন । 
উভয়েই চমতকত। নিকটে এসেই যুব ব্রহ্মচারী সহসা বিস্ময়ের স্বরে বলে 
উঠলেন £ আরে--ভারি আশ্চর্য তো । এই বয়সেই তুমি নর্ণদ] পরিক্রমায় 
বেরিয়েছ ? 

বালক ত্রহ্মচারীবর প্রসন্ন মুখখানির উপর সহসা যেন গান্তীর্যের ছাপ পড়ল, 
সেই সঙ্গে গাঢস্বরে তিনি বললেন হ মহাজ্বা ফ্ব আমার চেয়েও অল্প বয়সে 
কঠোর সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন । আমার তে৷ এ-পথে সবেমাত্র হাতে 
খড়ি হয়েছে। 

উৎফুল্পম়ুখে যুব! বললেন : সাধু, সাধু! তিন বছর ধরে আমার এই 


৩০ ধাড়খণ্ডের খাষি 


পরিক্রমা চলেছে , কত বাধ! বিদ্ব পেয়েছি, কত বিপদ অতিক্রম করেছি, 
কত আশ্চর্ধ বাপার দেখিছি, কিন্তু এমনটি বুঝি আর দেখিনি! প্রায়ই 
নর্দামায়ীকে জানাই-_যেন একজন সাথী মিলে যায় । কিন্তু আজ যে তারই 
সামনে এমন সংযোগ হবে, সেট! ভাবতে পারি নি। এমন একটি অস্ভুত 
সাথা পাওয়], মায়ীর দয় ছাড়া কি সম্ভব! 

বালক তার ডাগর ভাগর চোখ ছুটি মেলে স্থির দৃষ্টিতে ত্রক্মচারীর পানে 
চেয়েছিলেন । কথাগুলি শুনতে শুনতে মনটি ভার আনন্দে যেন ভরে গেল । 
সি্ঘস্বরে বললেন : তাহলে আমাকেও বলতে হয় সাধুজী, মায়ী আমাকেই 
কপা করেছেন। আমি যে একমাত্র তারই উপর নির্ভর করে দর্তীঘর থেকেই 
পরিক্রমার পথে বেরিয়ে পড়িছি। কাণে শোনা ছাড়া চোখে দেখবার মত 
কোন শিক্ষা আমি পাইনি, পথ-ঘাট কিছুই আমার জানা নেই | শুধু এই মাত্র 
জানি-_-আঁমাকে যেতে হবে, আমার সঙ্কল্প অপুর্ণ রাখলে চলবে না-_পুর্ণ 
করবার শক্তি মাধীই কৃপা করে দেবেন। তাই মায়ী আপনাকে মিলিয়ে 
দিলেন আমার সঙ্গে । 

হর্ষোৎফ লমুখে যুবক বললেন ; সত্যিই তুমি অনস্ভুত ছেলে,__এই বয়সেই 
পরমাত্বীর উপর নির্ভর করতে শিখেছ । সত্যিই ভাই, এই যে পরিক্রমা-_ 
মাসের পর যাপ, বছরের পর বছব ধরে--নদীরূপে পরযাত্মাই তাতে সিদ্ধি 
দিয়ে থাকেন | তার কৃপা ভিন্ন এ সাধন] সিদ্ধ হয় না। 

কথা বলতে বলতে যুব! সাধু সহসা সচকিতভাবে বলে উঠলেন : এই দেখ 
আমার কাণ্ড! এই দিকেই মাষীর দেখা পাৰ ভেবে হাওয়ার মতন ছুটে 
আসছিলাম এতক্ষণ, কিনাঁরার আভাস পেয়ে কি আনন্দ; কিন্তু কাছে এসেই 
ভোমাকে দেখে সব ভুলে গেছি । দেখছি, তোমার স্নান আহ্মিক হয়ে গেছে * 
তুমি ভাই এখানে একটু অপেক্ষা কর, আমি নদী-মায়ীকে পরশ করে লম্বা! পথ 
চলার শ্রান্তিটা কাটিয়ে আসি | 

বলতে বলতে ঝোলাঝুলি সেখানে নামিয়ে রেখে একখণ্ড গৈরিক বসন ও 
কমণ্ুপ্পটি নিয়ে আগন্তক যুবক নদী অভিমুখে অবতরণ করতে লাগলেন । 
বালক রঙ্মচারীও প্রক্কতিসিদ্ধ সায়স্তনী কর্তব্যে অস্থুপ্রাণিত হয়ে তটভুমির 
উপর উপলরাশিকেই আসন করে পুনরায় পরমাত্বার উপাসলায় আত্মনিয়োগ 
করালেন | 


বালযলীল। ৩১ 


খানিক পরে ত্রানাহিক সেরে যুবা ব্রহ্মচারী উপরে উঠে এসে দেখলেন, 
বালক তন্ময় হয়ে উপাঁসনায় নিমগ্ন । এ অবস্থায় তিনি বালকের ধ্যান ভঙ্গ না 
করে তাঁর পাশে বসে এক্ুষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে তার সেই ধ্যানমগ্রজ্যোতিঃক্ষিগ্ক 
মুখখানি দেখতে লাগলেন | ফলে, তিনিও যেন বাল-ব্রক্মচারীর ভাবাবেগে 
আকৃষ্ট হয়ে তারই পাশে আসন করে বসে উপাসনায় লিপ্ত হলেন। 

যখন তাদের ধ্যানভঙ্গ হলো, অনেকখানি রাত্রি হয়েছে। যুবক তার 
কমণ্ডলুর জলে মুখ ও চক্ষু প্রক্ষালন করে, বালকের দিকে সেটি এগিয়ে দিয়ে 
বললেন : আ্নাহ্নিক সেরে এখানে এসে দেখি, তুমি নিবিষ্টমনে ধ্যান করছ। 
ধ্যানভঙ্গ করা অন্থুচিত জেনে, আমিও আর একদফা ইষ্টের আরাধনায় বসে 
যাই | অনেক রাত হয়েছে _ প্রায় গ্বিপ্রহর | তুমি চোখে মুখে জল দাও । 
আমার ঝুলিতে কিছু ফল আঁছে, ছাজনে তাই আহার করে আজ এখানেই 
মায়ীর আস্তানায় রাব্রিবাস করব । ৃ 

উৎফুল্ল মুখে বালক বললেন £ আপনার কথায় আমার মনে পড়ে গেল, 
পরিব্রমার পথে নদী পড়লে, তাঁরই তীরে নদীর দিকে মুখ করে রাত্রিবাসের 
বিধি । কিন্তু আমি এমনি বোকা, নদী দেখে, তার জলে নেমে ত্বন করে, 
আবার পরিক্রমার জন্তে বনের দিকে যাচ্ছিলাম । আপনার স্তোত্র শুনে আমি 
স্তব্ধ হয়ে ফ্াড়িয়ে পড়ি আর এগুনো হয়নি । আপনার কৃপাতেই আমার 
তপস্যা ভঙ্গ হয়নি। 

বিস্ময়ের সুরে যুবা স্বধালেন 2 তপস্যা]? 

বালক স্ব হেসে উত্তর দিলেন ; আমি তো৷ জানি সাধুজী, নর্ধদামায়ীর 
এলাকা পর্যটন করাই রীতিমত একট] তপস্তা | পাহাডের গুহায় বসে একমনে 
তপশ্যার চেয়ে এই পরিক্রমা! আরে কঠিন । দেখুননা রোদে বৃষ্টিতে চলার 
সময় পাঁতুকা বা ছাতা ব্যবহার চলবে না, লোকালয়ে থাকা নিষেধ, পথে কোন 
নদী নালা খাল বিল পড়লে সাতার দিয়ে পার হতে হবে, তারপর ভাগা ক্রমে 
নর্মদাজীর দর্শন মিললে, আর সেখানেই রাত হলে তারই কোলের কাছে 
আসন পেতে রাতটি কাটানো চাই-_ এখানে ঘুষাবারও বিবি নেই । যদি কোন 
ব্যাপারে ভুলচুক হয়--তাহলে এত কষ্টের পরিক্রমা! তখনি ভেঙ্গে যাবে, 
আবার গোড়া থেকে সক করতে হবে । বলুন তে!, এ ওপস্যা নয়? 

যুব! মুগ্ধ দৃষ্টিতে বালক-সঙ্গীর ন্িগ্ধ মুখখানির দিকে চেয়ে তার কথাগুলি 


৩২. ঝাড়খণ্ডের খষি 


শুনছিলেন। শুনতে শুনতে অভিভুতের মতই বালকের কথাগুলি সমর্থন 
প্লুরে তিনি দ্স্বরে বললেন : ঠিক কথাই তুমি বলেছ ভাই! আমাদের এই 
নর্দা পরিক্রমা তপস্তাই বটে! শুনে আমি আশ্চর্ধ হয়ে ভাবছি, এত অল্প 
বয়সে তুমি পরিক্রমার বিধিনিষেধ সব জেনে এভাবে অভিজ্ঞ হয়ে পড়েছে! 
উপযুক্ত গুরুর কাছে দীক্ষা না পেলে তো এজ্ঞান হয় না। তোমার গুরু কে 
তাই--কফোথায় ভার আশ্রম? 

বালক তৎক্ষণাৎ অসঙ্কোচে উত্তর দিলেন £ আমার গুরু ভগবান, তিনিই 
আমাকে দীক্ষা দিয়েছেন, আর সে দীক্ষার মন্ত্র হচ্ছে--নর্ণদ1 পরিক্রমার বিধি । 
আমি কেবলই প্রার্থনা করি ভার কাছে, আমি যেন কোনদিন পথত্রষ্ট না হই | 

যুব বললেন : ভগবান তো মানুষ মাত্রেরই অন্তরে থাকেন, যে ভাগ্যবান 
সেই সেটা বুঝাতে পেরে নিজের জ্ঞান বুদ্ধি বিবেক সব শুদ্ধ করে নেয।| কিন্তু 
তিনি তে। আর দেখ। দিয়ে মুখে কিছু বলেন না। তার কপা হলে যোগ্য 
গুরু মিলে যায়, তিনিই তাকে দীক্ষ1 দিয়ে পথ দেখান । সন্গ্যাসী হতে হলে 
তাই গুরুকে প্রয়োজন হয় । তিনিই জ্ঞানের আলোটি জ্বেলে দিয়ে অন্তরের 
অন্ধকার কাটিয়ে দেন! গুরু নির্দেশ ছাড়া কোন তপশ্যাই সিদ্ধ হয় না ভাই ! 

বালকত্রহ্গচারী নিবিষ্টমনে কথাগুলি শুনলেন ; কিন্তু তারও অস্তর-মধ্যে 
সহজাত সংস্কারের এমন একটি আলোক-শিখার আভা এই বয়সেই তিনি 
অনুভব করে থাকেন যে, তার প্রভাবে মনের বদ্ধমূল ধারণ আরও দৃঢ় হয়ে 
ওঠে। তাই যুব৷ ব্রহ্মচারীর যুক্তিপুর্ণ উক্তিগুলির উত্তরে তিনি বললেন : 
দেখুন, গুরুর কাছে যদিও দীক্ষা নেবার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্ত আমি শুনিছি, 
উপনয়ন সংস্কারের পর দগগুহ থেকে তপশ্যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবার 
অগ্রিকার প্রত্যেক ত্রক্মচারীর আছে । কোন বিধিনিষেধ এখানে নেই-_ 
গরমাত্মাই তাকে পথ দেখান | 

সুঝা বললেন £ কথাটা গ্ভিক ; তবে এ সম্বন্ধে আরও একট কথ) আছে : 
সেই ব্রহ্মচারী কিন্ত আর কখনে। গৃহস্থাশ্রমে ফিরতে পারবেন না । তাহলেই 
তিনি হবেন পতিত । 

স্বর হেসে বালক বললেন : দেখুন, আমি বালক, বয়স অল্প, এই বয়সে 
যতখানি বিচ্ক। শিক্ষা করা উচিত ছিল, তাও শিক্ষা) হয় নি। কাজেই এইসব 
উঁচুদরের কথ! নিয়ে ভর্ক করবার মণ জ্ঞান বুদ্ধি আমার নেই । তবে উপনয়ন 


বাল্যলীলা ৩৩ 


সংস্কারটি এমন জিনিষ যে, সঙ্গে সঙ্গে ত্রক্গচারীর মনের সংবুদ্ধিটি আরে! 
উজ্জ্বল করে দেয়। তা! থেকেই আমার মনে এই লঙ্কয্প জাগে যে, আর কিছু 
না পারি--চিরত্রক্মাচারী হবার ব্রত নিয়ে দণ্তীঘর থেকে যাত্রা করবার অধিকার 
সস্ভ ব্রহ্মচারী মাত্রেরই আছে। এতে প্রয়োজন-__মনোবল, আর পরমাস্থার 
উপর বিশ্বাস। এর পরেই রয়েছে পরম তপস্যার উপায় --নর্শদাজীর পরিক্রমা । 
তবে আর কি চাই বলুন | সেকালের মুনি থষিদের মত বনে পাহাড়ে গিয়ে 
তপম্য। স্বর করা সোজা! কথা নয়; চাই গুরু, দীক্ষিত দেহ, তপশ্যার মন্ত্র, 
আরও কত বিধিনিয়ম-_কি রকম সব ন্যাটা বলুন ত। তারপর, বালক দেখে 
হয়ত ভাগিয়ে দেবেন, নয়ত, ধরে বেঁধে বাড়ীতে পাঠিয়ে দিয়ে হিতকারী 
সাজবেন। তাই ভাবলাম, এসব হাকঙ্গামায় না গিয়ে, বাল ব্রক্গচারীর ক্ষমতায় 
যা সম্ভব, তাই করি না কেন! সেইজন্তই তে! এই তপশ্যায় লেগে গেছি। 
এতে গুরু, মন্ত্র, দীক্ষা, বিদ্যা, কিছুরই প্রয়োজন নেই : শুধু সাহস, মনের 
জোর, আর ভগবানের উপর বিশ্বাস থাকলেই হলো ৷ এ তপস্যা যদি নিষ্ঠার 
সঙ্গে চালাতে পারি, বাধ! বিদ্ব হ্'হাতে ঠেলে নর্মদাজীর কোলে ওঠাই লক্ষ্য 
রাখি--ভাহলে সবই পাঁওয়। যাবে, এ যে গুরু মন্ত্র দীক্ষা জ্ঞান-_সবই আপনি 
এসে যাবে। 

কথাগুলি শুনতে শুনতে যুবক ব্রন্মচারী ভাবছিলেন__বয়সে কত ছোট, অথচ 
এই শিশুর আব্বজ্ঞান কি প্রবল ! প্রতি কথাটি যেন মন্ত্রের মতন শক্তিসম্পন্ন 
ও তেজময়। তিনি তো অনেক আগেই গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছেন, তার 
আগে বিদ্তা শিক্ষারও সুযোগ ঘটেছিল ; এদিকেও পুর্ণ ছুটি বছর ধরে 
নর্্দা পরিক্রমার ব্রত নিয়ে ছুটাছুটি করে বেড়াচ্ছেন । কিন্তু পেয়েছেন 
কি? গুটিকতক সোজা কথায় সগ্ভোপরিচিত এই বাল-ত্রহ্মচারী সন্নযাস- 
জীবনের কমযোগটি কি শুন্দরভাবেই বুঝিয়ে দিলেন! সত্যই ত, এই বালক 
যে কর্মে গভীর নিষ্ঠায় প্রবৃত্ত, তাই যে কঠিন যোগ, তারই মধো কঠোর 
তপন্য। ! 

্রক্মাচারীর মনে পড়ে -গুরুর কথা, দীক্ষা গ্রহণের সঙ্গে জ্ঞানগর্ভ কত 
উপদেশ । কিন্তু তৎক্ষণাৎ তার মুখখান] কঠিন হয়ে ওঠে, তার উপর ঘনিয়ে 
আসে অবিশ্বাস ও বিরক্তির ছায়া । যে-গুরুর নিকটে তিনি দীক্ষিত, সাধন 
ভঞ্জন সন্বদ্ধে যিনি বহু উপায় ও যৌগিক প্রণ।লীগুলির নির্দেশ দিয়ে একদ! 


৩৪ ঝাড়খণ্ডের ধাষি 


তাকে ধন্ত ও বাধিত করেছিলেন, এখন সেই গুরুর মূতি তাঁর স্থৃতিপথে 
জাগরিত হলেই তিনি যেন আতঙ্কে শিউরে ওঠেন এবং মনে মনে তৎক্ষণাৎ 
রাম নাম স্মরণ করে গুরু-নাম-স্মরণ-জনিত অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে চান! 
বয়োজোষ্ঠ ব্রক্মচারীর মনের এই ভাবাস্তর বাল-ত্রন্মচারীর তাক্ষ দৃষ্টিতে ধরা 
পড়ে গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ অসঙ্কোচে জিজ্ঞাসা করলেন: আপনি যে 
চুপ করে রইলেন? আমার কথাগুলো বুঝি ভাল লাগেনি আপনার, তাই 
মুখখানা ভার করে রইলেন--কিছু বললেন না? 

যুবক একথার উত্তরে দিব্য শান্তস্বরে বললেন; তোমার কথাগুলিই 
আমি মনে মনে ভাবছিলাম ভাই: নিজের মন থেকেই তুমি আত্মশুদ্ধির যে 
মিদেশ পেয়েছ, অনেক পড়া শোনা, ধ্যান, ধারণা, সাধন ভজনেও যা মেলে 
না। তোমার কথাই ভাবতে ভাবতে আমি বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম | 

বালক পুনরায় স্বধালেন £ কিন্তু আমার মনে হলো, কথাগুলো শোনবার 
পর আপনার অমন সুন্দর মুখখানা যেন কালো হয়ে গেল! ভাই 
ভাবছিলাম-_-বুঝি আমার উপর রাগ করেছেন । 

যুবক ত্রদ্দচারীর পক্ষে আর আত্মদমন সম্ভব হলে। না, তিনি এখন বেশ 
প্রশন্নভভাবেই বললেন £" তুমি যখন আমার মুখ দেখে মনোভাব সন্ন্ধে সন্দেহ 
করেছ, তখন তোমাকে বলতে আপত্তি নেই, আমার যিনি দীক্ষাদাত1 গুরু, 
তোমার সঙ্গে শিক্ষা-দীক্ষার কথ! প্রপঙ্গে তাঁকে মনে পড়তেই আমার মনট। 
বিষিয়ে ওঠে, মুখখানাও অমনি কালো হয়ে যায়। এদিক দিয়ে আমার 
ছুর্ভাগ্যের অন্ত নেই ভাই ! 

সবিপ্ময়ে বাদক বললেন £ গেকি! শুনিছি, মনের মধ্যে বিকার 
এলে, তখনি মা আর গুরুর মুখ স্মরণ করলে, বিকার কেটে যাঁয়। আর 
আপনি বলছেন-_গুরুকে মনে পড়তেই আপনার মন বিষিয়ে উঠেছে? এ 
যে অদ্ভুত কথ। ব্রক্মচাঁরী | 

যুবক ত্রন্মচারী গাস্বরে বললেন ; আমার সেই গুরুর চরিত্র আরও 
অদ্ভুত। পুরাণে আছে, খাষির অভিশাপে এক ধর্ণশীল রাজ। রাক্ষসের মত 
ভীষণ অনাচারী হয়েছিল । ইতিহাসে পড়েছি, ত্রাঙ্গণ সন্তান রাভু বিধমা 
কাঁলাপাহাড় হয়ে হিন্দুর ধর্ম ও দেবতার চরম নিগ্রহ করেছিল । কিন্ত আমি 
এই নর্জদামায়ীয় এলাকাতেই এক সিদ্ধাশ্রমে তেমনি এক কালাপাহাড়ের পাল্লায় 


বাল্যলীলা ৩৫ 


পড়েছিলাম ! দিব্য প্রশান্ত মৃতি, খষির মত দিব্যভীব, দেখলেই ভক্তি হয়। 
আমি তখন দীক্ষা নেবার জন্য গুরু খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম | তখকে দেখেই 
মুগ্ধ হয়ে ভার পদতলে পড়ে প্রার্থনা জানালাম--প্রভু, আমাকে দীক্ষা 
দিন ।' তিনি সেকথ। শুনেই প্রথমে হে! হে! করে হেসে উঠলেন, তারপরেই 
আমার হাতখানা ধরে একটা গুহার মধ্যে নিয়ে গিয়ে আমার কাণে কাণে 
দীক্ষার মন্ত্র দিলেন। সে মন্ত্র যেন আমার সর্বাঙ্গে একটা তড়িত্প্রবাহের 
পরশ দিয়ে আড়ষ্ট করল । তারপর খুব অল্প কথায় সাধন ভজন ও যোগের 
কথা বলে আবার গুহ! থেকে বাইরে নিয়ে এলেন আমাকে । তারপরে সহস৷! 
গীঠের উপর সজোরে এক চপেটাধাত করে বললেন ; “চবৈবতি-_চরৈবতি |, 
চলে, চলো, এগিয়ে চলে। | যে চলতে থাকে, সেই অমৃত লাভ করে। 

বালক সহ্ষে বলে উঠলেন ; বাঁ । বেশ কথাগুলি তো! 

যুবক ব্রহ্মচারী বললেন £ তাঁর কথা শুনলে দেহ রোমাঞ্চ হয়ে ওঠে 
দীক্ষার পর আশ্রমের একদিকে শিবমন্দির দেখে আমি আনন্দে তার পুজা 
করতে যাই! পুঁজায় বসেছি, এমন সময় গুরুদেব সুধলেন | “কি হচ্ছে 
রুদ্র পুজা? তারপরই তর্জন করে বললেন : “না রুদ্রো কুদ্রমর্চতে | এমন 
তীব্র স্বরে বললেন, পুজা] করতে করতে আমি সভয়ে তার দিকে তাকালাম । 
তিনি তখন করলেন কি--মন্দিরের মধ্যে সেধিয়ে পুজার উপকরণগুলে" দুছাতে 
তুলে ধরে শিবলিঙ্গের উপৰ সজোরে আছড়ে ফেলে হো! হো করে হেসে 
উঠলেন। সে কি বিকট হাসি! তার গমক থামতেই আমার পানে কটমট 
করে তাকিয়ে থেকে বললেন £ বুঝলি আমার কখ1? রুদ্র না হলে রুদ্র 
পুজ। করা যায় না| বেরিয়ে যা এখান থেকে। 

তখন ভয়ে হুঃখে অভিমানে আমি কাপতে কাঁপতে মন্দির থেকে বেরিয়ে 
এলাম | কিন্তু তাতেও নিষ্কৃতি পেলাম ন] - গুক্দেবও পিছনে পিছনে এসে 
আমার গল ধরে আশ্রমের দরজ1 দেখিয়ে দিলেন, সেই সঙ্গে তার ক 
থেকে হুঙ্কার উঠল-_“যাঁও |, বুঝলাম, আমাকে তিনি আশ্রম থেকে ভাঁড়িয়ে 
দিচ্ছেন । ছল ছল চোখে তার পানে একটিবার চেয়ে অসহায়তাবে আমার 
ঝুলি, দণ্ড, কমগুলুর দিকে তাকাতে লাগলাম | তিনি আমার অভিপ্রায় 
বুঝতে পেরে একটি একটি করে সেগুলো! এমন ভাবে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে 
লাগলেন যে, দণ্ডটা আমার পিঠে পড়ল, কমণ্ডলুও পায়ের উপর পড়ে রীতিমত 


৩৬ ঝাড়খণ্ডের থাষি 


আঘাত দিল, ঝুলিটা একখানা পাথরে আটকে ঝুলতে লাগল | ভয়ে ভয়ে 
সেগুলি কুড়িয়ে নিয়ে সেই রুদ্রমূতি রক্তচন্ষু অদ্ভুত গুরুকে দুর থেকে ভুমিষ্ট 
হয়ে প্রণাম করে পালিয়ে বাচলাম। আমার দীক্ষা ও দীক্ষাদাতা গুরুর 
এই ইতিহাস। 

বাল ত্রক্মচারী এই সময় জিজ্ঞাসা করলেন : তারপর আপনি কি করলেন ? 
হঠাৎ ভিনি ওভাবে বিগড়ে গেলেন কেন, সেকথা জানতে পেরেছিলেন ? 

ত্রক্মচারী বললেন £ হ্যা ভাই, ঠিক জায়গাতেই তুমি জিজ্ঞাসা করেছ। 
আসল কথাটা আমার বলা হয়নি। আশ্রম থেকে পালিয়ে অনেকটা তফাতে 
পাথরের একট! মন্দির দেখতে পেয়ে তারই দরজায় বসে পড়লাম । আশে- 
পাশে পাহাড়, অর্পন্বল্প জল । মন্দির দেখে মনে হলো, পড়ে৷ অবস্থায় 
রয়েছে। ভিতরে কোন দেবতার মৃতি আছে কিনা, দেখবার জন্য কৌতুহল 
হলো। ভিতরে ঢুকতেই দেখি, বনবাদাড়ে সে জায়গাটিও আচ্ছন্ন হয়ে 
উঠেছে। কোন রকমে সেই অপরিচ্ছন্ন পথ দিয়ে অলিন্দে উঠে গর্ভমন্দিরে 
তাকাতেই চমকে উঠলাম। পাথরের তৈরী একটি দেবীমূতি বেদীর উপরে 
বসে আছেন, কিন্ত তার মাথাটি এমনভাবে বিদীর্ণ যে স্পট্টই বুঝ! গেল; কৌন 
শক্ত প্রহরণ দিয়ে আধাতের পর আঘাঁত করে মৃতির মাথাটির এই অবস্থা 
কর! -হয়েছে। আমার মনে তখন প্রশ্ন জাগল, কোন্‌ দেবীর এ মন্দির__ 
এমন নিষুর কাও করেছে কোন্‌ পাষণ্ড? 

কিন্ত কে আমার এই প্রশ্নের উত্তর দিবে? ভারপ্রস্ত মনে মন্দিরের 
ভিতর থেকে বেরিয়ে বাইরে এসেছি, এমন সময় সেই অঞ্চলের এক 
আনিবাসীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়ে গেল । আমাকে মন্দির থেকে ম্লান 
মুখে বেরিয়ে আসতে দেখে সে কোন পর্যটক ভেবেই জিজ্ঞাপা করল : 
ঠাকুর কি পুজো করবার জন্তে মাতাজীর মন্দিরে গিয়েছিলেন? 

বললাম £ পুজা কাকে করব বল? মাতাজীর মাথাটি তো হর-ফাক হয়ে 
আছে দেখে এলাম। কি ব্যাপার বলতো বাপু! কোন্‌ মাতাজীর মন্দির 
এটি? কোন্‌ পাষণ্ড ভার অমন সুন্দর মৃতিটি নষ্ট করেছে? একি লেই 
কালাপাহাড়ের কাণ্ড ? 

আদিবাসী লোকটি লবিনয়ে বলল : ন! ঠাকুর, কালাপাহ|ড়ের গল্প 
আমর! কানে শুনে এসেছি ছেলেষেল! থেকে । আর সাক্ষাৎ কালাপাহাড়কে 


বালালীলা ৩৭ 


দেখেছি এই চোখে । তিনি তোমারই মতন ঠাকুর মান্রষ | ভারি জ্ঞানী 
আর সিদ্ধ পুরুষ বলে সবাই তারে খাতির করত। কিন্তু হঠাৎ তার 
মাথ। গেল বিগড়ে। নিতি নিতি এই মন্দিরে এসে তিনি নিজের হাতে 
নর্মদ] মায়ীর পুজা করতেন । এই মন্দিরে বেদীর উপরে যারে আপনি দেখে 
এলেন, সেই তো নর্মদামায়ীর মৃতি গো! কত লোক দর্শন করে পুজো 
দিয়ে ধন্য হোত, তোমার মত যে-সব ঠাকুর মায়ীর পরিক্রমা করত, তেনার। 
তে| গঙ্গোনাথে এলেই মায়ীর মন্দিরে এসে পুজো! করতেন । আর গ্যে 
সাধু ঠাকুরের কথা বললাম_-তার তো! কাজই ছিল সকালে সাঁঝে ছুটি বেলাই 
মায়ীকে পুজো! করা । কিন্তু ক্ষেপে ওঠবার পর তিনিই হলেন মায়ীর দুষষন। 
একদিন আমর! তাজ্জব হয়ে দেখি, পাগল! ঠাকুর ফুল পাতা সব ছড়িয়ে 
ফেলে লোহার একট! ডাওা নিয়ে মাঁয়ীর মাথার উপর জোরে জোরে ঘ! 
মারছে, আর সঙ্গে সঙ্গে চিল্লাচ্ছে--আমার সঙ্গে চালাকী, বুজরুকী চলবে না 
পুজে! তোর বন্ধ করে দিচ্ছি দ্যাখ ! 

আদিবাসী প্রত্যক্ষদর্শীর মত ভঙ্গি করে এমন ভাবাদ্রত্বরে কাহিনীট! 
বলতে লাগল যে, শুনতে শুনতে আমার মনে হলে। আমিও যেন দিবা-্ৃষ্টিতে 
পাগলা ঠাকুরের সেই নিষ্ঠুর কাণ্ড প্রত্যক্ষ করছি। কেননা, একটু আগে 
শিবের মন্দিরে আমার গুরুদেবকেও ঠিক এ রকম অকর্ম করতে দেখেছি । 
যাই হোক, এর পর সেই আদিবাসীর কাছ থেকে অনেক কথাই জানতে 
পারলাম। প্রথম কথ!, সেই অঞ্চলটির নাম গঙ্ষোনাথ | খানিক দুরে পর্বতের 
উপর গঙ্গোনাথ শিবের মন্দির আছে; সেখানে সাধুরা থাকেন | তাদের 
আশ্রমটিই নর্মদ। পবিক্রমণকারীদের একটি চমত্কার বিশ্রাম কেন্ত্র। দ্বিতীয় 
কথ! যে পাগল] ঠাকুরটি হঠাৎ দেবদেষী হয়ে নর্শদামায়ীর মৃতি ভেঙে 
দেন, দেবদেবীর প্রতি যার দারুণ বিদ্বেষ, কালাপাহাড়ের মত এ অঞ্চলে 
কুখ্যাত হয়ে উঠেছেন, তিনি গৌরীশঙ্কর মহারাজ নামে বিখ্যাত ছিলেন ; 
খুব পণ্ডিত লোক, সাধু ব্যক্তি, যোগসিদ্ধ বলে তার খ্যাতিও ছিল। কিন্তু 
মস্তিফ-বিকৃতির ফলে তিনি এখন সবার ঘৃণিত । শুনে আরও আশ্চর্য হলাম, 
সেই কালাপাহাড়-রূপী গৌর্বীশক্কর মহারাজই ”- আমার গুরুদেব । 


ছয় 
যুবক ব্রক্ষচারীর কথা শেষ হতেই বাল-ব্রক্মচারী পীতান্ধর তাকে 
সুধালেন ; আপনি কি তাহলে আর গুরুর কাছে ফিরে যাননি? ভার 
সঙ্গে অপনার আর দেখা_ 
বালকের কথায় বাধা দিয়ে ব্রঙ্ষচারী উত্তর করলেন: না, ন! 
আদিবাসীব্ কাছে এর সব কথা শুনে, আর সেই অনাচারী মান্ুুষাটি যে আমার 
গুরুদেব-- একথা জেনেই আমি তৎক্ষণাৎ সে-অঞ্চল ত্যাগ করে আলি। 
এমন কি, তার কাছে গঙ্গোনাথ আশ্রমের নাম শুনেও সেখানে যাইনি, দুর 
থেকে মন্দিরের চুড়োর উদ্দেশে একট] প্রণাম $কেই পালিয়ে আসি। 
পীতাদ্বর মুখখানা সরান করে বললেন £ কিন্তু আমার মনে হয়, গুরুদেবের 
কাছে আপনার ফিরে যাওয়া উচিত ছিল, সাঁধুজী | 
.. বিল্ময়ের সুরে ব্রহ্মচারী বললেন £ বলছ কি তুমি! কিন্ত যদি নিজের 
চোখে আমার গুরুর সে সব অনাচারী কাণ্ড দেখতে, তাহলে ও-কথা 
তোম।র মনে উঠত না, বলতে- পালিয়ে এসে ভালই করেছি। 
বালক এ কথার উত্তরে শাস্ত ও সংযত স্বরে বললেন আপনার কথা 
শোনার সঙ্গে সঙ্গে সেই সব অনাচারী কাওগুলে৷ যেম আমার চোখের 
সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল । এখনো আমি যেন আপনার গুরুদেবের রুদ্র 
মৃতি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সাধুজী, আপনি যদি নর্শদামায়ীর মন্দির থেকে 
বেরিয়েই ওখান থেকে পালিয়ে না এসে, আবার গুরুর কাছে ফিরে 
যেতেন, তাহলে হয়ত এ মনস্তাপ পেতেন না। 
বিক্ষারিত-দৃষ্টিতে বালকের মুখের দিকে চেয়ে ব্রক্ষাচারনী বললেন ; ডীর 
সব ব্বততান্ত ওুনেও এ কথা তুমি বলছ ? আমাকে তিনি যে-ভাঁবে মন্দির থেকে 
তাড়িয়ে দিয়েছিলেন_ তারপরও আমি কি সেখানে যেতে পারতাম ? 
বালক এবার সহাশ্যে উত্তর করলেন ; কেন পারতেন না-_-আপনি 
যখন তার কাছে দীক্ষা,নিয়ে শিষ্য হয়েছেন? যখন জানতে পারলেন 
সেই আদ্রিবাসীর কাছে-নর্দামায়ীর মল্িরে যিনি অত বড় অনাচার 
করেছেন, তিনি আপগার গুরু! তখনই উচিত ছিল তার কাছে আবার 
ফিরে যাওয়া, তাকে প্রসন্ন করা, তার ভুল বুঝিয়ে দেওয়] | 


বাল্যলীলা ৩২ 


যুব বালকের মুখে এ ধরনের কথাগুলি শুনে ব্রহ্মচারী বলে উঠলেন : 
তুমি এ অবস্থায় পড়লে পারতে তার কাছে যেতে__ভুল বুঝিয়ে দিয়ে 
কাকে ও-পথ থেকে ফেরাতে ? 

দ্ঢস্বরে বালক এবার উত্তর দিলেন; নিশ্চয়ই | আমি জেনেছি, 
গুরুর যেমন কর্তব্য শিষ্যকে দীক্ষা দিয়ে ভজনের পথে এগিয়ে দেওয়া, 
তেমনি সেই শিষ্ের গুরু যদি পথভ্রষ্ট হন, শিষ্যেরও কতব্য--গুরুর কাছে 
থেকে তাকে সাহায্য করা । 

ব্রঙ্মচারীর মুখে শ্রেষের হাসি ফুটে উঠল | বললেন ১ কিস্তসেগুর যে 
জ্ঞান-পাঁপী, সেটা ত বুঝছ না। তার মন্ত্র হয়েছে দেব-দ্বেষ, যন্ত্র হয়েছে 
দাণ্ডা। 

পীতাম্বর সহাশ্যে বললেন £: না হয় সেই দাণ্ড। শিষ্ের মাথাতেই 
পড়ে রক্তরাঙ্গা হয়ে উঠত-_যে দাঁওা পাথরের বিগ্রহের মাথায় অনেক-- 
অনেক বার পড়েছিল। তাহলে তিনি কি শিউরে উঠতেন ন। বলতে চান? 
আমর ত সংসারের মায়া কাটিয়ে এসেছি সাধুজী, তবে কিসের ভয় আমাদের ? 
চলুন, আমরা যাত্রা আবার ফিরাই--যেখান থেকে আপনি ফিরে এসেছেন, 
এবার আমিও আপনার সঙ্গে সেখানে যেতে চাই_-আপনি আমাকে নিয়ে 
চলুন সাঁধুজী ! 

বালকের দুঃসাহস ও মানসিক শক্তি যুবক ব্রহ্গচারীকে পুনরায় বিস্ময়া- 
ভিভুত করে তুলল। তার প্রকৃত মনোভাব বুঝবার উদ্দেশ্যে তীক্ষ দুটিতে 
সেই নিভাঁক মুখখানার দিকে তিনি তাকিয়ে রইলেন, মুখ দিয়ে একটি 
কথাও নির্গত হলো না। বুদ্ধিযান বাল-ব্রঙ্গচারীও সে দ্নাষ্টির অর্থ উপলব্ধি 
করে তেমনি দৃঢ়স্বরে বললেন £ দেখুন, আমার কথা শুনে আপনার 
মনে বোধ হয় সন্দেহ হচ্ছে, কিন্ত আমি আবার বলছি--বাজে কথ আমি 
বলিনি । এখানে গিয়ে আপনার গুরুজীকে দেখবার জন্যে আমার মন 
সত্যই চঞ্চল হয়ে উঠছে । এখন এ পথেই আমাদের যাত্রা আরম্ত হবে। 
আর, আপনি যদি ওখানে যেতে অনিচ্ছ ক থাকেন, তাহলে আমি একলাই 
যাব! তারপর, যে গঙ্গোনাথের মন্দির দেখেই আপনি চলে এসেছেন--. 
সেই মন্দিরেও যাবার জন্য আমার যন চঞ্চল হচ্ছে। 

জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলে ব্রদ্ষচারী বললেন : এখন দেখছি, এ 


৪০ বাঁড়খণ্ডের খষি 


সেই নর্দামায়ীর লীলা | তিনিই তোমার মনে শক্তি যোগাচ্ছেন । বুঝেছেন 
তিনি, এই বয়সেই ভার মাহাদ্ধ্য তুমি বুঝেছ। সত্যকার যে জ্ঞান, তার 
ককপায় তুমি পেয়েছ । বালক হলেও তুমি অসাধারণ। আর তোমাকে 
সাথীব্ূপে পেয়ে আমিও ধন্য হচ্ছি। 

বালক পাতাণ্বর এই সময় তাড়াতাড়ি মিনতির সরে বললেন : না, না, 
আমাকে এমন করে বাড়িয়ে আপনি অপরাধী করবেন না সাধুজী। 
আপনি আমার চেয়ে জ্ঞানে বিদ্যায় বয়সে সাহসে সব দিক দিয়েই অনেক 
বড়। তবে জময় সময় জ্ঞানীদেরও ভুল হয়। সেই যে কথা আছে 
না-'রজ্জতে সপ্পত্রম1' এখানেও তাই | আমি শুধু বলতে চাই__ আমরা 
ত হলেই সংসার ছেড়ে এসেছি, পিছনে চাইতে কেউ নেই, ভবে 
ভাবন] কেন? আপনি যেন আমার কথায় রাগ করবেন না সাধুজী | 

কথার সঙ্গে সঙ্গে ত্রহ্মচারীর একখানি হাত বালক চেপে ধরলেন । 
ব্রক্ষচারীও সঙ্গে সঙ্গে অপর হাতখান|। দিয়ে বালকের ক বেষ্টন করে 
শ্নেহার্র স্বরে বললেন 2 না ভাই, আমি তোমার উপর রাগ করিনি, 
বরং আমার ভুল দেখিয়ে দিয়েছে বলে খুশিই হয়েছি। এসো ভাই, 
আঙকের রাতটুকু আমরা এখানেই গল্পে সন্পে কাটাই, তার পর সকালেই 
আমাদের শভযাত্র।। 

নর্ণদ1 পরিক্রমার কঠোর বিধি হচ্ছে--সৌভাগ্যব্রমে যদি সায়াছের মুখে 
নর্দার পবিত্র কুলে উপস্থিত হবার সুযোগ ঘটে পর্টকের পক্ষে, তাহলে 
সায়ংকত্যাদি সেরে সেইখানেই বিনিদ্র নয়নে নর্মদামায়ীর ধ্যানের ভিতর 
দিয়ে রাত্রিটি অতিবাহিত করা চাই | কাজেই, তুই ব্রহ্মচারী পরস্পরের 
অতীত জীবন- সম্বন্ধে দীর্ঘ আলোচনার পর যখাসময় ধ্যানে নিমগ্ন হলেন। 

নিশাবসানের পর প্রাতঃক্কত্যাদি সেরে ছুই ব্রহ্মচারী পুনরায় যাত্র। 
আরম্ভ করলেন । যুবক-ত্রক্ষচারীর নামটিও পীতান্বর জেনেছেন | দীপক 
দানের পর গুরদেবই তাকে ধ্যানানন্দ নায়ে অভিহিত করেন। গুরুর 
সান্নিধ্য থেকে পালিয়ে এলেও গুরুদত্ত নামটি তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গেই 
বরণ করে নিয়েছেন। পাতাম্বর একথ! জেনে তাঁকে বললেন £ দেখুন দেখি, 
আপনি গুরুর দেওয়। নাম ব্যবহার করছেন, তাঁরই দীক্ষা দানের মন্ত্র 
জপছেন, তবু তাকে এত ভয়? গুরুর সন্বদ্ধে শাম্ত্ের কথা মনে করঃন_- 


বাপালীলা ৪১ 


উৎপাদক ্রক্ষদাতো গরীয়ান্‌ ক্রক্গদঃ পিতা, তশ্য্যোন্মন্যেত সততং পিতুর- 
প্যধিকমূ গুরুম্‌ । 

আপনি গুরুদর্শনে চলুন নিভয়ে | 

ধ্যানানন্দ উত্তর করেন : তুমিই আমার ভয় ভেঙ্গে দিয়েছে। এখন 
আমি নির্ভয়ে গুরুর কাছে গিয়ে তার পদ-বন্দন। করতে পারব । আমার 
মনে হচ্ছে, তুমি সঙ্গে থাকলে-গুরু যে অবস্থভেই থাকুন না কেন, 
শান্ত ভাবেই আলাপ করবেন । 

পীতান্বর উৎফুল্ল মুখে বলে ওঠেন : দেখুন, আমাদের পরিক্রমা 
এবার গঙ্গোনাথের উদ্দেশ্যে | সেখানেও নর্শদামায়ীর দর্শন মিলবে _মায়ী 
আমাদের মনোস্কামন! পুর্ণ করবেন । 

নর্মদা অঞ্চল মধো গঙ্গোনাথ আশ্রমটি যে পবিক্রমণ-কারীদের নির্ভরযোগ্য 
আশ্রয় স্বান, আশ্রম-সংলগ্র মন্দিরটিও যে অপুর্ব, এবং এই আশ্রমাটির 
প্রতিষ্ঠাতা যোগ-বিভুতি-সম্পন্ন এক মহাপুরুষ, পরিক্রমার পথে বিভিন্ন 
ক্ষেত্রে তারা সে সম্বন্ধে কিছু কিছু জ্ঞাত হলেন। 

স্সম্দ্ধ রাজধানী বরোদা নগরী থেকে এর দুরত্ব মাত্র ৪৫ মাইল । 
একদিকে পুণ্যসলিল! নর্মদা, অন্ত দিকে হুর্ভেদ্য মহাবন। নর্শদার তটভুমি 
থেকে অনেকখানি উচু স্থানে এই আশ্রম। এর স্বাভাবিক শাস্তি 
পাঁরিপাশ্থিক বনজ দ্ৃশ্যাবলী এবং মন্দির পাদদেশে বিকীর্ণ তাপসাশ্রমগ্ডলি 
দেখলেই পুরাণবণিভ তপোঁবনের কথাই মনে হয়। সেইরূপ পরম শান্ত 
পরিবেশে এই গলোনাথ প্রতিটিত। 

কিন্ত এই গঙ্গোনাথজীর প্রতিষ্ঠার মূলে এক তপন্যাসিদ্ধ মহাপুরষের প্রচেষ্টা 
ও কর্ম-সংযোগের কাহিনী শোনা যায় । জনসাধারণের অগম্য এই স্থানে একটি 
বিশাল গুহার মধ্যে আশ্রয় নিয়ে তিনি যে কতকাল ধরে তপস্য|! করেছেন, 
সে তত্ব অন্তের অঙজ্ঞাত। তবে তার আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এই মলোরম 
স্থানটি লোক চক্ষুর সম্মুখে প্রকাশ পেয়েছে- একথা সকলেই স্বীকার করে 
থাকেন। লোকমুখে প্রকাশ যে, এখানকার সর্বোচ্চ স্থানের এক অত্যান্ত 
দুর্গম অংশে ম্বয়সুলি্গ গলোনাথ প্রচ্ছন্ন ছিলেন | এই সাধক তপ:গ্রভাবে 
তথ্যটি জাত হয়ে ত্কাকেই আশ্রয় করে কঠোর সাধনায় ভ্রতী হন। তার দীর্ঘ 
তপস্তার মধ্যে ভারতবর্ধের রাষ্্রীয় কত পরিবর্তন হয়, শতাব্ীর পর শতাব্দী 


৪২ ঝাড়খণ্ডের খাষি 


কালসমুদ্রে মিশে যায়, কিন্ত শ্বয়ন্ুদেব গঙ্গোনাথের প্রসাদপুতঃ; তপঃশক্কির 
প্রভাবে তার জীবন-প্রদীপের আয়ু-বতিকাটি অক্ষু্ থাকে | সিদ্ধিলাভের পর 
তাপস যেন নুতন এক মাণব দ্ধূপে মানবজাতির কল্যাণকল্পে স্ুপ্রকাশ হলেন। 
তার প্রকাশের লঙ্গে সঙ্গে সর্বাধিক ছুর্গষ স্থান সুগম ও মনোরম হয়ে এ 
অঞ্চলবাসীকে চমতকৃত করল । নর্শদার তটভুমি থেকে ক্রমশঃ উচু হয়ে যে 
গভীর বনময় স্থানাটি আকাশের সঙ্গে মিশেছিল, তাঁর উপরে উঠল পাথরের 
আঁর এক মন্দির অভ্যন্তরে গঙ্গোনাথ মহাদেবের স্বয়জুলি-প।ঠ। পাশে 
আর এক মন্দিরে দেবী সরস্বতীর অপরূপ প্রস্তরময়ী মৃতি। অন্য দিকে সেই 
বিশাল গুহা । এখানেই গলোনাথের স্বয়সুলিল-প্রবর্তক মহাসাধকের বহু- 
মুগব্যাপী তপস্া। চলেছিল । 

স্বয়স্ুলিঙ্, গঙ্গোনাথের নাম ও তার মাহাত্ব্য সম্বন্ধে বহু কিন্বদস্তীর কথ এ 
অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে পুরুষানুক্রমে আলোচিত হয়েছে, কিন্ত আলোচ্য 
গঙ্গোনাথ দেবত! বরাবর লোকচক্ষুর অস্তরালেই প্রচ্ছন্ন ছিলেন । সিদ্ধ তাপসের 
সাধনালব শক্তির প্রভাবে পারিপাশ্বিক বিস্ময়কর আবেষ্টনের সঙ্গে গঙ্গোনাথের 
এই অপুর্ব প্রকাশ সর্ধসাধারণকে চমত্কৃত করল। আবার লোক মুখে রা 
হতে লাগল--নানা কথা, কাহিনী ও অলৌকিক আখ্যায়িকা : বিশ্বাসী 
অধিবাসীদের অন্তরে এই ধারণাই দৃঢ় হলে! যে--বাবা গঙ্গোনাথই এ-সব 
করেছেন, সাধু বাবাই স্বয়ং গঙ্গোনাথ। 

গৌরকান্তি উন্মভদেহ দীর্ঘবাহু দিব্যমূতি এই সাধুটিকে দর্শনমাত্রই ভাকে 
কোন দিব্যশৃক্তি-সম্পন্ন মহাপুরুষ ভেবে অতি বড় দান্তিকের মাথাও শ্রদ্ধায় নত 
হয়ে পড়ে । অথচ, তার সদা-হাস্য মুখ, আত্মভোলা ভাব, শিওসুলভ মনোবৃত্তি 
দেখে কল্পনাও কর! যায় না যে, এই মানুষটির মধ্যে দীর্ঘ-যুগব্যাপী তপংশক্তি 
প্রচ্ছন্ন আছে । বধীয়ান পুরুষর1 এর সঙ্গে অল্লক্ষণ আলাপ করেই আনন্দে 
অভিভূত হয়ে ভাবেন যে, বুঝি জীবনের একট দীর্ঘ অংশ এই সদানন্দময় 
সাধুটির সঙ্গে অতিবাহিত হয়েছে । বালকবালিকা, তথ1_-কিশোর কিশোরীর! 
গঙ্গোনাথ দর্শনে এলে সাধুজী সানন্দে তাদের সঙ্গে মিশে এমনভাবে বালন্ুুলভ 
খেলা-ধুলা দৌড়-ঝাঁপে মেতে ওঠেন যে, তারা এই আশ্চর্য মানুষটিকে ভাদের 
ক্রীড়া-সাথা ভেবে আহলাদে আটখান! হয়ে পড়ে । ভারপর নর্শদা পরিক্রমাত্রতী 
সংসারত্যাগী বিভিন্ন বয়সের পঠ়টকগণও নর্মদার তটভুমির উপর এমন একটি 


বাপ্যলীল। ৪০ 


বিশ্রান-স্থানের সন্ধান পেয়ে ধন্য হন। পাধূজীও এখানে প্রত্যেককে সাদর 
আহ্বানে ও আহার্ধ দানে এমনভাবে আপ্যায়িত করেন যে, তার] সর্বাধিক 
দুর্গম স্থানে আতিথ্য সৎ্কারের এমন ক্রটিহীন আয়োজন দেখে বিহ্ময়ানন্দে 
বিহ্বল হয়ে পড়েন। কিন্তু সাধুকেই এর নিয়স্তা জেনে রুতজ্রতা প্রকাশ 
করতে গেলেই তিনি বালকের মত নির্শল হাসিতে মুখখানি ভরিয়ে জানিয়ে 
দেন-_-'এ সব হচ্ছে গঙ্গোনাথজীর লীল11” যাঁরা নররদামায়ীকে প্রদক্ষিণ 
করবেন, এই জায়গাটিতে এসে ভাদের একটু বিশ্রাম নেওয়া চাইই, কিন্ত স্থানের 
তুর্গমতার জন্যে কেউ এখানে বিশ্রাম করবার সুযোগ পেতেন না, কোন রকমে 
নর্ধদামায়ীকে পরশ করেই অন্যত্র ছুটতেন আশ্রয় নেবার আঁশায়। কিন্ত 
এইখানেই কোন স্বুতুর্গম স্থানে স্বয়জু-লিঙ্গ মুতিকে গঙ্গোনাথ অধিষ্ঠিত রয়েছেন 
জেনেও-_তাদের দর্শনের সৌভাগ্য হোত না। এখন ভাঁদের ধারণ!, ভক্তদের 
এই দুর্ভোগ দূর করবার জন্তেই তিনি নিজেকে প্রকাশ করেছেন। এর পর 
নবীন যাত্রীদের প্রতি পরিক্রমা সম্বন্ধে সাধুজীর উপদেশগুলিও পাথেয় স্বরূপ 
হয়ে তাদের যাত্রাপথ স্বরগম করে দেয় । ফলত, এই সিদ্ধাশ্রমের সংস্পর্শে এসে 
পর্ধটকগণ পুণ্যঘলিলা নর্শদা-জননীর পরশ পেয়ে, সুউচ্চ পৰতশূঙ্গে স্থাপিত 
মন্দিরে গঙ্গোনাথ মহাদেব ও দেবী সরস্বতীর মৃতি দর্শন করে এবং আশ্রমস্বামী 
ব্রহ্মানন্ন মহারারজ্জজীর আদর আপ্যায়নে ধন্য হয়ে ভার উদ্েশেও জয়ধবনি 
না তুলে পারতেন না। ভখন-জয় মা নর্ধদে, জয় ভগবান গঙগোনাথজী, 
জয় দেবী সরস্বতী, জয় জয় ব্রক্ষানন্দজী মহারাজ 1 নামগুলি একসঙ্গে ধবনিত 
হয়ে এই স্পবিত্র সিদ্ধ স্থানটিকে মুখরিত করে তোলে । 

পথে যেতে যেতে স্বানে স্বানে এমন কোন কোন বধীরয়ান ব্যক্তির সঙ্গে 
সাক্ষাৎ হোত এদের-্যারা পর্টনকারী সাধুদের পরিচধার জন্য প্রস্তত হয়ে 
থাকতেন ফল জল দ্বুপ্ধ প্রভৃতি মোটামুটি আহার্ধ নিয়ে । গঙ্গোলাথ মন্দিরে 
আশ্রয় নিতে এরাই নির্দেশ দেন পথশ্রীস্ত পাগ্ছদিগকে এবং এদের মুখেই 
গঙ্গোনাথের প্রকাশের সঙ্গে সাধুজী ব্রহ্ম(নন্দ মহারাজের অলৌকিক কাহিনী 
প্রকাশ পাঁয়। এঁদের মতে মহারাজই স্বয়ং গলোনাথ ? | 

ধ্যানানন্দ বলেন £ আশ্চর্য এই যে, নিকটে গিয়েও গঙ্গোনাথ দর্শনের 
সৌভাগ্য আমার হয়নি। কি ভুলই করেছিলাম! 

গীতান্বর তাকে সাত্বনা দেন £ আমার অদৃষ্টে রয়েছে আপনার সঙগলাভ, 


৪৪ ঝাড়খত্ডের গ্ববি 


এক সঙ্গে জনে গিয়ে তাকে দর্শন করি- এই হয়ত গঙ্গোনাথের ইচ্ছ।। 
সে-ইচ্ছা এবার পুর্ণ হবে । 

ধ্যানানন্দ তার ব।নলক-সঙ্গীটিকে নিয়ে সারা পথ ভয়ে ভয়েই এসেছেন । 
প্রতি পদক্ষেপেই ভেবেছেন এ বুঝি তার উন্মাদ গুরুদেব দণ্ড-হস্তে ধেয়ে 
আসছেন! বনপথে কোন হিংআ জন্তর ছক্কার বা পদশব্ঝ শুনলেই শিউরে 
উঠেছেন__এ বুঝি গুরুদেব তর্জন করে শাসাচ্ছেন ! কিন্ত গুরুর ভয়ে তিনি 
অভিভুত হলেও, ভার সঙ্গীর মুখে ভয়ের ছায়াও পড়ে নাই ; বরং ধ্যানানম্দজীর 
ভীষণ প্রকৃতি শুরুমহারাজকে দেখবার জন্য তাঁর চোখ মুখে সবক্ষণই 
কৌতুছলের চিহ্ন ফটে উঠেছিল। ভয়ার্ত সঙ্গীকে বরাবরই তিনি আশ্বাস 
দিয়েছেন £ ন্নদামায়ীকে পরিক্রমণ করবার মত দুঃসাহস যখন আপনার মনে, 
তবুও কেন ভয় পাচ্ছেন ? আমরা ব্রহ্মচারী, আমাদের উচিত ভয়কে জয় করা। 

ধ্যানানন্দ বলেন 2 আমি হিংল্র বাঘের সামনে যেতেও ভয় পাই না, 
কিন্ত গুরুমহারাজের সেই মূতি মনে পড়লেই শিউরে উঠি ভয়ে | 

কিন্ত ধ্যানানন্দজীর সৌভাগ্যক্রমে এই দীর্ঘ পথের মধ্যে) এবং যে-মন্দিরে 
গুরুদেব বাস করেন, তারই এলাক। পার হয়ে আসবার সময়ও গুরু সন্দর্শশ 
ঘটে নাই, গুরুর হঙ্কারও তার কানে প্রবেশ করে নাই। পীতাম্বরই বরং 
সকৌতুকে মধ্যে মধ্যে জিজ্ঞাসা করেছেন 2 কোথায় আপনার গুরু_কোন 
সাড়া শব্ঘই ত তার পাচ্ছি না! আপনি পথ হারিয়ে ফেলেননি ত? 

ধ্যানানন্দজী তখন দুরবতাঁ বনানীর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বুঝি কোন 
দর্শনীয় বস্ত্র অন্বেষণ করছিলেন । সহসা উৎফুল্ল মুখে উল্লাসের নুরে বললেন £ 
পথ যে আমি হারাই নি, এ দেখ তার সাক্ষী--গঙ্লোনাথজীর মন্দিরের চূড়া! 
সেবার এখান থেকেই বিদায় নিয়ে পালিয়েছিলাম | আমার গুরু-মহারাজ 
যে-মন্দিরে থাকেন, সে স্বান আমর] পার হয়ে এসেছি--ধরতে পারি নি। 
এসে! ভাই, আমর গঙ্গোনাথভীকে এখান থেকেই প্রণাম করি | উভয়েই 
সমম্বরে জয়ধবনি করে উঠলেন £ জয় গঙ্গোনাথজী | 

তখন নর্শদার পশ্চিম প্রান্তে বিক্ষিপ্ত পর্বতশ্রেণীর শৃঙ্গে শুঙ্গে স্বর্ণরশ্মির 
আভা ছড়িয়ে অপরাহের ভুর্য ধীরে ধীরে অন্তমিত হচ্ছিলেন। সেই বিক্ষি 
রশ্মির একাংশ গঙ্গোনাথ মন্দিরের সুউচ্চ চুড়ার্টির উপর পড়ে অপুর্ব শোভার 
স্থটি করেছিল । 


বাল্যলীলা ৪৫ 


পাতাম্বর বলেন : আমরা প্রথমে নর্মদামায়ীকে প্রণাম করব, তাঁকে 
পরশ করে পবিত্র হয়ে গলোনাথজীর সঙ্গে সাধু মহারাজকে দর্শন করে তার 
পর যাব আপনার গুরুজীর আশ্রমে | 

ধ্যানানন্দ বললেন : সেই ভাল। গঙ্গোনাথের কাছে আশ্রয় ভিক্ষা 
করেই গুরু দর্শনে যাব | 

এখান থেকে মন্দির পর্ষন্ত পথ স্ুগম্য | পঁহছিতে বিলম্ব হলো না; 
কিন্তু মন্দির সান্নিধ্যে এসে উভয়েই স্তব্ধ হয়ে একই সঙ্গে স্বাণুর মত নীরবে 
দাড়িয়ে পড়লেন । সবিশ্ময়ে দেখলেন--পর্ধত শূঙ্গের উপরেই গঙ্গোলাথের 
মন্দির। তাঁরই দ্বার থেকে এক দীর্ঘ সোপান-শ্রেণী বছ নিম্নে নর্মদা তট পর্ষস্ত 
নেমে এসেছে : আর সেই সোপান-পথে এক দিব্যকান্তি দীর্ঘ মুতি বর্ষীয়ান 
পুরুষ দু' হাতে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ছুটি জলপুর্ণ তার কলস বহন করে অবলীলাক্রমে 
মন্দিরে চলেছেন । এ দেখে এদের মনে বিশ্ময়ের ভাব ফুটে ওঠবার কারণ 
হচ্ছে__দীর্ঘ মূতি পুরুষটির হাতের ঘড়া ছুটির আয়তন এত বৃহৎ যে, জলপুর্ণ 
অবস্থায় প্রত্যেকটি এক একটি বলিষ্ঠ যুবার বহনের পক্ষে যথেষ্ট, অথচ ইনি 
কিন| একাই এ-হেন অতিকায় জলপুর্ণ পাত্র ছুটি ছু' হাতে ঝুলিয়ে লিয়ে 
সোপান বেয়ে উঠছেন। 

সেই অবস্থায় সোপান-পথে উঠতে উঠতে সেই দীর্ঘাককৃতি পুরুষ সহসা 
পিছনে ফিরে তাকাতেই আগন্তকদের সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়ে গেল, 
সেই সঙ্গে মনে হল এদের, মহাপুরুষ চোখের ইঙ্গিতে উভয়কেই তাঁর নিকটে 
যাবার জন্ত আহ্বান করলেন ৷ তখন ধ্যানানন্প ও পীতাম্বর দু'জনেই দ্রুতপদে 
সোপান পথে উঠে গিয়ে এক সঙ্গে তার চরণ বন্দনা করলেন । 

কলস দু'টি দু'হাতে ধরে থেকেই সেই দীর্ঘাকৃতি পুরুষটি এতক্ষণ 
সেইখানেই ফঁড়িয়ে ছিলেন | এরা উভয়ে প্রণাম করতেই বললেন £ নমো 
নারায়ণায়। 

গীতান্বর বললেন : বাবা, আপনার ধড়া দুটো! আমাদের হাতে দিন, 
আমর! মল্গিরে নিয়ে যাচ্ছি । 

সাধু পুরুষ সহাম্যে বললেন : তোমার চেয়েও আমার ধড়া বেশী ভারী। 

ধ্যানানন্দ যুক্তকরে সবিনয়ে বললেন : তাহলে আমাকে দিন, আমি 
ম] হয় দ্ব'বারেই নিয়ে যাব । 


৪৬ ঝাড়খণ্ডের ধষি 


সাধু পুরুষ তেমনি হেসে বললেন £ বুড়ে। হলেও আমি এ ডার বইতে 
পারি--কোন কষ্ট হয় না। এর! দুটিই আমার বড় প্রিয়, এদের নাম হচ্ছে 
রাম ও লছমন্‌ | দেখছি তোমরা নবাগত -ধুলাপায়েই এখানে এসেছ। 
আগে নর্নদাজীকে পরশ করে প্রণাম জানাঁও, তার পর এই সোপান 
বেয়ে উপরে এসো । তোমর] এখানে অতিথি | 

কথাগুলি বলেই সাধুজী উপরে উঠতে লাগলেন | ব্রক্ষচারীদের বুঝতে 
বিলম্ব হলে! না যে, ইনিই এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা মহাত্বা ব্রক্মানন্দজী 
মহারাজ | 

উভয়েই অতঃপর ত্রতপদে সেই দীর্ঘ সোপানরাজি অবলম্বনে নর্ধদীতটে 
নেমে এলেন। নদীর উপকূলে ভূমিষ্ঠ হয়ে তার পুত বারি স্পর্শ করে 
প্রণতি নিবেদন করলেন । ধ্যানানন্দ বললেন £ চলো যন্দিবে গঙোনাথজীকে 
দর্শন করে সাধুজীর সঙ্গে আলাপ করি । সন্ধ্যার মুখে আন করা যাবে | 

নীরবে সম্মতি জানিয়ে গীতাদ্বর ধ্যানানন্দের অন্ুগমন কবলেন | 


সাত 


গঙ্গোনাথের মন্দির ও প্বয়ভূমৃতি দর্শন করে উভয়েই আনন্দে অভিভূত 
হলেন। নর্নদার পবিত্র জল স্পর্শ করে তাদের দীর্ঘ পর্যটনের ক্লান্তি মোচন 
হয়েছিল । এখন স্বয়নুমূতি দর্শন করে দেহে মনে পরম শাস্তি পেলেন। 
সেই দীর্থাকৃতি সাধু তখন মন্দিরের বাইরে ছাদয়ুক্ত প্রশস্ত অলিন্দে অখণ্ড- 
ধুনীর সামনে বসেছিলেন । তাঁর আহ্বানে উভয়ে নিকটে এসে বসলেন । 
সাধুর দ্ব্টি বাল-ব্রক্মচারী পীতাম্বরেব মুখে নিবদ্ধ, পীতান্বরও সাধুর পানে 
তাকিয়ে ছিলেন_ আবার উভয়ের দৃষ্টি সংযোগ হলো । সাধুর মুখে হাসি 
ফুটে উঠেছে দেখে ধ্যানানন্দ তাকে উদ্দেশ করে বললেন : অদ্ভুত ছেলে । 
উপনয়নের পর দণ্ডীঘর থেকেই পালিয়ে এসেছে । এই বযসেই নর্শদা 
পরিক্রমার ব্রত নিয়েছে । এখনো দীক্ষা হয় নি। 

পীতান্বরের দিকে তখনে! সাঁধু তাকিয়েছিলেন, মুখে সেই নির্সল হাসি। 
ধীরে ধীরে জুম্পষ্ট স্বরে বললেন £ যে ভাগ্যবান, গড়! থেকেই তার মনের 
ইচ্ছা সবই পুর্ণ হয়। 

চোখ ছুটি বিস্কারিত করে পীতান্বর সাধুর দিকে চাইলেন। এই সাধুকে 


বালালীল। ৪৭ 


দেখেই তিনিও ভাবাবিভুত হয়েছিলেন । তার মনে শুধু এই চিন্তাই উঠছিল__ 
কত মানুষ ত দেখেছি, কিন্তু এমন অদ্ভুত পুরুষ আমার চোখে কখনো পড়েনি। 
এখনো৷ ভাল করে আলাপ হয় নি, কিন্ত প্রথম দর্শনেই আমার অন্তরাত্বা যেন 
আকুল হয়ে বলছে__ইনিই আঁমাঁর গুরু, জন্মজন্মান্তরের গুরু! এইভাবে 
চিন্তামগ্ন অবস্থাতেই তিনি ভাবাবেগে বলে উঠলেন : বাবা! আমি মুর্খ, 
অক্তান, বিছা শিক্ষা বলতে কিছুই শিখিনি, কিছুই জানি না; কিন্ত উপনয়ন 
হতেই আমার মনে এই প্রবৃত্তি জেগে ওঠে । মনে হতে থাকে-_-সংসারে 
আবদ্ধ থেকে গৃহী হতে আমি কিছুতেই পারব না। তাই বেরিয়ে পড়ি; 
আমার ধারণা-_-এ পথেই আমার ইষ্টলাভ হবে । 

সাধুজী তাঁর দীর্ঘ দুটি বাছ বাড়িয়ে বালককে সন্ষেহে কোলের কাছে 
টেনে এনে বললেন : গ্রবও এমনি বিশ্বাসে ভর করে সাধনার পথে বেরিয়ে- 
ছিলেন। তার ই্টলাভ হয়েছিল, তোমারও হবে| মাতাজীর ককপা৷ তুমি 
অনেক আগেই পেয়েছ__তিনিই তোমাকে এগিয়ে এনেছেন । আমিও যে 
এমনি একটি বাল-ভক্তের প্রতীক্ষায় আছি। এখন তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, 
আমার প্রতীক্ষার সেই বালক--তুমি। তোমার প্রয়োজন হচ্ছে এখন দীক্ষা, 
তার পর শিক্ষ।। সাধনার পথে এ দুটিই চাই। দীক্ষা না হলে সাধনা 
হবে না, শিক্ষা না পেলে সিদ্ধি আমে না। 


পীতাগ্বরের মুখখানি সাধুজীর কথায় আনন্দে ঝলমল করে উঠল; 
উল্লাসের জুরে বললেন £ আপনি যেন অন্তর্যামীর মতই দীক্ষা আর শিক্ষার 
কথা বললেন, এ ছুটির কোলটিই যে আমার হয় নি, এই জন্তেই বুঝি 
মায়ীনর্ঁদা আমাকে এখানে আনলেন! আর ধ্যানানন্দজীও তারই ইচ্ছায় 
সাথী হয়ে পথ দেখিয়ে সাধু মহারাজের আশ্রমে এনে আমাকে বন্য 
করলেণ ! 

সাধূজী জিজ্ঞান্ু দৃষ্টিতে ধ্যানানন্দের দিকে তাকাতেই তিনি সবিনয়ে 
নর্মদার এক উপকূলে বালক ব্রঙ্মচারীর সঙ্গে তার আলাপ, তারপর বালকের 
কথায় কি সুত্রে এখানে আবার ফিরে আসেন, সবই বললেন । 

কথা-প্রসঙ্গে ধ্যানানন্দের উম্মাদগুর গৌরীশঙ্কর ত্রক্ষমচারীর কাহিনী 
গুনে তিনি ন্মিতমুখে বললেন £ তুমি তাহলে গৌরীশঙ্করজীর মন শিল্ত-_ 
তাঁর কাছে দীক্ষা পেয়েছিলে, তারপর, তার অনাচারী কাণ্ড দেখে ভয়ে 


৪৮ ঝাড়খণ্ডের ধাষি 


পালিয়েছিলে ? তাহলে ত এই বাঁলকই তাঁর বিবেক বুদ্ধি চালিয়ে তোমাকে. 
ফিরিয়ে এনেছে । এসবওএ নদ! মায়ীর লীল! | 

এ-কথ শুনে বালক পীতাম্বরই তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করলেন : তাহলে 
তিনি এখন কোথায় মহারাজ? নিজের সেই আশ্রমেই আছেন কি ? 

ব্রঙ্মানন্দজী বললেন £ কোথায় যে কখন থাকেন তিনি, তার কোন স্থিরত। 
নেই। এক জায়গায় ত তিনি বরাবর থাকেন ন1, আর থাকতেও পারেন 
ন1! কোথাও স্থির হয়ে এক জায়গায় | 

ধ্যানানন্দ জিজ্ঞাসা করলেন £ কেন এমন হয় মহারাজ? এখনো কি 
নর্দামায়ীর উপর কার তেমনি আক্রোশ আছে ? 

সু হেসে ব্রক্মানন্ভী বললেন ; সে দোষ তার নয়। অনেক পুর্থি 
পড়েছেন, বিদ্ভা যেন পোকার মতন তার মাথার ভিতরে কিলবিল করে বেড়ায়, 
কিন্তু দেমাক থেকে বিস্তা বার করে দেবার ফুরসতও মেলেনি । বে এবার 
দেখছি আদায় করবার লোক এসেছে, আর চিন্তা নেই | 

কথাগুলি বলেই তিনি পীতাম্বরের দিকে পুর্ববৎ হাসি মুখে তাকালেন । 
পরক্ষণে ধ্যানানন্দকে বললেন : দীক্ষার পর শিস্কের কর্তব্য হচ্ছে, গুরুর 
জ্ঞাম-ভাগডারের সের! সের! রত্বগুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করা । যে বেশী সাহসী 
আর বুদ্ধিমান, সেগুলি নিয়ে নিজের ভাওার ভরিয়ে ফেলে | দীক্ষা নেবার 
পর তুমি কিন্ত গুরুর উপর নির্ভর করতে ন! পেরে মন্দিরে সে ধিয়েছিলে 
রুদ্র পুজা! করতে, তাঁতেই তিনি বিরূপ হন তোমার প্রতি । 

সাধুজীর কথায় ধ্যানানন্দের মনের সংশয় কেটে যায়, বুঝতে পারেন 
তিনি, সত্যই ত-_দীক্ষা লাভের পর গুরুর কাছে উপদেশ নেবার জন্তে কোন 
আগ্রহই প্রকাশ করেন নি! পীতান্বরও অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে 
তাকালেন; উভয়ের অন্তর থেকেই যেন একট! ছুশ্চিস্তার ভার নেমে গেল । 

ক্ষণকাল নীরব থেকে নাধু মহারাজ বললেন : দেব বিগ্রহের প্রতি 
ার বিছেষ দেখে মন্দিরগুলির পাওার। মিলিত হয়ে তাকে একটা গুহায় 
আবদ্ধ করে রেখেছেন শুনেছি । তিনিও সেই শাস্তি মেনে নিয়ে ধ্যানমপ্র 
হয়ে প্রায়িশ্চিত্ত করছেন। 

এই সমগ্ন কতিপয্ন পর্যটনকারী শিশ্ক এসে সাধুর্ধীর চরণবন্না৷ করে 
তকে ধিরে বসলেন উপদেশ শোনবার উদৌশ্ঠে | এই মন্দির থেকে কিছুটা 


বালালীলা 8৯ 


নীচে পিছনের দিকে শিস্তদের আশ্রম এবং পর্যটকদের জন্য ধর্মশালা, 
গোশাল] ও পুপোগ্ান | শিশ্বর্গ এবং অতিথি অভ্যাগতদের জন্যই এই 
সব ব্যবস্থা করেছেন সাধু ব্রক্মানন্দজী | শিষ্তদের দিকে একবার চেয়ে 
সাধূজী বললেন £ এর! এখানেই থাকে, তোমরা হয়ত ভাবছিলে এত বড় 
একটা আশ্রমে এই ব্বদ্ধটি একাই বাস করে। আরো! অনেকে ধর্মশালায় 
আছে--তারা পর্যটক ; কিন্তু এব আমার শিশ্ত -এখাঁনেই বরাবর থাকে । 
সন্ধ্যার পর আমাদের ধর্ধীলোচনা হয়। ভোমরা শীঘ্র সায়ংকত্য 
সেরে এস। 

ধ্যানানন্দ ও গীতান্বর দুজনেই পুনরায় নর্নদা-তটে গিয়ে আমান ও উপাদপনাদি 
করলেন। তারপর সাধুর আশ্রমে ফিরে এসে দেখলেন, তাদের জন্য আহাধ 
প্রস্তত। শালপাতার উপর এক একটি পলান্নেব প্রকাণ্ড গোলক, কিছু 
ভাজি ও দধি। 

সাধুজী সম্মেহে বললেন : মার! দিন অভুজ আছ, আগে ভোজন 
হয়ে যাক, তারপর অন্য কথা। বনে পড়। 

পাশাপাশি উভয়ে বসে সম্মুখে পাতার উপর অন্ভুত আহার্য দেখে মুখ 
চাওয়! চাওয়ি করতেই সাধুজী সহাম্ে বললেন : আর শোন, পরিক্রমাকারীদের 
জন্যেই এখানে বিশ্রামের ব্যবস্থা । এখানে একটা ছেদ পড়ে। বিশ্রাম 
অস্তে এখান থেকেই আবার পরিক্রমার নূতন পর্ব সুরু হবে। তাহলেই 
বুঝতে পারছ, এখানে থাকলেও পরিক্রমার বিধি ভঙ্গ হয় না। 

উভয়ে নীরবেই শুনছিলেন আনন্দময় সাধু পুরুষের কথা, সম্মুখে আহা, 
ভুগে গেছেন খাবার কথা, মন ও দৃষ্টি সাধুর দিকে | সাধুই তখন বললেন £ 
এবার পাতার পানে চাও, গোল ভাঙ। 

ভোমরা এখানে নতুন এসেছ, ভাই এ গোলার সঙ্গে পরিচয় লেই। ওটি 
আমারই স্্টি--যে কোন একজন এই একটি মাত্র গোল। পুরোপুরি খেলেই 
তৃত্তি পাবে, এমন পরিমাণে ঘী মসলার সাহায্যে খিচুড়ি পাক করে এই 
গোল! তৈরী কর হয়। 

পাতের উপর অঙ্পময় হরিদ্রাভ গোলক দেখে উভয়েই ইতভ্ততঃ করছিলেন ) 
পীতান্থরের পাতের গোলকর্টি অবশ্য আয়তনে খানিকটা ক্ষুদ্র, যেন হিলাব 
করে তৈরী হয়েছে! এখন পরিচয় শুনে আনলের সঙ্গে হাসি যেন আর 

১ 


8০ ঝাড়খণ্ডেন থষি 


মুখে খরে না। পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে উভয়ে সেই সুস্বাছ্ু খাছ্ের সঙ্গাবহার 
করতে থাকেন । সাধুজীও কথ] প্রসঙ্গে বললেন : এখানকার আশ্রমে 
যখন ভাণ্ডার] হয়, তার খবর ছড়িয়ে পড়লে চারিদিকের দশ দশ ক্রোশ থেকে 
লোক ছুটে আমে এই গোলার লোভে । 

খেতে খেতে উভয় ব্রহ্মচারী সকৌতুকে সাধুজীর মুখের দিকে চেয়ে 
থাকেন, তার কথাগুলি যেন পাতের সুখাগ্যের মতই মিষ্ট । হঠাৎ সাধুজী 
বললেন £ এখন একটা হাসির গল্প বলি শোন। একবার আমি বরদার 
রাজধানীতে গিয়েছিলাম, তখন শিওজীরাও গায়কোয়াড় বরোদার মহারাজ | 
বরোদায় গিয়ে শুনেছিলাম, মহারাজার নাকি খুব জবর রকমের এক চাদির 
তোপ আছে। মহারাজের সঙ্গে দেখা হতেই তাকে জিপ্জাঁসা করি_-“আপনার 
প্রাসাদে নাকি এক চাদির তোপ আছে? মহারাজ জানালেন-_-“ই7--আছে।' 
আমি জিজ্ঞাসা করলাম--'সে তোপ থেকে গোলা কতদুর পর্যস্ত ছোটে ?' 
বরদারাজজ বললেন-_প্রায় এক মাইল যায়।' আমি তখন মহারাজের 
কথাটাকে খাটো করবার উদ্দেশ্যে বললাম--'আপ কে। তোপ কুছ নাহি হ্যায় 
হামারি গোলা চারি খুটমে দশ দশ ক্রোশ তক ঘুমতা হ্যায়।” মহারাজ 
অবাক হয়ে চেয়ে থাকেন, কথাট। বুঝতে পারেন না : তখন তাকে বুঝিয়ে 
দিলাম-_“ইহ হামারী খিচুড়ীকা গোলা!" মহারাজও তখন আসল কথাটা! 
বুঝতে পেরে হাসতে হাসতে বললেন--'সাধুকে গোলাকা সাথ হামারি 
গোৌঁল৷ কেস! সেকৃতা হায় বলিয়ে ? 

গল্প শুনতে শুনতে পরম তৃপ্তির সঙ্গে উভয় ত্রক্মচাবীর ভোজন শেষ 
হলো | তখন ধুনীর সামনে সাধুজী একা বসে আছেন, শিশ্তর1 সব চলে 
গেছেন । খানিক পরেই ধর্মশাল! থেকে ঘন ঘন ঘণ্টা বাজতে লাগল । 
সাধুজী বললেন; অপরাহ্নের অনেক আগেই ওখানে ভোজনের ব্যবস্থা 
থাকে । কোন বিশেষ কারণে আজ সন্ধ্যার পর ব্যবস্থা হয়েছে । আশ্রমে 
লোকত্ন সকলে ভেজনে বসলেই ঘণ্ট! বাজিয়ে সেটা জানিয়ে দেওয়| 
হয়--যদি কেউ অভুস্ত থাকে ত এসে পড়.ক'। সবার ভোজন হয়ে গ্রেলে, জার 
একবার ঘণ্টা বাজিয়ে সেই সঙ্গে অভুক্তদের উদ্দেশ্যে ডাক দেওয়। হয়, যখন 
আর ফেউ আসে না"-তখন আমার ভোজন সুরু হয় | 

ছুই বরক্গচারী স্বিশ্ময়ে সাধুভ্ীর কথা শুনতে থাকেন। খানিক পরে 


বালাালীল। 3১ 


পুনরায় ঘণ্টা বাজল, সেই সঙ্গে বলিষ্ঠ কঠের আহ্বানও শোনা গেল--কেউ যদি 
কোথাও অভুক্ত এখনে থাক--শীগগীর এস, এখনি ফটক বন্ধ হবে। 

গীতাশ্বর সহস1 জিজ্ঞাসা করলেন £ আপনি ভোজন করবেন না? 

সাধুজী ধুনীর দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললেন £ আমার গোলাও ওর 
রেখে গেছে, এ দেখ ধূনীর পাশে গবম হচ্ছে! যখন জানব যে আর 
কেউ ভোজন করতে নেই, তখন আমি ভোজন করব। কিন্তু এমনি 
গঙ্গোনাথজীর লীলা, আমার ভোজনের পর আর কিছুই থাকে না-_সব 
শেষ হয়ে যায়। 

ধ্যানানন্দ ও পীতান্বর উভয়েই দেখলেন, একটি পাত্রের উপর একই 
আকারের গোলক, ভাজি ও দধি। কোনও রকম তারতম্য নেই। 

প্রত্যুষে উঠেই পীতাম্বর সাধুজীর চরণ বন্দনা করে বললেন £ রাতে 
স্বপ্ন দেখেছি-_-সাধু মহারাজ যেন আমাকে দীক্ষা দিচ্ছেন। 

স্বত্ব হেসে সাধুজী বললেন ; তাহলে স্বপ্পে যা দেখেছ, এখন সত্য 
হোক । এর পর মিলিয়ে নিও। প্রাতঃকত্য সেরে তাড়াতাড়ি স্নান 
করে এস; সত্যিই আমি তোমাকে দীক্ষা দেব। এ হচ্ছে নর্জদামায়ীর 
হুকুম | 

নিজের সেই অখগ্-ধুনীর কাছে পীতাম্বরকে বসিয়ে ব্রহ্মানন্ন মহারাজ 
ভীঁকে দীক্ষা দিলেন। দীক্ষা গ্রহণের পর বালক ত্রহ্মচাবীর মনে হলো 
তিনি যেন নবজীবন লাভ করেছেন । মনে হতে থাকে, অন্তনিহিত শক্তির 
সঙ্গে যেন আর একটা প্রচণ্ড শক্তি এসে মিশে গেল | 

দীক্ষাদানের পর ত্রক্মানন্দ মহারাজ পীতাপ্বরকে বললেন £ তুমি এখন 
থেকে শাস্ত্রসন্মত নৈষ্িক ব্রহ্মচারী হলে । 

গীতান্বর বসলেন £ আমাকে আরও একটু স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিন নৈটিক 
ব্রক্গাচারী কাকে বাল। 

বালকের কথায় সত্তষ্ট হয়েই ত্রঙ্গানন্পজী স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিলেন । 
বললেন : শাস্ত্রে দুই বক ক্রক্ষচারীর উল্লেখ আছে, উপকুর্বাণ ও নৈষ্টিক | 
ধারা উপনয়নে যজ্জোপবীত ধারণ করেন, তারপর গুরুণৃহে বাস করেন, 
সেখানেই বেদাদি অধ্যয়নের পর যথাসাধ্য গুরুদক্ষিণ। দিয়ে আবার গৃহে ফিরে 
যাঁন, সারা হলেন উপকুর্ীণ ব্রহ্মচারী । এরা বিবাহ করে সংসারধর্ম পালন 


৫২ ঝাড়খণ্ডের থবি 


করবেন, তবে বিবাহ হবে পুন্রার্থে। অর্থাৎ বংশরক্ষার অন্ত পুত্র পাবার 
আশাতেই বিবাহ । সংসার-ধ্ণে লিপ্ত হলেও মনে রাখবেন এরা” দেব-্খণ, 
থবি-ণ, পিতৃ-খণ ও মহত-ণ | পরিশোধ করবার জন্যই এদের সংসারধর্মে 
পিগ্ত হওয়11 দেব-খণ হচ্ছে যন্ত্র, ঝষি-ণ আচার-নিষ্ঠা, পিতৃ-ণ বংশরক্ষা, 
আর মহুষ্য-থণ জীব সেবা । পরিণত বয়সে ব্রক্মচারী এক] বা! সন্ত্রীক বাপগ্রস্থ 
অবলম্বন করবেন। আর, নৈটিক ত্রক্মটারী হচ্ছেন তারা-্যারা যজ্ঞোপবীত 
গ্রহণ করেই চিরত্রন্ষাচর্য অবলম্বন করেন, গৃহে ফেরবার কোন আশাই রাখেন 
মা, যেমন--আমি, তুমি । তোমার মধ্যে নৈষ্ঠিক ত্রহ্মচারীর গুণ দেখেই আমি 
তোমাকে দীক্ষা! দিয়ে পরম আনল্গ পেষেছি। তবে তুমিও মনে রেখ যে, 
নৈষ্টিক ক্রক্মচারী হলেও তাঁর জীবনের ব্রত হবে ভীবকে শিবজ্ঞানে ভাঁবা, 
আর্তের সেবা, মানবতার পুজা । আমি কিন্তু এখনই দিব্য দৃষ্টিতে দেখছি, 
এ-ত্রত তুমি সুন্দরভাবে পালন করতে সমর্থ হবে, মন্থুম্ত সমাজের অনেক কল্যাণ 
ভুমি করবে, অসংখ্য শিষ্য-পরিবৃত হয়ে তুমি বিপুল প্রতিষ্ঠা পাবে । ভবিষ্যৎ 
উপলব্ধি করেই আমি তোমার নামাকরণ করলাম--বালানল্দ । 


আট 


দীক্ষার পর বালক পীতান্বর বালানদ্দ নামে অভিহিত হলেন। সাধু 
মহারাজ বললেন £ কেতাব পড়িয়ে তোমাকে শিক্ষা দেবার মত বিদ্যা, ধৈর্ধ বা 
উৎসাহ আমার নেই | তবে মুখে মুখে আমি উপদেশ দেব, তুমি মন দিয়ে 
শুনতে থাক। এর পর যদি কোন দিন এ পাগল] সাধু গৌরীশঙ্ষব্ীর 
দেখ! মিলে যায়, তাহলে কেতাবী বিদ্যাটাও তার কাছ থেকে আদায় করে 
নিও-_বিগ্তার ভারে সে বেচারী অস্থির হয়ে পড়েছে। 

সাধু মহারাজ যে সব উপদেশ দেন, বালানন্দের সঙ্গে ধ্যানানদ্দও সে সব 
শুনে ধস্ক হল, আনন্প পান। বালক বালানন্দ কিন্তু অবসর সময়ে একাই 
নর্ধদার তীর ধরে দুর্গম পাহাড়ের দিকে যান, সেখানে তন্ন তন্ন করে উন্মাদ 
মাধ গৌরীশঙ্ষরজীর সন্ধান করেন । তার সম্বন্ধ ব্রঙ্গানন্দ মহারাজ যে নির্দেশটি 
দিয়েছেন--বালক যোটি পরম ত্য ভেবে অন্ুুসন্ধিৎস্ব হয়ে উঠেছেন । 
বালকের ধারণা, বাক্নিদ্ধ সাধুর কথা কখনে! অমূলক হতে পারে দা-- 


বালালীলা তত 
গৌরীশঙ্কর মহারাজ নিশ্চয়ই কোন দুর্গম গুহার মধ্যে স্বেচ্ছাবদ্ধ হয়ে ধ্যান 
করছেন, আর এর পিছনে কোনও বহস্য হয়ত আছে । 

ধ্যানানল্প কিন্ত বেশী দিন এই আশ্রমে পড়ে থাকতে সম্মত হলেন না-_ 
পাছে তার নর্ধদ1 পরিক্রমার সংকল্প ব্যর্থ হয়, এই আশংকায় । তিনি বালানন্দকে 
সে কথা জানালেন--একেবারে দণ্ড কমণ্ডলু ও ঝোলাঝুলি নিয়ে প্রস্তত হয়ে । 

বালানন্দ বাধ। দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন : গুরুদর্শন করবেন না? আমার 
কিন্ত মনে হচ্ছে, আপনার কর্তব্য আগে গুরুর সন্ধান করে তার পরিচর্যা । 
তার পরে-- 

ধ্যানানন্দ বালকের কথায় বাধা দিয়ে বললেন : আমার কর্তব্য এখন 
থেকে তোমাকেই পালন করতে হবে| ত্রক্গানন্দ মহারজও বলেছেন - তিনিই 
তোমার ভাবী শিক্ষাণ্ডরু | ওর আশীর্ধাদে তুমি হয়ত তার সন্ধান পাবে । কিন্তু 
আমার সে ধেধ নেই) পরিক্রমার প্রলোভন আমাকে কঠোর ভাবে আকর্ধণ 
করছে। আমার স্থির সংকল্প শুনে সাধু মহারাজ বাধ! দেন নি, তুমিও তাই 
দিয়ো না। 

বালানন্দ গন্ভীরয়ুখে বললেন : বেশ, তাই হোক ; আমি একাই আমার 
ভাবী শিক্ষাণ্তরু গৌরীশঙ্করক্ষীর সন্ধান করতে পারব । যদি আমার উদ্দেশ্য 
সিদ্ধ হয়, তাকে নিয়েই পরিক্রমায় বার হব । না হয়, দীক্ষিত জীবনে শিক্ষার 
সজেই নূতন করে পরিক্রমা আরম্ত করব । আপনি ত প্রস্তত হয়েই বেরিয়েছেন, 
ভাহলে আপনি আনুন- নমো! নারায়ণায় | 

এর পর আর সংলাপ চলে না। ধ্যানানন্দের চিত্তে তখন পরিক্রমার 
আকাংখ! তীত্র হয়ে উঠেছে। ভিনিও নমে। নারায়ণায় বলে বেরিয়ে 
পড়লেন। 

এ ব্যাপারে বালক সাধুর উৎসাহ আরও প্রবল হয়ে উঠলস। যে দীক্ষাদাত। 
গুরুর প্রচুর পাণ্ডিত্য সত্বেও মন্তিক বিকৃতির জন্যই তাকে উপেক্ষা করে 
ধ্যানীনন্দ চলে গেলেন, সেই উপেক্ষিত মানুষটিকে নিজের চেষ্টায় খুঁভে বের 
করে তাকেই শিক্ষার্তরুর আপনে বসাবার অভিপ্রায়ে একাপ্রচিত্তে তিনি সম্র 
বনভুমি পর্যটনের অ্রত নিলেন | দেবী নর্মদাকে উদ্দেশ করে বালক কাত্তরকণে 
প্রার্থন। জানালেন--তোমারই.পরিক্রমার ত্রত নিয়ে মাগো, আমি এমন এক 
অদ্ভুত প্রন্কতি সাধুর কথ শুনিছি, যিনি জ্ঞান হারিয়ে উদ্মাদের মত তোমার 


$8 ঘাড়খণ্ডের খাষি 
নিগ্রহেও কুগ্ঠিত নন ! আমি প্রাণপণ করেছি তাকে পাবার জন্য ; আমার 
বিশ্বাস, তোমার কপাতেই আমি তার মোহ দুব করতে পারব। তুমি আমার 
সহায় থেকো। আর, এও ত তোমারই কাজ মা! এর জন্থে আমার পরিক্রমার 
বিধি যদি ভঙ্গ হয়, আবার আমি নুতন করে এ কার্ষে ব্রতী হব। 

বালক সংকল্প করলেন- যেখানেই তিনি থাকুন ন] কেন, খুঁজে আমাকে 
বের করতেই হবে । 

বালকের ক্ষুধা নেই, তৃষণা৷ নেই, দৃটি শুধু সম্মুখে ; লক্ষ্য-_বাঞ্চিত 
মানুষটির সন্ধান | দীর্ঘ পর্যটনে প্রহরের পর প্রহর অতীত হয়ে গেল, বনপথে 
অবিশ্রান্ত পর্যটনে পদদ্বয় ক্ষত বিক্ষত হলো, তবু তার গতির বিরাম নেই । 

অপরাহ্ছের দিকে সম্মুখে দৃষ্টি পড়তেই বালক বালানদ্দ সহস বিস্ময়ে 
শিউরে উঠলেন । গঙ্গোনাথ থেকে বনপথে প্রবেশের সময় নর্মদার তটভুমি 
ছেড়ে গভীর বন প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয়েছিল--নর্ধদাকে ফেলে 
কত দুরেই এসেছেন। কিন্তু অপরাহ্র এই স্থানটিতে আসতেই নিবিড় 
বনরাজির অন্তরালে প্রবাহিত নর্দার শত জলধার1 তাকে চমতকৃত করে অন্তর 
মধ্যে আনন্দের ধারা বহিয়ে দিল! প্রকৃতির অনবদ্থ সৌন্দর্যভরা ছবি তার 
চোখের সামনে কে যেন প্রসারিত কবে দিয়েছে_বৃক্ষশাখা ও পত্রপল্লবের 
ভিতর দিহয় নর্মদার শোভা সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে । 

দারুণ সঙ্কটে কিম্বা দৈহিক কষ্টের সময় সম্থুখে মাতৃমৃতি দেখলে সম্তান 
যেমন আকুল হয়ে ভর কোল লক্ষ্য করে ছুটে যায়, সারাদিনব্যাপী পথশ্রমে 
ক্লান্ত বালকের অস্তরটিও অদূরে প্রবাহিতা পুণ্যতোয়া নদীর ন্সিগ্ধ জলবাশি 
দেখে তেমনি আশন্দে নেচে উঠল-- তিনিও ছুটলেন নর্্দামায়ীর কোলে 
আশ্রয় নেবার জন্য | 

নদীর জলে অবগাহন করে যথাবিহিতভাবে অনার পর জলপানে তৃপ্ত 
হয়ে বালানন্দ যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেম। আনন্দে ভার দুই চক্ষু বাপ্পাচ্ছন্ন 
হয়ে উঠল * আপন মনে ভাব-গদগদ স্বরে বলে উঠলেন £ সত্যই তুমি মা 
অস্তর্ধ্যামিনী ; লক্ষ্য যদিও অন্যদিকে ফেলেছি, কিন্ত তোমাকে ভুলিনি ; 
সর্ষদাই উপলব্ধি করি--তুমি সঙ্গে আছ, সাথে সাথে ফিরছ । ভাবতাম আগে, 
এ সব মনের খেয়াল মাত্র, কিন্ত এখন তোমাকে দেখে বুঝছি মা, ভুল নয়-_ 
মায়ের মমড়া নিয়ে তুমি ছেলের সঙ্গে সজেই ফিরছ। আমি ধন্ঠ, ধন্য 


বালালীলা ৫৫ 


ছু হাতে বাশাচ্ছন্ন চক্ষু ছুটি মুছে তীরের দিকে ফিরে আসতেই বালানন্দ 
দেখতে পেলেন, এক বৃদ্ধা লাঠির উপর দেহভার চাপিয়ে ধীরে ধীরে নদীর 
জলের দিকে নামছেন । বসতিহীন এ হেন নির্জন অঞ্চলে বধাঁয়সী নারীটিকে 
দেখে বালানন্দ স্তব্ধভাবে তার দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলেন | 

বৃদ্ধার দৃষ্টিও বালক বালানন্দের দিকে | খানিকটা] এগিয়ে এসেই তিনি 
হাতের লাঠিট? কংকরময় তীরভুমিতে রেখে নিজেও বসে পড়লেন, তারপর 
হাতছানি দিয়ে বালানন্দকে কাছে আসবার জন্তা ইসারা করলেন । বালানন্দ 
ভতক্ষণাৎ একটু ঝুঁকে নর্মদার পুণ্যবারি আর একবার মাথার উপর ছিটিয়ে 
কমগুলুটি পুর্ণ করে ব্বদ্ধার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন | বৃদ্ধা লিগ্ধ দষ্টিতে তার 
দিকে চেয়ে সহাস্যে বললেন : তুমি খুব চালাক ছেলে, আমাকে এখানে 
এভাবে বসে পড়তে দেখেই বুঝতে পেরেছ যে, আমার তৃষ্ণা পেয়েছে : তাই 
জল নিয়ে ছুটে এসেছ ! 

বালানন্দ জলপুর্ণ কমণুলু বৃদ্ধার সামনে রেখে বললেন £ আপনি জল খান, 
যদি প্রয়োজন হয়_-আঁবার জল ভরে আনব । 

কমগুলুটি হাতে নিয়ে কিছুটা জলপান করে বৃদ্ধা তৃপ্তিব স্বরে বললেন £ 
আ:, বাচলুম -তুমি খুব লক্ষ্মীছেলে। তা বাপু, তুমি যেমন আমাকে জল 
খাওয়ালে, আমিও তোমাকে কিছু দিতে চাই। 

বলতে বলতে বৃদ্ধা তার কাপড়ের ভিতর থেকে ক্ষুদ্র একটি পু'টুলি বের 
করলেন । একখণ্ড পরিচ্ছন্ন সাদা কাপড়ে খানিকটা বিভুতি ও প্রায় ছু আঁচলা 
পরিমিত কালোকালে! গোলমরিচ বাঁধা রয়েছে । বন্ত্রথণ্ডের অন্ত প্রান্তে কাচা 
শানপাতায় মোড়া ছাটি লাড্ডু! বিভুতি ও কালো মরিচগুলি একটি বার খুলে 
বালান্দকে দেখিয়ে বৃদ্ধা বললেন £ এই বিভুতি আর মরিচএর গুণের কথা 
পরে বসব | এখন তুমি নাড়, হুটি খেয়ে ফেল তত বাছ। । 

বালানন্প বললেন £ কাছে নাড়, থাকতে আপনি শুধু জল খেলেন কেন? 
বেশ, এখন আপনি একটি খান, জল ত যথেষ্ট রয়েছে, না হয় আবার আনছি । 

বৃদ্ধা বললেন £ আমার খাওয়া আগেই হয়ে গেছে- সেই জন্তেই ত জলের 
সন্ধানে আসি! এখন তুমি ও ছুটি খাও দেখি ; ভয় নেই, ভাল খাবার, আমি 
. নিজের হাতে তৈরী করেছি । 
এমন জেছার্স্বরে বৃদ্ধা নাড়, ছুটি খাবার জন্য বালানন্দকে গীঁড়াগীড়ি 


৫৬ ঝাঁড়খণ্ডের ধাধি 


করতে লাগলেন বে, তিনি আজাব আপত্তি করতে পারলেন না, ছুটে 
নাড়ই তাকে থেতে হলো । খাওযার পর বৃদ্ধা কমগলুটি কাছে আগিয়ে 
দিলেন, বালানন্দও পাত্রের জলটুকু নিঃশেষ করে ফেললেন । স্ভাব মনে 
হলে, সারা দিনেব প্রচুব ক্ষুধা ও পথশ্রমজনিত অবসাদের যেন অবনান 
হয়ে গেল বৃদ্ধা-প্রদত্ত নাড় হাটি ভক্ষণ কবে। 

বৃদ্ধা এর পর পুলিন্দান ভিতর থেকে বিভুতি-মাখ! ছুটি মাত্র মরিচ 
বালানল্পেব হাতে দিয়ে বললেন : মুখে রাখ--শুধু মুখশুদ্ধি নয়, দেহ 
মন পর্ধস্ত শুদ্ধ হবে, দেহেব ও মনের যত কিছু বিকার সব কেটে 
যাবে। ভয় নেই-- মুখে দে। 

বালানন্দ মরিচ ছুটি মুখে দিলেন। বৃদ্ধা পু"টুলিটি বালানন্দের হাতে 
দিয়ে বললেন £ কাছে রেখে দে তুই, অনেক কাজে লাগবে। এর 
আর এক গুণ-_পাগলের পাগলামী সাবিয়ে দেয়। মাহুধত ভালে! 
হয়ই: পাগলা হাতীর পেটেও যদি এই সিদ্ধ-মরিচ এক মুঠে| খানিকট! 
বিভুতির সঙ্গে পড়ে, তারও পাগলামি কেটে যায়। 

কথাটা শুনেই বালানন্দ সচকিতভাবে বলে উঠলেন £ পাগলামি কেটে 
যায়! বালকেব মনে বিকৃত-মস্তিক সাধু গৌরীশক্করজীব কথা তৎক্ষণাৎ জেগে 
ওঠে ; সেই স্ুত্রেই এই প্রশ্ন । 

বদ্ধা এ প্রশ্ন শুনে আব একটু গন্তীব হয়ে জোর গলায় উত্তব দিলেন £ হ্যা 
রে-হ্যা; এতে সন্দেহ কববাব কিছু নেই | যত বড়, যতদিনেব__আর, যে- 
বকমেবই পাগল হোক না কেন-মাহুষ হ'লে এক চিষটে বিভুতি আর 
তিনটি মবিচ পব পর তিন দিন খেলেই মাথা পরিফার হয়ে যাবে-- 
ফোন দোষ বা গোল তার মাথায় আর থাকবে না। 

হ্বদ্ধার কথ! শুনতে শুনতে বালানন্দের মনে হলো, তার সর্বদেহের 
মধ্যে যেন অভিনব এক পুলকপ্রবাহ বয়ে গেল ; সেই সঙ্গে সমস্ত রক্তও যেন 
চঞ্চল হয়ে উঠছে। তার মনে প্রশ্ন জাগল-_ দেহ ও মনের এ পরিবর্তন কিসে 
ঘটল? বন্ধাদত্ সিদ্ধ-মরিচ ছুটির প্রভাবেই কি এরকম হলো? 

রন্ধা যেন বাদকের মনোভাব খুরখতে পেরেই বললেন £ তা ব'লে 
তুমি যেন বাছা সথ করে এ মরিচ খেয়ে! না। যে ছুটি খেয়েছ, এতেই 
োমার দেহ মন মগরুত হয়ে ধানে | অনেক পু'ঘি পড়ে কিছ] দিনরাত অপ 


বাল্যলীলা ৫৭ 


তপ করে যে-সব সাধু পণ্ডিত মাথা বিগড়ে কিভভুতকিমাকার হয়, এ-মরিচ তাদের 
অন্তে | তুমি এর গুণ পরীক্ষা করতেও পার | 

বালক বালানন্দ নির্বাক দ্রর্টিতে চেয়ে থাকেন ত্বদ্ধার পানে, মনের 
কথ। মুখ দিয়ে আর ফুটে বের হয় না। বৃদ্ধ| সেট লক্ষ্য করে বললেন £ 
ডাবছ বুঝি, কি করে পরীক্ষা করবে- সে রকম পাগল কোথায় পাবে? 
দেখ, এখান থেকে খানিক দুরে এ যে জোড়া শালগাছ দেখা যাচ্ছে, 
ওরই পাশ দিয়ে একটা সরু গলি পথ লাপের মত্ত একে বেঁকে একটা 
টিপির গায়ে গিয়ে মিশেছে । আসলে কিন্তু সেটা টিপি নয়--ছোট একটা 
গুহা । তার ভিতরে থাকে একট] বনমান্ুষ | এমনি সেট! ছুষ্ট যে, মানুষ 
দেখলেই ক্ষেপে ওঠে, মারতে আসে, ঠিক যেন--ডাকাত। কত চেষ্টা 
যে করছি তার কাছে যেতে, তাকে বলতে--ওরে হতভাগা, হটো। মরিচ- 
পড়া মুখে দে, তার ঝালে তোর মনের ভিতরকার বুনে ভাবট। শুধরে যাবে, 
মনটাঁও বদলাবে । কিগ্তসে কি শোনে আমার কথা ? বনমান্ুষ ত বনমান্ষ ! 
চোখ মুখ পাকিয়ে ভয় দেখায়, হাতের কাছে যা পায় তাই ছুড়ে মারতে চায় 
আমার কি? কথা ন। শুনলে বনমান্গুষ হয়েই এ'খানে থাকবেন! 

দ্ধার কথ ওনতে শুনতে বালানন্দের মনে প্রশ্ন জাগে-কে এ বনমানুষ | 
কার কথা বৃদ্ধা বলছেন ? গৌরীশঙ্কর মহারাজের যে সব কদর্ধ কাও মনে 
হলেই তিনি চঞ্চল অস্থির হয়ে পড়েন, ব্বদ্ধার কথিত বনমান্থষের সঙ্গে তার 
যেন সার্বশ্য রয়েছে! তবে কি বৃদ্ধা সেই গৌরীশন্করজীকেই বনমানুষ স্থির 
করে এভাবে আক্ষেপ করলেন? বৃদ্ধার কথার পিঠে বালানন্দ সাগ্রহে বললেন : 
আপনি যদি বলেন ত, আমি তার কাছে যেতে পারি ; আপনার এই বিভুতি 
আর মরিচ তাকে দিয়ে _ 

ঝংকার দিয়ে বৃদ্ধা বলেন £ কেন--কিসের দায় তোর পড়েছে শুদি? 
বনমানুষের কাছে বুঝি মানুষ কখনো যায়? যদি কামড়ায়, আঁচড়ে দেয়, 
মারে--তখন ? 

মত হেসে বালানন্দ বললেন : আমাকে সবাই ভালবাসে, কেউ মারে 
না, বকে না, কামড়ায় না। বলের পথে কতবার সাপের মুখে পড়েছি, 
এযনও হয়েছে_-সাপ উঠেছে ফৌস্‌. করে, ফণা তুলে ; ভাবলুম বুঝি 
কামড়ালে ; কিস্ত এমনি আশ্চর্য, চোবোচোখি হতেই দেখি। মাথা নীচু করে 


৫৮ ঝাড়খণ্ের ধঁষি 


সেই সাপ ম্ুড় সুড় করে চলে যাচ্ছে। আপনি চন্ুন না আমার সঙ্গে ; 
দেখবেন, যত বড় দুরন্ত বনমানুষ হোন না কেন-_আমি তার সঙ্গে এমনি 
ভাঁব করে ফেলব, যেন কতদিনের চেনা । 

বৃদ্ধা সোলাসে বলে ওঠেন : ওরে বাবা! ভুমি ভ তাহলে বড় সাধারণ 
ছেলে নও দেখছি! সাপ তোমাকে ছেোঁয় না__ফণ। নামিয়ে পালিয়ে যায়, 
বনমানুষের নামেও তুমি ভয় পাও না--দেখা করতে চাও ! তা বাপু, যা 
তোমার ইচ্ছা হয় কর, আমি আব কি বলি বলত? দেখ--যদি এ যরিচ- 
পড়া খাইয়ে তার ঘাড়ের ভুতটাকে নামাতে পারো । তাহলে তুমি যাও, 
আমিও আমরি গেরামষে যাই | 

বালানন্দ বললেন : পারবেন আপনার গ্রামে একলা যেতে? কিন্তু 
এখানে গ্রাম কোথায়? কোন চিহ্ন ত দেখছি না। তাহলে চলুন, আপনার 
সঙ্গে গিয়ে আমি আপনাকে পৌছে দিয়ে আসি । 

বৃদ্ধা এবার মুখখানা] শক্ত করে বললেন : নাবে বাপু--না ; আর জ্বালাসনি 
আমাকে | যত সব পাগলের পাল্লায় পডে আমার প্রাণ যায় বলে-আঁপনি 
ওভে ঠাই পায় না, শঙ্করাকে ডাকে । নিজেরই মাথা রাখার জায়গা মেলে 
ন1, দাঁতে কাটি এমন দান। জোটে না, এব ওপর তোমাকে সঙ্গে নিযে আবার 
এঁকটা ফ্যাঙ্গাদ বাধাই আর কি! 

বৃদ্ধার কথায় বালকের মুখখান। লজ্জায় বিবর্ণ হয়ে ওঠে, ছলছল চোখে 
বদ্ধার পানে চেয়ে বলে উঠলেন £ না, না, আমি ত থাকব বলে আপনার 
সঙ্গে মেতে চাইনি, পাছে পথে একলা যেতে আপনার কষ্ট হয়, তাই আপনাকে 
গ্রামে পৌছে দিয়ে আসবার কথা বলছিলাম । 

বৃন্ধাও ম্লান মুখে অ্রেহার্জ স্বরে বললেন হ আহা, মরবে যাই। সত্যি 
বাছার আমার কি দয়ার শরীর! আমার কথায় খুব বাগ হয়েছে না? কি 
করি বল, বুড়ো হয়েছি, গুছিয়ে কথা বলতে পারিনে, একট্ুতেই রেগে উঠি। 
1, আমারই বধ! দোষ কি বল? এ হতচ্ছাড়া বুনো মান্ুষটাই যে আমার 
এই হাল করেছে! হ্যা, তাহলে এখন বলি তোমাকে বাছা, আচ্ছা করে 
এ মরিচ-পড়। সকালে বিকেলে দ্বটি বেলা দশট1 করে দানা এ হতভাগারে 
গিগিয়ে দিতে পার, তাহলেই ওর মনের ঝাঁঝ নেমে যাবে, আর মনটাও 
হাক্ষা হবে| এখন চল, আমিও উঠি। 


বাল্যলীল। ৫৯ 


বলেই বৃদ্ধ! লাঠিখান। তুলে নিয়ে তার উপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে 
দাড়ালেন। বালানদ্দও তাড়াতাড়ি তাহার কমণ্ডলুটি নদীর জলে ভরে নিয়ে 
ঝুলি ও দণ্ডটি গুছিয়ে বৃদ্ধার কাছে এসে বললেন £ চলুন! 

লাঠি অবলম্বনে আগে আগে বৃদ্ধা এবং তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে 
বালানন্দ ধীরে ধীরে নদী সৈকত থেকে উপরে উঠতে লাগলেন । 


নয় 


কিছুদূর অগ্রসর হতেই তারা দেখলেন, বড় বড় ছুটে শাল গাছ সংকীর্ণ 
বনপখথটি রুদ্ধ করে পাশাপাশি দাড়িয়ে আছে । বৃদ্ধা বললেন : এই গাছ 
দুটোর কথাই বলেছিলুম তোমাকে । পাশাপাশি ছুটিতে হাত ধরাধরি করে 
এমন ভাবে ছড়িয়ে আছে যে, দেখলে মনে হয় বুঝি আর রাস্তা নেই-_- 
এইখানেই শেষ হয়েছে । 

বালানন্দ স্থুধালেন : আপনি এখন কোন্‌ দিকে যাবেন? 

বৃদ্ধা বললেন £ আমার পথ সামনেই । এই গাছ ছ্ুটো আমার পথ 
আটকাবে ভেবেছ বুঝি! আমি এদেব পাশ কাটিয়ে ঠিক যাব, এখন তুষি 
কোথায় যাবে, সেইাটি হচ্ছে কথা | তোমার পথটি দেখতে পেয়েছ ? 

চোখ ছুটে! তুলে বালানন্দ বৃদ্ধার পানে তাকালেন । বৃদ্ধা হেসে বললেন ; 
কথাটা কি বুঝতে পার নি? পথের কথা জিজ্ঞাসা করছি | তুমি এখন কোন্‌ 
পথে যাবে? 

মৃতু হেসে বালক সাধু বললেন £ পথেব কথা ত আগেই আপনি বলে 
দিয়েছেন। এই জোড় গাছের পাশ দিয়ে যেতে হবে আমাকে ! এইখানেই 
গুহ1, আর তার ভিতরে একজন মান্নুষ আছেন বললেন না? 

বালকের কথা শুনে, বৃদ্ধার মুখে হাসির একটা ঝলক খেলে গেল! তার 
পানে তাকিয়ে বললেন : মনে আছে তাহলে ! 

বালানন্ন বললেন ; কিন্তু পথ ত এখানে দেখছি ন1, খালি যেবন! 

ব্বদ্ধী বললেন ; বোক1 ছেলে, বনে না সেধুলে কি পথ পাওয়া যায়? 
এখানে কি মাটি দিয়ে বাধা পথ আছে যে চিনে যাবে ! পায়ে পায়ে চলে চলে 
দাগ পড়ে, তাই ধরে খুব হুপিয়ার হয়ে যেতে হয়। এই জোড় গাছের 
পাশ দিয়ে একটু এগুলেই দেখতে পাবে মণ্ত একট! টিপি-- 


ড০ ঝাড়খণ্ডের খাষি 


বালানন্দ বললেন £ আপলি ত বলেছেন, তাঁর ভিতরেই একট। গুহা আছে, 
আর সেখানে থাকে একট! বনমাহষ 

বৃদ্ধা বললেন : তাথাকে। তবেকি আর বাইরে বেরিয়ে আসে না? 
আসতেই হবে, নৈলে দরিয়ার সনে লড়াই করবে কে? 

বালানন্দ জিজ্ঞাস করলেন : দবিয়ার সনে লড়াই করে ত্র লাভ ? 

ঝঙ্কার দিয়ে বৃদ্ধা বললেন £ সেই জানে | যত রাগ তার এ নর্শদার 
ওপরে । তাকে ভ্যাংচাবে, গাল দেবে, তার জলে পাথর ছুড়ে ছুড়ে ফেলে 
বুজিয়ে দেবার জন্যে কত পাগলামিই করবে । অগন্ত্য থষির মত যদি ক্ষমতা 
থাকত, তাহলে হয়ত নর্মদা বুড়ীকে গণ্ুষে শুষেই ফেলত । 

বালানন্দ এই সময় মনে মনে কি ভেবে বললেন £ দেখুন, আপনার কথা 
শুনে আমার মনে ভাঁরি ধোকা লাগছে । আমি একজন সাধুর সন্ধানেই বনে 
ঘুরে বেড়াচ্ছি। লোকে বলে, তার নাকি মাথ! খারাপ হয়েছে। মানুষের 
ভীড় তিনি সইতে পারেন না, ঠাঁকুর দেবতার বিগ্রহ তার চোখে পড়লেই তার 
ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েন | সব চেয়ে বেশী রাগ আর বিছ্বেষ নর্নদাজীর উপরে | 
তীঁকে মারতে যান, যা তা বলেন। তাইত এ অঞ্চলের লোক তাকে 
কালাপাহাড়-সাধু বলেন । আপনি কি সেই সাধুর কথ! ভুলে-বনমান্থম বলে 
ঘ্বণা করছিলেন ? ইনিই কি তাহলে গৌরীশঙ্কব মহারাজ--গুহার মধ্যে 
এখন লুকিয়ে আছেন ? 

বৃদ্ধা এতক্ষণ পাথরের মূতির মত স্থির ভাবে দাড়িয়ে নীরবে বালানদ্দের 
কথাগুলি শুনছিলেন । ক্ষণকালের জন্য তাদের পথ চলায় ছেদ পড়েছিল । 
পরক্ষণে মুখখান। গম্ভীর করে ব্বদ্ধাই বললেন £ হবে হয়ত সেই। কিন্তু লুকিয়ে 
থাকবে কেন? কালাপাহাড়র। কি লুকোয়? 

বালানঙগও কিছুক্ষণ নীরব থেকে, তারপর কণ্ঠে একটু জোর দিয়ে বললেন £ 
আপনার মতলব আমি বুঝেছি । আমার সঙ্গে দেখা হবার সময় থেকেই 
ফতবারই এ সাধুর কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছেন । নিজের ইচ্ছা নেই তার 
কাছে যাবার, অথচ তিনি লেরে ওঠেন, পাগলামি তার সেরে যায়, সেজন্তে কত 
কিযে বলছেন আমাকে ; মন্ত্রপড়া মরিচ আর বিভুতি দিলেন পুটুলি বেঁধে 
আমার হাতে, আমি যাঁতে তাকে এই সিদ্ধ ওযুধ খাইয়ে ভালো করে ভুলি। 
কাটি হবে * আপুনি মিত্র গীয়ে ফাঁন। আমিও টিপিটার ভিতরে সেধিয়ে 


বালযলীল৷ ৬১ 


স্তাকে দেখি, তার সঙ্গে আলাপ করি, তারপর আপনি যা যাকরতে বলেছেন, 
সেগুলি দিয়ে সেবা! করে তাঁকে সুস্থ করে তুলি। তাহলে আর বিলম্ব করা 
নয়, সন্ধ্যা হয়ে আসছে । 

বালানন্দের কথাগুলি শুনে, লাঠিটা পাথুরে মাটিতে বার কয়েক একে, 
বৃদ্ধা হাঁ হা; শর্ষে হেসে উঠলেন । তার পর বালানন্দের মাথায় হাঁতখানি 
রেখে বললেন : পরমাত্মার দয়ায় সব কাজ তোমার সিদ্ধ হয়ে যাবে৷ আমি 
তবে আমার পথে যাই, তুমিও তোমার পথ দেখ। 

এক নিশ্বাস কথাগুলি বলেই, তিনি গেই স্থান থেকে ধীরে ধীরে খানিকটা 
গিয়ে, তারপর গভীব বনের দিকে এগিয়ে গেলেন । বালানন্নও বৃদ্ধা কথিত 
টিপিটি কগ্পনা করে ভ্রতপদে সামনের দিকে এগিয়ে চললেন । 

চেষ্টা, যত্ব, নিষ্ঠা ও আগ্রহ থাকলে অন্তরের সব কামনাই সিদ্ধ হয়ে থাঁকে। 
সন্ধ্যার সেই প্প্রায়ান্ধকারে, বালক বালানন্দ সংকীর্ণ পথটি ধরে মাটির সুসৃহৎ 
টিপিটির সামনে উপনীত হয়ে দেখতে পেলেন, একস্থানে দ্বারের মত প্রকাণ্ড 
একখান পাথর রয়েছে । দণ্ড, কমণ্ডলু ও পুটুলিটি বনপথে রেখে, তিনি 
হু'হাতে দেহেব সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে চাপ দিয়ে পাথরখানা খুলে ফেললেন । 
অন্ুমানে বুঝলেন, সত্যই স্থানটি গুহার মত । সঙ্গেব জিনিষ পত্রগুলি গুছিয়ে 
নিয়ে একটু এগিয়ে যেতেই, আলোবৰ একট। স্ুল ব্বেখা তার চোখে পড়ল। 
ক্ষণকাল স্থিরভাবে দাড়িয়ে ও সেদিকে ঘড় লক রেখে বুঝলেন, অদূরে একট 
ধুনি জলছে, তারই আলোক-বশ্ি ধীরে ধীবে অন্ধকারাচ্ছম গুহাটির মধ্যে 
প্রতিফলিত হচ্ছে । আনন্দে বালানন্দের মুখমণ্ডল উৎফুল্পু হয়ে উঠল। 
ধীরে ধীরে সেই অগ্রিকুও লক্ষ্য করে তিনি কয়েক পদ অগ্রসর হতেই 
দেখতে পেলেন, দীর্থাক্কতি এক বিরাট পুরুষ গরজ্জলিত ধুনির সন্মুখে 
ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসে আছেন। তার মাথার চুলগুলি অযত্বে জটার আকৃতি 
ধরে পিঠ পর্ষস্ত প্রসারিত, আর মুখ দীর্ঘ শ্মশ্রুগুষ্ফে সমাচ্ছন্ন | বালক 
বালাননের বুঝতে বিলম্ব হুলে। না--ইনিই ব্বদ্ধা কথিত সেই বনমান্নষ, আর-- 
তাদের বছবাঞ্চিত উন্মত্ত সাধু গৌরীশদ্বরূজী | 


ন্শ 


ধ্যানমগ্ন ত্রক্মচারীকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম কবে বালানন্দ তার সামনেই 
আসন পেতে বসলেদ। যেন পরিচিত স্থান, পরিচিত এই গুহাবাসী 
সাধু। উভয়েই নীবব। বালক বালানন্দের ব্যাকুল দ্বৃষ্টি বর্ষীয়ান সাধুব 
মুখে নিবদ্ধ। প্রায় একদণ্ড কাল পবে সাধুব ধ্যান ভঙ্গ হলো। বাল- 
ব্রহ্মচারীর সঙ্গে চোখোচোখি হতেই তিনি চীৎকার করে উঠলেন; চিক 
স্থায়, ঠিক হ্যায়, ভগবানজী ভেজ]। 

বালানন্দও সঙ্গে সঙ্গে পুনবায ভূমিষ্ঠ হয়ে সাধুজীকে প্রণাম কবে বললেন £ 
হ্যা গুরুজী--ভগবানজীর কৃপা হতেই আমি আপনাব কাছে এসেছি। 
দাসের সেবা গ্রহণ করতে আজ্ঞা হোক । 

বিশ্মিত কঠে গৌবীশঙ্কব মহাবাঁজ বললেন 2 সেবা? গুরুজী? বি্তু 
আমি তোমাকে কোনদিন দীক্ষা] দিয়েছি বলে ত মনে হচ্ছেনা! ঝুট 
হযায়-বুট । আমার সামনে বসে মিথ্যা বলছ? আমাকে তুমি চেন না, 
আমার কথা শোননি, আমাব সংহাব মৃতি তুমি দেখনি? আশ্চর্য্য, এখনে! 
ঠাণ্ডা মেজাজে তোমাৰ সঙ্গে কথা বলছি আমি, আশ্চর্ম 

হাত ছু'খানি যুক্ত করে নম্স্ববে বালান'দ বললেন * এও ভগবানজীব 
কপ! গুরুজী ! আমি যদি মিথ্যাচরী হতাম, মনে মধ্যে পাপ লুকিযে 
থাকত, তাহলে কি আপনাব কাছে আসবাব উপায় পেতাম, আব আপনিও 
আমাকে দেখে মার-মৃতি না ধবে এমন করে মিষ্ট স্তুবে কথা বলতেন? 

সাধুর দৃঢ় অস্তরাটি এতক্ষণে তুলে উঠল, বালকের সুন্দর মূততি এবং 
যুক্তিপুর্ণ মিষ্ট কথাগুলি তাকে বুঝি সত্যই অভিভুত করল । তেমনি গম্ভীব 
ও সহছভাবেই তিনি বললেন : সুর থেকেই তুমি আমাকে গুকজী 
বলছ! অবশ্য বহু ভক্তকে দীক্ষা দিয়ে আমি তাদের গুরুজী হয়েছি, 
কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ আসে না আমার কাছে-কোন খোঁজ খবরও 
নেয় না কেউ। কিন্তু বাপু, তোমাকে আমি নিশ্চয়ই দীক্ষা দিই নাই 
কোনদিন, তাহলে মনে পড়ত; তবুও তুমি আমাকে গুরুজী বলছ কেন? 

বাঁদানঙ্গ বললেন ₹ হয, আপনি যা বললেন, আমি স্বীকার করছি। 
দীক্ষা আমার মেওয়াঁ" হয়ে গেছে এবং আপলারই মত এক মহাপুরুষ 


বালালীল৷ ৬৩ 


আমাকে দীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু দীক্ষা হলেও শিক্ষা যে আমার একেবারে 
অসম্পূর্ণ হয়ে আছে ঠাকুর। সেকথা আমার দীক্ষাদাতা গুরুকে বলতেই 
তিনি আমাকে দৈববাণীর মত যে কথাগুলি শুনিয়ে দেন, সেগুলি যেন 
আমার কাছে জপের মন্ত্রে মত আমার মনের মধ্যে গুপ্ত রয়েছে। 
তিনি বলেছিলেন-_-তোমার প্রয়োজন আগে দীক্ষা, তারপর শিক্ষা! । 
সাধনার পথে এ ছুটোই চাই । দীক্ষা না হলে সাধনা হয় না, শিক্ষা ন! 
পেলে সিদ্ধি আসে না। তোমাকে দীক্ষা দেবার জন্য আমি যেমন এখানে 
বসে তোমার প্রতীক্ষা করেছি, তোমার শিক্ষাও সম্পূর্ণ করবার জন্য এমন 
এক অন্ডুত সাধক তোমার প্রতীক্ষায় আছেন -পু'ধী পড়া বিপুল বিষ্কা। 
পোকার মত তার মাথার মধো জড় হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । এখন তোমাকে 
সেই বিদ্ভা আদায় করতে হবে তাকে খুঁজে বার করে। এ অঞ্চলেই 
কোথাও তিনি লুকিষে আছেন, তার নাম -গৌরীশঙ্কর মহারাজ | 

সাধু এমন গলায় সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে অট্টনাদ করে উঠলেন--সেই 
শ্রবণ ভৈবব নাদ আতাত্বক নয--হাশ্যময় | এমন অট্রহ্গাসির ধ্বনি বালানন্দের 
করণে কখনো প্রবেশ কবে নি, সেই গম্ভীর গুহ] তার আবর্তে যেন উদ্বেগিত 
হয়ে কাপতে লাগল ; পরক্ষণে যুক্তকবে ললাট স্পর্শ করে তিনি বললেন 5 
বুঝিছি, মাধু ব্রহ্মা নন্দজী তোমাকে দীক্ষ! দিবেছেন, আমার কথ! বলেছেন, 
বুঝিছি--নমে। নাবায়ণায,--নারায়ণায ! বেশ, আমি তোম|কে শিক্ষা দেব, 
কিন্তু পুর্ণ সাতটি বছর তোমাকে সর্বক্ষণ আমার কাছে থাকতে হবে, সমস্ত 
মন মর্জি শক্তি ভক্তি দিয়ে শিক্ষা আদায কবে নিতে হবে । 

আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে গৌবীশঙ্করজীর সম্মুখে পুনরায় ভূমিষ্ঠ হয়ে 
পদযুগলে মাথা ঠেকিষে বালক বালানন্দ বললেন ; শিক্ষার জন্ম দেহ পণ 
করে আমি আপনার কাছেই থাকব গুরুজী , শিক্ষার লঙে আপনার সেব! 
পরিচর্যা করে আমি ধন্য হব, আপনি আমাকে চরণে স্থান দিন। 

আজানুলদ্বিত দীর্ঘ হাতখানি তুলে বালক ক্রক্ষচারীর মাথায় উপর রেখে 
সাধুজী উৎফুল্ল মুখে আশীর্ধবাদ কবলেন : তোমার মনস্কামন! পুর্ণ হবে, শর 
ভৌমার সঙ্গ পেয়ে আমার মাথার পোঁকাগুলোও ঠাণ্ডা হবে--কে যেন আমার 
কানে কানে বলে দিলে । আমরা কাল সকালেই এখান থেকে বিদায় 
নিয়ে অঙ্ধানঙ্গজীর আশ্রমে গিয়ে তাকে নমস্কার কর । 


৬৪ ঝাড়খণ্ডের ধবি 


সাঁধুজীর কথ! শুনে বালকের সব্র্বাগ আনন্দে রোমাঞ্চ হয়ে উঠল। 
তিনিও উচ্ছুসিত কণ্ঠে উল্লাসের সুরে বললেন : আমারও এই ইচ্ছ। গুরুজী ! 
গঙ্গোনাথজীর মন্দিরে আমি যদি আপনাকে নিয়ে যেতে পারি, সবাই 
ধন্ত ধন্ত করবেন । আমার আর একটি প্রার্থনা আছে আপনার কাছে_ সেটিও 
রাখতে হবে । 
প্রসন্ন মুখে নাধু জানালেন £ সচ্ছন্দে বলতে পার বেটা, তোমাকে আমার 
অদেয় কিছু নেই। এই অল্প ক্ষণের মধ্যেই তুমি আমাকে জয় করে ফেলেছ। 
বলদ-_.কি তুমি চাও ? 
কিঞ্চিৎ কুষ্ঠিত ভাবেই বালানন্দ বললেন : দেখুন গুরুজী, যে মঙ্গলময় 
ভগবানদ্ী আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন, এই গুপ্ত গুহার সন্ধান পেয়ে 
আমি এখানে আঙ্নতে পেরেছি, তারই কৃপায় আমি এক মামীর কাছে কিছু 
প্রসাদ পেয়েছি আপনার জছ্ক | এখন মনে কোল ছ্িধ। না রেখে আপনি গ্রহণ 
করবেন--এই আমার প্রার্থনা আপনার কাছে। 
সাধুজী আবার সেইভাবে হেসে উঠলেন, তার অট্হাসির ধবনি আবার সেই 
গহাটিকে প্রকম্পিত করে তুলল। হাসির ধ্বনি বাঁমুতরঙ্গে বিলীন হতেই 
তিনি বললেল ; আঁমি জেনেছি সে মায়ী কে? মায়ীর। মায়ীই থাকে 
বাচ্চা--দরদের এভটুকু কমতি দেখা যায় না। বাস্‌--তাই হবে, সেই 
পাওয়াই আমি নেব ; আর তুমিই নিজের হাতে মায়ীর দেওয় দাওয়াই দিয়ে 
' আমার সেবা সুর করবে । এখন এসো, আমি তোমার আহার ও রাব্রিবাসের 
বাবস্থা করি । 
বালানন্দ আনন্দে শিউরে উঠে বললেন : এ কি বলছেন গুক্জী-_আমারই 
কর্তব্য আগে আপনার আহারের ব্যবস্থা করা-_ 
স্ব হেনে সাধুজী বললেন : কিন্তু তুমি যে এখন আমার অতিথি, এই 
হুর্গগ 'গুহামধ্যে অভ্যাগত। গুহাবাসীরও ধর্ণ আছে, বিশেষ করে 
আতিথেয়তা । আবার দেখ এমনি মজা, অপরাহ্ের দিকে এক পাহাড়িয়া 
মায়ী, ফোন রকমে এই গুহার সন্ধান পেয়ে এ গবাক্ষে এক ভাঁড় হুধ আর 
কিছু ফল রেখে গেছে! যে ভাবে সে রেখে গেছে, তেমনি পড়ে আছে, 
আব খাঁকতও । এখন তুমি আসায় কাজে যদি লাগে ক্ষতি কি! এ থেকেই 
, ষোঝা, তখামরী কি ভাবে সারা হুনিগ্বার সাঁছিষের খবর রাখেন,| এ স্ধ 


বাল্যলীল। ৬৫ 


এখানে আন, ধূনীতে আরো ছুখানা কাঠ দাও, আর ভাঁড় থেকে দুধটুকু 
লোটায় ঢেলে ত্র আগুনে চাপাও । ব্যস্‌-এ থেকেই জান! যাবে, সেবা 
পরিচর্ধী করতে তোমার কি রকম সামর্থ্য আছে। 

বালক বালানন্দ অবাক হয়ে মনে মনে ভাবতে থাকেন, এযন সুন্দর প্রকৃতি 
ও ল্সেহপ্রবণ মন যে মাশ্ুষটির, তার সম্বন্ধে কত কথাই শোনা গেছে! এখন 
মনে হচ্ছে-_বহু পুণ্য আর ভাগ্যের জোরেই তিনি এমন সদালাপী শিক্ষার্তরু 
পেয়েছেন । বালানন্দ অতঃপর সাধুজীর নির্দেশমত পরিচর্যায় প্রত্বস্ত 
হলেন। 

প্রত্যুষেই প্রাতঃকৃত্যাদির পর উভয়ে সেই গুপ্ত গুহা ভ্যাগ করে 
গজোনাথ আশ্রমের উদ্েশে চললেন ! পথে চলতে চলতে সাধু গৌরীশক্কর 
বালানন্দকে বললেন হ তোঁমার সঙ্গে আলাপ করে কথাবার্তী শুনে যনে 
ছোচ্ছে আধ্যাত্বিকতার পথে তুমি এই বয়সে অনেকটা এগিয়ে পড়েছ। 
তোমাকে লৌকিক শিক্ষা দিয়ে কৃতবিদ্য করে তুলতে আমার পক্ষে অন্ুুবিধা 
হবে না। 

বালানন্দ তৎক্ষণাৎ সবিনয়ে বললেন £ আপনি যে অনুমান করেছেন তা 
ঠিক নয় গুরুজী! আপনাদের যত সাধু সঙ্গ করে হয়ত ভাসা ভাসা কিন্তু 
শিখতে পেরেছি, কিন্ত তাঁকে শিক্ষা বল! যায় না! আমি এই জগতের কথা, 
যিনি এই জগতের শ্রষ্টা-_-তার কথা, থবিদের কথা, তাদের লেখ শাস্ত্র 
বিজ্ঞান সংহিতা দর্শন প্রভাতির কথ! আগাগোড়া সব জানতে চাই। এমন 
করে আমাকে সব বুঝিয়ে দিতে হবে--পরে আমাকে কেউ জিজ্ঞাসা করলে, 
আমিও যেন বুঝিয়ে দিতে পারি | 

গৌরীশঙ্করজী সহাস্যে বললেন £ তাই হবে । তোমার কথা শুনে আমি 
যেন ভাবদৃষ্টিতে উজ্জ্বল ভবিষ্তৎ তোমার দেখতে পাচ্ছি বালানন্দ_-দেশের নানা 
স্থান থেকে হাজার হাজার ভক্ত তোমার কাছে জ্ঞানের প্রার্থী হয়ে আসছে। 

বালক সাধুর সুন্দর মুখখানি আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল বটে, কিন্ত সঙ্গে 
সঙ্গে নিজের সম্বন্ধে গ্রষি-কল্প সাধুশ্রেষ্ঠের মুখ থেকে এই ভবিষ্বাদ্বাণী শুনে 
মনে মনে লজ্জিভ ও সঙ্কুচিত হলেন । গৌরীশক্করজী সেটি উপলব্ধি করে 
কণ্ঠে জোর দিয়ে বললেন £ যে ভগবানের প্রতি তোমার দু বিশ্বাস, তোমার 
সম্বন্ধে এ তারই অনুজ্ঞার আভাস । ভবিত্যতে তুমি এই ভারতে সাধনাসিদ্ধ 

৫ 


৬৬ ঝাড়খণ্ডের খাবি 


সাধূপুকষরূপে খ্যাতি পাবে--বহু বহু ভক্ত তোমার কাছে দীক্ষা নিয়ে ধস্া হবে| 
একটা কথা ভোমাকে মনে রাখতে বলছি বালানন্দ_-জীবের এই শৈশব 
জীবনটিই তার সমগ্র ভাবী জীবনের প্রতিবিষ্বের মতন। এ থেকেই সব কিছু 
জানা যায়। জীবনকে মনের মতন করে গঠন করবার এমন সময় আর নেই । 
তোমার সমস্ত কৈশোর-জীবন সামনে পড়ে রয়েছে, কিশোর বয়সেই তুমি 
সংকল্প করে নর্রদা-পরিক্রমায় প্রবৃত্ত হয়েছে । একি বড় সহজ কথা: এই 
বিরাট পরিক্র1ার সঙ্গেই যেভাবে তোমার শিক্ষা চলবে, সেও অপুর্ব | 

বালানদ্দের মনে হলো, যেন অন্তধ্যামীর মতই সাধু গৌরীশঙ্করজী তার 
জীবনের যাত্রাপথের নির্দেশ দিলেন-_-মনে যনে তিনি নিজেই য] স্থির করে 
রেখেছিলেন । নর্ধদা-পরিক্রমাঁয় তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ । এই পরিক্রমার সঙ্গে যদি 
তার শিক্ষা চলে, তাহলে এক সঙ্গে ছুটে! কাজই সিদ্ধ হবে--পরিক্রমার সঙ্গে 
নৃত্তন নূতন নান] স্থান, অরণ্য, পর্ধত প্রভৃতি দর্শন করে শিক্ষাকেও নালা 
প্রকারে সার্থক করে তুলবেন । 

উল্লামেব স্বরে বালক তাঁর মনের কথ! পাধুজীকে বলতেই তিনিও 
সোল্লাসে পুরধের মত অট্টহাসির ঝংকার তুলে বলে উঠলেন £ যাদ্বশী ভাবনা যস্থা 
সিদ্ধিভবতি তাদ্রশী। এ হবোতেই হবে_-ভগবানজীর ইচ্ছাতেই আমাদের এই 
সংযোগ । আমার জীবনে দোষ ক্রটি অন্যায় অনাচার অনেক হয়ে গেছে, 
প্রথন তার প্রায়শ্চিত্তের সময় এসেছে! আমাকে আবার নিয়ম করে চালাতে 
হবে পৰিক্রমার কাজ, সেই সঙ্গে শিক্ষাত্রতীরূপে শিক্ষাদান । 

কুর্য্যোদয়ের আগেই গৌরীশক্কর মহারাজ বালক বালানন্দকে সঙ্গে করে 
গঙ্গোনাথজীর মন্দির দ্বারে উপস্থিত হলেন। এদের দুজনকে দেখেই 
আশ্রমবাসী সকলেই উল্লাসে চীৎকার করে উঠলেন । ক্রক্ষানন্ন মহারাজ 
তখন ভার অখণ্ড ধুনির উপর ঘ্ৃতসিক্ত সমিধ আহুতি দিয়ে শিষ্যদের প্রতীক্ষা 
কবছিলেন। এমনি সময় চারদিক থেকে তারা উল্লাস ধ্বনি তুলে সেখানে 
সমবেত হয়ে বললেন £ ভারি আশ্চর্য মহারাজ, গৌরীশঙ্কর্ী এসেছেন-_সঙ্গে 
মহারাজের সেই বালক শিস্ত বালানন্দ। 

প্রফুল্ল মুখে মহারাজ বললেন £ এ বালকই তাকে এনেছে! সে সক্ষপ্প 
করেছিল, বিদ্কত মস্তিক সাধুকে সে সুস্থ করে আশ্রমে আনবে । গৌরীশত্বর 
তার ভাবী শিশ্কাকে তাহলে জানতে প্পরেছেন। 


বাল্যলীল! ৬৭ 

এই জময় “নমো! নারায়ণায়' ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত করে নমস্কার করতে করতে 
গৌরীশঙ্কর মহারাজ সেখানে উপস্থিত হলেন। বালক বালানন্দও ভ্রুতপদে 
নিকটে এসে ভূমিষ্ঠ হয়ে দীক্ষাগুরূর পদধুলি গ্রহণ করলেন । 

গৌরীশক্কর মহারাজ বললেন : এই ছোকরার কাণ্ড দেখুন, গুহ মধ্যে 
লুকিয়ে থেকে প্রায়শ্চিত্ত করছিলাম, সন্ধান করে সেখানে গিয়ে আবার আমাকে 
টেনে এনেছে । আর, এর মনের এমনি শক্তি যে, আমি কিছুতেই বাধা দিতে 
পারিনি--নিজেই যেন ওর কাছে বাধ্য হয়ে পড়েছি । বলে কিনা দীক্ষা 
পেয়েছে আপনার কাছে, শিক্ষা দিতে হবে আমাকে ; যাকে বল। যায় আটে 
পৃটে বেঁধে দ্ঢবন্ধন | 

ব্রহ্মানন্দ মহারাজ সাদরে গৌরীশঙ্করজীকে নিকটে কুশাসনে বসিয়ে সহাশ্মে 
বললেন £ একেই বলে- প্রকৃতির প্রতিশোধ | উদ্ত্রাস্ত হয়ে তুমি যে সব 
অনাচার করেছ, তার প্রায়শ্চিত্তের সময় এদেছে। বিপুল বিদ্যার সাধনায় 
সিদ্ধিলাভ করেও সে বিদ্যা প্রচারের ক্ষেত্র পাও নাই । পরমেশ্বর মঙ্গলময় : 
তিনি দেশ ও জাতির প্রয়োজন বুঝেই এই ভক্ত শিহ্যটিকে তোমার হাতে স'পে 
দিয়েছেন | প্রকৃতির বিদ্যাগাবে এখন থেকে কিছুকাল তোমাকে শিক্ষাগ্তরুর 
দায়িত্ব বহন করতে হবে। 

ব্রন্মা*্.-প মহারাজের এই নিদেশ শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করে সেইদিন থেকেই 
গৌরীশক্কর মহারাজ বালক বালানন্দের শিক্ষাভার গ্রহণ করলেন । 


এগারে। 


অপূর্ব গুরু, অপুর্ব শিক্ষা, অপুর্ব শিক্ষার পদ্ধতি। বালানন্দ ভাবেন, 
শিক্ষা ত দেবেন, কিন্তু প্রস্থ কোথায়? এখন তার মনে অনুতাপ হয়-_ 
পাঠশালার পণ্ডিত শিক্ষ। দিবার জন্য যখন সাধাসাধি করতেন, তখন যদি 
পড়াশোন। কিছুটা! শিখে রাঁখতেন_-তাহ'লে এখন স্থবিধা হত ! 

গুরুক্জী যেন শিষ্যের মনোভাব বুঝেই তার সে আক্ষেপ দুর করে দেন। 
বলেন £ গ্রন্থের জন্যে ভাববার কিছু নেই, গ্রশ্থের শব্বগুলি সব আমার কণ্ঠ 
থেকেই বেরবে। ভবে শিক্ষার আগে দেহের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। 


ঘেরওড সংহিতায় বলছে 


৬৮ ৃ থাড়খণ্ডের ধষি 


আম কুন্ত মিবান্তস্বা জীর্ণমানঃ সদ] ঘট | 
যোসাগনেন সংদহা ঘতত্তব্বিং সমাচরেখ ॥ 
অর্থাৎ--আমাদের এই মানব দেহটি কাচা মাটির তৈরী একটি ঘটের 
মতন । কীচা ঘটে জল রাখলে জলের সঙ্গে ঘটাটিও নষ্ট হয়ে যায়। কিন্ত 
সেই ঘট আগুনে পুড়িয়ে নিয়ে তাতে জল রাখলে সে জল সেখানে ঠাণ্ডা 
অবস্থায় ভাল থাকে । 
বালানন্দ জিজ্ঞাসা করলেন : তাহলে ত গুরুজী আমার দেহ-ঘটটিকে 
শোধন করে নিতে হবে ! সেকি উপায়ে হবে? গুরুজী বললেন : 
ষটুকর্মণ। শোধনঞ্চ আসনেন ভবেদঢ, 
মুদ্রয়। শ্থিরতাচৈব প্রত্যাহারেণ ধায়তা 
প্রাণায়ামাল্লাঘবঞ্জ ধ্যানাৎ প্রত্যক্ষমাত্বনি ॥ 
অর্থাৎছয় রকম কর্ণ দিয়ে শোধন, মুদ্রা দিয়ে স্থৈষ্য, আসন দিয়ে দারা, 
প্রাণায়াম দিয়ে লধুতা।, ধ্যান দিয়ে ধারণার বস্তুকে দেখা, আর সমাধি দিয়ে 
আত্মপ্রকাশের আনন্দ লাভ হয়ে থাকে । 
এরপর গুরুজী শিষ্যকে বুঝিয়ে বললেন এগুলি হচ্ছে হঠযোগের অঙ্গ । 
তোমাকে এখন থেকে এই যৌগ অভ্যাস করতে হবে! এই যোগের সঙ্গে 
শিক্ষারও সম্বন্ধ আছে জেনো । গুরু শিস্তকে এই বয়সেই স্ুকঠিন হঠযোগের 
সাধনা ও ক্রিয়া সম্বন্ধে হাতে ধরে উপদেশ সহ শিক্ষা দিতে লাগলেন। 
অনেকের ধারণা, রাজযোগই প্রকৃত যোগ, আর হঠযোগ কতকটা কসরৎ বা 
বুজককি মাত্র।। কিন্তু গুরুজী বালাশন্দকে বুঝিয়ে দিলেন, লোকের এ ধারণ! 
ভুল। এই উভয় যোগের অঙ্গাঙ্জী সম্বন্ধ রয়েছে__ 
হঠং বিনা রাজযোগং, রাজযোগং বিনা হঠত। 
নসিদ্ধতি তত মুগ্রমানিষ্পতে সমভ্যসেৎ ॥ 
অর্থাৎ__হঠযোগ বিনা রাজযোগ বা রাজযোগ বিনা হঠযোগ সিদ্ধ হয় না। 
এই সংগে নানাপ্রকার মুদ্রা ও প্রাণায়াম অভ্যাস করাতে থাকেন । গুরুজী 
শিষ্কে যখন তখন বলেন. মধু অক্ষিকা হো! যাঁও।...অর্থাৎ যে কোন 
স্থলে যেখানেই মধু পাবে--তুলে নেবে । ফলে, পুর্ণযৌবনেও যে যোগবিষ্ঘা 
যোগীদের আয়ত্ত হয় না, বালক বালানন্দ নয় দশ বছর বয়সেই সে বিদ্যায় 
পাঁরদশিত! লাভে সমর্থ হলেন । 


বাল্যলীল। ৬৯ 


শিক্ষাপ্রন্থ সম্পর্কে গুরুজী পুরে যে কথা বলেছিলেন, বালানন্দ কার্ধকালে 
দেখলেন তা ভ্রান্ত সত্য । বেদ, উপনিষদ, সংহিতা, শান্তর, পুরাণ সবই ভার 
কঠস্ব। যোগ ও প্রাণায়াযের সংগে শিক্ষা! দান কাজটিও নিয়মিতভাবে 
চলতে লাগল । 

পুর্ণ পাঁচ মাস গঙ্গোনাথজীর মন্দিরে সশিষ্য বাস করলেন গৌরীশঙ্কর 
মহারাজ | ষষ্ঠ মাসের এক প্রত্যুষে_-ব্রহ্মানন্দ মহারাজের নিকট বিদায় নিয়ে 
গুরু শিশ্য নর্ণদা পরিক্রমাকে উপলক্ষ করে তুগ্ম পথ ধরে যাত্রা আরন্ত 
করলেন । সেই সঙ্গে বিদ্যা চাও নানাভাবে চলতে থাকে | গাছের বড় বড় 
পাতা চয়ন করে এনে, গাছের পাতার রস ও ত্বক থেকে মপী এবং এইভাবে নল 
খাঁগড়া, বাশের সরু প্রশাথা (কঞ্চি ) বা হাসের পালক থেকে লেখনী তৈরী 
করে শিষ্কে লেখা শিথাতে থাকেন | বিষ্যাশিক্ষার সঙ্গে নবীন শিশ্ত ব্রহ্মচারী 
জীবনের করণীয় কাজগুলিও উত্তমরূপে শিক্ষা করে দক্ষ হয়ে ওঠেন। 
সেবা-ধর্দেও তাঁর বিশেষ আগ্রহ দেখে গুরুজী তাকে সেবা সম্বন্ধে পারদর্শী 
করে তোলেন | এই সুত্রে নানাবিধ উধধ এবং যোগশজির সাহায্যে রোগীকে 
সুস্থ করে তোলবার বহু প্রক্রিয়াও দেখিয়ে দেন | জাবার, কোন দেবশ্বীন বা 
তার্ধের কাছাকাছি এলে গুরুণ্জী সাধু সন্ন্যাসী ও ভক্তদের আহ্বান করে ভুরি 
ভোজ দিয়ে বালানন্দের মনেও বিস্ময়ের শিহরণ তোলেন। শিশ্ত ভেবে 
পান না কপর্দকহীন সাধুর পক্ষে এভাবে ভাগ্ডারার ব্যবস্থা কেমন করে সম্ভব 
হতে পারে? প্রচুর অর্থে ক্রীত রাশি রাশি খাগ্-সম্ভার ব্যতীত এবরপ 
ভাগঙারার আয়োজন যে অসম্ভব! একদিন বালক বালানন্দ কথায় কথায় 
গুরুকে তার সন্দেহের কথাটা বলেই ফেললেন । শুনে গুরুজী মহ হেসে 
জানালেন : সাধু-ইচ্ছ। থাকলে কোন কাজই আটকায় না, ভগবানজী নিজেই 
সব ব্যবন্বা করে দেন। 

বালক বালানন্দ আশ্চর্য্যান্থিত হয়ে গুরুর কার্যকলাপ দেখেন, আর তার এ 
কথাগুলি ভাবেন । আশ্চর্য, এমন সহজ ও স্বাভাবিকভাবে সেই সব ব্যয়সাধ্য 
ব্বহৎ কাজ সম্পন্ন হয়ে যায় যে, সে সম্বন্ধে বালানন্দ প্রশ্নেরও কোন অবকাশ 
পান না। হয়ত উপধু্তপরি দুই তিন সপ্তাহ ধরে হুর্গম জর্গলের ভিতর 
দিয়ে গুরু-শিষ্কের নর্ধদা পরিক্রম! চলেছে ; কখনো উচ্চ চড়াই লঙ্ঘন করে 
নুতন কোন বনভুমি মধ্যে অবত্তরণ, আবার পরদিনই হয়ত ভুগর্ডে নেমে 


4 ঝাঁডখণ্ডের খধি 


পথের সন্ধান করতে করতে কোন পার্বত্য নদীর উপকূলে উপস্থিতি-_সে নদী 
পার না হলে আর তাদের নিষ্কতি নেই ; অথচ কোন কিছু অবলম্বনে পার 
হবার উপায়ও নেই * কখন কখন বা ডোঙ্। জাতীয় ক্ষু্র জলযানের সাহাযো 
পারানির স্ুযোগ এসে যায, কিন্তু নর্মদা পবিক্রমাকারীদের পক্ষে সে সাহায্য 
গ্রহণও নিয়ম-বিরদ্ধ কাজ | এত সহজে এই কঠিন পরিক্রমা সিদ্ধ হয় না! 
তখন তত্লীতন্তা পীঠে বেঁধে সম্ভরণে পরপারে উপনীত হোতে পারলেই 
পরিক্রমার বিধি পালিত হবে । গুরুশিস্যকেও নিষ্ঠার সঙ্গে এই বিধি পালন 
করতে হয়। এভাবে দিনের পর দিন নানারূপ দুর্গম পথ অতিক্রমের পর 
গুরু শ্রাস্ত শিষ্যের মুখের দিকে চেয়ে মেহের সুরে বললেন £ বড্‌ডে৷ 
পরিশ্রম হয়েছে না? আচ্ছা, এখানে ঘণ্টা কতক কাটিয়ে দেহকে বিশ্রাম 
দেওয়া যাক, সেই অবসরে মনের কাজ চলুক । আমর! যে চড়াই উতরাই 
ডেঙে নদী নাল! পার হয়ে এসেছি-_-এসব থেকে শিক্ষার উপাদান যথেষ্ট 
আছে । এখন সেই শিক্ষার ব্যাপার চলবে । কিবল? 

বালানন্দ ত তাই চান। গুরুর উৎসাহের চেয়ে কোন দিক দিয়েই তার 
উৎসাহের অভাব নেই | সন্মতি জানিয়ে তৎক্ষণাৎ গুকর পদতলে বসে পড়লেন 
এবং তার ক্লান্ত পদযুগল কোলে তুলে নিয়ে শিক্ষা সম্পর্কে পুৰ প্রসলের শেষ 
কথ! স্মরণ করিয়ে দিলেন | শিষ্কের প্রগাঢ় অধাবসায় দেখে গুরুও চমত্কৃত। 
দণ্ডের পর দও ধরে চলে শিক্ষার সাধনা | বড় বড় জাটিল সশরশ্যাব সমাধান 
করে দিতে হয় গুরুকে, শিষ্য ভাতে ধন্য হন। এমনি অবস্থায় গুরু হয়ত 
বলে ওঠেন হ ক'দিন ধরে খুবই পরিশ্রম চলেছে না? আচ্ছা, এবার সামনে 
আশ্রয়যোগ্য কোন স্থান পেলেই-_ যেখানে সাধুষস্তরা থাকেন, কাছাকাছি 
গ্রাম ব নগরের লোকজনদের যাতায়াত আছে সেইখানে গিয়েই খুব জাঁকিয়ে 
এক ভাগীর] লাগিয়ে দেওয়! যাবে । সাধুসম্তদের সেবার সঙ্গে গ্রামীন 
লোকজনরাও পরিতৃপ্ত হয়ে ঠাকুরজীর প্রসাদ পাবে । 

চলার পথে গুরুজী প্রথম যেদিন এভাবে ভাগ্ডারার কথা তোলেন : শুনে 
ধালানগ্গ মনে মনে ভাবেন, বৃদ্ধ বয়সে পথশ্রমে গুরুজী অত্যন্ত ক্রাস্ত হয়ে 
পড়েছেন, তাই এভাবে ভোগের প্রসঙ্গ তুলেছেন। কিন্তু ধরে নেওয়াই 
গেল--সামনে এবার হয়ত এমন একটা স্থান মিলবে, ঠাকুরজীর পুজ। হয়, 
স্থানীয় লোকজন আসেন | কিন্তু গুরুজী সেখানে গিয়েই ভাগুার লাগাঁবার 


বাল্যলীল ৭১ 


কথা বলেন কোন্‌ জাহমে আর কার আশায়? গঙ্গোনাথের মন্দিরে তার 
দীক্ষাগ্ডর ব্রন্মানন্দ মহারাজকে ভাগারা দিতে দেখেছেণ--সে কি বিরাট 
ব্যাপার! ভারে ভারে কোথা থেকে যে নানাবিধ খাদ্য সামগ্রী আসছে, 
পাকশালার চুল্লী গুলি উদরাস্ত্কাল জ্বলছে, দিবা দ্িপ্রহর কাল থেকে ভোজনপর্ধ 
চলছে, আর রাত দ্বিপ্রহবের পর আশ্রম-স্বামীর ভোজনে বসবার আগে আর 
নিবৃত্তি তার নেই--মেই অলৌকিক কাও স্বচক্ষে দেখেছেন বালানন্দ। দেখে 
কি এক অপরূপ আনন্দেই তিনি আচ্ছন্ন হয়েছিলেন! এখন তার শিক্ষাগ্তরুর 
মুখেও শুনছেন সেই ভাঙারার কথা! কিন্তু সাধুসন্তদের চিন্তা ত ব্যর্থ হয় 
না, মনের বাসনা ত অপুর্ণ থাকে না, তবে? 

কয়েকদিন পরে গুরুশিষ্য নর্মদাতীরবর্তী তীর্ঘতুল্য এক সিদ্ধ স্থানে 
উপনীত হলেন | নর্মদা পরিক্রযমাকারীদের এই স্থানটি অবস্থিতি ও বিশ্রামের 
একটি কেন্দ্র। সেমময় কতকগুলি পরিক্রমাত্রতধারী সাধু এখানে আশ্রয় 
গ্রহণ করেছিলেন । নর্্দাদেবীর মন্দিরের পুরোহিতগণ গতর ও শিস্তাকে 
সাদর অভ্যর্থনা করলেন । কিন্তু অল্পক্ষণের মধো যখন প্রচারিত হলো যে, 
বিখ্যাত পরিব্রাজক সাধু, মহাতাপস গৌরীশঙ্করজী তার এক কিশোর 
শিষ্যকে নিয়ে নর্দদা পরিক্রমার উদ্দেশ্যে কাঠিয়াবাড় অঞ্চলকে ধন্য করতে 
এসেছেন, তখন উল্লাসের একটা সাড়া পড়ে গেল। বহুলোক তাকে দর্শন 
করতে এলো,_কিছু না কিছু উপহার সঙ্গে নিয়ে--ফল, মিষ্ট, ছুধ, ঘি, 
মাখন, এমনি কত কি! গুরুজী সে সব দেবমন্দিরে পাগিয়ে দিলেন | সন্ধ্যার 
পর তিনি মন্দিরের পুরোহিতকে ডেকে বললেন : কাল এখানে ভাগ্ডারা 
লাগাবার ব্যবস্থা করুন । বেল বারোট] থেকে রাত বারোট। পর্যন্ত গিবিচারে 
আহুত অনাহুত সবার সেবা চলবে । 

মন্দিরের পুরোহিতর। এরূপ ভাগ্ারার জঙ্ষে পরিচিত ছিলেন । কিন্ত 
এখানে সময়ের ব্যবধান খুব জামান্য-_রাতট্ুকু মাত্র ; তাই সন্দিগ্ধ কে 
স্ুধালেন £ আগামী কালই ভাগ্ীার। লাগাতে চান মহারাজজী £ কিন্ত 

মহারাজন্জী দৃন্বরে বললেন £ এখানে “কিন্ত' কিছু নেই। বাত ভোর 
হবার সঙ্গে সঙ্গে মালপত্র সব এসে যাবে । আপনারা আজ থেকেই জিনিষ 
পত্র, চুলী প্রভৃতির যোগাড় করে-_-জনকতক উপযুক্ত লোক দিয়ে সোহরত 
করে দিন-_যে, আগামী কাল বেল! ১২ট। থেকে রাত ১২টা পর্য্যন্ত নর্দামায়ীর 


৭২ ঝাড়খণ্ডের খবি 


মন্দিরে ভাগ্ডারা চলবে--সাধূ সন্ত গৃহী সন্ন্যাসী আবালবৃদ্ধবনিতা। এখানে 
ভোজন করবেন । 

বালানদ্দ অবাক হয়ে তার এই খেয়ালী গুরুর কাণ্ড নিয়ে নিজের মনেই 
আলোচনা করেন-ধাঁর ঝুলিতে এক মুঠি চাল বা আটার সংস্থান নেই, তার 
মুখ দিয়েই এই বিরাট ভোজের পরিকল্পনার কথা বেরিয়েছে, অথচ তিনি 
দিব্যি নিশ্চিন্ত ও নিবিকার ! তবে কি গুরুজীর সেই পুর্ব ব্যাধি আবার মাথার 
মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে? কিন্ত তার মুখখানি ত দিব্যপ্রসন্ন-_দুশ্চিন্তার কোন 
ছাঁয়াও সেখানে পড়েনি! কেমন করে মুখের কথ] তার বাস্তব হবে? এযে 
সত্যই অসম্ভব ! 

পরদিন প্রত্যুষে প্রাতঃকত্যাদির পর বালানন্দ গুরুবন্দনা করে শিক্ষার্থী 
রূপে বসেছেন ; কিন্তু তর মনের মধ্যে ভাঁগারার ব্যাপারটি শ্ীতিমত দোলা 
দিচ্ছে । খানিক পরেই মহোৎসব আর্ত হবার কথা, কিন্ত এখনে] পধ্যস্ত 
ভার কোন নিদর্শনই পাওয়া যায় নাই | গরুর মুখের দিকে চেয়ে দেখেন, 
সেখানে চিন্তার চিহছও নেই । 

এমনি সময় এই কাও দেখে বালানন্দ সোল্লাসে চীৎকার করলেন : 
গুরুজী--একি কাণ্ড? 

বহজনের কলরবে প্রত্যুষেই দেবস্থান মুখরিত হয়ে উঠল। জান। গেল, 
কাঠিয়াবাড়ের এক ধনাত্য শ্রেষঠী তার গুরু মহারাজ গৌবীণঙ্করজী এখানে 
ভাণ্ডার! দেবার বাসনা করেছেন জেনে তারই খাতিরে আটা, ডাল, ঘি, তরি- 
তরকারী, দধি, নিষ্টাদি পাঠিয়েছেন । 

গুরুজী সহান্যে বললেন £ তোমার দুশ্চিন্তা কাটল ত? যাকৃ, আমাদের 
কাজ এখানে চলুক ;, ওখানকার কাজ সব ব্যবস্থা করবার যোগ্য লোক আছে । 
আরে, যার কাঁজ--সেই করিয়ে নেবে । 

খুব ঘট! করে স্ুশৃঙ্খলে ভাণগ্ডারার কাজ শেষ হয়ে গেল। সাধুজী কিন্ত 
রাত বারোটার পুর্ব পথ্যস্ত অভুক্ত থেকে অতিথি সং্কারে প্রবৃত্ত থাকেন। 
গুরুর আদর্শে বালানন্দও অভ্ভুক্ত রইলেন । বাত্রি দ্বিপ্রহরের ঘণ্টাধ্ঘনির পর 
সশিষ্য গৌরীশঙ্করজী ভোঞনে বসলেন । 

পরে এই অলৌকিক ব্যাপার সম্পর্কে বালানন্দ তার গুরুজীকে জিজ্ঞাসা 
করেছিলেন : কি করে এতবড় একট কাণ্ড এত সহজে আশ্চর্যভাবে সম্পন্ন 


বাল্যলীল। দঙ 


হয় গুরুজী? আমার জানতে বড় আগ্রহ হচ্ছে, দয়া করে এর রহস্য বলে 
আমার মণের একটা সংশয় দূর করে দিন গুরুজী । 

গুরুজী তার উত্তর দিয়েছিলেন : সাধুসন্তদের সাধনালদ্ধ বিভুতির 
প্রভাবে জীবনে অনেক অসম্ভব ব্যাপার এইভাবে সম্ভব হয়ে থাকে । তবে 
এসব খুবই গোপনীয় বিষয়__শুধু গুরু-শিষ্ঠ বা সম-অবস্থাপন্ন সঙ্গী-সাধীরাই 
জ্ঞাত থাকেন। বছুদিন ধরে সাধনার পর ইচ্ছা-শক্তি পুর্ণ করবার ক্ষমতা 
সাধকের আয়ত্ব হয়। পাতগজল দর্শন, দত্াত্রেয় সংহিতা, হঠদীপিকা।, 
হঠযোগ, ঘেরওসংহিতা, যোগী যাজ্ঞবন্ক, গোরক্ষ সংহিতা, যোগসার, শিব 
সংহিতা প্রভৃতি আধ্যান্ত্বিক যোগশাস্ত্রগুলিতে এর উল্লেখ আছে। কিন্তু বই 
পড়ে বিশেষ ফল পাওয়া যায় না। আমি তোমাকে হাতে কলমে এসব যোগ 
সম্বন্ধে শিক্ষা দেব। এর প্রখম পর্যার হচ্ছে__ ক্রিয়া যোগ। ব্রত, জপ, 
নিয়মাদি পালনের পর এই ক্রিয়াযোগ অন্নষ্ঠান করলে মনের অবিষ্যা দেহ 
ছেড়ে পালায়, আর বিবেক সন্ত জ্ঞান সেখানে প্রবেশ করে । তখন সাধক 
নিবিচারে পরমেশ্বরকে সাধনালন্ধ কর্ণ অর্পণ করে ক্রিয়াযোগী হন। এই 
ভাঁবে এক একটি যোগে সিদ্ধিলাভ করলে সাধক হবেন মহাযোগী পুরুষ । 
এরা জীবনধারণের জন্য জীবিকা ব1 জীবন রক্ষার জন্য চিন্তা-_-এসব কিছুরই 
পরোঁয়৷ কবেন না, পরযাত্াদেব নিজেই এদের রক্ষণাবেক্ষণ করেন । এমনি 
আটপ্রকাৰর কঠোর সাধনা আছে, এগুলিতে পর পর সিদ্ধ হতে পারলে সাধক 
অষ্টু সিদ্ধির অধিকারী হন। জীবনের এই অবস্থার এরা হন ত্রঙ্গজ্ঞ। 
যোগসিদ্ধ সাধু ত্রশ্মাজ্জ হলেই তরি ইচ্ছান্ুুযায়ী সবই প্রাপ্তি হবে__পুথিকীতে 
এরা হবেন সবার বরেণ্য । কিন্তু প্রায়ই দেখা গেছে-ব্রক্মবিদ্‌ ব্যক্তিই 
ব্রহ্ম হন। 

বালাণন্দ গুরুকে ধরে বসলেন, বললেন : আমাকে ভাল করে বুঝিয়ে দিন, 
কি করে সাধুর! ব্রহ্মাবিদ্‌ হন | 

গৌরীশঙ্কর মহারাজ শিশ্তকে বিষয়টি সহজ করে বুঝিয়ে দিবার উদোশ্টে 
বললেন : যে জিনিষ লাভ করলে আর কোন জিনিষ পাবার জন্য মনে আগ্রহ 
থাকে না, যে স্বখ উপলব্ধি হলে অন্ত সুখের জন্য মনে লালসা জাগে না, 
যে জ্রান প্রাপ্ত হলে আর সব জ্ঞানকেই তুচ্ছ মনে হয়--লাধক-জীবনের সেই 
অবস্থাই ব্রহ্ম, সেই অবস্থ1 প্রাপ্ত হোলেই সাধক হন ত্রক্মাবিদ্‌ । 


৭8 ঝাড়খণ্ডের থষি 


বালানন্দ তন্ময় হয়ে শুনতে থাকেন | শিশ্ের আগ্রহ দেখে প্রসন্ন মনে 
বলেন 2 সাংসারিক ব্যাপারে যখন দেখ! যায়_-কোন বালকের মনে বৈরাগ্য 
জেগেছে, কিছুতেই সে সংসারে থাকতে চাইছে না, তখন বুঝতে হবে-_সেই 
বালক সাধারণ নয়, পুর্ব জন্মের সাধনালরা সংস্কার তাকে বেরাগ্যের পথ 
দেখাচ্ছে । হয়ত পুর্ব-জন্মের সাধনা তার মিদ্ধ হয়নি-কিম্বা যোগত্রষ্ট 
হয়েছিল, তাহলেও পরমাত্বার করুণ। থেকে সে বঞ্চিত হয় নি, পরজন্মে শৈশব 
থেকেই সে আত্বোপলন্ধির আভাস পেয়েছে । তখন শ্রীভগবান সেই বালককে 
সাধন পথে এগিয়ে দেন, নানাভাবে তাকে পথ দেখান, সত্যই সে ভাগ্যবান ! 

এই পর্ধস্ত বলেই গুরুজী গভীর দৃষ্টিতে বালক বালানন্দের দিকে 
তাকালেন । বালানন্দের নির্ল মুখখানি ধীরে ধীরে লজ্জায় নত হলো। 

এমনি বিভিন্ন ঘটনার ভিতর দিয়ে নানাস্থান পধটনের সঙ্গে বিবিধ শাস্ত্র 
গ্রন্থাদির আলোচনা, অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা সমান ভাবে চলতে থাকে । 
গুরুজীর সাধনালন্ধ জ্ঞান ও বিভুতি শিষ্যকে চমত্কত করলেও, তিনি শীরবে 
উপলব্ধি করবার পাত্র নন, এক একটি ঘটনার পর গুরুর কাছ থেকে সে-সবের 
রহস্য উদঘাটিত করে তবে তিনি আশ্বস্ত হন। এই শিক্ষাস্থত্রেই বুঝতে 
পারেন, শ্রীভগবানের অসামান্ত“করুণাতেই এই রহস্যময় মহাপুরুষ শিক্ষাণ্তরু- 
রূপে তাকে ধন্য করতে এসেছেন, এরই সময়োচিত অহায়তায় তিনিও হয়ত 
একদিন পথের সগ্ধান পাবেন । 


দীর্ঘ সাতাট বৎসর ধরে এমনি খিক্ষনীয় ও জ্ঞাতব্য বিবিধ ঘটনারাজির 
ভিতর দিয়ে বালানন্দের শিক্ষা যখন পুর্ণ হয়ে এসেছে, সেই সময় বিশেষ কোন 
পর্যোৎসব উপলক্ষে গুরু গৌরীশঙ্করজী পুণ্যতীর্ঘ প্রয়াগে সশিষ্ক উপনীত 
হলেন | বছ সাধু সন্ন্যাসী এ-সময় গৌরীশঙ্কর মহারাজের আন্ুসঙ্গী 
হয়েছেন। বালানন্দ এখন আর বালক ব। কিশোর নহেন , ধীরে ধীরে তরুণ 
যৌবনের মাধু্যময় অংশে উপনীত হয়েছেন | আশৈশব ত্রহ্মচ্য পালনে এবং 
একাদিক্রমে দীর্ঘ সাতটি বছর পোকালিয়ের বাহিরে প্রকৃতির আশ্রয়ে অবস্থানে 
এই সময় অপুর্ব এক লাবণ্যময় ত্যুতি তার কমনীয় অঙ্কে দিব্য জ্যোতির্ধয় 
করে তুলেছে । প্রয়াগ ভীর্থ থেকেই গুরু মহারাজ তার কাছ থেকে বিদায় 
॥নলেন। দীর্থকালের এই নির্ভরযোগ্য পরম পুজ্য গুরুজীর অদর্শন-বেদনা 


বাল্যলীল। ৭৫ 


ব্রহ্মচারী বালানন্দকে ব্যাকুল করে তুললে, তিনি অভয় দিয়ে বললেন £ বৎস! 
এখন একমাত্র পরযেশ্বরকে নির্ভর করে, আবার নূতন করে তোমার সন্কল্প 
সাধনে ব্রতী হও, পুনরার নর্রদা পরিক্রমা আরম্ত কর--পরমাত্বাদেব তোমার 
সাথী থাকবেন, নর্মদামায়ী তোমাকে কপা করবেন। তোমার এই পরিক্রমাই 
ভোমাকে অসামান্ত সিদ্ধি দেবে, তোমার সাধক-জীবন ধন্ত ও আদর্শ হবে। 
অতঃপর আমরা খিক্ষা-সিদ্ধ জ্ঞান-তাপস তরুণ সাধক বালানন্দ ব্রহ্মচারীর 


সাধন-পথে অর্দশতাব্দীব্যাপী মহাপরিক্রমার সঙ্গে পরিচিত হব-_এই গ্রন্থে 
দ্বিতীয় পর্বে । 


প্রথম পরব” সমাপু 


দ্বিতীয় পর্ব 


যৌবনে 


মন্াপরিক্রমা 


এক 


সন্ন্যাসী এক। যাত্রী । দীর্থায়ত দেহ-যষ্টি প্রশস্ত ললাট, গৌরকান্তি, 
স্থগঠিত সুঠাম বলিষ্ঠ দেহ, আজান্ুলম্বিত বাহু, প্রসন্ন মুখ, আনন্দোজ্জবল আয়ত 
দুটি চক্ষু, মাথার দীর্ঘ রুক্ষ জটাদল পৃষ্ঠদেশে প্রলপ্িত--এমনই এক অপরূপ 
জ্রীমত্ডিত দিব্যদেহী সাধু নর্মদা-তীরবতী ভীষণ দুর্গম বনভুমির ভিতর দিয়ে 
অসম্ভব দ্রতপদে এগিয়ে চলেছেন । তীর বামহাতে একটি স্ুবৃহৎ কমগুলু, 
দক্ষিণ-হাতে দীর্ঘ ঘটি, পুষ্দেশে ক্ষুদ্র একটি গাটরি বাঁধা । এভাবে যে-সব সাধু- 
সঙ্স্যাসী নর্শদার তীরভুমি থেকে পুণ্যসলিলা জননী নর্মদাকে অর্চনা করে 
সন্নিহিত দুর্গম অরণ্যে প্রবেশ করেন--ভাদের লক্ষ্যই হলো পরিক্রম৷ এবং 
এই পরিক্রমণকেই শ্রদ্ধা সহকার নর্মদ! পরিক্রমা বলে অভিহিত কর] হয় ! 

সীধুজীবনে সর্বাধিক কঠিন সাধনা এই নর্মদা-নদী-পরিক্রমা | নর্ষদা নদীর 
তীরবর্তী কোন এক তীর্থ স্বান থেকে সাধুর! এই পরিক্রম1* আর্ত করেন। 
দুর্ভেষ্ত অরণানী অতিক্রম করে এই দীর্ঘ নদীর উৎপত্তি স্থান হুর্গম অযরকণ্টক 
পর্যান্ত গিয়ে, আবার সেখান থেকে নদীর অপর তীর ধরে পরিক্রম। চলতে 
থাকবে এবং যে মহাসমুদ্রে নর্নদা গিয়ে মিশেছেন, সেখানে উপনীত হলেই এই 
পরিক্রমার একটি পর্ধ শেষ হবে। এই একটি পরিক্রম] ভাল ভাবে সম্পন্ন 
করতে হলে তিন চার বছর কেটে যায় । যাঁর মহাপরিক্রমায় ত্রতী, তারা 
আবার নর্ধদ] নদীর অপর কোন তীর ধরে নুতনভাবে পরিক্রমা আরম্ভ করেন । 
পরিক্রমাকালে পরিব্রাজক সাধুর নিপল অন্তরে অধ্যাত্ব-লগতের কত বিচিত্র 
তথ্য, বেদ, উপনিষদ, শ্রুতি, সংহিতা প্রভৃতি মহাণ্রস্থগুলির উপাখ্যান, 
অগতের কল্যাণকর আধ্যাত্বিক অবদানগুলি উদিত হয়ে-_স্মরণ মনন অনুধ্যান 
প্রভৃতি চিত্রবৃত্তিগুলির এমন উৎকষধ সাধন করতে থাকে যে, এই পধ্যটন 
স্বত্রেই মনোবিজ্ঞানী ও তপন্যাপরাঁয়ণ তাপসের সিদ্ধি তার করতলগত হয়। 
আশ্রম বা গুহা আশ্রয় করে দীর্ঘকালব্যাপী কঠোর তপন্যার পর সাধারণতঃ 
সাধুর! তপঃশক্তিপরায়ণ খাষিবূপে লোকসমাজে নমস্য হয়ে থাকেন ! এরূপ 
বহ খধষির সহিত ভারতবাসী পরিচিত | কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে নদ নদী, 

* এই কঠিন পরিক্রুমার নিয়ম এবং বিধি-নিষেধের কথা প্রথম খণ্ডে 
যথাম্বানে বল! হয়েছে । 


যৌবনে ৭৯ 


বনম্পতি ও তীর্ঘভুমি পরিব্ত বিরাট বিরাট পর্বত ও অরণ্য-অঞ্চলগুলি বারবার 
পধ্যটন করে স্বয়ংসিদ্ধ মহাতাপসরূপে দেশবাসীর বিস্ময় ও শ্রদ্ধাভক্তি লাভ 
করে চিরশ্মরণীয় ছয়ে আছেন একমাত্র এই মহাপুরুষ সাধু বালানন্দ ব্রন্মচারী-_ 
যার তরুণ যৌবনকাল থেকে পরবতী প্রায় অর্ধশতাব্মীব্যাপী মহাপর্যটনের 
অপুব কাহিনী এই খণ্ডে বিবৃত হচ্ছে। 

চিত্রকুট আশ্রম থেকে রাজ-সন্নাসী ভরত একদ1 অগ্রজ শ্রীরামচন্দের 
পাদুকার সঙ্গে তার আদেশ বহন করে অযোধ্যায় ফিরে এসে রাজ্যপাদনে 
ব্রতী হয়েছিলেন | উনবিংশ খতকের প্রানন্তে বালানন্দজীও এই পুণ্য-পবিত্র 
তপোবন থেকে খিঙ্গাগুকর কাছ থেকে তার মাবকজীবনের অবদানগুলি 
আত্মস্থ করে-দীক্ষা-গুরু-দত্ত জ্ঞানামৃত পানে বিভোব হয়ে অপরূপ এক 
তপ:সাবধনায় ব্রতী হলেন। 

নগ্রদা-ভীরে শ্রদ্ধাসহকারে শোতস্বিনী নর্ধদা মাতার পুজা-অর্চনার পর সাধু 
বালানন্দ নর্মদা-কান্তারে প্রবেশ করেন । প্রয়াগেব পথেই সাধারণভাবে 
পরিক্ুমা-পাঞ্জকারী কতিপয় প্রৌঢ বয়স্ক সাধুদের সঙে বালানন্দের সাক্ষাৎ 
হর়। আলাপস্বত্রে তারা যেই জানলেন, তরুণ বয়সে একাই ইনি নঞ্দা 
পরিক্রমায় চলেছেন, তথন তাঁরা বনের মধ্যে অসংখ্য বিপত্তির কথা তুলে 
তাকে বাধ! দিতে লাগলেন । বললেন ; এ ত আর সাধারণ বন নয়__ 
মহাবন | হেন হিজর জন্ত জানোয়ার নেই-এই বিরাট বনে, যাদের সন্ধান 
পাওয়া যায় না। বাধ, ভালুক, গণ্ডার, হাতী--এরা সব দিনের বেলাও 
ঘুরে বেড়ায় শিকার সন্ধানে | এমন সব মহাকায় অজগর আছে- যাদের 
সামনে পড়লে পালাবার জো৷ নেই, একবার চোখোচোখি হলেই নিশ্বাস ছেড়ে 
কাছে টেনে এনে গিলতে থাঁকে ! দল বেঁধে হৈ হুল্লোড করতে করতে ন! 
গেলে, এমন বিপাকে পড়বে যে, না-পারবে এগুতে, ফিরেও আসবার পথ 
পাবে না| তাই বাপু, সাবধান করে দিচ্ছি-_-বনের মুখে অপেক্ষা করবে, 
এক সঙ্গে পরিক্রমার জন্ক্ে দল বেঁধে বেরিয়েছে- এমনি কোন দল ন! 
পাওয়া পধান্ত এক] কখনে1 সেধিয়ো ন] সে বনে। 

বালানন্দ তাদের কথ! শুনে বলে ওঠেন £ ও-বন আমার দেখ! আছে । 
ন* বছর বয়সে আমি পরিক্রমা! আরন্ত করি--একইভাবে চলেছে । মা নর্মদা 
যখন সঙ্গী জুটিয়ে দিয়েছেন, তার সঙ্গ পেয়ে ধন্য হয়েছি , আবার যখন নিঃসল 


৮০ ঝাড়খণ্ডের খাষি 


ফয়েছেন, একাই গেছি ; যনে এইমাত্র ভরস1-_খ্র বেটি ঠিক সঙ্গে আছেন | 
সেই ঘন্যেই বুঝি বাঘ ভালুক কিম্বা অঅগরের মুখে পড়েও দিব্যি বেঁচে আছি। 

বালালন্দের কথ! শুনে সাধুর] চমকে উঠলেন । ন' বছর বয়সে ভিনি 
সংসার ছেড়ে এভাবে পরিক্রমা সুরু করে এখনো তাতে লিগ আছেন শুনে 
কিছুক্ষণ শুক হয়ে রইলেন। তার। প্রত্যেকেই বুঝলেন, বয়সে কাচা হলে 
কি হয়, ইনি সত্যই এক অন্কুত প্রন্কতির মানুষ । তারপর নর্ধদা পরিক্রমা! 
নিয়ে নিজের] বড়াই না করে বালানন্দের মুখে তারই দীর্ঘ ভ্রমণের কথা 
শুনতে থাকেন । কিন্তু শৈশবে ন' বছর বয়স থেকে প্রথম যৌবনের কিছুকাল 
পর্য্যন্ত একটান। পর্যটনের মধ্যে দস্থ্য ও হিং শ্বাপদ কতৃক কখনে। 
আক্রাস্ত হন নি শুনে সাধুর গভীরভাবে বিস্ময় প্রকাশ করতে থাকেন । 
বালানন্দপ বললেন : আমর] যদি কারে প্রতি হিংসা না করি, যত বড হিংল্র 
প্রাণী হোক না কেন, হিংসায় বিরত থাকবে । সাপের নাম শুনলেই মানুষ 
ভয় পায়, ভাবে-_দংশন করাই তার স্বভাব। কিন্ত সেই সাপের সঙ্গে 
মেশামিশি হয়েছে, তবু সে কামড়ায় নি | নয় বছর বয়স থেকে বনে জঙ্গলে 
পাহাড়ে পর্বতে বছ তর্গম স্থানে ঘুরেছি ; বাইশ বছর বয়সে আবার নতুন করে 
পর্যটনে বেব্িয়েছি, কিন্ত আগেও কোন দিন জীবন বিপন্ন হয় নাই, এখনে 
সেই ভরসায় নিভয়ে চলেছি, সহায় যা নর্দ] ! 

তবুও সাধুর বর্তমানের অবস্থা জানিয়ে বালানন্দকে এইভাবে সতর্ক করে 
দিলেন : দশ বারো বছর পরে এখন দেশের লোকের মতিগতি অন্য রকম 
হয়েছে । আগে সাধুদের দেখলে সবাই নিজেদের জীবনকে ধণ্ত মনে করত, 
মন্দ প্রক্কতির লোকগুলোও সাবধান হোত : কিন্তু এখন আর সেদিন নেই-_ 
মহাবনের এক একটা ঝাড়ির মুখে দল বেঁধে ভীল দস্ত্যারা ওত পেতে থাকে, 
সাঁধুদের দেখলেই তাদের সম্বল লোট1 কম্বল, এমন কি-_-ঝুলিতে ডাল চাল আটা 
থাকলে, সে সবও কেড়ে নেয় । আগে হয়ত এ রকম ছিল না, কিন্ত দেশে 
আকাল পড়ায় নিম্ন শ্রেণীর লোকেব। দস্্যবৃত্তি ধরেছে । এ-সব ভেবে সাবধান 
হয়ে যাওয়াই ভাল । | 

বয়সে বরণ্য শ্রদ্ধেয় সাধুদের কথাগুলি শুনে বালানন্দ বললেন : আপনাদের 
উপদেশ মাথ। পেতে নিলাম, সাবধান হয়েই অরণ্যে প্রবেশ করব ।' শৈশব 
থেকেই এই আনন্পযয় পুকরুষাটি তর্ক বিতর্কের ছলেও কারও মণে আধাত 


যৌবনে ৮১ 


দেওয়] পছন্দ করতেন নাঁ। কথা প্রসঙ্গেও সকলে আনন্দ পান, এই ছিল 
তার লক্ষা। হিংসা ও ক্রোধকে শৈশব থেকেই দমন করতে অজ্তান্ত 
হয়েছিলেন বলেই, সকল অবস্থায় নিজেও যেমন আনন্দে মগ্ন থাকেন, সঙ্গী- 
সাথী বা স্থান বিশেষে আলোচনাকারীরাও যাতে সেই নিল আনন্দের আস্বাদ 
পান_ _সেইভাবেই কথা বলতে, বা আলাপ করতে যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন | 
ভবিষ্যতেও শিষ্কদের ইনি প্রায়ই বলতেন--.'মুখের কথা মিষ্ট করে বললে 
শ্রোতারা যখন তুষ্ট হন, তখন রুষ্ট হয়ে তিক্ত কথা শুনিয়ে লাভ কিছু আছে? 
মিট কথায় হাসিমুখে বুঝিয়ে দিতে পাঁবলে, যে বিরুদ্ধ বিষয় নিয়ে তর্ক, তার! 
তার দোষ বুঝে নিজেরাই উপদেশ মেনে নেবে । এই জন্যই ধাষিরা তাঁদের 
“অমৃত বাণী' আমাদের অন্য রেখে গেছেন £ 
অহং গঁভণামি মনস। মনাংসি 
মম চিত্ত মর চিতেভিরেত। 

অথাঁৎ-'আমার মন দিয়ে তোমাদের মনের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই, আবার 
চিত্ত দিয়ে তোমাদের চিত্তের নঙ্গেও সংযুক্ত হতে চাই 1” তাই খধির! শেষে এই 
শুভেচ্ছা জানিয়েছেন_'লহৃদরং সাংমনস্যমবিদ্বেষং কণোমি বঃ 1” অর্থাৎ 
“তোমরা পরস্পর সহৃদয় হও, স্প্রীতিযুক্ত হও, সব কিছু বিদ্বেষ থেকে 
তোমরা মুক্ত হও।' 

অতীতের থষিবাক্য আত্মস্থ করে, বাক্যের সঙ্গে চিত্ত সংযোগ কবে, 
তিনিও এমনি সহৃদয় হন যে, অতি বড় ছৃবিনীত ক্ষমতাদৃণ্ত মাহষও উদ্ধত 
মৃতিতে পশুশক্তি প্রয়োগ করতে এমে শেষে তার অন্ত্রনিহিত অস্বতের পরশ 
পেয়ে সংযত হন, নিজের দোষ ত্রুটি অন্তায় বুঝতে পেরে কাতরকঠে কপাভিক্ষা 
করতে থাকে ; এমন দৃষ্টান্ত অনেক আছে। 

উদাত্তকণ্ঠে ধষি বাক্যের ঝংকার তুলে সন্ন্যাসী বালানন্দ একাই চলেছেন । 
সম্মুখে দিগন্তবিসারী মহারণ্য-_একাধিক্রমে চলিশ ক্রোশ অবাধে এই বনভূমি 
অতিক্রম করতে পারলে, তখন একটি ঝারি পাবেন, সেখানে আশ্রয় মিলতে 
পারে! কিন্ত পুবৌক্ত সাধুর! জানিয়েছেন-_ঝারিমুখে ভীল দস্থ্যর! লুণ্ঠন 
প্রত্যাশায় উদ্‌প্রীব হয়ে থাকে, সাধুদের লোটা কম্বল নুন করতেও তারা 
কুষ্ঠিত নয়। বালানন্দ অরণণাধিষ্টাত্রী নর্নদা দেবীর উদ্দেশে প্রার্থনা জানান--- 
ভারতের অতীত এঁতিহ তুমিই রক্ষা কর মা! সাধু দর্শনে পাপী তাপীর 

৬ 


৮ ধাড়খণ্ডের থাষি 


অস্তরও নিঞ্ঁল হয়, সত্যের সন্ধান পায়। এ অনাচার যাতে নিবারণ করতে 
পারি, তুমিই সেই ভাবে চিত্তবৃত্তি চালিত কর মা! সত্যদশী খষিরা ষে 
ভাবে অভয়ের বন্দনা করে অমর আদর্শ রেখে গেছেন, আযিও সেই প্রার্থনা 
করছি | সঙ্গে সঙ্গে নীরব নিস্তব্ধ অরণ্যাণী তার উদাত্ত কস্বরে ঝংকৃত 
হয়ে উঠল * 
অভয়ং নঃ করোত্যন্তরীস্কম্‌ 
অভয়ং দ্ঠাবাপুথথিবী উভে ইমে। 
অভয়ং পশ্চাঁদভয়ং পুরস্তা 
দৃত্তরাদধরাদভযং নে! অস্ত ॥ 
অভয়ংমিব্রাদভয়ম মিত্রাদ্‌ 
অভয়ং জ্ঞাতাদভয়ং পুরো যঃ 
অভয়ং নত্তমভয়ং দিবা নঃ 
সর্বা আশ! যম মিত্রং ভবন্ত॥ 
স্তোত্র পাঠ কবতে করতে আপন মনে বাঁলাশন্দ বনপথে অগ্রপর হচ্ছেন, 
দুর্গম পথের বাধাগুলি কে যেন আঁগে থেকেই সমত্বে সবিয়ে দিয়েছে, 
সংকীর্ণ একটি পথ যেন*সিসপিত ভঙ্গিতে আহ্নান করছে তাকে; এমনি সময় 
পাশ্থবত প্রকাণ্ড একটি গাছ থেকে সহসা ঝুপ ঝুপ করে তার সামনে লাফিয়ে 
পড়ল ছুটি বলিষ্ঠ মন্ুস্তমৃতি। 
বালানন্দও এ ব্যাপাবে প্রথমে চমকে উঠলেন; তারপর স্থির ভাবে 
ফ্াড়িয়ে জিজ্ঞাসা কবলেন কি হযেছে? গাছে উঠেছিলে কেন-_আর 
আমাকে দেখেই বা গাছ থেকে লাফিয়ে পড়বার কারণ ? 
মানুষ দুটি বলল £ আমরা এই বন ভেঙে যাচ্ছিলাম; হঠাৎ বাধের 
মত দেখতে একট! জানোয়ার আমাদের দেখতে পেয়েই থাবা পেতে বসল | 
আমাদের একজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বুঝতে পেরে আমরা গাছের উপর 
উঠে পড়ি। জানোয়ারটাও একটা হ্ষ্কার তুলে গাছের গোড়ায় এপে 
চারপাশে ঘুবতে লাগল! এমনি সময় আপনি গান গাইতে গাইতে এসে 
পড়লেন ; আপনাকে দেখেই হোক, আর গান শুনেই হোক, জানোয়ারটা 
যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে ছুটে পালাল | 
বালানন্দ বললেনঃ তোমরা ঘদি ওর কোন অনিষ্ট না করে থাক, 


যৌবনে ৮৬ 


যতবড় হিংত্র জানোয়ার হোক,_-তোমাদের উপর হিংসা করতে পারে না। 
দীর্ঘকাল ধরে এই অরণ্যের সংশ্রবে থেকে ওদের সম্বন্ধে আমার মনে এই 
ধারণ! দৃঢ় হয়েছে । 

উভয়েই স্বীকার করলেন যে, জানোয়ারাটিকে দেখতে পেয়েই তারা 
প্রথমে লাঠি তুলে ভয় দেখিয়েছিলেন । কিন্তু তার পর গর্জন করে তাকে 
এগিয়ে আসতে দেখে তারাই ভয় পেয়ে গাছের তলায় লাঠি ফেলে ডাল ধরে 
উপরে উঠে পড়েন। 

এরপর বালানন্দ প্রশ্ন করে জানতে পারলেন তারা হৃজনেই উদাসী 
সম্প্রদায়ের উপাপক। এই জন্প্রদায় শিখ গুরু মহাত্রা নানকের ধর্মমভাবলম্বী | 
গুরু নানকও তার শিষ্কদের প্রতি নর্ধদ] পরিক্রযার নির্দেশ দিয়ে গেছেন | 
সেই স্দুত্রে উদাসী সম্প্রদায়ও সুদুর পাঞ্জাব থেকে নর্মদা অঞ্চলে এসে প্রতি 
বছর পরিক্রমায় ব্রতী হন। এরাও এই উদ্দেশে নর্দার কাস্তারে প্রবেশ 
করেছেন । 

বালানন্দের চেয়ে এরা বয়োজ্যেষ্ঠ হলেও তার ব্যক্তিত্বের প্রভাবে 
আকৃষ্ট হয়ে, গুরুর মত তিনি শ্রদ্ধেয় ভেবে অন্থরোধ করলেন যে, অতঃপর 
বালানন্দজীর সঙ্গেই তারা৷ পরিক্রমা করবেন | উদাসী সাধুদ্বয়ের একজনের 
নাম-'আনক', আর একজন '্জংলী বাবা নামে পরিচিত | শেষোক্ত ব্যক্তি 
ভারতবর্ষের বিভিন্ন দম বনভূমি পর্যটন করে এই আখ্যা পেয়েছেন। 
কিন্তু তাঁকেও স্বীকার করতে হয়েছে শর্র্দা অঞ্চলের এই বহু বিস্তীর্ণ 
বনভূমির মত দুর্গম ও হিংশ্র-জন্ত জানোয়ার-পুর্ণ ভীষণ স্থান তিনি কোথাও 
দেখেন নাই | 

বালানন্দ বললেন £ আমার অঙ্গে অরণ্য পরিক্রমা করবে-এ ত খুব 
আ'নন্দের কথা 1 তবে, আমার প্রকৃতি আলাদা | পরমাত্মার ইচ্ছায় নর্মদা 
মায়ী পরিক্রমাকারীদের বক্ষণাবেক্ষণ করেন--এই অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে আমি 
বরাবর চলেছি । এমন কি, শুনলে তোমর। অবাক হবে-বছ পধ্যটককে 
গাছে উঠে ডালের সঙ্গে বন্য লতা দিয়ে নিজেদের দেহ বন্ধন করে রাত্রিবাস 
করতে দেখেছি! নীচে থাকলে বুমস্ত অবস্থায় পাছে বাঘ, ভাল্লুক বা 
অজগর সাপের গ্রাসে পড়ে মার। পড়েন-এই আশংকায় । আমি কিন্ত 
এভাবে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা দেখে মনে মনে কৌতুক বোধ করি। কেননা 


৮৪ ঝাড়খণ্ডের খষি 


প্রাণের মায়! যেখানে কাটিয়ে ফেলেছি, প্রাণরক্ষার জন্তে এত কাণ্ড করতে 
হবে? আমি ত নদীর কিনার] কিম্বা বনের মধ্যেই একটু ফাকা জায়গায় 
রাব্রিবাসের ব্যবস্থা করে এই ভেবে নিশ্চিন্ত হই--নরদা মায়ীর কোলেই 
যখন আশ্রয় নিয়েছি, আমার ভয় নেই । 

শৈশব থেকে নানাভাবে বহু লোকের সঙ্গে মিশে আলাপ পরিচয় করার 
ফলে বালানন্দজীর অভিজ্ঞতালন্ধ বাকৃপটুত্ায় সকলেই মুগ্ধ ও অভিভূত 
হতেন । নবাগত দুই সাধু-_-দনক এবং জংলীবাবাও পরিতুষ্ট হলেন। 
জংলীবাবা কৌতুহলী হয়ে এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলেন: আপনি কি বরাবর 
একাই এভাবে পরিক্রমা করে আসছেন সাধুজী ? 

বালানন্দ সহাশ্তে বললেন £ আগেই ত বলেছি, নর্মদামায়ী ছাড়! কারও 
পরোয়া করিনে--একাই বেরিয়ে পড়ি, তাবপর পথে হয়ত সঙ্গী সাথী জুটে 
যায়, তাদের সঙ্গে বেশ আনন্দেই দিন কাটে । কিন্ত একঘেয়ে জঙ্গল যাত্রা 
তাদের অনেকেরই পছন্দ হয় না-_তাঁরা কাছাকাছি গাঁও, শহর কিম্বা কোন 
তীর্ধের সন্ধান পেলেই আমাকে ছেড়ে সরে পড়েন। জানেন যে, আমার 
লক্ষ্য পরিক্রমা, ঠিক পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া--সে পথে কোন আস্তানা 
যদি মিলে যায় আর নদীর কাছাকাছি হয়, কুচ পরোয়া নেই-আশ্রয় নিই। 
কিন্তু তা বলে নিজের সুবিধার দিকে চেয়ে বিপথে পাড়ি দিতে রাজী নই। 
তোমাদের যতক্ষণ ভাল লাগবে, আমার সঙ্গে থেকো : তারপর যেই বুঝবে-_ 
একঘেয়ে লাগছে, বা মনে ধরছে না, তখন মন যা চাইবে, তাই করবে-_ 
আমার তাতে বাধ] দেবার প্রবৃত্তি নেই । 

উভয়েই ভাবের উচ্ছাসে জানালেন যে, গাব বালানন্দজীকে কিছুতেই 
ছাড়বেন না-_বরাবরই তার সঙ্গে থাকবেন | বালানন্দ ত্সিগ্ধ স্বরে বললেন £ 
ভালো । 


অতঃপর অবাধ গতিতে ভিন সাধুর পরিক্রমা চলল । জংলী বাবা গীতন্ঞ 
ছিলেন, কিন্ত ত্তার কণ্ঠ ছিল কর্কশ । পক্ষান্তরে বালানন্দজী শৈশব থেকে ভার 
অনুপম সুকণ্ের ভ্রন্য সাধুমহলের প্রশংসা পেয়ে এসেছেন । কোন মন্দির ব! 
ভীর্ঘে আশ্রয় নিলে গুরু গৌরীশক্করের আদেশ হোত শিস্তের প্রতি_-'একট। 
ভজন ত শোলাও 1 অমনি তাদ্ধ স্ুক্ের ঝংকার উঠে এমন এক আনন্দময় 


যৌবনে ৮৫ 


পরিবেশের স্ষ্টি করত যে, আশ্রমস্ব সকলে শ্রোতারপে মুগ্ধ কঠে ধন্য ধস্থয 
করতেন। সেই কণ্ঠ তার দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে একই ভাবে অক্ষ থাকতে 
দেখ গেছে । | 
কথাপ্রসঙ্গে সনকের মুখে বালানন্দজাঁ যেই শুনতে পেলেন, জংলী বাবা 
গুরু নানকজীর তৈরী অনেক দৌহ|] জানেন, আর নিজেই সে সব গীত 
করেন। অমনি তাকে নানকজীর একটি দোহা শোনাবার অন্য আন্থরোধ 
করলেন । জংলী বাব৷ তত্ক্ষণাৎ আর্ত করলেন £ 
সাধ কৈ সংগি মুখ উল হোত | 
সাধ সংগি মল পকলি খোত ॥ 
সাধ কৈ সংগি মিটে অভিমান । 
সাধ কৈ সংগি প্রগটে স্ুজ্ঞান ॥ 
সাধ কে সংগি বুকৈ প্রভু নেরা। 
সাধ সংগি সভ হোত নিবেরা ॥ 
এই দোহার অর্থ হচ্ছে_-সাধু সঙ্গে মুখ উজ্জ্বল হয়, সাধু সজে মনের ময়লা! 
ধুয়ে যায়, সাধু সঙ্গে অভিমান দুরে পালায়। সাধু সঙ্গে জ্ঞানের প্রকাশ হয়, 
সাধু সঙ্গে প্রভুকে নিকটে মনে হয়, সাধু সঙ্গে সকল বাসনার শিবৃত্তি হয়। 
জংলী বাব! তার ভজন শেষ করে নিজেই অপ্রসন্ন চিত্তে বললেন-__ 
ভগবানজী গান গাইবার শক্তি দিলেও গলা দেন শি। তাই আমার গান শুনে 
জঙ্গলের জন্ত জানোয়ার আক্রমণ করতে ছুটে আধে, কিন্ত মাধুজী আপনার 
মিঠে গলার আওয়াজ পেয়েই তার! হিংসা ভুলে এগিয়ে আসে । 
এরপর বালানন্দজীকেও অনুরুদ্ধ হয়ে একটি ভজন ধরতে হলে| তিনি 
তখন নিজের অত্যন্ত প্রিয় ভজনটি ধরলেন £ 
জীয়া যে৷ চাহে ত জীবকো রক্ষা করোরে | 
ধন যে! চাহে ত ধরমকে। বাঢ়াও রে ॥ 
নাচ। যো চাহো। ত, নাচ গোবিন্দ আগে। 
গাওয়া যো চাহে! ত, বামণ্ডণ গাওরে ॥ 
ভাগ! যো চাহে! ত, ভাগে বুর। করমসে | 
আয়া যে! চাহে ত, রাম শরণমে আওরে ॥ 
মহজবোদ্ধ সরল ভজন । এর অর্থ হচ্ছে--যে লোক দীর্ঘকাল বীচতে 


৮৬ ঝাড়খণ্ডের ধাষি 


চান, তার উচিত জীব হত্যা না করে জীবনকে রক্ষা করা । ধনের আকাছ্ 
যার, তিনি যেন ধশ্ন বৃদ্ধি ববেন | ন'চতে যাঁর সাধ, যেন গোবিন্দ বিগ্রহের 
সামনে নাচেন। গানের বাসনা মনে জাগলে রামচন্দ্র গুণগান কর 
কর্তব্য । পালাবার বাপনা হলে মন্দ কর্ম ছেডে পালাবেন | যিনি আসতে 
চাঁন, যেন রামচন্দ্রের শরণ নিতে এগিয়ে আসেন। 

স্বকের ঝংকাব গানের মিষ্ট শব্দগুলির সঙ্গে মিশে নির্জন বনভুমিকে 
মুখারত করে তুলল | উদাসী সাধুদ্বয় মুগ্ধ হয়ে বাব বার বলতে লাগলেন * 
আমাদের জীবন ধন্য হলেো]। এ হচ্ছে সাঁধু সঙেব ফল | 

মনের আনন্দে ক্রমশ: এরা গভীব অধণ্যে প্রবেশ করলেন । এই সঙ্গে 
আলাপ আলোচনাও চলতে লাগল । বালানন্দ সর্বক্ষণই তাব সঙ্গীদ্ধকে 
সতর্ক করে দেন : আমাদের এই যে পরিক্রমা, একেও তপস্যা বলে জানবে। 
চলতে চলতে আমবা এখন প্রসংগ নিষে আলোচন। করব, যাঁতে জ্ঞানলাভ হয় । 

কথায় কথায় গুবলাভের প্রসংগ উঠতে উদাসী সাধুব। বললেন যে, গুক 
কৃপা লাভ করতে তাদের বহুদিন বৃথাই কেটে গেছে। এক গুরুব কাছ থেকে 
বিদায় নিযে অন্ত গুরু ধরতে হয়েছে । শেষে এমন এক সিদ্ধ গুরুব সন্ধান 
মিলে গেল__িনি বার কয়েক নর্মদা মায়ীকে পবিক্রমা করেছেন, তার কাছে 
দীক্ষা নিয়েই ত এই পথের সন্ধান পেয়েছি। কৌতুহলী হয়ে এরা 
বালানন্দজীর গুরুর কথা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি হাসিমুখে বললেন £ নর্নদা 
মায়ার এমনি দয়া আমার উপর যে, আমার গুরুদেব ভার এই শিষ্তাটর জন্ত 
প্রতীক্ষা করেছিলেন__তখন আমি নয় বছরের বালক । 

জংলী বাবা একথা শুনেই সোল্লাসে তার সাথীর পৃষ্ঠে জোরে একটা ঠেল। 
দিয়ে বললেন £ শুনছ ভায়া_গাধুজীর কি সৌভাগ্য । অত কম বয়সে গুরু 
ককপা পেয়ে ধন্য হয়েছেন । 

ব!লানন্দ সহাস্তে বললেন £ এই গুরু সম্বন্ধে খধির] কি বলেছেন শোন-_ 

গুরু বিন্‌ না মিলে জ্রেয়ান, তাগ্‌ বিন্‌ না মিলে সজ্জন। 
তপ বিন্‌ না] মিলে রাজ, বল বিন্‌ না ছটে ছুর্জন || 

অর্থাৎ_-গুর বিনা জ্ঞান মিলে না, ভাগ্যে না থাকলে সাধু সঙ্গ হয় না, 
বিন| তপস্যায় রাজ্য মিলে না, শক্তি ছাড়া শক্রকে পরাজয় কর! যায় না। 
কাজেই জ্লানলাভ করতে হলে গুরু চাইই। 


যৌবনে ৮৭ 


এই ভাবে শত্প্রপঙ্গের আলোচনার অঙ্গে এ দেব পরিক্রমা! চলতে থাকে । 
উদাসী সাধুদ্বয় হিসাবী মানুষ | ভ্রমণের সঙ্গে ভোজনের বাবস্বাব দিকেও 
বিশেষ লক্ষ্য তাদের | বলেন দেহ রক্ষার জন্য এব প্রয়োজন সর্ববাপ্রে । 
সেজন্য, আটা, ডাল, ঘা এবং মশল|পত্র সঙ্গের গীটখি মব্যে উভয়েই কিছু 
বেশ পরিষাণে সঞ্চর কবেছিলেন | গারাদিন পধ্যঃনের পর জঅন্ধ্যার দিকে 
নদীতীরে এগে পাকের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বালানন্দকে এ বিষয়ে 
উদাসীন দেখে তারা অবাক হয়ে যান। তার গীটরির মধ্যে অত্যন্ত 
প্রয়োজনীয় কিছু কিছু বস্ত্র থাকে--আপদে বিপদে ওুঁধধের মত যেগুলি 
কাজে লাগে! যেমন--মধু, আদা, হবিভকী, আমলকী, এমন কি উগ্রশক্তি- 
সম্পম বিষও এ সঙ্গে খাকে । খাগ্যবস্তর কথ! সাধুবা তুললে বালানন্দ সহাস্মে 
বলেন--আগেই ত বলেছি, এশবের কোন পরোয়া করি না, প্রয়োজনও 
মনে করি না| নর্রদ1 মায়ীই ব্যবস্থা করবেন এই আমার ভরস1। 

সাধুরা তখন সবিনয়ে অনুণোধ করতে খাকেন-তারা ডাল রুটি তৈরী 
করবেন, সাধুজীকে গ্রহণ করতে হবে। পাছে তারা মন:ক্ষুন্ন হন, এই 
আশঙ্কায় বাঁলানন্দ আপত্তি না করে বলেন-- সামান্য আহায্যেই আমার তৃপ্তি । 
তোমাদের ভোজ্য গ্রহণ করলেই যদি সন্তষ্ট হও, তাহলে আমাকে গ্রহণ 
করতেই হবে । তবে ছু'খানি রুটি, আর সামান্য কিছু ভাজি আমার পক্ষে 
যথেই্। এর বেশী কিছু নয়। 

জংলী পাবা কথাটা শুনে বলেন_-এ যে পাখার আহাব শাধুজী ! এতে 
শরীর টিকবে কি করে? আমরা প্রত্যেকে যে এর চার পাঁচগুণ বেশী 
ভোজন করি। 

ভোজ্য বস্ত্র দিকে কটাক্ষ করে বালানন্দ সহাস্তে বলেন-_-মে ত চোখের 
সামনেই দেখছি । যার যেমণ রুচি, ভার উপর আগ্রহ থাকলে পরমান্বার 
কৃপায় সেটা পিদ্ধ হয়ে থাকে, কিন্তু এ কথা গৃহীর পক্ষেই খাটে ॥ সাধু 
সন্ন্যাসীদের কথা আলাদ!, অনাহার বা অনশনেও তাদের অভ্যন্ত হতে হয়। 
তবে ভগবানের ওপর বিশ্বাস থাকলে, তিনি ভক্তের বাসনা পূর্ণ করে থাকেন। 

বালানন্দজীর উপদেশগুলি উভয় সাধু সানন্দে শোনেন । এই যে পবিত্র 
পর্যটন, এরা তাকে বিশুদ্ধ জ্নলভের উপায় বলে গ্রহণ করতে পারেন 
দি--পরিকমীর পর লোক-সমাঁজে অভিভ্র হবেন, খ্যাতি বৃদ্ধি পাবে, সকলে 


৮৮ ঝাড়খণ্ডের খাষি 


শ্রদ্ধাভক্তি করবে-এই উদ্দেশ্েই এদের পরিক্রমা । বালানন্দও এদের 
উভয়ের উদ্দেশ্য জানতে পেবেছিলেন। জেনেছিলেন যে, বুদ্ধিবৃত্তি যাতে 
উন্মোচিত হয়--সেদিকে এদের আদৌ লক্ষ্য নেই। দিনান্তে আহার ও 
বিশ্রামের তুখ জুবিধ] ভোগ করবার জন্তই এ'র! যেন উদ্প্রীব হয়ে থাকতেন, 
সেইজন্ নির্জন বনার্নী অপেক্ষা নদীতীরবতাঁ বসতিবহুল অঞ্চলগুলির দিকেই 
এ'র। বেশী আকৃষ্ট হতেন, যেহেতু সেখানে আহাধ্যপ্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকে । 
কিন্ত এ ব্যবস্থা! বালানন্দজীর ইচ্ছার একান্ত প্রতিকূল । তাঁর জীবনে এমন 
ঘটনা বছবাধ খটেছে যে, গভীর অরণামধো প্রবিষ্ট হয়ে, নিকটে নদীর 
সন্ধান লন] পেয়ে, সন্ধাকালে অন্ত্রমানে নদীর অবস্থিতি স্থির করে নিয়ে 
অরণ্যবক্ষেই রাত্রিবাস করেছেন_ব্যাকুল ভাবে নর্ধদামায়ীর কাছে প্রার্থনা 
জানিয়েছেন, এই স্থানে তিনি অধিটিত| হয়ে তাঁকে ধন্য করন, তিনি অন্তরে 
ধারণ] করে নিয়েছেণ_মায়ীর পদতলেই রাতের শয্যা পেতেছেন | 
প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গে তর অন্তর আনন্দে পুর্ণ হয়ে উঠেছে* তিনিও এই ভেবে 
আশ্বস্ত হয়েছেন যে, মা তার প্রার্থন। গ্রহণ করেছেন । 

কিন্ত উদাসী সাধু ছুটির মতিগতি অন্য দিকে-_ অরণ্য যেখানে অফীর্ণ 
হয়ে কোন পল্লীর সঙ্গে মিশেছে, সেই দিকেই তাদেব চিত্ত আকুৃ্ট হতে 
থাকে । এইভাবে ভ্রমণ করতে করতে তাঁরা একদ1 নর্জদা তীরবতাঁ মাগুল! 
নামক একটি স্থানে এসে পড়লেন । এ অঞ্চলে তখন দস্যদের খুব প্রাতুভাব : 
তার। অবাধে গ্রামবাসীদের ধন সম্পত্তি গরু মহিষ ভেড়া প্রভৃতি গৃহপালিত 
পণ্ুগুলি পর্যন্ত লুঠ করে জন্নিহিত অরণ্য মধ্যে প্রবেশ কবে নিশ্চিন্ত হয় । 
দুম বনপথে তাদের অনুসরণ করাতে কেউ সাহস পায় না। এরূপ অনাচার 
ব্যাপক হয়ে পড়ায়, মাণ্ডল৷ জেলার কমিশনার সাহেব সদলবলে এর প্রতীকারের 
উদ্দেশ্যে আসেন | তিনি গ্রামের সীম।ন| ত্যাগ করে হুর্গম বনের মধ্যেই তার 
শিবির পাতাবার ব্যবস্থা করেন। সাহেবের সঙ্গে তার স্ত্রী, কতিপয় উপযুক্ত 
পুত্র কন্তা, বহু বরকন্দাজ ও খিতমতদারদের সমাগম হওয়ায় স্থানটি বেশ 
জমকে ওঠে । | 

এদিকে বালানন্দ এবং তার ছুই সাথী সাহেবের তাবুর কাছাকাছি একটা 
স্বানে এসে পড়লেন। কতিপয় গ্রামবাসীও এই বনে কাঠের সন্ধানে 
এসেছিল । সাধু দর্শনে তার! ধন্ঠ হয়ে ভক্তি নিবেদন করতে এগিয়ে এলো । 


যৌবনে ৮৯ 


স্থানটি কিছু ফাক1 দেখে এখানেই বালানন্দজী আশ্রয় নেবার জন্য সঙ্ল্প 
করলেন । সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে তখন বনভূমি ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন হচ্ছিল | 
উদাসী সাধুদ্বয়ের ইচ্ছা, আরও খানিকটা! এগিয়ে গিয়ে নদীতীরে আশ্রয় 
নেন | বালানন্দকে সে কথা জানাবার উদ্দেশ্যে স্থধালেন 2 সাধুজী, সামনের 
দিকে এগিয়ে গিয়ে আন্তানা পাতলে হয় না? 

বালানন্দজী গন্তীর মুখে বললেন £ না_-বরং আরও খানিকট' পিছিয়ে 
গিয়ে আস্তানা পাতলে ভাল হোত, শান্তিতে রাতটা কাটাতে পারতে | 

জংলী বাবা এ কথ শুনে ক্ষু হয়ে বললেন : কেন? নরর্দামায়ীর প্রতি 
আপনার কত ভক্তি, অথচ এখন তাঁর তীরে যেতে নারাজ? মায়ীকে দর্শন 
করবেন না? 

বালানন্দ বললেন £ হ্যা, কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেই নদীমায়ীকে দর্শন করতে 
যাব, সেখানে ত্রান আহিক শেষ করে আবার এখানে ফিরব । কিন্তু এখানকার 
আস্তান৷ আরও গভীর বনে পাতলেই ভাল করতে । 

এমনি সময় কাষ্ঠআহরণকাবী গ্রামবাসীর! সাধু দর্শনে এসে জানাল যে, 
কাছেই কমিশনাব সাহেবের তাবু পড়েছে--ডাকুর সন্ধ্যানে তিনি এসেছেন । 
ভারি কড়া সাহেব, আমাদেব মত গ্রামীনদের গ্রাহ্া করেন না, মানুষ বলেই 
ভাবেন না। আপনারাও খুব হিয়ার থাকবেন মহারাজজী--সাধুসন্তের 
উপর সাছেবের ভারি রাগ। 

উদাসী সাধুরা এতক্ষণে বুঝলেন, কেন বালানন্দ মহারাজ আরে৷ গতীর 
জঙ্গলে পিছিয়ে গিয়ে তাদের আন্তান|] ফেলবার জন্যে বলেছিলেন । 
গ্রামবাসীদের কথা শুনে এবং তাদের নির্দেশমত বনের একদিকে তীক্ষ দ্বাষ্টিতে 
তাকাতেই তারা দেখতে পেলেন, কমিশনার সাহেবের তাবু, তার সামনে 
টহলদার সশস্ত্র বরকন্দাজ দল । 

বালানন্দ বললেন £ এত কাল পর্যটন করছি, কিস্ত কখনে প্র সাহেবদের 
সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটেনি । আজও ওদের সঙ্গে সংস্পর্শ হয়, এটা আমার 
ইচ্ছা] নয় | একটা অমঙ্গলের আভাস আমি পাচ্ছি। 

বালানন্দের কথা শুনে জংলী বাবা কখে উঠে বললেন £ আমরা জানি 
ওর! সয়তান আছে, পাগ্জাবকে ওরা জালিয়ে এসেছে । কিস্ত আমর সাধু, 
আমাদের সে ওরা দুশ্মনি করবে কেন--ওরের কি এক্তিয়ার ? 


৯৩ ঝাড়খণ্ডের ধাষি 


জংলী বাবার কথা শেষ হতে না হতে দেখ! গেল -জ'ন ছুই বরকন্দাজ 
বম্ডুকে সঙ্গীন চড়িয়ে তাদের দিকেই সবেগে আসছে । 

উদাসী সাধুদ্বয় তখন সাবাদিনব্যাপী পথশ্রমের পর নৈশ আহার্য প্রস্বতে 
ব্স্ত। একজন রুটির আটা মেখে একখান] লৌহপাত্রে রেখে জোর দিয়ে 
উলছেন। এদেব ঝোলার মধ্যেই কিছু কিছু প্রযোজনীয জিনিষপত্র থাকে, 
সেই সঙ্গে আহা প্রস্ীতের সাধারণ উপাদানও | আর একজন ধুনি সাজিয়ে 
পাথর ঠুকে ঠুকে অগ্নি উৎপাদনে আগ্রহশীল। একটু তফাতে বালানন্দজী তার 
আঁসনে বসে গুণ গুণ স্বরে একটি দৌহাব কীর্তন তুলে সকৌতুকে ক্ষুধার্ত 
দুই সাথীর আঁহার্ধ প্রস্তরতের উদ্যোগ-পর্ব “দখছেন | কমিশনাব সাহেবের 
বরকন্দাজদ্বব হালীন উঁচিয়ে সবেগে তাদের দিকে আসছে জেনেও তার ভাতে 
জক্ষেপ না কবে নিজেদের কাজেই যেন ব্যস্ত বালিপ্ত। কিন্তু একটু পরেই 
উত্ভয় বরকন্নাজ সেখানে এসে উদ্ধত কঠে জানাল যে, কমিশনার হুজুর তলপ 
করেছেন, এখনি তাদের তিন জনকে তার সামনে হাজির হতে হবে। হুজুর 
কাবুতে আছেন । 

সনক ও জংলী বাবা দুজনেই যুগপৎ বালানন্দজীর পানে তাকালেন _ 
তাদের সেই দৃষ্টি থেকেই প্রশ্ন সুচি হলো--এখন কি কববেন তাব1? 
বালানন্দ এফইভাবে কীর্তনে মগ্ন | একটু পরে সহসা তিনি বরন্দাজদের দিকে 
লিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে বললেন £ তোমাদের হুজুরকে বলগে, আমরা ত্রমণকাবা 
সাধু সন্ন্যাসী, গৃহীর বাড়ীতে আমরা যাঁব না। তা ছাড় সাহেবদের 
সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই, আমরা হনিয়ার কোন খবর রাখি না। 
তোমাদের হুজুরকে এই কথাঁগুলিই বল। 

ভুই বরকন্দাজ সাধুর কথা শুনে প্রথমে নিজেরা পবামর্শ কবল, তারপর 
একজন সাধুদের উপর নজর রাখবার জন্ত সেখাশে রইল, অপর বরকন্দাজ 
ারুতে ফিরে গেল সাধুজীর কথা সাহেবকে শোনাবার জন্য | 

সাহেব তখন তঠাবুর প্রাঙ্গণে পাইপ টানতে টানতে পাইচারী করহিলেন। 
ভার মেজাজটিও ভাল ছিল না, বড় ছেলেটি প্রত্যুবেই জঙ্গলে সে ধিয়েছে.., 
শিকারের উদ্দেশ্যে _ এখনো পর্যস্ত ফেরবার নাম নেই । খানিক আগে কয়েক- 
জন সিপাহীকে পাঠিয়েছেন ছেলের সঞ্ধানে, কিত্ত তারাও ফেবেণি। এমনি 
সঙ্গয় ধরকন্দাজ এপে বালানলা সাধুর কথা সাহেবকে বলল । 


যৌবনে ৯১ 


শুনেই সাহেব একেবাবে আগুন হয়ে উঠলেন, কমিশনার সাহেবের 
হুকুম অমান্য করে এত বড় আম্পর্ধী। তিনি সেই ববকন্দাজকে বললেন * 
নেহি, নেহি, জকুর হি'য়1! আনে হোগা, আবি লেযাঁও | 

হুকুম শুনে বরকল্সা ছুটল সেখানে । বালানন্দকে বলল যে, সাছেৰ 
ভারি রেগে গেছেন-তটাদের হাঁজিব হতে হবে সাহেবের কাছে এখনই | 

উদাসী সাধুরা আবার তাকালেন বালানন্দেন দিকে । কিন্তু বাঁলানন্দ 
নিবিকার ;, স্বাব চে'খে মুখে উদ্বেগ বা আঁশঙ্কাব কোন ছায়াই পড়েনি । 
তেমনি শাস্তভাবে স্িপ্ধস্বরে তিনি বরকন্দাজকে বললেন : সাধুদের মুখ 
থেকে একবাব যে কথা বান হয, তার আর অদল বদল হয় না। সারাদিন 
অরণ্য ভ্রমণেব পর তারা যেখানে আসন পেতেছেন, সেখান থেকে স্বেচ্ছায় 
উঠবেন না। সাহেব ইচ্ছা! করলে জোর-ভবরদস্তি করে তাদের ধরে নিয়ে 
যেতে পারেন | 

আবার সেই বরকন্দাজ ছুটল সাহেবের কাছে সাধুব জবাব নিয়ে। পুত্রের 
ব্যাপারে সাহেব একেই উদ্বিগ্ন ছিলেন, এখন এই ভিখ্‌ মাংগা বুজরুকদের 
কথায় ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন । তৎক্ষণাৎ তাবুর মধ্যে ঢুকে হাণ্টারটা 
টেনে নিয়ে বরকন্দাজকে বললেন £ চলো জল্দি । 

ব্যাপার দেখে বলানন্দেব উভয় সাী ত্রস্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং বার বার 
বালানন্দকে বলছিলেন যে, সাছেবের হুকুম তামিল না করলে যদি সাহেব 
কোন হাঙ্গাম] বাধায় ? 

অর্থাৎ তারা বেগতিক দেখে সাছেবের মঙ্গে সন্ধি স্থাপনে ব্যস্ত হয়ে 
উঠেছিলেন | কিন্তু বালানন্দ বরাবরই অটল। তিনি দ্রটস্বরে বললেন : 
নর্নদাযায়ী আর গুরুজী ছাড়া কারো হুকুম তামিল করতে আমি শিখিনি। 
তারপর একবাব যে কথা বলেছি, তার খণ্ডন করবার শক্তিও আমার নেই । 
সাহেবের গরজ থাকে ত নিজেই এখানে আসবে | 

বালানন্দেব কথা শেষ হতে না হতেই আহেবকে উদ্ধত ভঙ্গিতে আসতে 
দেখা গেল । বালাপন্দ তার সাথীদের বললেন £ তোমরা তোমাদের কাজ 
করতে খাক-_ আমার সঙ্গেই সাছেবের বোঝাপড়া হয়ে যাক। 

সাহেব সেখানে এমেই হাতির হাণ্টারাট বার তুই আপ্ফালন করে বালানন্দের 
সামনে গিয়ে দাড়ালেন । বরকল্দাজ ইতিমধ্যেই আদেশ অমাচ্ভ কারী সাধু্টিকে 


৯২ ঝাড়খণ্ডের খষি 


দেখিয়ে দিয়েছিল | সাহেব প্রথমে হুকুম না শোনার জন্য চড়া গলায় 
বালানন্দকে ধমক দিলেন। বালানন্দ নীরবে সাহেবের ছমকী শোনেন, আর 
মিট মিট করে চেয়ে থাকেন, চোখে মুখে ফুটে ওঠে হাসির স্বত্ব আলো। সাহেব 
তাতে আরও চটে ওঠেন । শেষে শক্ত হয়ে বললেন : শোনো । এ অঞ্চলে 
বহু স্থানে চুরি ডাকাতি হচ্ছে । আমার বিশ্বাস_-সে সব তোমাদেরই কাজ। 

বালানন্দকে তখন শাস্তকঠে প্রতিবাদ করতে হলো ; তিনি বেশস্প্ট করে 
সাহেবকে বুঝিয়ে দিতে থাকেন-_অনেক রকমের সাধুসম্ত আছে, তারাও 
এক শ্রেণীর সাধু--নরদ1 নদীর তীরবতী কুর্গষ অরণ্যে ভ্রমণ করাই গ্টাদের 
সাধনমার্গের লক্ষ্য । চোর দক্ুযুদের সঙ্গে সাহেব তাদের নাম করে খুবই অন্থায় 
কাজ করেছেন । 

বালানন্দের ঝুলিটি সামনেই পড়ে ছিল | সাঁহেব সেটি তুলে বললেন যে, 
তার কথ মিথ্যা নয়, আর তিনি যে অন্যায় কিছু বলেন নি, এ থেকেই প্রমাণ 
হবে। এর পর একান্ত অবজ্ঞাব সঙ্গে সাহেব সেই ঝুলিটি সেখানে উপুড় করে 
দিতেই তার ভিতরের জিনিষগুলি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল | তার মধ্যে ইম্পাতে 
তৈরী ছোট একটি শাবল, আর সেই রকম আয়তনের একটি টাঙ্গি সর্বাগ্রে 
সাহেবের দৃষ্টি আকুষ্ট করল । তিনি তখন বূঢ় 1বন্ধপের সুরে বললেন £ 
ঠিক হায় ! ৰা 

সাহেবের কথার ভঙ্গি থেকেই বালানন্দ বুঝতে পারলেন যে, অস্ত্র ুটিকে 
সাহেব তার আগেকার উক্তির প্রাণ স্বরূপ ভেবে উৎফুল্ন হয়ে উঠেছেন । 
তিনি তখনই সাহেবের সন্দেহ মোচনের উদেশে বুঝাতে লাগলেন যে, যার! 
বনে জজলে ঘোরাঘুরি করে, এ রকম অস্্ সব সময়ই তাদের সঙ্গে রাখতে 
হয়। এছুটে। এমন কিছু মারাত্মক অস্ত্র নয় যে, শাহেব বড় রকম কিছু 
আবিফার করেছেন ভেবে অত উল্লাস করছেন। জঙ্গল মধ্যে গাছের মূলে 
এমন অনেক খাচ্য বস্ত্ব থাকে, যেগুলি তোলবার জন্য এই শাবলের প্রয়োজন 
হয়। অস্থায়ী আস্তানা নির্মাণ করবার জন্যও এই জিনিষটি কাজে লাগে। 
গাছ থেকে ধুনির কাঠ সংগ্রহ করতে টাঙ্গিরও আবশ্বক আছে । 

সাহেব বালানন্দের কথ অগ্রাহ করে দুত্বরে বললেন নেহি, নেহি, 
তোম্‌ লোক মোকাম তোড়তে হৈ, সিদ দেতে হৈ, আদমীকো ঘাল করতে 
হে, ইসি ওয়াস্তে ইসব ঝুলিমে রাখ দিয়া । 


যৌবনে ৯৩ 


স্থৃতরাং এই ছুটি অস্ত্র রাখার দরুণ বালাণন্দকে এক প্রকার অপরাধী 
সাব্যস্ত করেই সাহেব ঝুলি থেকে বিক্ষিপ্ত দিনিষগুলিও তদারক করতে লেগে 
গেলেন । প্রথমেই একটি পুলিন্দা খুলে ফেলতেই তার ভিতর থেকে খানিকট। 
গঞ্জিকা বেরিয়ে পড়ল । আবগারী ব্যাপারে গাজা আফিয়ের সঙ্গে সাহেবের 
পৰিচয় ছিল। তথ|পি সাহেব জিন্ঞাসা করলেন £ এত বেশী পরিমাণে 
আবগার্ী জিনিস রাখা হয়েছে কেন ? 

বালানন্দ বললেন ত সেবন করবার উদ্দেশ্যে । তোমন। যেমন পাইপে 
তামাক ভরে তার ধূমপান করে আনন্দ পাও, আমরাও টির কলিকায় এই 
জিনিষটি রীতিমত তদ্ধির করে সেজে আগুনের আচে পুড়িয়ে এর ধুম সেবন 
করি। দিনরাত বনে ঙ্গলে নদীর কিনারায় পাহাড় পরতে আশ্রয় নিরে থাকতে 
হয়, মাথার ওপর দিয়ে ঝড় বৃষ্টি বহে যায়। সেসব দৌরাস্্ সা করবার শক্তি 
পাই এই বস্ত্র সেবন করে। তোমাদের পাইপের এ শোধন করা শক্তিহারা 
তামাকের চেয়ে আমাদের এই তামাকের তেজ আর গুণ অনেক বেশী। 

এই মময় আর একট পুঁটশি খুলতেই বে ভীষণ বস্তাটি বেরিয়ে পড়ল, 
সেটিও কাধাস্ব্রে নাহেবের অ্ুপরিচিত। সাহেব সেটি দেখে চমকে উঠে 
বললেন £ কি খব্বনাশ! এ যে দেখছি আরসেনিক (*ভ্াবিষ)। এ বস্ত 
তোমার ঝুলিতে কেন? জান, বেশী পরিমাণে এই গাঁজা ও শঙ্খবিষ কারও 
কাছে যদি ধর পতে, তাহলে তখনি তাকে গ্রেপ্তার করে চালান দেওয়া হয়? 
তোমার ঝুলি থেকে এ দুটে| জিনিস যখন মিলেছে, তোমারও এ শাস্তি হবে। 

বালানন্দ বললেন 2 গাজার খা আগে5 বলেছি, ওর ধুম পান করি। 
আর, আমাদের মত আাধুর1--বারমাস বশে দঙ্গলে যার] ঘুরে বেড়ায়, এই বিষও 
তার! ব্যবহার করে 'ওষধের মত | তার পর, সব সময় এ দুটো জিনিস পাওয়া 
যায় না বলেই, মরশুমের সময় কিছু বেশী পরিমাণে কিনে ঝুলির মধ্যে রাখ! 
হয়েছে । যে জিনিজ ওষধের মত ব্যবহার চলে, এ রকম অবস্থায় সঙ্গে কিন্তু 
বেশী থকিলেও আবগারী আইনের আমলে পড়ে না। 

সাহেব তার অভ্যাস মত পুনরায় ধমক দিয়ে বললেন : তুমি দেখছি 
সবজাস্তা সাধু, 'আইন কানথনও জেনে রেখেছ | কিন্তু শঙ্খবিষ কেউ যে ওষুধের 
মত খাবার জন্তে সঙ্গে রাখে, একথা আমি বিশ্বাস করি না। মানুষ মারবার 
জন্যই এই বিষের পাথর সঙ্গে রেখেছ তুমি | 


৯৪ ঝাড়খণ্ডের থাষি 


বালানন্দ বললেন : সাধুর! কখন মিথ্যা বলে না। এখন আমার কথ 
বিশ্বাস করা বা না-কর1, তোমার ইচ্ছা] । আমি এখনে। বলছি, খাবার জন্তই 
এ বিষ সঙ্গে রেখেছি । 

সাহেব তৎক্ষণাৎ সেই বিষ থেকে একটা ডেলা তুলে নিয়ে বললেন £ 
ঘদি আমার সামনে তুমি এটুকু খেতে পার, তাহলে বুঝব তোমার কথা সত্যি। 
নতুব] বুঝব, তুমি মিছে কথা৷ বলেছ, আর সেজন্য তোমাকে এই হাণ্টার 
দিয়ে চাবকাব। 

বিষের ডেলাটুকু বালানন্দের হাতে দিয়ে সাহেব হাণ্টারটি নিয়ে আন্ফালন 
করতে লাগলেন | বালানন্দের অন্তর এখন সাহেবের কথায় বিক্ষুব্ধ হয়ে 
উঠল । সাহেব ভাকে মিথ্যাবাদী বলে! মানুষ মারবার জন্ত এই বিষ বেশী 
পরিমাণে তিনি সঙ্গে রেখেছেন ! বিষ-পাথরের যে অংশটুকু সাহেব তাঁকে 
খেতে বললেন, তার পরিমাণ বিচার না করেই তৎক্ষণাৎ তিনি মুখের মধ্যে 
ফেলে গিলে ফেললেন। এ-কাণ্ড দেখে চোখ দুটো কপালের দিকে তুলে 
সাহেব অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন ; উদাসী সাধুদ্ধয় এবং সাহেবের বরকন্দাজর1ও 
স্তম্ভিত। 

একটু পরে সাহেব বললেন : সত্যিই তুমি সবটা খেয়ে ফেললে-_মরবে যে? 

বালানন্দ বললেন £ তুমিই ত আমাকে মরতে বাধ্য করলে সাছেব! 
(তোমার কথামত হাজতে বা জেলখানায় শাস্তি ভোগ করতে যাওয়ার চেয়ে বিষ 
খেয়ে মরা অনেক ভাল আমার পক্ষে । 

বালানম্দ যেখানে আসন করেছিলেন, তার পিছনেই একটা বড় গাছ ছিল। 
সেই গাছের গুঁড়িতে পীঠের ঠেস দিয়ে তিনি শক্ত হয়ে বসলেন। উদ্দেশ্য, 
বিষের ক্রিয়া আরন্ত হলে মাটির উপর সহজে না পড়ে যান। উদাসী সাধূদের 
লক্ষ্য করে বললেন ; যদি আমার ম্বৃত্যু হয়, দেহাটি নরদা মায়ীর জলে 
ভাসিয়ে দিও, এই আমার অনুরোধ | 

এমনি সমর ঝুলির দিনিসপব্রগুলি ছড়ানে। অবস্থায় দেখে তিনি ক্রিষ্ট কঠে 
বললেন £ অনেক দরকারী জিনিস থলিতে ছিল, সাহেব সেগুলো ছড়িয়ে 
দিয়েছেন, যদি থলির মধ্যে ভরে রাখ ভাল হয়, এর পর অনেকেরই 


উপকার হবে। 
সাহেব আগতেই উদ্াসীদের হাতের কাজ বন্ধ হয়েছিল। বালানন্দের 


যৌবনে ৯৫ 


কথায় তখনই ভারা জিনিসগুলি ঝেড়ে ঝুড়ে থলিতে ভরতে লাগলেন । 
সাহেবও সেখানে এক পাশে স্থাণুর মত স্থির হয়ে দাড়িয়ে তাকিয়ে রইলেন । 
তার মনে তখন অনুতাপ এসেছে -এভাবে সাধুকে এতখানি বিশ্বপাথর খেতে 
বলে প্রকারান্তরে তার প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা করেছেন_-এই কথাই তার মনে 
একট! অস্বস্তিকর চিন্তার উদ্রেক করছিল। সাধুর দিকে তাকাতেই দেখেন, 
একই ভাবে গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে আছেন, কোনরূপ চাঞ্চল্য বা 
অস্থিরতার নিদর্শন পাঁওয়! যায় না| সাহেবের ইচ্ছা! হলে জিজ্ঞাস] করেন__ 
দেহের মধ্যে কষ্ট হচ্ছেকি না? বিষপায়ীর। যে নিদারুণ যাতনা ভোগ করে 
থাকে, সাহেবের সেটা জানা ছিল। এই অদ্ভুত সাধুর অবস্থাঁটি ভালভাবে 
বুঝবার অভিপ্রায়ে তিনি হাতের হাণ্টারটি ভার ঘাড়ের দিকে আস্তে আস্তে 
চালনা করতে লাগলেন । কিন্তু তাতেও বালানদ্দের কোন সাড়া পাওয়৷ 
গেল না। 

এমনি সময় তার শিবির থেকে একটা কোলাহল উঠে সাহেবকে সচকিত 
করল | তিনি জনৈক বরকন্দাছকে উক্ত কোলাহলের কারণ জাঁনাবার জন্য 
শিবিবে পাঠালেন | কিন্ত পরক্ষণেই শিবির থেকে এক অনুচর ছুটত ছুটিতে 
এসে খনর দিল--সাঁঙেবের বড ছেলে এইমাত্র শিকার কবে ফেরেন: কিন্ত 
খোচা] থেকে নাখবার আঅময় এমন বেকায়দায় পড়ে যান যে, আনলে সঙ্গে অজ্ঞান 
হয়ে পড়েছেন | 

সাহেব আর কোন দিকে না চেয়ে, কাউকে কিছু না বলে, মুখ দিয়ে 
একট] ছুর্বোধ্য শব্দ কৰে শিবিরের দিকে দ্রতপদে চলে গেলেন । 


দই 

সংজ্ঞাহীন আছেব-পুত্রকে নিয়ে শিবিরে তখন ছৈ চৈ পড়ে গেছে। 
জ্ঞান সঞ্চারের জন্য সাধারণত যে সব প্রক্রিয়া করা হয়ে থাকে, সেগুলির 
যথাসাধ্য ব্যবস্থা সত্বেও কোন ফল পাওয়া গেল না। সাহেব তখন মাওুলার 
সদরে ঘোড়ম*য়ার পাঠালেন সেখানকার ডাক্তারকে আনবার জন্য | বিভাগীয় 
কমিশনার সাছেবের শিবিরে বিপত্তির খবর পেয়ে ডাক্তার তাড়াতাড়ি এসে 
গেলেন । প্রয়োজনমত যন্ত্রপাতি ও ওষধপত্র তিনি সঙ্গে করেই এনেছিলেন | 
কিন্ত বছক্ষণ ধরে চিকিৎমা করেও কোন ফল পাওয়া গেল না। 


৯৬ ঝাড়খণ্ডের থষি 


এদিকে উদাসী সাধুরা তাদের আহার্য্ের উদ্যোৌগ-পর্ধ শেষ করেই ধুনি 
জ্বালিয়ে পাকের ব্যবস্থা করলেন। মধ্যে মধ্যে বালানন্দের অবস্থাটা 
পরীক্ষাও করেন। তিনি সেই একইভাবে গাছের গীঠে ঠেস দিয়ে উপবিষ্ট, 
চক্ষু দুটি নিমীলিত। তাবা বিখে্ষভাবে লক্ষ্য করে বুঝতে পারেন যে, ওষ্ঠ 
ত্রুটি যেন ঈষৎ স্পন্দিত হচ্ছে। তখন তারা অনুমান করেন, সাধুজী মনে 
মনে কোন মন্ত্র জপ করছেন। তা'হলে ভয় নেই, তার যেজধপ প্রবল 
যোগবল, তাতে এ শঙ্খবিষ তিনি পরিপাক করে ফেলবেন এবং তাদের এত 
যত্বে প্রস্তুত আহাধও গ্রহণ করবেন । ইতিমধ্যে এ অঞ্চলের আদিবাসীদের 
মধ্যে কতিপয় উৎসাহী বধীয়ান ব্যক্তিও সেই স্থানে সমবেত হয়েছিল। 
তারা সমস্ত ঘটন শুনে দৃঁঢস্বরে মত প্রকাশ করল-_সাধুর প্রতি কুবাবহার 
করাতেই সাহেবের শিবিরে সঙ্গে সেই দারুণ বিপত্তি ঘটেছে । সাধুকে 
তুষ্ট না করলে সাহেবের ছেলে সেবে উঠবে না-_যত্তই ডাক্তাব বদ্ঠি আনুক | 
উদাসী সাধুব] সাগ্রহে প্রতীক্ষা করতে থাকেন__কতক্ষণে বালানন্দজীব 
বাহিক চৈতন্যোদয় হবে--তাদের সঙ্গে একত্র ভোজনে বলবেন । 

শিবিরের মধ্যে পুত্রের চিকিৎসা ও নানারূপ ভুশ্চিস্তাব যধ্যেও সাধুর 
মুখখানা মধ্যে মণ্যে সাহেবেৰ মলের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠে তাকে বিচলিত 
করতে থাকে! হঠাৎ তিনি ডাক্তারকে বললেন : দেখুন, কাছেই একজন 
সাধু শঙ্খবিষ সেবন করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সেই সময়েই আমার খিবিরে 
এই হুর্ঘটনা হয়। আপনি ঝা করে তাকে দেখে আস্মন ত| যদি বাচাতে 
পারেন ত কথাই নেই, নতুব] তার জস্তে যে চিকিৎসা কববেন আমিই তাঁর 
সমস্ত খরচা দেব | পুধের এক বরকন্দাজ একটা লগনেব সাহায্যে ডাক্তারকে 
পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল | 

উদাসী সাধুর! সাগ্রহে প্রতীক্ষা করছিলেন-- বালানন্দভ্ী কতক্ষণে সুস্থ 
হয়ে ওঠেন। এমনি সময় লঠনের আলোকে ছুই ব্যক্তিকে দেখে তারা 
চমকিত হয়ে উঠলেন__সাহেব কি কোন কারসাজি করবার জন্যে এদের 
পাঠিয়েছেন? কিন্তু তারা ঘখন জানতে পারলেন, সাহেব নিজের ছেলের 
চিকিৎসার জন্তে দর থেকে যে ডাক্তার আনিয়েছিলেন, তাঁকেই পাঠিয়েছেন 
সাধুর চিকিৎসার উদ্দেস্টে, তখন তারা বুঝলেন, তাহলে সাহেবের মনে 
অঞ্থুতাপ হয়েছে । একেই বলে--গরু মেরে জুতো দান। 


যোরনে হর 


জংলীবাবা ত হেসেই খুন। ডাক্তারকে বললেন : আপনি এই সাধু- 
বাবার কি চিকিৎসা করবেন ডাক্তার সাব--সাধুজী নিজেই নিজের চিকিৎসা 
করেছেন । আপনি বরং পরীক্ষা করে দেখলে তাছ্জব হবেন। 

সত্যিই অভিজ্ঞ ডাক্তার 'তাজ্জব' হন সাধুর অবস্থা দেখে । দিব্য শ্বাস 
প্রশ্বাস চলেছে, নাড়ীর গতিও বেশ ভ্রত, কিন্তু সেটা কোনরূপ উত্তেজনা 
প্রস্তুত বলে মনে হয় না, জ্বর বা কোন ব্যাধিরও সন্ধান পান না। 
সন্দিগ্ধ কণ্ঠে ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন: সাধুজী কি সতাই শঙ্খবিষ 
খেয়েছিলেন ? 

জংলীবাবা তর্ক না করে মাধুর ঝুলি থেকে বিষপাথরটি বার করে 
ডাভ্তারকে দেখালেন ; বললেন £ এরই কিছুটা অংশ ভেঙে পড়ে--সাহেবের 
কথায় তখনি গিলে ফেলেন । তারপরই এই অবস্থা | 

ডাক্তীর বিষপাথবটি অতি সম্ভর্পণে পরীক্ষা করে শিউরে উঠলেন--তীত্র 
শর্তিসম্পন্ন হলাছল ! আত্রাণেই বিষের ক্রিয়া অন্নভুত হবার কথা। 
এই বিষম বিষ সেবন করে সাধু এখনও জীবিত আছেন! অথচ, এখন তার 
নাড়ী দেখে কিছুতেই উপলব্ধি হয় না যে, কোনরূপ বিষ বা উগ্র মাদক 
দ্রব্য তিনি সেবন করেছেন চার পাঁচ ঘণ্টা পুর্বে। 

সহসা সোখ্সাহে জংলীবাবা! বললেন : সাধুজীর নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে, এখনি 
সব ঠিক হয়ে যাবে । 

তিনি তাড়াতাড়ি এক লোটা জল বালানন্দের সামনে রেখে বললেন £ 
মহারাজ, পানি এনেছি ; আচমন করে পবিত্র হোন । 

সত্যই বালানন্দ যেন গাঁড় নিদ্রা থেকে সদ্য জাগ্তত হয়েছেন | এতক্ষণ 
একই ভাবে গাছেব গায়ে ঠেস দিখে বসেছিলেন ; এখন ধড়মড় করে উঠ্ঠে 
সোজা হয়ে বসলেন । তারপর বিহবলভাবে চারদিকে চেয়ে বললেন : মা-জী 

চলে গেছেন তাহলে ! এতক্ষণ আমাকে কোলে করে বসেছিলেন, আমাকে 
সকার সিদ্ধ মরিচ খেতে দেন। তিনিই তত বললেন--ভয় নেই। 

আর কোন কিছু নাবলে লোটা থেকে জল নিয়ে মুখ ধুতে লাগলেন । 
.সনক নামে শাধুটি বললেন : তোমার মা-জী সাছেবকেও রেহহি দেননি। 
তার ছেলে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হন। সাহেব তখন সদর থেকে 
ডাক্তার আনান | ভারপর তিনি কি ভেবে তোমার চিকিৎসার জন্য তাকে 

৭ 


৯৮ ঝাড়খণ্ডের খষি 


পাঠিয়েছেন__-ইনিই ডাক্তার সাহেব | মাতাজীর কৃপায় তুমি সেরে উঠলে, 
কিন্ত সাহেবের ছেলের জ্ঞান এখনো! হয় নি-_হয়ত' হবে না। 

বালামন্দের মুখখানি এখন আনন্দে যেন ঝলযল করছে । সেই মুখ থেকে 
স্িপ্ধ বাণী নির্গত হলো: মা-জী যখন বলে গেলেন-__ভয় নেই, তখন 
সাহেবের ছেলেও জ্ঞান হারিয়ে থাকতে পারে না, আমারই মত চাঙ্গা হয়ে 
উঠবেই । মায়ী যে জানে নিজের ভালো নিয়েই চুপ করে থাকবার মত 
ছেলে আমি নই । 

বালানন্দের ঝুলিটি একটু তফাতে ছিল ; সেটি কাছে আনবার ভন্য জংলীকে 
ইক্ষিত করলেন | এরপর সেই ঝুলিব মধ্যে হাতখানা ঢুকিয়ে একটি ছোট 
পাথরের ডিপা বার করলেন । .সটি ভস্মে €ুর্ণ ছিল। গাছের একটি ঝর! 
পাতায় সেই ভস্ম খানিকটা রাখলেন, তারপর একটি মোড়ক বেঁধে ডাক্তারকে 
দিয়ে বললেন: যদি দৈবের প্রতি আপনার বিশ্বাস খাকে, তাহলে এই ভস্ম 
রোগীর গায়ে মাখিয়ে দিতে বলবেন সাহেবকে । ভার ছেলে সুস্থ হবে৷ 

ডাকার শ্রদ্ধার সঙ্গে সাধুদত্ত মোড়ক গ্রহণ করণে বলচলন ; আমার 
ধারণ] মহারাজজী, যে ডাক্তার দৈবকে, অর্থাৎ ৬*বানকে বিশ্বাস করে না। 
তার চিকিৎসা-শার উপর বিশ্বাপ থাকতে পাবে না। আমি আজ এখানে 
দৈবের যে অপুর্ব লীলা দেখেছি, তাতে বিশ্বাস আরও গতীর হয়েছে; তাই 
আমি ভরসা কবছি, এরপর কমিশনার সাহেবেবও টৈতন্য হবে। সাধুসস্তদের 
প্রতি তার শ্রদ্ধা জাগবে । যেহেতু, আমি বিশ্বাস কবি, সাধুজীর এই ভস্মের 
শক্তি ব্যর্থ হবে না। 

ডাক্তার তত্ক্ষণাৎ ববকন্দাজকে সঙ্গে করে যেখান থেকে চলে গেলেন। 


ত্তিন 
সাধুদত্ত ভল্ম কমিশনার সাহেবের সংজ্ঞাহীন পুত্রের অঙ্গে লেপন করবার 
কিছুক্ষণ পরেই তার চৈতন্তোদয় হওয়ায় শিবিরের সেই আতঙ্ককর পরিবেশের 
মধ্যে অপ্রত্যাশিত আনন্দের রোল উঠে ঘরে বাইরে সকলকেই চমৎরুত 
করল । গিনিব একটা থলি নিয়ে সাহেব বেরিয়ে পড়লেন সাধুকে বখশিস, 
দেবার উদ্দেশ্যে । খানিক আগে ধীকে সিদেল চোর ভেবে চাবুক হাতে করে 
নায়েস্তা করবার মতলবে ধেয়ে এসেছিলেন, ডীরই অলৌকিক শক্তিতে মুগ্ধ 


যৌষনে ৯৯ 


হয়ে অর্থদানে তুষ্ট করবার জন্ত সাহেবের কি আগ্রহ ! এখন সেই সাধারণ 
মানুষটি সাহেবের দৃষ্টিতে অনন্য-শাধারণ অতিমানূষ । এই শ্রেণীর মানুষরাই 
জীব-জগতের কল্যাণের জন্তই পৃথিবীতে আবিভূত হন_-এই ধারণাই 
সাহেবের মনে এখন দ্বাচ হয়েছে । 

সেই প্রকাণ্ড গাছটির পীঠে পীঠু রেখে বাঁলানন্দজী একইভাবে বসে 
আছেন । খানিক দুরে উদাসী সাধুদ্বয় কোন রকমে শয়নের ব্যবস্থ। করে 
নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন । সাহেবের সঙ্গে কৌতুহলী হয়ে আরও অনেকেই 
এসেছেন__সাধু দর্শনে ধন্য হতে। 

সাধুর সেই একই ভাব । জনপমাগমে ও চিত্তচাঞ্চলোৌর কোন আভাষ পাওয়] 
গেল না। আহেবও স্থিরভাবে নিষ্পলক নয়নে সাধুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন । 
সাধুদের যোগ" ও ধ্যানে'র কথা সাহেব শুনেছেন, গ্রন্থেও পড়েছেন । কিন্ত 
এসব আধ্যান্মক ব্যাপারে কোনদিনই তার আস্থা ছিল না। এখন এই সাধুর 
সামনে নীরবে একইভাবে এতক্ষণ, দাড়িয়ে থেকে সাহেবের মনে হলো, 
হয়ত সেই যোগ বা ধ্যানে আধুজী মগ্ন হয়েছেন, কিম্বা এমনও হোঁতে পারে, 
সেই বিষ-পাথরের ক্রিয়ায় তিনি আচ্ছন্ন । যাই হোক, পরীক্ষা করে দেখবার 
জন্ত সাহেব পুনরায় উদ্প্রীব হয়ে উঠলেন | তিনি বেশ শান্ত, স্সিপ্ধ অথচ 
উদাত্তকঠে আহ্ব!ন করতে লাগলেন £ সাধুজী | সাধুজী | সাধুজী ! 

তৃতীয় ডাকের পর সাধুর যুদিত চক্ষু ছুটি উশ্নীলিত হলো; সেই সঙ্গে 
সাহেবের শান্ত মৃতিও তাঁর চোখের সামনে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেল। বনের 
মধ্যে বৃক্ষতলে আশ্রয় ।নলেও, তিনি এখন আশ্রমী। আশ্রমে অতিথির 
সমাগমে প্রফুল্লমুখে হাত তুলে ইঙ্গিতে সম্বস্ধনা] জানালেন | কিন্তু সাহেবের 
বসবার যোগ্য আমন না থাকায় আসন এহণের অন্য অন্নবোধ করতে পারলেন 
না| শেষে সহাশ্যে স্বহস্বরে বললেন £ স্বাগতম্‌ ! আইয়ে-_ 

সাছেবও ললাটের দিকে তার লম্বা লম্বা হছৃ'খালি সংযুক্ত হাত তুলে 
অভিবাদন করলেশ। তারপর ম্বৃস্বরে বললেন : সাধুজীর দাওয়াই আম!র 
ছেলেকে সুস্থ করেছে। 

সাধু বললে : আমি জানতাম, তোমার ছেলে সুস্ব হবে। যে মঙ্গলময়ী 
মায়ী আমার দেহ থেকে সমস্ত বিষ ঝেড়ে দিয়েছেন, তিনিই তোমার ছেলেকে 
সুস্থ করে দিয়েছেন। মায়ীদের ত এই কাজ। 


মাও ঝাড়খণ্ডের খষি 


সাঁধুর কথাগুলি সাহেব বুঝতে পারলেন না, সাধুর দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে 
তাকিয়ে বইলেন | তখন বালানন্দ বললেন £ এ সব কথা বুঝিয়ে দেওয়া 
কঠিন। তবে এইটুকু জেনে বাখো, সত্যকে আশ্রয় করলে কোন ভয় থাকে 
না, অমঙ্গল আসে না, সতোর সঙ্গেই ভগবান থাকেন। তোমার ছেলেব 
হৃদয়ে সত্য আছে, তাই ঈশ্বব তাকে বক্ষা কবেছেন | 

সচ বরাবব তপ্‌ লহা হৈ, ঝুট ববাবব পাপ। 
জবকে। হিবদৈ মাচ হৈ, তাকে হিবদৈ, আপ ॥ 

ছড়ার্টি বলেই সাধুজী তাঁব অর্থটি সোজ] কবে বুঝিয়ে দিলেন--সত্যেব মতন 
তপস্যা নেই, মিথ্যার পতন পাপ নেই। যাব হৃদয়ে সত্য, ভগবান ও তার 
হৃদয়ে থাকেন। 

সকল দেশের সকল মানব, সকল জাতি এবং সকল ধর্ণাবলম্বীদের বোঝবার 
ও মানবার মত উপদেশ | সাহেব শুনে মুগ্ধ হন । 

এই সময় তিনি সেই গিনিব থলিটা সাধুব সামনে রেখে বললেন; এই থলিতে 
গোটাকয়েক মোহর আছে-_সাধুজীব সেবায় লাগলে আমি ভাবি খুশি হব | 

সাহেবের কথায় সাধুব সর্বাঙ্গ শিউবে উঠল । তিনি স্থির দৃষ্টিতে সাহেবের 
দিকে চেয়ে মৃহু হেসে বললেন : তখন আামাব ঝোলা উল্টে দেখেছিলে, 
তামার একটি পয়সাও তাব মধ্যে পাওনি | এখন এই মোহর নিয়ে আমি কি 
করব বলতে পাব, সাহেব? বনে জঙ্গলে ঘোবাই আমার কর্ণ, সেই আমার 
সাধন]! সেখানে টাক পয়সাব কোন প্রয়োজন নেই | আমার ঝুলির মধ্যে 
দুটো লোহার জিনিষ দেখে তুমি আমাকে সিদেল চোর ঠাওরেছিলে, এমনি 
এক থলি গিনি থাকলে কি ভাঁবতে বলত? তুমি ও থলি তুলে নাও, ওর 
যব্যে যা আছে আমার কোন কাজেই লাগবে না । 

সাহেব বললেন ₹ আপনাকে ত গাজ1] কিনতে হয় মেইজন্তই আমি এই 
থলি দিচ্ছি মনে করুন| 

ধালানন্দ বললেন : ও-বস্ত্বও আমাদের অমনি মিলে যায়| আর অঙগলে ত 
গাজার দোকান নেই_যে কিনব | অল্প দামে ও জিনিষ মেলে, মোহর ভাঙিয়ে 
কেউ গাঁ কেনে না। 

সাহেব বললেন ; সাধুতীকে কিছু দিতে না পারলে আমি কিন্তু কিছুতেই 
শাস্তি পাব না। 


যৌৰনে ১০১ 


'সাধুজী সহান্টে বললেন আমার প্রতি যদি তোমার শ্রদ্ধা হয়ে থাকে, 
তাহলে সেই শ্রদ্ধা ঈশ্বরকে দাঁও ; তাকে বিশ্বাস কর। আর, এই থলির 
অর্থ যার প্রকৃত তুস্থ, তাদের প্রয়োজনে দান করলেই আমাকে দেওয়া হবে। 

সাহেব আর অন্নুরোধ করতে সাহস পেলেন না। থলিটি সাধুজীর সামনে 
থেকে তুলে নিলেন । তারপর বললেন £ আমিও কালই এখান থেকে শিবির 
তুলে মহারাজপুরে যাচ্ছি। যদি পেখানে সাধুজীর দেখা পাই, দুস্থদের 
আপনার কাছে এনে দান খয়রাতের ব্যবস্থা করব । 

বালানন্দজী মৃদু হাসলেন , কিছু বললেন না] 

পরদিন কমিশনার সাছেব শিবির তুলে স্থানান্তরে যাবেন স্থির হয়েছে। 
প্রতরাসের পর তারই আয়োজন চলেছে | এমন সময় তিনি সাধুর খবর নিতে 
এক বরকন্দাজকে পাঠালেন । সে লোক ফিরে এসে খবর দিল- রাত্রি প্রভাত 
হবার আগেই সাধুরা চলে গেছেন । 

সাহেব একটু বিমর্ষ হলেন। সাধুর সঙ্গে আর একবার দেখা করবাব ইচ্ছা 
ছিল ত্তার। সাধুর উপদেশগুলি শুনে তিনি মুগ্ধ হযেছিল্ে, আরও কিছু 
শোনার বাসনা ছিল । ভেবেছিলেন, প্রাতরাশের পর সাধুস্থানে যাবেন । কিন্ত 
সে আশা তার অপুর্ণ থেকে গেল । 

পর্যটন কালে গৃহী বা! সরকারী পদস্থ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে তাদের সজে 
ঘনিষ্ঠতা কব! সাধুদের রীতি ও নীতি বিরুদ্ধ । এখানে কমিশনার সাহেবের 
পরবতাঁ আঁচরণে তারই সন্ভাবনাব আভাস পেষে বালাঘন্দ উদদ্বগ্ন হরে ওঠেন 
এবং রাত্রির চতুর্থ প্রহরে তার সঙ্গীদের তাড়া দিয়ে তুপে অমর-কণ্টকের ছূর্গম 
অরণা-পথে যাত্বা করেশ। 

বালানন্দের প্রতি উদীনী সাধুদ্ধয়ের এখন আস্বা ও বিশ্বাসের আস্ত নেই । 
পথে যেতে যেতে জংলী বাবা বললেন £ সাধু বাবা, আপনি ত নীলকণঠ 
হয়েছেন । শুনেছি, বিশ্বনাথজী বিষপান কষে বিশ্বসংসরি রক্ষা করেছিলেন 
আপনিও আমাদের সন্কটের সময় বিষ ভোজন করে মুস্কিল আসান করেছেন । 

সনকজী বললেন £ আঁপনি যা করেছেন, তা অলৌকিক । এমন করে 
বিষ খেয়ে হজম করতে কাউকে দেখিনি । 

বালানন্দন্্রী শুধু একটি কথা বলেই খব সমস্যার সমাধান করে দিলেন £ 
ও-ব্যাপারে আমার বাহাঁছুরী কিছু ছিল ন1-_সবই নর্দা মায়ীর ককপা| 


১১৫ ঝাড়খণ্ডের ধষি 


কিন্ত নর্শদামায়ীর প্রতি উদাসী সাধুদ্বয়েব আস্থা তেমন গভীর নয় বলেই, 
তার] শুধু বালানন্দের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকেন। বরাবরই তার! 
সাধুজীকে একাই দেখেছেন-নর্দা মায়ী সেখানে কখন তাকে কপা করতে 
এসেছিলেন ? 

এরপর তারা সাহেবের প্রসঙ্গ তুলে বললেন £: সাহেব যখন সকালে 
জানতে পারবে, আমরা রাতারাতি সরে পড়েছি , তখন তাঁর মনে কিভাব 
হবে সাধুজী ? রাগ করবে, খুশি হবে, না--আমাদের ভল্লাশে লোক পাঠাবে ? 

বালানন্দ বললেন £ আমার মনে হয়, সাহেব একটু ক্ষুপ্ন হবেন। সকাল 
হলেই তিনি আসতেন আমাদের স্থানে । খুব চেষ্টা করতেন, আমরা যাতে 
সাহেবের কথামত তার সঙ্গে মহারাজপুরের সদরে যেতে সম্মত হই | সাহেবেৰ 
সে অন্থুরোধ আমর! রাখতে পারব ন1 বলেই ভ রাতারাতি এভাবে জঙ্গলের 
সদরে চলেছি । 

জঙ্গলের সদর ওনে তুই সাধুই হো হে৷ করে ছেসে উঠলেন। বালানন্দ 
বললেন : হাসি নয়, ভোর হলেই দেখবে, আমরা যেখানে গিয়ে পৌছেছি, 
কিরকম জববু জঙ্গল সেটি । জনপদের সদর বলতে যেমন সের! স্বানকে 
বোঝায়, জঙ্গলের সদর বললে তেমনি জবর রকমের জঙ্গল বুঝতে হবে । পরে 
দেখলেইদ“চোখে মনে চমক লাগবে | 

ভংলীবাব1 জিজ্ঞাসা করলেন £ চমক লাগুক ক্গতি নেই, কিন্তু আমাদের 
রলদ মিলবে ত? যেরসদ কাছে আছে, একখানা করেও কাটি আমাদের 
ভাগে পড়বে না। 

বালানন্দ একটু বিরক্ত হয়ে বললেন £$ তোমাদের খালি খাবার চিন্তা । 
কিন্ত বারবার আমি বল্গছি, যে মায়ীর না নিয়ে পরিক্রমায় বেরিয়েছি, তাঁর 
ওপর যদি সত্যই বিশ্বাস থাকে, তার কপার উপব যদি নির্ভর করিতে পার, 
তাহলে খানের জন্য ভাবতে হয় না--তিনিই যুগিয়ে দেন । 

অংলীবাব| বললেন £ ব্াস্‌ - এবার তাহলে মায়ীর কপার দিকে তাকিয়ে 
আমর! নিগের! কোন চেষ্টাই আর করব না। 

সকাল হতেই দিনের আলো আস্তে আস্তে সেই নিবিড় বনানী মধ্যে 
প্রবেশ করতেই তারা বুঝতে পারলেন, অজ্ঞাত পথে নুতন কোন গভীরতম 
'ুরগোর পাদদেশে তারা এসে পড়েছেন । অদুষ্টপুর্ব সেই মহারণোর 


যৌবনে ১০৩ 


ভীতিপ্রদ নিদর্শন দেখে জংলীবাব! সভয়ে বালানন্দজীকে জিপ্ঞাসা করলেন £ 
দেখছেন, কি রকম ভীষণ অরণ্যের সামনে এসে পড়েছি । এখন কি 
করবেন ?£ মহাবনের মধ্যে আমরা সেধুবো৷ নাকি ? 

গন্তীরমুখে বালানন্দজী বসলেন £ নিশ্চয়ই | একটু আগে বলছিনে 
না__মায়ীর উপর নির্ভর করে তার কপা পরীক্ষা করবে? সামনে এখন 
মহাবন দেখে পেছুলে চল্বে না ত। মনে কর-_নর্শদা মায়ীরই এই খেল! । 
নির্ভর যখন করেছ, তাঁকে স্মরণ করে এগিয়ে চল-ভয় কি? এমনই ভরস্কর 
বনে পরিক্রমা কবেই ত আনন্দ-_জাননা, ভয়ঙ্করের ভিতরেই মনোরম সৌন্দর্য ! 


চাঁর 

তরগ্ম অরণ্যের ভীষণ জপ দেখে বালানন্দের অন্তর পরমালন্দে বিহ্বল 
হয়ে উঠে। হাতের যষ্টির দ্বারা চলার পথের বাধা সরাতে তিনি যেমন 
এগ্ডতৈ থাকেন, তার দুই সাথীকেও সাহায্য করেন। কোন কোন স্থানে 
গাছের শুক্ত শাখাটিংক সবলে নত করে নিজে এনিয়ে এসেই সাধীদের 
আসবার জুবিধার জন্ম স্থানটি অতিক্রম না কর! পর্যন্ত সেই শাখাটিকে 
আয়ত্তে রাখেন ; তাবপর তাকে মুক্তি দিতেই হস্চ্যুত শাখাটি সশবে তার 
স্থানটি আবার অধিকার করে । এইভাবে বাধার পর বাবা সরিয়ে অনুমবণকারী 
দুই সাথীকে নিয়ে অগ্রগাতী হন-তার উৎসাহ ও বন-পর্ধটনের কৌশল 
দেখে বিস্ময় ও লজ্জায় সাখীবা অভিভূত হয়ে পড়েন। ময় সময় তারা 
এগিয়ে যাবার জন্য আগ্রহান্ষিত হন, কিন্ত বালাণন্দ বাধা দিযে বলেন £ এতে 
লজ্জা পাবার কিছু নেই, এভাবে জঙ্গল ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেও শিক্ষার 
অনেক কিছু আছে; আমি যেভাবে এগিয়ে চলেছি, পেট] লক্ষ্য করে চলতে 
থাক, এ থেকেই অভিজ্ঞ হয়ে উঠবে । 

এমন গভীর সেই অরণ্য যে, মধ্যাহ্নকাল অভীত হ'লেও পত্রবল্লরীব 
আচ্ছাদনী ভেদ করে সুর্যালোক প্রবেশের উপায় নেই। একটানা দীর্ঘ 
পর্যটনেও বালানন্দের দেহ মন ক্লান্তিহীন, কিন্তু হই সাথী একেবারে অবসন্ন 
হয়ে পড়েছেন , এখন কিছু আহার্ষের ব্যবস্থা না হ'লে তাদের পক্ষে 
একপদও অগ্রসর হওয়া কঠিন। তাদের সঙ্গে একবারেব মত সামান্য 
পরিমাণ যে খাগ্ঠদ্রব্য আছে, তাই পাক করে ক্ষুধানল শান্ত করতে চান। 


১০৪ ঝাড়খণ্ডের খ্ষি 


বালানন্দ বললেন * পরিগ্রম। সম্বন্ধেও কতকগুলি নিয়ম কানুন আছে। 
সারাদিন অবিশ্রাস্তভাবে পথ চলবে ; তবে যদি অত্যন্ত ক্লাস্ত হ'ও, একটু 
বিশ্রাম ও জলপান করতে পার । কি গৃহীর মত পাকের ব্যবস্থা! সন্ধ্য।র 
আগে কিছুতেই হতে পারে না। অপরাহছের দিকে এমনভাবে হিসাব করে 
পথ চলতে হবে- সন্ধ্যার মুখেই যেস্থানে আমরা গিয়ে পৌছাব, (সখান থেকে 
লর্মদামায়ী যত দ্ুরেই থাকুন না কেন--যেন সেই স্থানাটির অবস্থিতি ঠিক 
সামনে বলেই অনুমান করা চলে অর্থাৎ সেখান থেকে সোজা চলতে 
আরম্ত করলে মদীতীরে পৌছানে! সম্ভব হবে । 

বালানন্দের এই আপত্তি শুনে জংলীবাব! সবিনষ্টঘ জানালেন 2 এর পর 
আমব] নিয়ম কান্ধন মেনে চলব, কিন্ত আজ এখানেই যাঁতে পাকের ব্যবস্থা! 
করতে পারি, সাধুজী মেই রকম কোন ব্যবস্থা দিন কপা করে--আমর! 
একেবারে আতুর হযে পড়েছি । 

বাগানন্দজী সহান্যে বললেন । তাহলে ধর্ধশাস্রের ব্যবস্থাই তোমাদের 
সহায় হোক। শাস্ত্রে আছে_- 

আতুরে নিয়মে নাস্তি বালে বৃদ্ধে তখৈবচ | 
কুলাচাররতে, চেব এষ ধন: সনাতনঃ ॥ 

অর্থাৎ---আতুর অবস্থায় নিয়ম নেই, বালক ব্বদ্ধদের সন্বদ্ধেও এই কথা। এ 
ছাড়াও ধার। কুলাচারের মধ্যে, তাদের পক্ষেও নিয়ম না মেনে চলায় দোষ 
নেই। এ হচ্ছে সনাতন ধর্ধের ব্যবস্থা । তোমরা দুজনেই যখন পথশ্রমে 
কাতর হয়ে পড়ছে, তখন আতুৰ বলেই ধরা গেল। বেশ, কাছাকাছি 
কোথাও জল যদি পাও, সেইখানেই ভোজনেব ব্যবস্থা কর! আমিও তাহলে 
নিশ্চিন্ত হয়ে ধ্যানে বসি। 

জংলীবাবা ও সনকজী উত্তয়েই অদ্কুরোধ করতে লাগলেন, বালানন্দজীও 
লিয়ম ভঙ্গ করে তাদের সঙ্গে ভোজনে বসেন । কিন্তু বালানন্দ সহাস্তে সে 
অঙ্নুরোধ উপেক্ষা করে বললেন: আতুর হলে আমিও তোমাদের সঙ্গে 
ভোজন করতাম; কিন্তু দেখতেই পাচ্ছ ত, আমার দেহে বা মনে কিছুমাত্র 
ক্লান্তি আলে নি। আমার জঙ্বা তোমরা উদ্বিগ্ন হয়ো না, নিজেদের ভোজনের 
পর্বটা তাড়াতাড়ি সেরে নাও । 

একথা বলেই বালানন্দ্জী ভূমির উপর দক্ষিণ কানটি কিছুক্ষণ রেখেই 


ঘৌবানে ১০৬ 


সহর্ধে বললেন : কাছেই ঝর্ণা আছে--পাহাড় থেকে জঙ্গ পড়ছে, তার 
আভাস পাচ্ছি। 

এ-অন্পসমান যে সত্য, অগ্ন অন্বেষণেই মেটা জানতে পারা গেল। 
জঙ্গলের এই অংশে অনুচ্চ একটি পাহাড় চারদিকে গাছপালা ও বন্যলতায় 
আবৃত হয়েছিল, তারই একটা অংশ ভেদ করে অবিরাঁয গতিতে জলধার! 


নিঃস্থত হচ্ছিল | সেই অলে তার! তৃপ্তির সঙ্গে অবগাহন করলেন এবং 
তাদের সঙ্গে দলের যে পাত্র ছিল, ভরে এনে পাকের আয়োজন করতে 
লাগলেন । ওদিকে বালানন্দজী দুটি আতুর আত্মার ক্ষুমিব্ত্তির উপায় হচ্ছে 
জেনে প্রসন্ন মনে ধ্যানে বসলেন। 

অরণ্যের যে অংশে তাঁরা আশ্রয় নিয়েছেন, সে স্থানটি অনেকটা ফাকা ; 
কিছু দুরে বড় বড় কতকগুলি গাছের শাখা-প্রণাথা গায়ে গারে মিশে এক 
শ্রেণীর বড় বড় পাতা বহুল লতায় আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িত হয়ে চন্দ্রাতপের মত 
বীচের স্থানটিকে এমনভাবে আব্বত করেছে যে, আকাশের আলোও বিকীর্ণ 
হবাব পথে বাঁধা পাচ্ছে। এজন্য স্থানটি বেশ মনোরম, আহার, বিশ্রাম 
এবং ধ্যান-ধারণার পক্ষে একান্ত উপযোগী । বালানন্দ একটা গাছের গীঠে 
প্লীঠচ রেখে ধ্যানে বসলেন । জংলীবাবা ও সনকজী তাদের ঝোলা থেকে 
আট বা'র করে আহার প্রস্তত করতে প্রবৃত্ত হলেন । 

খানিকটা স্থান ফাকা হলেও, আশে পাশে জঙ্গল । সেদিকে কিছু শুকনে। 
কাঠ দেখতে পেয়ে জংলীবাবা ইন্ধন দেবার উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করতে গেলেশ। 
গাছটি শষ অবস্থায় সেখান পড়েহিল। তার একটা শাখা ধরে টানতেই 
পরিচিত একটা ভীষণ তর্জন শোন] গেল, সঙ্গে সঙ্গে প্রকাণ্ড একটা গোখরো 
সাঁপ ফণা উদ্যত করে উঠল । একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে জংলীবাবা সলচ্ছে 
পিছিয়ে এলেন ; সনকজীও চীৎকার করে উঠলেন _মহারাজ, কাল সাপ। 

সাঁপটা তখন ক্রোধে গর্জন করতে করতে হুলছিল। যদি এগিয়ে এসে 
আক্রমণ করে--পালাবার পথ নেই, চারদিকেই নিবিড় জঙ্গল, ঝোপ-ঝাপ। 
সাপের দ্লষ্টিও যেন তাদের দুজনকেই অভিভুত করে ফেলেছে । এত বড় 
সাপ এই ভ্রাতের-এর আগে তারা দেখেন নি, মনে হতে লাগলো --স্বতুযু 
করাল মৃতি ধরে একবারে সামনে উপস্থিত। 

আশ্চর্ব কাণ্ড। সহসা সাপটা তার সেই ভীষণ ফণা অন্সদিকে ফিরিয়ে 


১০৬ ঝাড়খণ্ডের ঘি 


নিজের দেহটাকে কুগুলীবদ্ধ করতে লাগল । পরক্ষণেই একট নেউলও গর্জন 
করতে করতে সাপটার মুধোমুখ। হয়ে যেন তাকে সংগ্রামে আহ্বান করল। 
যেমন প্রকাণ্ড সাপ, নেউনাটও তেমনি বৃহদাককৃতি, সচরাচর এত বৃহৎ নেউল 
দেখা যায় না। নির্বাক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে তারা সাপ ও নেউলের 
অদ্ভুত সংগ্রাম দেখতে লাগলেন । এমন কি, উভয়ের তর্জনের আওয়াজ 
শুনে বালানন্দজীও এই দঁশ্য দেখছিলেন। তার কেবলই মনে হচ্ছিল - 
নর্মদামাধীর কপার কখা * তাৰ ভক্তদেন বিপন্ন অবস্থা জেনেই এই আশ্চর্য 
লীল। দেখালেন | তিনি এই জাতের সাপগুলেকে চেনেন, শুধু ফণা তুলেই 
এরা ভয় দেখিয়ে নিরস্ত হবার পাত্র নয়, আততায়ীদের অবস্থা বুঝে 
বিদ্বাথবেগে এগিয়ে আসে, দংশন করেই বিষ ঢেলে দেব! এখন এই 
নেউলটিই আকস্মিকভাবে এসে এদের ছ্ুজনকে পক্ষা করল । বালানন্দজী 
বিশুগ্ধচিত্তে নর্শদামায়ীকে তাব এই কপাব অন্ত আঁবাব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ক'রে 
প্রণতি ভ্বানালেন | 

ওদিকে একটি ঘণ্ট। ধরে চলল এই প্রচণ্ড সংগ্রাম । একদিকে নকুলের 
অদ্ভুত কৌশল ও চতুরতা, অন্যদিকে প্রচণ্ড গোখুব সাপেব শক্তি ও বিক্রম-_ 
ক্ষণে ক্ষণে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে লাগল | হঠাৎ সাপটা তাব সমস্ত দেহ 
দিয়ে নেউলটিকে আটে পৃষ্টে জডিযে ফেলল, কিন্ত একট্র পবেই বিচিত্র 
কৌশলে নেউলটি সে মর্প-বন্ধন এখকে নিজেকে মুক্ত কবেই সাপটার উপর 
প্রবলবেগে ঝাপিয়ে পড়ল । অবশেষে সাপটাই ক্রমশঃ নিবাঁধ হয়ে পড়ল, 
আর নেউলট। যেন মবিয়! হয়ে উঠে তাকে বারবার আক্রমণ করতে লাগল । 
এর ফলে আাপটাকে স্ৃতকল্প অবস্থায় দেখে বালানন্দজী ঘন ঘন করতালি দিয়ে 
নেউলটাকে ধলতে লাগলেন ; সাবাস্‌ | বছৎ খুব, আবি ভাগো। 

নেউলট] একবার ঘাড় তুলে শঙ্খ লক্ষ্য করে তাকাল--এতক্ষণ ভার সমগ্র 
লক্ষ্য সাপটার উপধ্ কেন্দ্রীভূত হয়েছিল । কি ভেবে উল্লানে কি বিষাদে 
কে জানে, নেউলট। বিজয়গর্ধে বনের মধ্যে প্রবেশ করল এক অপরূপ চালে। 

এতক্ষণে দুই সাধুর উত্সাহ স্ফুরিত হয়ে উঠল ' উভয়েই তাদের লাঠি 
নিয়ে মরণাপন্স সাপটাকে হত্যা করতে এগিয়ে গেলেন । কিন্তু তৎক্ষণাৎ 
ব/গানন্দজী বাধ! দিয়ে বললেন £ করছ কি? মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘ1 দিয়ে 
কোন লাভ «নই | প্রথমেই যখন ফণা তুলে উঠেছিল তখন ভোষাদের এ 


যৌবনে ্‌ ২৪৯ 


বিক্রম কোথায় ছিল £ নর্মদামায়ীর ওপর নির্ভর করেছিলে বলেই, সাক্ষাৎ 
মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে গেছ । এখন আবার হিংসারৃত্তিকে প্রশ্ীয় দিচ্ছে? 
সবে এসো। ওর প্রতি আমাদেরও কর্তবা আছে । 

বলতে বলতে বালানন্দজী ভার ধ্যানের আসন থেকে উঠে মুমুযু সাপটার 
কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে ছৃ' হাতে ভুলে ধ'রে ফাকা জায়গায় আনলেন । 
সাপটা তখন লঙ্কা! হয়ে শুয়ে পিটপিট করে তার উদ্ধারকর্তার পানে তাকাচ্ছিল, 
এ দৃষ্টি শান্ত, সেই অগ্নিবরী দৃষ্টি কোথায় অদ্নৃশ্য হয়ে গেছে। তিনি একবার 
বনের দিকে ভাঁকালেন, তারপব দ্রুত গতিতে একটা গাছ থেকে গোটা কতক 
পাতা ছি'ডে এনে হাতের চাপে তার রস বা'র করে সাপটার আহত স্বান- 
গুলিতে প্রলেপের মত করে মাখিয়ে দিতে লাগলেন । সাথী সাধু হৃ'্জন 
অবাক বিশ্ময়ে সাধুজীর এই অদ্ভুত কা দেখতে লাগলেন । 


পাঁচ 

বালানন্দেব পরিচর্যায় স্স্থ হোলেও সাপটিকে আর হিংসাচারে প্রবৃত্ত 
হোতে দেখা গেল না, যতক্ষণ তিনি তাকে আয়ত্তাধীনে বেখেছিলেন, 
একটিবারও সে ফণা উগ্ভাত করে নি-বরাবর বিষহীন সাপের মত মাটির 
উপর মাঁথাটি নত কবে একই ভাবে পড়ে থাকে । স্বামীজীর ইচ্ছা! বেচারাকে 
কিছু খেতে দেন; বললেন : দুধই এর পক্ষে এখন সু্পথ্য। 

জংলী বাবা বললেন : কাছে যদি লোকালয় থাকত, লোট! নিয়ে গ্রাম 
থেকে দুধ চেয়ে আনতাম। 

সনকজী সহান্যে বললেন : এক সাধু এসেছেন, তিনি গোখবা সাপ 
নিয়ে খেল! করেন-_তার জন্য দুধ চাই। একথা শুনলে গাঁয়ের লোক সব 
ছুটে আসত তামাশা দেখতে । 

বালানন্দজী বললেন: কাজ মনেই বাপু অত হাঙ্গামীয়, তার চেয়ে 
জঙ্গলে চলে যাক। 

এরপর তিনি ধীরে ধীরে হাতের তালি দিতেই সাপা্টি যেন তার অভিপ্রায় 
বুঝতে পেরেই আস্তে আন্তে অদুরব্তাঁ জলের মধ্যে প্রবেশ করল। 

ছুই সাধুকে লক্ষা করে বালানম্দ বললেন £ তোমাদের ভোজন ব্যাপারে 
আজ ক্রমাগত বিদ্ব পড়ছে, দিনও শেম হয়ে আসছে । এখন আত্বাকে তৃপ্ত 


১০৮ | ঝাড়খণের খষি 


করবার জন্য তির কর। এ ব্যাপারটি ইচ্ছা! করলেই ঠিক মিলে না_ 
বিধাতার ইচ্ছা হোলে তবে জোটে । 

ভোজের তদবির করভে করতে জংলীবাবা হাসতে হাসতে বললেন £ 
গুরুভ্রী, আপনার নর্মদামারীর ইচ্ছাতেই এসব ব্যাঘত ঘটেছে । আপনি পণ 
করে বসে আছ্ন--সন্ধ্যার আগে কিছুতেই ভোজন করবেন না। এখন 
যে অবস্থ] দেখছি, সন্ধ্যার আগে পাকও হয়ে উঠবে না। 

তর্গম অরণ্যপথে পরিক্রমার ফলে সকলেই ক্লান্ত হয়েছিলেন, সেজন্ত এই 
স্থানেই রাত্রিবাস করবেন স্থির থাকে । বালানন্দজী তাপ অভাস্ব কৌশলে 
নর্নদার অবস্থিতি সন্বন্ধে যে অনুমান করেন, কখনো। তা ব্যর্থ হয় না। 
অপরাহ্ছের দিকে দুই সাধু আহাধ প্রস্তুত করতে তৎপর হলেন । বালানন্দজী 
উদাত্তকঠে স্তোব্রপাঠ করে তাদের অন্তরে উৎসাহ সঞ্চার করতে লাগলেন । 

নিকটে ঝরণ থাকায় তাদের বন্ধন ও স্নামাদিব বিশেষ স্থবিধা হলো। 
সন্ধার পর মন্ত্র গপ এবং নর্মদ| দেবীর অনা করে সাধুর ভোজনে বসলেন ! 
আয়োজন সামান্য ; আটার মোট। মোটা ক্লাট এবং কিছু ভাজি--পর্ধটনের সময় 
বন থেকেই এরা শাক সজী মংগ্রহ করেছিলেন । বালনিন্দজীকেও ভোজ্যাংশ 
গ্রহণ করতে হলো, তার অংপত্তি এখানে টিকল না। 
” ভোজন করতে করতেই জংলীবাবা বললেন : আমাদের পু'ভজিপাট। সব 
শেষ হয়ে গেল। এই ভীষণ অরণ্য অতিক্রম করে গোঁকালয়ে যেতে না 
পারলে এক মুঠি আটাও মিলবে ন]। 

বালানন্দ শহাশ্যে বলপেন ১ মিলাবার মালিক ঘিনি তাকে জানাও | 
শর ইচ্ছ। হলে এই মহাবনের মধ্যেও তোমাদের ক্ষুধা শাস্তির ব্যপস্বা হবে। 
পরিক্রমায় যখন বেবিয়েছ, মায়ীর ওপর বিশ্বাস রাখ, যেমন করেই হোক তিনি 
অব স্ুসার করে দেবেন। 

চারদিকে জঙ্গল, মাঝখানে কিছুটা স্থান ফাকা_-যেখানে এদের আসন 
আন্তৃত হয়েছে । বালানন্দজী আসনের গানেই এক ধুনী জ্বলছে | ফীকা 
স্বানটুকুর চার কোণে আরও চারটি অগ্রিকুণ্ড জ্বেলে স্থানটিকে যতদুর সম্ভব 
সুরক্ষিত কর। হয়েছে । তথাপি অংলীবাবা! ও সনকজীর আতঙ্কের অন্ত নেই । 
যর্দিকোন হিংঘ্ শ্বাপদ এসে হাল দেয়, কিনব! তখনকার মত কোন বিষধর 
সাপ এসে ফণ। তুলে দাড়ায় । 


যৌবনে ১০৯ 


তাঁদের আতঙ্ক দেখে বালানন্দজী মুখ টিগে হাসেন । ভাবেন, তথাপি 
এর প্রশী শক্তির উপর নির্ভর করতে পারছে লা। তাঁদের মনে বিশ্বীস 
দলটি করবার উদ্দোশ্টে বালানন্দ বললেন £ একটা গল্প বলি শোন, বানানে! 
নয়, বান্তব। বহর ছয়েক আগের কথা, সেবার আমার গুরুজীর সে 
পরিক্রমা চলেছে । একটা জঙ্গলের মুখে একদল সাধুর সঙ্গ পাওয়া! গেল, 
তারাও পরিক্রমায় বেরিয়েছিলেন । তাদের মধ্যে এক সাধুর আবার আফিম 
খাওয়ার অভ্যাস ছিল। তার ঝোলার মধ্যে যথেষ্ট আফিষয ছিল। কিন্ত 
বনের পথে একদল ডাকাত তার ঝোল|টি লুঠ করে নিয়ে যায়। এদিকে 
আফিম অভাবে তাঁর ম্বৃতকল্প অবস্থা-দলের সাধুদের সঙ্গে সমান ভালে 
চলতে পারছিলেন না। তাঁর অবস্থা দেখে আমার গুরুজীর দয়া হলে! 
সেই আফিমখোর সাধুটির প্রতি । আমাকে বললেন--তুমি ত জোয়ান 
ছেলে, তোমার কাধের ওপর একখানা হাত রেখে দেহের ভারট] চাপিয়ে 
উনি চপতে থাকুন । আমি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে এগিয়ে গেলাম । আফিম 
না খতে পেয়ে তিনি তখন অস্থির হয়ে পড়েছেন, তার হাত পাঠক ঠক 
করে কাপছে তথন। আমি একট] হাত টেনে নিয়ে কাধে বেখে বললাম--. 
আঁপনাঁর দেহের সমস্ত ভার আমার ওপর চাপিয়ে দিন, আমি ভার বছে 
নিয়ে যেতে পারব । আমার দেখাদেখি আর একজন যুবক সাধু এগিয়ে 
এসে তাঁর আর একখানা হাত নিজের কাধের উপর টেনে নিলেন। সাধু 
কোন রকমে এগিয়ে যান, ঘন ঘন হাই তোলেন, আর আর্তস্বরে নর্মদা- 
এয়ীকে ডেকে তর করুণ] ভিক্ষা করতে থাকেন | তার সেই আহ্বান 
শুনে আমিও যেন একটা উপায় পেলাম, সঙ্গে সঙ্গে কাতরকণ্ে ডাকতে 
লাগলাম নর্রদামায়ীকে মনে মনে। এইভাবে আমরা অনেকখানি পথ 
এগিয়ে এলাম তাকে এ ভাবে নিয়ে। কিন্তু লক্ষা করলাম, সাধু ক্রমশঃই 
অবসন্ন হয়ে পড়ছেন । এমনি সময় এক অদ্তুত ব্যাপারে আমর] সকলে 
সচকিত হয়ে উঠলাম । আমাদের আগে আগে বারা যাচ্ছিলেন, আর 
মাঝে মাঝে ফিরে ফিরে আফিয অভাবে ভেঙ্গে পড়া সাধুটিকে দেখছিলেন - 
হঠাৎ তাদের ভিতর থেকে উল্লাসের সুরে একটা কলরব উঠল: আফিম, 
আফিম ! আফিমের নামে আমাদের অঙ্গের মৃৃতকল্প সাধুটিও যেন উল্লাসে 
নেচে উঠলেন। পরক্ষণে দেখা গেল, পথে একটা আফিমের কৌটা পাওয়া 


১১০ ঝাড়খণ্ডের ঘি 


গেছে, তার মধ্যে আফিমের যে ডেলাটি রয়েছে ত্ু'ভরির কম নয়। আফিষ 
দেখে সাধুর কি আনন্দ- বুঝি মনের অবসাদ কালাচাদ দর্শনেই অনেকটা 
হাস পেল। তিনি কিন্তু করলেন কি--ষে পরিমাণ আফিম খেতেন, 
আন্দাজ করে সেইটুকু নিয়েই সেবন করলেন, তারপর আর একবারের 
মত এক ডেল রেখে বাকি আফিম শুদ্ধ ডিবাটি_ যিনি পথে কুড়িয়ে 
পেয়েছিলেন, তার হাতে দিয়ে বললেন - নর্মদাষায়ীর দেখ। যেখানে পাবে, 
তুমি এই ডিবাটি তার জলে ফেলে দিও--মাযের দেওয়া জিনিষ মায়ের 
কাছেই থাক। 

তার কাও দেখে অলেকে নিষেধ করলেন: বললেন -পথে যখন 
পাওয়া গেছে, জলে ফেলে দিতে বলছ কেন, এরপর আবার কোথায় পাবে? 

সাধু বললেন ৫ এ মায়ীই আবার যোগাবে । ওর নাম নিয়ে যখন পরিক্রমা 
করতে বেরিয়েছি, সব দায় যে রই । আমার যেটুকু দরকাব ছিল, তাই 
নিয়েছি । বেশী নিলে উনি ভাববেন- লোভী ছেলে | 

ত্র কথামত এর পর নর্ণদ তীরে উপস্থিত হব মাত্রই আফিমের ডিবাটি 
নর্মদার জলে ফেলে দেওয়া হয়| তাঁর মুখে বা মনে কোনপ্রকার বিকাৰ 
দেখা ধায় নি। রাত্রিটা নর্শদাতীরে কাটিয়ে পরদিন যাত্রাপথে আমরা একটা 
গঞ্জের কাছাকাছি আসতেই সেই অহিফেনসেবী সাধুর এক ব্যবসায়ী শিশ্ত 
এসে আমাদের পথ রোধ করলেন। তার একান্ত ইচ্ছা, দলের সমস্ত সাধুদের 
সম্মানের জন্য এক ভাণ্ডার দেশ। অনেক বাদানুবাদের পর স্থির হলো, 
নর্মদ1 তীরবতাঁ দেবালয়ে তিনি সাধুদের সেবার ব্যবস্থা করবেন । দীর্থ বন 
পর্টনের পর এভাবে ভক্তের উদ্যেগে ভাগ্ারার ব্যবস্থা হওয়ায় পর্যটনকারী 
দলটি খুবই সন্তষ্ট হলেন। সেই সাধুই এক সময় দলের সকলকে একটি বড় 
ডিবা দেখিয়ে বললেন নররদামায়ীর কপা দেখ | আমার এ শিশ্ত এই ডিবার 
ভিতর এত আঁফিম দিয়াছেন যে, সম্বংসরের মধ্যে আর আফিমের জন্য ভাবতে 
হবে না| নর্দামায়ীর উপর বিশ্বাস রাখলে কোন ভাবনাই থাকে না। 

গল্পটি শেষ করে বালানন্দজী বললেন-_-আমার জান! ঘটনা এটা, বানানে! 
নয়। আর, আমিও সেই সাধুর মত নর্মদাঁমায়ীর উপর সমস্ত ব্যবস্থার ভার 
দিয়ে এই পরিক্রমায় নেমেছি ৷ তাঁই বলছি, তাঁকে স্মরণ কর-_তাঁর কপ! 
হোঁলে কোন বিপদই আমাদের অনিষ্ট করতে পারবে না) 


যৌবনে ১১১ 


যাই হোক, রাতট। কোন ভাবে কেটে গেল। হিংল্র শ্বাপদের শুভাগষন 
না|! হোলেও, তাদের তর্জন গর্জনের ধ্বনির বিরাম ছিল না। নর্মদামায়ীর 
কপা-মাহাত্ব্য কীর্তন করে বালানন্দজী নিশ্ুন্ধ হন ভার অভ্যাসমভ | কিন্তু 
ঘন ঘন বাঘের হঙ্কারে জংলীবাবা ও সনকজী উভয়েই শিউরে শিউরে 
উঠছিলেন সার] রাত, সুনিদ্রা একেবারে হয় নি । 

প্রভাতে বালানন্দজী দুজনকেই বললেন ১ হিংঅ্র পশুর ভয়ে তোমর! 
ঘুমাতে পার নি আমি জানি। তোমাদের ভয় ভেঙে দেবার অন্য আমি 
সেই বাস্তব গরটি শুনিয়েছিলাম, কিন্তু তবু তোমর] আশ্বস্ত হতে পারনি | 
যাই ধোঁক, আরও কিছুদিন আমার সঙ্গে থাকলে তোমাদের ভয় ভেঙে যাবে, 
আর মায়ীর উপর বিশ্বাসও দৃঢ় হবে । 

জংলীবাবা বললেন £ দেখুন সাধুজী, জঙ্গলে ঘোরাঘুব্ি আমিও অনেক 
করেছি, আর অনেক কিছু দেখেছি । কিন্তু এবার আমরা এমন একটা 
জঙ্গলে মে ধিয়েছি, যেখানে স্থযোগ সুবিধা কিছুই নেই, ঘে দিকে তাকাই-_- 
খাপি বন আর বন, (ঘন এর কুল কিনার] নেই-_মহাঁধাগরের নত অসীম । 

বালানন্দ বললেন ; এই মহাবন পরিক্রমা করেই ভ আঁনন্দ। এরই 
মধো তোহর। মহামারীর পরম মাহাত্য, তার লীলার রহস্য জানবার সুযোগ 
পাবে | ভয়।লকে দেখে ভয় না পেয়ে তার কাছে এাগয়ে যাওয়াই ত সাধক 
জীবনের পরম সংকেত, এতেই ত সার্থকতা সব দিক দিয়ে। এই পথেই 
আণন্দের পদধবনি শোন যায়| আর যদি তোমাদের মনে আতঙ্ক হয়, 
সন্দেহ জাগে, আনি তোমাদের সুখিধার জন্ত অন্য পথও দেখিয়ে দিতে পারি, 
যাতে সত্বর লোকালয়ে উপস্থিত হতে পার । 

উভয় সাধুই এখন স্ব স্ব চিত্তকে সংযত করে দ্ঁচস্বরে জানালেন £ না, 
না, আমর] আপনার সঙ্গ কিছুতেই ত্যাগ করব না- আপনার সঙ্গে এই 
মহাবনের রহস্য দেখে ধন্য হব। 


ছয় 

কিন্ত এর পর প্রায় সমস্ত দিনটা সেই বনের আরও অনেকখানি দুর্গসতম 
'ংশ পর্যটন করে তাদের মনে এমনি নৈরাশ্বের সঞ্চার হোতে লাগল ধে, 
নুতন রহস্যানুমদ্ধানের আকাঙ্ক্ষা! তার আবর্তে কোথায় যেন গুলিয়ে গেল! 


১১২ ধাড়খণ্ডের ধষি 


উভয়ের সঞ্চিত খাগ্ঠ পুর্ধদিনেই নি:শেষ হয়েছিল , বনপথে যেতে যেতে 
চারদিকে সন্ধাণী দৃষ্টিতে তাকিয়েও ভক্ষণযোগ্য কোন প্রকার ফল মূল পাননি 
--কোন কোন গাছে অপরিচিত কিছু কিছু ফল অপক্ক অবস্থায় দেখতে পেয়ে 
পরমাগ্রহে সংএহ করেও শেষ পধন্ত হতাশ হতে হল। সে-দব ফল এমনি 
তিক্ত বা কষাঁয় যে, কার সাধ্য গেগুলির রপসাস্বাদন করে! অরণ্যের অজ্ঞাত 
ফল ভক্ষণ করতে বালানন্দজী পুনঃ পুনঃ নিষেধ করলেও এর! ভুজনে ক্ষুধার 
তাড়নায় তাকে গোপন করেই এই শ্রেণীর অখাগ্ক ফল সংগ্রহ করে শেষে 
হতাশ হল। 

বালালম্দজী এদের অবস্থা দেখে এক সময় বিরক্তির সঙ্গেই বললেন : 
ভোজনের দিকে তোমাদের যখন এত লালসা শহর থেকে বেশী রকম খাস্ঠ 
সঞ্চয় করেই তোমাদের উচিত ছিল বনভ্রমণে আসা । এইজন্তই আমি 
বলেছিলাম, তোমরা গ্রামের পথ ধরে যাত্রা বদল কর। অস্ত পথ ধরলে 
তোমরা সম্তবত: এতক্ষণে কোন গ্রামের কাছাকাছি যেতে পারতে, সেখানে 
খাস্ভেরও সন্ধান পাওর। হয়ত সম্ভব হোত | 

জংলীবাবা রক দি স্বাম'জীর মুখে নিবদ্ধ করে শুফ্ষস্মরে জিজ্ঞাসা 
করলেন : আপনার মনে কি কিছুমাত্র খাবার লালসা হয় নি, গুরুজী-_ক্ষুধা 
কি আপনাকে কাতর করে তোলেনি, সত্য বলুন--চাপবেন না। 

এরূপ প্রশ্রে রাগ হবার কথা, কিন্তু তেমনি মুদ্ধু হেসে স্বামীজী বললেন : 
আমার মুখের পানে চেয়ে দেখলেই তোমার কথাব জবাব পাবে । আমাকে 
কি তোমাদের মত ক্লান্ত এবং আর্ত মনে হচ্ছে? প্রভাতে যেষন দেখেছিলে, 
চতুর্থ প্রহরেও আমি কি ঠিক সেই অবস্থায় নেই? নিজের মুখ নিজে ন 
দেখতে পেলেও আমি ঠিক আছি, তার কারণ--যখন পরিক্রমা! করি, আমি 
শুধু মনে মনে মায়ীকে চিত্ত! করি, ক্ষুধার কথ! কখনো ভাবি না, তাই সেও 
প্রশ্রয় পায় না। 

সনকর্জী জিজ্ঞাসা করলেন £ কিন্ত আপনি ত বলেন গুরুজী, দিন শেষ 
হলেই আপনি খাবার পান-কোন দিন আপনাকে অভুক্ত থাকতে হয় না। 

শ্বামীজী বললেন : হ্যা, একথা আমি বলিছি! মায়ীর কাজ আমি 
যেমন করি, মারীও তেমনি তার কাজ করেশ। যখন মনে করেন, আমার 
কিছু খাওয়া উচিত--সারাদিন অভুক্ত আছি, তিনিও তাঁর ব্যবস্থা করে 


যৌবনে ১১৩ 


রাখেন। কিন্ত তোমর। ত মামীর ওপর আম্মা রাখতে পারছ না, তার 
কারণ-_-তোমাদের মনে বিশ্বাস নেই। 

জংলীবাব। বললেন * সকাল থেকে এক ঝৌঁকে আমর! এতদুর এসেছি, 
ছু এক জায়গায় ঝরণার জল ছাড়া কিছুই মুখে দিতে পারি নি। আকাশের 
পানে তাকিয়ে বুঝতে পার! যাচ্ছে দিনও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে । আর 
খানিকটা পথ গেলেই, কোন জায়গায় আস্তান। নিতে হবে রাত কাটাবার জন্য । 
আপনি কি যনে করেন গুরুজী, আজও যায়ী আপনার জন্বে খাবার 
যোগাবেন ; আর আপনার সঙ্গে থেকেও আমর] সে খাবারের কিছুই পাব ন1? 

সহাস্তে স্বামীজী উত্তর দিলেন : সে মায়ীই জানেন। তবে আমি 
এটুকুও বলতে পারি-_-আমরা যেখানে আস্তানা পাতব আর কিছুক্ষণ পরে, 
সেখানে আমরা কিছু না! কিছু পাবই | আর, এও জেনো--এক যাত্রায় পৃথক 
ফল হবে না। আমি যা পাব, একলা পাব না তোমরাও তার ভাগ পাবে। 

+তলীবাব। একথ। শুনে বেশ শক্ত হয়ে বলে উঠলেন কুচ পরোঁয়! নেই 
_-এব পর গুরুজীর পানে চেয়েই আমর! পরিক্রম| চালাব, ক্ষুধা যখন একেবারে 
অসহ্য হয়ে উঠবে, তখন আপনাকেই দেখব-_ মনে মনে আপনার দোহাই 
দিয়ে এ দ্বরধমনটিকে দমন করব । 

শ্বামীজীর মুখখানি পলকে অপ্রসন্ন হয়ে উঠল ; ক্ষুব্ধ স্বরে তিনি বললেন : 
আমি কে? সংসার ছেড়ে এসেও তোমরা এখনো ভুলের বোঝা বহে 
বেড়াচ্ছ ? পরমাত্বাকে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছ না। কত বারই 
ত বলেছি- মনে যখনই কোন প্রবৃত্তি প্রবল হয়ে বিকার ঘটাতে চাইবে, 
তখনই মায়ীর শরণ নেবে, তাকেই ডাকবে, তিনি সব সঙ্কট মোচন 
করে দেবেন । 

দুই শিশ্তই ঘাড় নেড়ে স্বামীজীর কথায় সম্মতি জানালেন। এর পর 
পুনরায় নৃত্ভন উদ্ভমে চলল তাদের বনপরিক্রযা। স্বামীজীই আগে আগে 
চলেছেন, চলার পথে গাছের শাখা প্রশাখা, বা লতার বেষ্টনি যষ্টির সাহায্যে 
তিনিই অপসারিত করে এগিয়ে চলেন, সারাদিনের ক্লান্তি এবং ক্ষুধাজমিত 
অবলাদ শিশ্হর্টিকে আচ্ছন্ন করায় তারা কোনরকমে গুরজীকে অনুসরণ 
করছিলেন মাত্র, অগ্রগামী হোয়ে অঙগলভাঙ্গার উৎসাহ তাঁর! হারিয়ে 
ফেলেছেন । 

৮ 


১১৪ ধাঁড়খণ্ডের খষি 


নিবিড় বনের মধ্যে দিনের আলে! ক্রমশঃ ম্রান হয়ে আসছে দেখেই 
কারা বুঝতে পারলেন যে, দিন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে । এ অবস্থায় অজ্ঞাত 
বনপথে আর এগিয়ে যাওয়া উচিত কিনা ছুই শিষ্য এই প্রশ্ন তুললেন । 
তাদের মতে জঙ্গলের যে অংশে ভারা এসে পড়েছেন, এখানে রাত্রিবাস কোন 
দিক দিয়েই স্মবিধাজনক নয়। 

স্বামীজী এতক্ষণ নীরবে চারদিকে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন। সহসা 
তাঁর মুখখানি প্রফুল্ল হয়ে উঠল ; তখনই সহাস্তে বললেন £ আমি কিন্তু এই 
জায়গ!টিকেই নিরাপদ স্বান মনে করছি, এখানেই আস্তান। পেতে রান্রিবাস 
করা যাবে । শুধু তাই নয়, জায়£াটি সাধন ভজনের উপযুক্ত মনে হোচ্ছে। 
এখানে আরে ছুটে! দিন থাকাও চলতে পারে । 

ছুই শিষ্য অবাক হোয়ে স্বামীজীর মুখের পানে তাকিয়ে থাকেন ; 
উভয়েরই মনোমত প্রশ্ন _স্বামীজী একি বলছেন । যে-জায়গায় ভারা এসে 
পড়েছেন, সেখান থেকে তাড়াতাড়ি সরে যাবার জন্য তারা হয়েছেন ব্যস্ত, 
আর শ্বামীন্দী বলছেন, এই জায়গাটাই থাকবার পক্ষে প্রশস্ত। 

এদের মনোভাব বুঝে স্বামীভী বললেন : তোমরা লক্ষ্য করনি, কাছেই 
বারণ আছে । আমি তার স্মাভাপ পেয়েছি। তাহলে এ জায়গাটা! পাহাড়ের 
অংশ। আমরা অনেকদূর থেকে চড়াই ভেঙে উঠেছি, তাই বুঝতে পার নি। 
তারপর, পাকা ডুমুরের গন্ধ পেয়েছি--নিশ্চয়ই এখানে যজ্ঞ ডুমুরের গাছ 
আছে। তাহলে তোমাদের খাবারও সংস্থান হবে । 

জংলীবাব! বললেন ; কিন্তু এতখানি পথের কোথাও ডুমুরগাছ আমর! 
দেখিনি । পাক ডুমুর যদি পাওয়া যায় খুব ভাল কথা, কিন্ত রুটির সঙ্গেই 
ও জিনিষট] খাপ খায় | মনে হয় যেন "অমৃত | 
স্ব হেসে স্বামীজী বললেন £ পেটের চিন্তাতেই তুমি অস্থির, খাবার 
ভদবিরও খুব জান | যাক্‌, চল আমরা সামনে আর না গিয়ে ডানদিকের এ 
বাঁকট ঘুরে দেখি, ও পাশের জায়গাটা কেমন-_খুব সম্ভব, থে দিকে কোথাও 
ঝরণা আছে। 

কথ! বলতে বলতেই স্বামীজী সেখান থেকে ভানদিক ধরে এগিয়ে 
চললেন । যেতে যেতে তিনজনেই বুঝলেন, জঙ্গলের এ দিকট1 অনেকখানি 
নীচু-_খানিকট। গিয়ে পিছনে ফিরে তাকাতেই ভান] গেল, তাঁর] বরাবর উঁচু 


যৌবনে ১১৫ 


পথেই উঠে এসেছেন-_এ জায়গাট। পার্ধত্য অঞ্চলই বটে। আরও কিছুদ্কণ 
পরে তাঁর। অঙ্গলাকীর্ণ বাকটি অতিক্রম করতেই সবিস্ময়ে দেখলেন, তাঁর! ছুটে 
পাহাড়ের মধাবতাঁ উপত্যকায় এসে পড়েছেন । ডানদিকের পাহাড়াটি ভীষণ 
অঙ্গলাকীর্ণ, কিন্ত বামদ্িকের পাছাড়টি ঠিক একটা বড় টিলার মত। এরই 
একট] অংশ দিয়ে ঝরণার জল অবিশ্রান্ত গতিতে একটা স্ুশ্রাব্য শব তুলে 
নির্গত হোচ্ছে এবং ঝরণাঁর মুখ থেকে একটা প্রণালী বা নালার ভিতর দিয়ে 
সেই জলধার। পাহাড়টির পাশ দিয়ে এমন ভাবে বয়ে চলেছে, যেন অপচয় 
ন। করে যথাস্বানে সঞ্চিত হচ্ছে । 

শ্বামীজী বিশেষভাবে লক্ষা করে বললেন : এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, 
এখানে জনসমাগম হয়ে থাকে ; নিকটে বা দুরে লোকের ধসতি আছে। 
ঝরণার জল তাদের চেষ্টাতেই এভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে । এখন আমর] টিলাটির 
উপর উঠে আস্তানা পাতব | মনে হচ্ছে _ওখানেই ডুমুরগাছ আছে। 

শিশ্ত্বয় উৎফুল্ল হয়ে বললেন : গুরুজীব অদ্ভুত অন্থমান শক্তি! এমন 
স্বান থাকতে আমর] ভেবে অস্থির হয়েছিলাম | এখন বুঝতে পারছি সামনে 
এগিয়ে গেলে জঙ্গলের শেষ আর পেতাম না। এ জায়গা দেখে যনে আশার 
জঞ্চার হোচ্ছে। 

স্বামীজী বললেন : উপরে উঠলে তখন আর নামতে ইচ্ছা! করবে না। 
ওখান থেকে তাঁকালেই বুঝতে পারবে, আমরা নিজেদের অক্তাতে কত উচু 
চড়ায়ে উঠেছি । 

তিনজনেই সাবধানে উপরে উঠতে লাঁগলেন। কিছুক্ষণ পরেই টিলায় 
আকৃতি পাহাড়টির উপরে উঠে মনোরয স্বানটি দেখে তাদের সকল কষ্টের যেন 
অবসান হলো । চারদিকের পরিবেশ দেখে স্বামীজী বললেন £ মায়ী ঠিক 
ঘায়গাতেই আমাদের এনেছেম | যথেষ্ট শুকনো কাঠও দেখা যাচ্ছে, ধুনি 
জ্বালবার পক্ষে এগুলো খুব উপযোগী । এ দেখ- যজ্ঞডুমুর গাছও অলেক 
রয়েছে, পাকাফলও পাবে । এসো, এখানেই আমাদের আত্তান] পাতা যাক । 

বড় একট] গাছের ঠিক কাওটির নীচে স্বামীজী তার আসন পেতে বসলেন । 
ছুই শিশ্তুও কাছাকাছি আর দুটি গাছের তলায় নিজেদের স্মান করে নিলেন । 
গজের সামান্য বন্ত্রাদি গাছের ডালে ডালে লতার আনলা বেঁধে তার উপরে 
ছুড়িয়ে দিলেন। স্থানটি এখন তাবুর মত দর্শনীয় হয়ে উঠল । উপর থেকে 


১১৬ ঝাড়খণ্ডের খাষি 


ভখনও পর্য্যন্ত দিনের আলে নিশ্চিন্ত হয় নাই- তখনও পর্ধ্যহ্ন দিনের দেবতা 
পশ্চিমৃকাশে নামতে নামতেও তাব রক্তিম কিরণ ছড়াচ্ছিলেন । 

জংলীবাবা ও শনকভী ডুমুরের সন্ধ/ন করতে লাগলেন | গাছের উচু বড় 
বড় পরিপুষ্ট ডুমুব গুচ্ছে গুচ্ছে ঝুপছিল, তবে এখনও পাক ধরে নি, কোন কোন 
গাছে হু' চারটি পক্ক ডুঞঃরও দেখা গেল। সেগুলি সংগ্রহ কবতে তারা ব্যস্ত 
হয়েছেন, এবং এদিকে প্রকাণ্ড গাছটির তলায় বসে স্বামীজী ঝুলি থেকে 
চকমকি পাথর বের করে ঠঁকে কে আগুন জবালছেন, এমন সময় সমগ্র বনভুমি 
প্রকম্পিত করে ঘন ঘন বন্দুকের আওয়াজ উঠল | জংলীবাব] লো তুলে- 
ছিলেন পরিপকক এক থোলো যঙ্জডুমুরের উদ্োশে, খনকজীও একখও কাষ্ঠ 
উচিয়েছেন এই একই উদ্দেশ্যে, অমনি এই ভীষণ কাণ্ড! উভয়েই স্ব স্ব 
প্রহরণ ত্যাগ করে স্বামীজীব দোহাই দিয়ে তার পাশে এসে বসে পড়লেন, 
আতঙ্কে তাদের চক্ষুগ্ুলি তখন কপালের দিকে উঠে গেছে । স্বামীজী কিন্ত 
নিধিকার তিনি তখন ধুনীর কাষ্ঠে ঘষিত চকমকির বহি সংসোগ করেছেন, 
ধুনার শুফ ইন্ধন অগ্নি পুষ্ট হয়ে জ্বলে উঠেছে। সেই অবস্থায় ভয়াঙ ছুই 
শিষ্ের পানে একটিবার ক্সিপ্ধ দুটিতে চেয়েই শীরবে তিনি 1চত্তকে ধ্যানে 
নিবি করলেন। 

ঠিক এই সময় আবার সেই ভীষণ আওয়াজ উঠল । অধিকত্ত, আওয়াজেব 
সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক নিঃস্থত গুলি তানদর আস্তানার উপর পড়তে লাগল। 
স্বামীজী নিজেই স্বহস্তে স্বপ্প ব্যবধানে মুখোমুখা ছুটো৷ ডালে লতার ধরণী 
তৈরী করেভার উপর কৌপীন ও গায়ের মোটা চাঁদরখান] শুকাবার ডগ্য 
মেলে দিয়েছিলেন, কর্ণধিদারী শব্ষের মলে বন্দুকের গুলি সেই চাঁদর ও 
কৌগীন ভেদ করে গাহটি গায়ে গিয়ে বিধতে লাগল । এবার ছুই শি্তয 
গ্রাণভয়ে চীৎকার করে উঠলেন | জংলীবাবার কণ্ঠস্বর অত্যন্ত তীব্র, তিনি 
সেই স্বরে ঝঙ্কার ভুপলেন £ গ্ল্যিহ কৌন্‌ গোলী ছোড়রহ। হায় ফ্যিহ সন্ত 
মহারাজজীকি ডেরা, রোৌখো--শনকজীও তার কণ্ঠের সঙ্গে ক মিলিয়ে 
চীৎকার করতে লাগলেন । 

একটু পরেই গুলির আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল- একটিও গুলি এর পর 
আর নিক্ষিপ্ত হলো না। খানিকক্ষণ পরে ঢালু পথে একসঙ্গে বছলোকের 
পদশব্ব শুনতে পাওয়া গেল-সেই সঙ্গে ভারী জুতার মস্‌ মস্‌ শব্ধ, বহু 


যৌবনে ১১৭ 


কের মিশ্রধবনি, আস্ত্রের ঝনাৎকাঁর--পব মিলিয়ে এক বিস্ময়কর পরিস্থিতি 
সেই নিস্তব্ধ স্থানটির শান্তিভঙ্গ করল । ৃ 

ব্যাপারটি জানবার জন্য জংলীবাবাবা এগিয়ে চলেছেন, এমন সময় উফীষ 
ও উজ্জল রাজ পরিচ্ছদধারী এক যুবক পারিষদর্গ এবং দেহরক্ষী মৈনিকগণ 
কতৃক পরিবেষ্টিত অবস্থায় সেখানে উপস্থিত হোলেন। প্রথমেই স্বামীভীর 
উপর তার দুষ্ট নিবদ্ধ ছলো; দেখলেন খাষিকর এক পাধুপুরুষ বৃহৎ একট 
শিশুরৃক্ষের তলদেশে তার আপনে ধঠানমগ্র, সামনেই ধুনির অগ্নি প্রজ্মলিত। 
গাহটির গায়ে এবং সাধুর বাবহার্য কৌপীন ও উত্তদীর বসনগুলিতে নিক্ষিপ্ত 
গুলির চিহ্ন রয়েছে । জাধুব ছুই শিস্তা বিহ্বল ভাবে দাড়িয়ে আছেন। 
বুঝলেন--এরাই গুলিবর্ষণে চীৎকাব তুলেছিলেন । তখন তিনি পাদুকা 
ত্যাগ করে স্বামীজীর আনন সালিধো গিয়ে তাব উক্ীষমণ্ডিত শির সেখানে 
নত করে শ্রদ্ধা জানালেন | স্বামীজী তখনও সমাখিযগ্র ! গুলিবর্ষণের ময় 
তিনি মাতৃচরণে আভ্রনিবেদন কবে সেই যে ধ্যানমগ্র হন, ক্রমে তা। সমাধিতে 
পরিণত হয়। জংলীবাবা এই সময় মহাউ এসে উচ্চকণে 'জয় নর্মদামায়ী' 
ধবনির সঙ্গে "গুরু মহারাজজী 1 বলে সন্বোবন করতেই তার সমাধি ভঙ্গ 
হলে] | সামনেই রাজ পরিচ্ছদবাখী যুবাকে তাৰ পদতলে নতভাগ্ু অবস্থায় 
উপবিষ্ট দেখে তিনি তার স্বভাবসিদ্ধ শিষ্টাটান্ে অভার্থনা করলেন, ঝুলির 
ভিতব থেকে একথণ্ড হত্রিণ-চন্ন বিহয়ে শিয়ে বসবান জন্তা অন্রবোধ 
জানালেন । 

আগন্তক ভেবেছিলেন, ভার অশিষ্টাচারে সাধুজী হয়ত জটভাবে তিরস্কার 
করবেন, অভিশাপ দেবেন, কিন্তু এখন শিওর মত তার সরল ব্যবহার দেখে 
একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। স্বামীজীই হাতে হানতে বললেন £ চারদিক 
থেকে গুলি ছুটছে দেখে আমার ছুই সাথী যখন হতচকিত হয়ে পড়ে, আমি 
তখন মনে মনে পরমাত্ার শরণ নিই_তিনিই আমাকে আচ্ছন্ন করেছিলেন । 

তখন প্রকাশ পেল যে, আগন্তক নরসিংহগড় বাজোব রাজা । মধ্য- 
প্রদেশে ভুপালের পাশ্বেই নারারণগড় নামে সমৃদ্ধ রাজ্যটির রাজধানী হচ্ছে 
নরসিংহগড় | রাজা সেদিন দলবল নিয়ে এই পাধতা জঙ্গলে শিকার করতে 
আসেন । এম্বানটি দুর্গ, মান্ুমের গতিবিধি নেই, তাঁদের মনে এই ধারণাই 
ছিল। সেই জন্যেই তারা পাখীর ঝাঁক লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন, কিন্তু 


১১৮ ঝাড়খণ্ডের খষি 


সাধু মহারাজ যে এখানে আসন পেতেছেম তাত জান] ছিল না, তাই বিভ্রান্তি 
ঘটে। এখন তিনি বুঝতে পারছেন, ভারা কি সাংঘাতিক কাজ করেছিলেন । 
তাদেরই শুভার্ব্ট বশত: সাধু মহারাজের পরযাপ্বাই সব দিক রক্ষা করেছেন। 

সব শুনে স্বামীজী তার সঙ্ষে এমন মিষ্ট ব্যবহার করলেন, যেন কিছুই 
হয় নি। রাজ] অনুতপ্ত ভাবে যতই ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তিনিও সঙ্গে সঙ্গে 
সহান্তে এমন মিষ্ট বাক্যে আপ্যায়ন করতে থাকেন-_-যেন কিছুই হয় নি 
“সবই পরমাত্বার ইচ্ছা, তোমার যঙ্গাল হোক, সমান দৃষ্টিতে সনাইকে দেখবার 
তোমাকে শক্তি দিন পরমাত্্বা।' এইভাবে শুভেচ্ছা জানিয়ে সেই প্রশ্বর্ষশালী 
পাজাকেও চমতকত করে দিলেন। তিনি তখন সাগ্রহে অশ্ররোধ করতে 
লাগলেন £ অধীনের রাজধানী এখান থেকে বেশী দুরে নয়, সাধু মহারাজ 
ঘদি অনুমতি কবেন তাহলে হাতী পাঠিয়ে শিস্তদের সঙ্গে প্রভুকে রাছ- 
প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে ধন্য হই। 

কিন্তু তেযনি মৃত্ব হেসে স্বামীজী রাজাকে জানালেন £ আপনার এ 
অনুরোধ রক্ষা করা আমার পক্ষে এখন সদ্ধব হবে না, কারণ, আসব) স্বল্প 
করে নর্ধদা! পরিক্রমায় বেরিয়েছি। গৃহীর গৃহে আতিথ্য স্বীকার করবার 
সামর্থ্য আমাদের নেই ;" এর জন্ত আপনি ক্ষুগ্ন হবেন না। এখান থেকেই 
আমি আপনার পরিজনবর্গকে আশীর্ধবাদ করছি, ভাদের কল্যাণ ছোক । 

এরপর রাজ! পকাতছে অন্রুরোধ করলেন : মৃহাবাজজী আমাদের সঙ্গে 
যে পব খাগ্যবস্ভ এসোছিল, তাঁর মধ্যে কিছু অংশ শ্রদ্ধভীবেই রাখা আছে। 
দেবত। ব্রাহ্মণের সেবায় যদি লাগে, সেই ভেবেই আঁনা হয়েছিল ; কিন্ত 
পথে আমর] কোথাও দেবস্থান পাইনি | সাধু মহাপাকে দর্শন করে আমরা! 
ধন্ঘ হয়েছি, মনে হচ্ছে আমরা দেবদর্শন করেছি! এখন এই উপচারগুলি 
দেবসেবায় লাগলে এ দাঁস কুতার্থ হবে, দয়া করে এই অনুমতি করুন| 

স্বামীজীর পক্ষে সে অঙ্গরোধ প্রত্যাখ্যান কর! সম্ভব হলে না। তার 
সম্মতি পেয়েই বাজ্াজ্ঞায় শিবির থেকে বেদানা, আপেল, আঙ্গুর, খঙ্জর, 
কিসযিস, বাদাম, পেস্তা, প্রভৃতি প্রচুর ছুশ্রাপ্য ফল, রাজভোগ্য মেওয়া, 
জীনের ব্যাগে বাধা আটা ও চিনি প্রভৃতি প্রকাও একট] টুকরিতে বোঝাই 
করে রাজভূত্যগণ উদ্ধার সঙ্গে সেখানে রেখে, স্বামীজীকে প্রণাম করে 
চলে গেল। 


যৌবনে ১১% 


শিগ্ধ দিতে স্বামীজী শিশ্তদের দিকে তাকালেন | জংলীবাবা উচছুসিত 
কঠে বলে উঠলেন: নর্মদামায়ী কি জয়--স্াীঁর কৃপায় আমাদের তুভোগ 
কেটে গেল। এখন বুঝছি, গুরুমহারাজজী খাঁটি কথ। বলেছিলেন-__ 
সনকজী সোল্লাসে ও সহাশ্যে বললেন : 
“বিশ্বাসে মিলায় বস্ত, তর্কে বহু দুর! 


সাত 

জংলীবাব! ও শনকরজীব অন্তরে আর আনন্দ ধরে লা-সেই সঙ্গে বিস্ময় 
ভাবটাও মাত্রা ছাপিয়ে পড়ে । উভযেই বিশস্মযোল্লাসে বার বার বলতে থাকেন 
_কি আশ্চর্য, ভাঙনের মধ্যেও পরমাক্বাজী ভোজনের ব্যবস্থা করে 
পাঠালেন! তাও কি যেমন তেমন মামুলী কিছু_-রাঁজভোগের যোগ্য 
সব কিছু ! 

উল্লাসের সঙ্গে ভক্তি বিলিয়ে বালানন্দজীর উদ্দেশেও নানাভাবে প্রশস্ত 
চলে। পরমাক্মাজী যেন স্বামী মহারাজের সঙ্গে সঙ্গে ফেবেন, সময় হলেই 
গ্রয়োজনমত সামগ্রপত্র যোগান দেন। কি তাজ্জবেব কথা | 

যদ হেসে বালানন্পজী বললেন ; তাজ্জব নয়, গীতায় শ্রীভগবানের বাণী 
মনে কর- তিনিই বলেছেন £ 

“এবং সতত যুক্তানাং যোগরক্ষেমং বছাম্যহ 

এ থেকেই বুঝতে হবে - আমরা সতত তাতে যুক্ত হয়ে আছি । এটা বুঝতে 
পারলে, মনে বিশ্বাস থাকলে, আপদ বিপদে অধাব হতে হয় না। 

সেই সন্ধায় সাধুবা বীতিমত্ত ভোগের ব্যবস্থা কবলেন। উপাদেয় 
গব্যঘবতযুক্ত রূট-পুবি, ভাজি, নানাবিধ ফল ও মিষ্টান্ম__বহুদিন পরে জনহীন 
অঙগল মধ্যে রাজভোগের আয়োজন | ধুনীর সামনে বসে বালানন্পভী এক 
একবার অপ!ঙ্গে তুই শিষ্যের দিকে চেয়ে তাদের সেই কর্ধব্যস্ত অবস্থা, 
আনন্দময় ভঙ্গি লক্ষ্য করেন, সেই সঙ্গে নিজেও পরিতৃপ্ত হন। 

কিন্ত এত যত্ত্ে ভোজের বিপুন্দ ব্যবস্থা করেও তারা স্বামীজীকে পুর্ণ- 
ভোত্ধনে সম্মত করতে সমর্থ হলেন না। তাঁরা যতই অন্থুরোধ করেন, তিনি 
স্বত্ব হেসে প্রসম্নভাবেই বলেন: তোমরা দুজনে ভালভাবে ভোজন করে 
পরিপুর্ণ তৃপ্তিলা করবে বলেই আমি এ পর্যস্ত কোন কথা বলিনি। তোমর। 


১২০ ঝাড়খণ্ডের খুবি 


ত ভ্রান, যেদিন জোটে একখানি রুটি আর সামান্য কিছু উপচার হলেই আমার 
পরম তৃথ্তি। আজও তাঁর ব্যতিক্রম হতে পারে না। 

শেষে তাদের একান্ত অনুরোধ উপেক্ষা করতে অক্ষম হয়ে, ঘ্বৃতপন্ধ 
ছুখানি রুটি এবং কিছু কিছু ফল ও মিষ্টান্ন গ্রহণ করলেন । সেই সঙ্গে 
বললেন £ তোমর! দ্বজনে তৃপ্তির সঙ্গে ভোজন কর, আমি তাই দেখি, 
আর এতেই আমার পুর্ণতৃপ্তি । 

স্বামীজীর ভোজনের পর তার ছুজনে পবিতপ্তির সঙ্গেই ভোজন করলেন । 
আঁচমনের পর স্বামীজী ম্বয়ং তাদের কাছে এসে বসলেন শ্বহত্তে সাহাষা 
করবার অন্য, যদি কোন কিছুর প্রয়োজন হয়। 

শিশ্তাদের আনন্দে আনন্দময় গুরুজীর সমগ্র চিত্ত আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে 
উঠল_-মনে মনে তিনি পরমাত্বাীকে স্মরণ করে তার অপার ককণায় 
অভিভূত হলেন । 

গ্রভ্যষেই প্রাতঃকত্যাদির পর জংলীবাব! বালানন্দজীকে প্রাত্যহিক 
বন্দনার পর নিবেদন করলেন : যদি মহারাজজীর মণ্রি হয়, এই আন্তানাটি 
না ছেড়ে ছু' চারদিন এখানেই আমরা থাকি । জায়গাটি খাসা, এখান থেকে 
প্রন্কৃতিমায়ীর শোভাও উপভোগ করা যায়, কাছেই ঝর্ণা_জলকষ্টের ভয় নেই, 
তারপর আমাদের এই আস্তানাটি যেন কেল্লার মত, কাল ত দেখা গেল--_ 
বন্দুকের গুলীও কার গায়ে বিঁধল না। তাই এখানে আরও কিছুদিন 
থাকবার ইচ্ছা প্রবল হচ্ছে । 

বালানন্দজী সহাম্যে বললেন $ আসল কারণ হচ্ছে--রাজবাঁড়ীর সিধা। 
ফাল বাতের রাঁজভোগেও ফুরায় নি, এখনো অনেক মাল মজুত আছে 
সেইজন্যই জায়গার উপর মায়া পড়েছে-এই ত? 

স্বামীজী জোরে হেমে উঠলেন তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে । শ্বানটিও 
গমগম করে উঠল হাঁসির রোলে। ঈষৎ লক্ষিত হয়ে জংলীবাবা হাত 
ছু'খানি কচলাতে কচলাতে বললেন £ গ্ররুজী ঠিকই ধরেছেন | বনে ব্নে 
ভ্রমণ ত বহুদিন ধরেই চলেছে, কিন্তু এভাবে ছুর্যোগের ভিতর দিয়ে রাজভোগ 
আসা, তারপর পেটতরে খেয়েও মালপত্র নিঃশেষ ন1 হওয়ায় সঞ্চয় করে 
রাথা-এর আগে কখলো এ নদীবে দেখিনি | সেইজন্তেই এখদ মায়া 
পড়েছে। শবে একথাও বলি গুরুজী, মায়! পড়েছে শর খাগ্যগুলির উপর-_ 


যৌবনে ১২১ 


স্থানট] অবিশ্বি উপলক্ষ মাত্র । স্বামীজী বললেন : স্থানটিই কিন্ত আমার 
ভাল লেগেছে । এখান থেকে দুরের চারদিকের অনেক দ্বশ্য দেখা যায়। 
বারণার ঝিরঝির আঁওয়াজটিও ভারি মিঠে লাগে। কিস্ক একটা আঁশঙ্কাও 
মনে জাগছে । 

“সে কি গুরুজী--কিসের আশঙ্কা ?” বলতে বলতে সনকজীও এগিয়ে 
এসে বালানন্দকে বন্দনা করে নিকটেই বসলেন | গুরুর প্রতি তাদের বিশ্বাম 
এখন এমনি দ্ট হয়ে উঠেছে যে, ভার মুখের কথা বৃথা হবে না, এ সত্য 
তাদের এখন মজ্জাগত হয়ে পড়েছে । তাই আশঙ্কার কথা শুনে উভয়েই 
শাহ্কিত দ্টিতে গুরুর দিকে চেয়ে রইলেন । 

বালানন্দজী স্মিতমুখে বললেন : আশঙ্কাও অনেক দিক দিয়ে অনেক 
রকষেই আসে ; প্রত্যেকটিই সে কালকের মত বন্দুকের গুলী ছুঁড়ে জানায় 
সে এসেছে--তা নয়। আমি যে আশঙ্কার কথা ভাবছি, আমার পক্ষে ভারি 
রলমের হলেও, তোমাদের দিক দিয়ে 'শাপে বরের' মতনও হতে পারে । 

দুই শিষ্বের মুখেই কৌতুহলের চিহ্ন সুস্পষ্ট হয়ে উঠল। এর পর কোল 
প্রশ্ন না করেই উভয়ে স্বামীজীর মুখের দিকে জিজ্ঞাসুদন্টিতে তাকিয়ে রইলেন । 

বালানন্দজী বললেন * আমার আশঙ্কাটির কথা তাহলে বলি শোন। 
বালি তো নরসিংগড়ের রাজাকে দেখলে । চেহারা আর মেজাজ দুটোই রাজার 
মত। কালকের ব্যাপারটা চাঁপা নেই-রাজধানীতে গিয়েই বাঁজাসাহেব 
ব্যাপারটাকে ফলাও করে নিশ্চয় বলেছেন | রাজপুরীতেও ব্যাপারটা 
জাঁনাজানি হয়েছে । তারা অবাক হয়ে শুনছেন--ওভাঁবে গুলী বর্ষণের পরও 
গাধুজী বহাল তবিয়তে বেঁচে গেছেন | তাহলে মেই সাধু সামান্য লোক নন-- 
হয়ত বম্দুকের গুলীগুলে৷ গিলেই ফেলেছেন । এখন মুস্কিল বাধছে, সাধুব 
কথ শুনে বাজবাড়ীর ভক্তিয়ভী মায়ীরা যদি সাধুদর্শনে এসে পড়েন, তখন 
ভামর! কি করে সাঁমলান, কোথায় বসাব, কিভাবে রাঁজঅতিথিদের সংকার 
করব--এইগুলোই হচ্ছে ভাবনার কথা, আর--এইটিই হচ্ছে আমার আশঙ্কা | 

সনকজী বললেন £ ওখানকার রাজা এলে আমরা যেভাবে অভ্যর্থন! 
করেছিলাম, ওখান থেকে রাঁজপবিজমেরা এলেও তেমনি খাতির করব। 

জংলীবাবা বললেন £ বড় বড় গাছ চারদিকে ফীাড়িয়ে রয়েছে, গাহ্‌- 
গুলোতে ফলের নামগন্ধ নেই, কিন্ত ইয়া বড় বড় পাতা- যেল এক একটা 


১২২ ঝাঁখণ্ডের বি 


ছাতা, বৃষ্টি হলে মাথায় দিয়ে দেহ বাঁচানো যায়। কেটে এনে এখানে 
বিছিয়ে দেব | এ ত আব বৈঠকখানা নয়, খষির আশ্রম। 

বালানন্দ বললেন: যদি সত্যই কেউ আসেন রাজবাড়ীর লোকেরা, 
তোমর] বরং রাজধানীতে যেও তাদের সঙ্গে । কেন আঁর বনে বনে ঘুরে 
বাটভোগ করবে । সেখানে গেলে আরামে থাকতে পাবে, খাবার পরবার 
কোন ভাবনা হবে না। 

আংলীবাবা গুরুজীর কথায় ক্রি হয়ে বললেন : আরামের কথা আর 
শোনাবেন লা গুরুজী, আমাদের সে ভুল ভেডে গেছে । পরিক্রমা করব বলে 
বনে এসে, আমরা প্রথযে ভুলের পথই ধরেছিলাম। আপনার মতন ত্যাগী 
গুরুর কপা পেয়ে, সাথী হয়ে আর কিছুবই পরোয়া করি ন1। 

সনকজীও সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছৃুসিতকঠে জানিয়ে দিলেন : আমাদের মন 
বলুন, বুদ্ধি বলুন, ইচ্ছা বলুন--আপনাকেই ধিবে আছে গুকজী। যখনই 
ভুল চুক হবে, অন্যায় দেখবেন, অমনি সতর্ক করে দেবেন--এই আমাদের 
আজি। 

* বালানদ্দ বললেন : তাহলে এই আস্তানায় জড়েব মত পড়ে থাকলে 
চলবে না|! আমরা পরিক্রমার ব্রত নিয়েছি মনে রেখ । আস্তানা! এখানে 
থাকুক, এখান থেকেই এদিককার জঙলটা ঘুরতে হবে: পরিত্রাজকের পক্ষে 
এটাও একটা সাধনা | 

পরিক্রমার নির্দেশটি দিয়েই দীর্ঘ যষ্িটি হাতে কবে বালানন্দজী উঠে 
পড়লেন । সম্মুখে সমাশীন তুই শিষ্কাকেও সঙ্গে সঙ্গে উঠত হলো । টিলাটির 
একপাশে ইতিমধ্যেই খাগ্ঠ সঞ্চয়ের ভাগ্ডারাটি এমনভাবে এরা নির্ীণ করে 
ফেলেছেন যে, পশুপাখী এসে তার সন্ধান না পায় এবং সহজে তার সংস্পর্শে 
যেতে না পারে । 

তিনজনেই উপর থেকে নামতে লাগলেন । সেখান থেকেই বড় পাহাড়টি 
দেখতে পেয়ে বালানন্দজী বললেন £ নীচে মেয়েই আমরা ডান দিকের বড় 
পাহাড়টির উপরে উঠব। 

অংলীবাব! বললেন £ ওর ওপরে কিন্তু ভীষণ জঙ্গল, হিং জন্ত জানোয়ার 
থাকাও আসম্চর্য নয়। 

শ্বামীদী সহাপ্তে বললেন : শ্রস্ত জানোয়ারের বাসস্বানই ত অঙল। 


যৌবনে ১২৩ 


তাদের সেখানে থাকাটা আশ্চর্যের বিষয় হবে কেন? আমরা বরং তাদের 
আস্তানায় চলেছি আতিথা গ্রহণ করতে । মানুষের উদ্দেশ্য ওর' বুঝতে পারে । 

নীচে উপত্যকার মত সন্কীর্ণ স্বানটিতে নেমেই তার] পুনরায় অন্য দিকের 
উচু পাহাড়টির উপর উঠতে লাগলেন । বালানন্দ বললেন ; এই পাহাড়েই 
কাল নরসিংগড়ওয়ালীর! শিকার করতে এসেছিলেন | তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে 
পেবরেই এখানকার পাখীগুলে আমর] যে ছেটি পাছাড়টির উপরে আস্তান' 
পেতেছিলাম, সেখানকার গাছগুলোর উপরে আশ্রয় নিয়েছিল। তারাও 
সেটা বুঝতে পেরে গুলী চালিয়েছিলেন | 

আগের পহাডটির চেয়েও এটি যেমন বড়, তেমনি উচু; সুতরাং উপরে 
উঠতে এদের অনেকখানি সময় লাগল । কিস্তু উপরে উঠেই সেখান থেকে 
পেছনের দিকে দুরের দৃশ্যাবলী দেখে প্রত্যেকেই মুগ্ধ হলেন। সর্বত্রই 
দিগন্তবিস্তারী গভীর অরণ্যের সমারোহ--স্বানে শ্বানে পর্ত-শুল্গের অস্পষ্ট 
রূপরেখ। মেঘের সঙ্গে মিশে আছে । 

এরপর সামনে বনের মধ্যে তার! প্রবেশ করলেন । আগে বালানন্দজী, 
সকার হাতের দীর্ঘ যাষ্ট-_তাঁরই সাহায্যে অভ্যাসমত যেতে যেতে বৃক্ষগুলির 
শাখা-গ্রশাখ! সরিয়ে দিয়ে নিজের ও সহযাত্রীদের যাবার পথ করে নেন। 
এদিন এই পাহাড়িটির উপর বিবিধ বিচিত্র বিচিত্র আয়কর মনোহর বৃক্ষরাজির 
সমাবেশ দেখে তিনি চমতকৃত হলেন। বনমধ্যে দেই সব বৃক্ষের সারি-- 
বৃক্ষের পর বৃক্ষ, সরল সতেজ সুদীর্ঘ, তাদের শাখায় শাখায় তাকাশ সমাচ্ছন্ন : 
কোন কোন পুষ্টাল' বৃঞ্ষে স্ুলাঙ্গী লতা, লতায় লতায় ফুল-_-অপরপ দৃশ্য । 
আর এক অংশে বংশবন--ঈষৎ হরিদ্রীত নবীন নধর শ্যমল পত্রাৰলী সমাকীর্ণ 
ঘন সঙ্গিবিষ্ট বংশগুলি প্রভাতী সুর্ধকিরণে আত হয়ে যেন জীবস্ত সৌন্দর্যের 
বিকাশ করছে । ক্রোশের পর ক্রোশ-__যতহুর দৃষ্টি চলে, এই সৌন্দর্ধ-বারিধি 
তরঙ্গায়িত হচ্ছে । এখান থেকে উর্ধে দৃষ্টিপাত করতেই আর এক অপরূপ 
দশ্ব_শৃজের পর শৃঙ্গ, তারপর আরও উন্নত শৃঙ্গ, সেখানেও গাছের সমারোহ 
_ কিন্ত সেখানে সারিবদ্ধ নিবিড় বৃক্ষশ্রেণীর উপরে যেন জলস্ত অগ্রিরাশি 
শিখা বিস্তার করে ধবংসের লাচ সুরু করেছে । 

জংলীবাবা সেই ভীষণ দৃশ্য দেখে চীৎকার করে উঠলেন : গুরুজী, 
দেখুন, দেখুন-_-পাহাড়ের উপরে প্র গাছগুলোর মাথায় আগুন জ্বলাছে। 


১২৪ ঝাড়বণ্ডের খষি 


সমকজীও শঙ্কিতকঠে চীৎকার করলেন : কি দর্ধনাশ। আমরা হে 
দাবানলের কথা শুনেছি, বোধহয় সেই আগুন ! 

বালানন্দজী এতক্ষণ নির্ণিমেষ নেত্রে উপরের দিকের সেই অপরুপ দ্রশ্ব 
দেখতে দেখতে অতিভুত হয়ে পড়েছিলেন, সহস! সঙ্গীদের চীৎকারে 
প্রকৃতিষ্ব হয়ে তিনি ক্ষিপ্ধ স্বরে বললেন : ভাল করে দেখ, ঘাঁকড়িও না-__ 
চেয়ে চেয়ে অনুভব কর, তাহলেই বুঝবে পরমাঞআ্সাজীর এও এক অপবপ 
লীল! ৷ পাহাড়ের উপরে এ যে গাছগুলি দেখছ--গায়ে গায়ে মিশে 
অনেকদূর এগিয়ে গেছে, ওরাই বিখ্যাত জারউল গাছ । ওদের শাখা 
প্রশাখাগুলি গোলাগী ফুলে ভরে গেছে--তার ওপর পড়েছে লবারুণের রক্তবর্ণ 
আভা | তাতেই যনে হচ্ছে--অত উচুতে গাছের মাথায় আগুন জলছে। 

জংলীবাবা জিজ্ঞাসা করলেন £ জাঁরউল গাছ্‌--তার ফুলের ওপর সুবয- 
নাবায়ণের কিরণ পড়তেই এই কাণ্ড ! 

সহাম্যে বালানন্দজী বললেন | প্রক্কতিযায়ীর এক অন্ভুত সজ্জা। আর 
এ যে জারউল গাছ দেখছ, পাহাড়ের উপরেই ছদ্মায়। এই গাছ সুব 
আওলাতী : এ থেকে গৃহস্থলোকের ঘরবসতের অনেক দরকারী আঁপবাবপত্র 
তৈরী হয়, জলপথে চলবার জন্য নৌকা তৈরীর উপাদান এই গাছের কাঠ। 

উপবের চক্ফুচমৎকারী শোভা দেখতে দেখতে আরও কিছুদূর অগ্রসস 
হতেই জংলীবাবা পুনরায় বিশ্মযের কুরে চীৎকার করে বললেন £ এদিকে 
দেখুন গুরুজী, গাছ নেই, খাপি পাতা উঠেছি জমিন থেকে, আর কি ভীষণ 
চেহারা ! 

সনকজী সমর্থন করে বলে উঠলেন : সত্যিই, দেখলে ভয় হয়। 
ভৌতিক কিছু নয় তগুরজী? 

গুরুজী ঘৃষ্টি ফিরিয়ে পাশের দিকে তাকাতেই বিশাল আয়তনের সারিবদ্ধ 
পা্চাগুলি দেখতে পেলেন । মনে হলো. কে যেন নিপুণভাবে এক একটি 
অতিকায় পাত! জমির উপর সারি সারি বপিয়ে দিয়ে গেছে। প্রতোকর্টি 
পাতা এত বড় যে, এক একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি তার উপর অনায়াসে শয়ন 
কবতে পারে । স্থারী্রী দীর্ঘকালীন পর্বটনের ফলে বনের গাছপালা 
লতাপত্রাদির তথ্য নিখুতভাবে জানবার সুযোগ পান। এমন কি, কোন 
গাছের কি গুণ গার্থস্থয বাপারে তাদের কি উপযোগিতা, গে সবও অভিজ্ত] 


যৌবনে ১২০ 


জত্রে জ্ঞাত ছিলেন। প্রস্তবময় ভুমি সংলগ্ন বুহদায়তনের পাতাগুলি দেখেই 
তিনি সহাস্তে বললেন ১ প্রতোক জিনিটি ভাল করে দেখে তার পর নিজের 
মন্তব্য প্রকাশ কর] উচিত | সাহয করে একটু এগিয়ে গিয়ে পরীক্ষা! করলেই 
বুঝতে পারবে, গাছের ডাল থেকে এ সব পাতা নির্গত হয়নি বটে, কিস্ত 
মাটি থেকেই উঠেছে। এগুলি হচ্ছে কন্দ জাতীয় উদ্ভিদ, পাছাড় অঞ্চলেই 
অয়ায়; কন্দের শিকড় থাকে মাটির মধ্যে, আর কন্দ থেকেই পাতা ওঠে- 
এর নাম আনার কলি । 

এর পর আঁর গুরুীকে বলতে হলে! না, উভয়েই তগন নির্ভয়ে 
মহোৎসাহে পাতাগুলির দিকে এগিয়ে গেলেন এধং শীচু হয়ে ভুমিব উপর 
বসে পরীক্ষ! করতেই বুঝতে পারলেন, গুরুদ্দীর কথাই সত্য 

ংলীবাবা বললেন ; গুরুজী, আমরা এই পাতা ছু'চাবখান। সঙ্গে নিয়ে 
যাব। যদি সত্যই কোন অতিথি অর্থাৎ রাজবাড়ী থেকে কেউ আমাঁদেব 
আস্তানায় আসেন, এই পাতা দেব বিছ্য়ে--আসনের কাজ হবে। 

বড় বড় ঢাউল ঢাউস পাতাগুলো বাধবার জন্য জংলীবাবা বন্ধনীর সন্ধানে 
একটু এগিয়ে গেলেন । নির্জন অরণ্য মধ্যে বন্ধন রজ্জু আর কোথায় পাবেন, 
যদি কোন লতা বা এই জাতীয় কোন কিছু পান, তাহলেই তার 
কাজ হবে। 

এদিকে একস্থানে বিশাল আয়তনের ছু প্রাচীন ম্বক্ষ বালানন্দজীর দৃটি 
আকৃষ্ট করে। গাছ ছুটির শাখা প্রশাখায় গুচ্ছ গুচ্ছ ফল ধরেছে, তার সৌরতে 
্থানটিও যেন আমোদিত হয়ে উঠেছে. পথঢাবীবরাও এখানে মুগ্ধ না হয়ে পারে 
না । সনকজী পাঁতাগুলি গুছাতে গুছাতে জিজ্ঞাসা কবলেন : গুরুজী, ও হটে! 
কিগাছ £ 'ওদের কাণ্ড ও ডাল পালা একই রকমের, কিন্তু পাতা! আর ফল 
আলাদা | কচি কচি ফলের এমন মিটি গন্ধ ফুলের গন্ধ না জানি আরো কত 
মিষ্টি হোত । 

একটু হেসে বালানন্দজী বললেন £ এ সব গাছের ফুল হয় মাসুক 
থেকেই ফল ধরে । প্রকৃতিজীর অদ্ভুত স্থাষ্ট | থধিরাও তাই এই মহাবৃক্ষকে 
বস্পতির শ্রেণীভুক্ত করে গেছেন। এই যে ছুটি বিশাল বৃক্ষ দেখছ, এরা 
অশ্ব ও বট নামে পরিচিত | আর গুটি তিনেক বৃক্ষ এদের সঙ্গে এখানে 
মিশলেই স্থানটি পঞ্জবটি হোত । 


১২৬ ঘাড়খণ্ডের খছি 


সনকজী জিল্ঞাসা করলেন : সে তিনটি বৃক্ষ কিকি গুরুজী? 

বালানন্দ বললেন £ আমলকি, অশোক ও বিশ্ব । এখানে কিন্ত ও তিনটির 
একটিও নেই | তবুও এই স্থানটি খুবই মনোরম-_সাধন ভজনের উপযুক্ত | 
এখানে এসে যথেষ্ট আনন্দ পেলাম । 

সহসা জংলীবাবার আর্তনাদ শুনে উভয়েই চমকে উঠলেন । স্বর লক্ষ্য 
করে তাকাতেই এর! দেখতে পেলেন- অদূরে একটা ঝোপের সামনে ফ্াড়িয়ে 
জংলীবাব] ঠক ঠক করে কাপছেন আর তার ক থেকে আর্তস্বর নির্গত হচ্ছে 
--গুরুজী--মরলাম ? 

ওদিকে হয়েছে কি- অদ্ভুত পাঁতাগুলি একস্বানে জড়ো করে বাধবার 
উদ্দেশ্যে রজ্জুর মত কার্যকরি হয়, এমন কোন লতার সন্ধানে জংলীবাবা এগিয়ে 
যান। একট! ঝোপের মধ্যে তার বাঞ্ছিত লতার মত কোন বস্তু দেখে সেটি 
আহরণ করবার জন্য হাতের যষ্টিটি চালনা করতেই বুঝলেন যে, সকার নসীবে 
“রজ্্ুতে সপন্বয' কথাটা বাম্তব হয়ে উঠেছে । সেই লতাটি পরক্ষণে বিষধর 
সর্পে পরিণত হয়ে ফণ। বিস্তার করে তর্জতন করতে থাকে | জংলীবাবা সে 
অবস্থায় সঙ্গে পছিয়ে এসে স্থাহ্বুর মত নিশ্চল অবস্থায় াড়িয়ে এভাবে 
আর্তনাদ করে ওঠেন। সর্পাটও ফণ! উদ্যত করে দারুণ ক্রোধে দ্বলতে থাকে ; 
. পরম্পরে চোখাচোখি হতে জংলীবাবা এমনি বিহ্বল হয়ে পড়েন যে, তার 
চলচ্ছক্তি বিলুপ্ত হয়ে যায়| ক্রমে কঠস্বরও স্তব্ধ হয়--কেবলমাত্র পদযুগল 
থর্‌ থর্‌ করে কাপতে থাকে । 

সে এক অপুর্ব দৃশ্য! স্তপের মত ব্ক্ষব্গরী সমন্বিত সাধারণ একটি 
ঝোপের ভিতর থেকে অগাধারণ এক কৃষ্চকাঁয় মহাসর্প বিশাল ফণা উদ্যত করে 
বিসপিত-ভঙ্গিতে আন্দোলিত হচ্ছে; তার ক্ুদ্ধকণ্ঠের হিস হিস্‌ শষ এমন 
এফ ভীষণ মধুর ঝঙ্কার তুলছে, সন্নিহিত গাছগুলিও বুঝি আতঙ্কে শিউরে 
উঠছে--মান্ুুষের অবস্থার কথা বলাই বাছল্য ! 

স্বামীজী স্তব্ধ বিস্ময়ে এই বিচিত্র অথচ সাংঘাতিক শ্ৃশ্যার্ট দেখলেন এবং 
ব্যাপারটি উপলব্িও করলেন সনকজীও দুরে থেকেও আতঙ্কে এমনি 
আডষ্ট হয়ে পড়লেন যে, তীর মুখ দিয়ে কথা বের হল লা--আতঙ্ক-বিহ্বল 
দৃষ্টিতে শ্বামীজীর মুখের পাঁনে তাকালেন মান্র। 

স্বামী অবস্থাটি বুধলেন ! বুঝলেন যে, &ট ংলীবাব! সর্রদৃটিতে বিহ্বল 


যৌবনে ১২৭ 


হয়ে যে ভাবে কাপছে-হয়ত এখনি পড়ে যাবে, আর তৎক্ষণাৎ হে ভীষণ 
সাপট। তার দেছের উপর ঝাপিয়ে পড়ে স্বাভাবিক হিংম্্ প্রবৃত্তি তার চরিতার্থ 
করবে। তিনি আর অগ্রসর না হয়ে সেখানে দর হয়ে দাড়িয়ে তার স্বভাব" 
সিদ্ধ গল্তীর স্বরকে অধিকতর গম্ভীর ও উচ্চতম করে ওুকার ধবনির সঙ্গে 
স্তোত্রের ঝংকার তুললেন হ 

ও শান্তি: ও শান্তি; ও শান্তি: ও হরি ও। 

ও শান্তি: শান্তি: শান্তি: হরি ও। 
সহ নাব বত 
সহ নৌ ভুনভ্ত, 
সহ বীধ্যাং কববাবহৈ 
তেজস্বি নাবধীত মস্ত মা বিদ্বিষবহৈ-_ 

ও শাস্তিঃ ও শাস্তি: ও শাস্তি: ৩ হরি ও ॥ 
উদ্যত কঠস্বরকে উচ্চগ্রামে তুলে ওুঁকার শব্দটির মধ্যে সঙ্গীতের গুরু গম্ভীর 
রাগ ও রাগিণার পথখর করে বৈদিক স্তোত্রের আলাপ আবরিম্ত করলেন বালা” 
নন্জী | পুর্ব স্বর, অপূর্ব স্থর, অপুর্ব তার শষঙযোজনা' অপুর্ব ও অপরূপ 
সুরের ঝংকার উঠে সমগ্র বনভুমিকে বুঝি স্তন্ধ ও নিমগ্র করে তুলল । এমন 
কি, সেই হিংজ্রপ্রন্কতি তুদ্ধ মহসর্পটির কঠনি:স্থত হিস হিস্‌ শব্দের তঙ্জনও 
স্তব্ধ হয়ে গেল--ওষ্কার ধ্বনির গন্ভীর মধুর ঝঙ্কার বুঝি উদ্যত ফণা দংশনোন্মুখ 
প্রত্যক্ষ কালস্বরূপ বিষধরটির হিংম্র প্রবৃত্তি নিবৃত্তি ঘটিয়েছে । সুরের 
সঙ্গে সঙ্গে বালানন্নজী উপর দেহভার সমর্পণ করে উভয় হাতের করতালি 
সংযোগে এমন সুসঙ্গত তাল দিতে লাগলেন যে, ম্বদ্গ করতালের মিলিত 
সঙ্গতের কোন আভাষই বুঝ! গেল না। 

দেখতে দেখতে সর্পদেছের বিসপিত ভঙ্গী স্তব্ধ হয়ে গেল, পক্ষাস্তরে 
বালানন্দজীর উন্নত দেহখানিই তখন ভাবাবেগে দুলতে লাগল | ক্রমেই সুরের 
ঝংকার লীন হয়ে এল, সেই সঙ্গে সাপটিও ফণা প্কুচিত করে ধীরে ধীরে 
ঝোপের মধ্োই অর্ৃশ্য হয়ে গেল। 
তখনও বালানন্দজীর ক থেকে ভাবাবেগে ওক্কার ধবনির ঝংকার উর্ছে 

এবং উভয় করের মিলিত ধবনির সঙ্গে সমগ্র দেহখানি ধীরে ধীরে আলো লিত 
হচ্ছে । খাষি স্যষ্ট সুমধুর স্তোত্র এবং স্বকণ্ঠের অপরূপ সুর তার আপন সত্বাফে 


09৪ ৫5৫ ৫5€ (৫ 


১২৮ থাড়খণ্ডের থৰি 


বুঝি বিহবল করেছে বা হারিয়ে ফেলেছে । উভয় শিশ্ত এই সময় সাল্গিধ্য 
এসে ভক্তিনভ্রস্বরে আবাহন করলেন : ঘন্তা--গুরুজী ধন্য । 

ধীরে ধীরে প্রকৃতিস্ব হয়ে সম্মুখে তাকালেন বালানন্দজী । দেখলেন, 
ভংলীবাব! ও সনকজী তাঁর সামনে নতজানু হয়ে বসে তাকে সম্বর্ধনা করছে। 
তংক্ষণা্ বর্তমানে ফিরে এলেন বালানন্দজী | মধ হেসে বললেন ; কি 
প্রাণময় স্তোত্রের স্যইই করেছিলেন এই ভারতের খষি মহাত্বারা। দেখলে ত 
এর মাহাত্ব্য ? কালসর্পও হিংসা ভুলে শান্ত হয়ে চলে গেল । সত্যই থষি 
মহাত্বাদের শীস্তিমন্ত্র সকল অশান্তি বিনাশ করে জগতকে আনন্দ দেয়। কিন্ত 
কাল ধর্ধে ভারতবাঁসী এর মাহাত্ব্য ভুলে যাচ্ছে, এর প্রতি বিশ্বাস হারাচ্ছে। 
যাক, ভোমার একটা ফীড়া কেটে গেল জংলী; এখন আশ্রমে ফিরে চল । 

এই যে এতবড় একটা কাণ্ড হয়ে গেল, স্তে।ব্র গান করে সর্পের গ্রাস থেকে 
বাদানন্দজী বিপন্ন শিষ্তকে রক্ষা করলেন, তার জন্য কোন আত্মপ্লাঘা নেই, 
নিজের বাহাত্বরির জন্ত কোন রকম বাক্বিন্যাস নেই ; যেন কিছুই হয় নি-- 
এমনি সহজ ও স্বাভাবিক ভাবে সহাস্থে উভয় সাথীকে আশ্রমে ফিরে যাবার 
নির্দেশ দিয়ে নিজেই পিছনে-ফেলে-আসা পথে পুনরায় পদক্ষেপ করলেন । 


আট 

উভয় শিশ্ক-সাঁধীকে সঙ্গে করে বালানন্দজ্রী পুনরায় পুর্বের আশ্রয় স্থানে 
এসে যে দৃশ্াটর সম্মুখীন হন, যাত্রাকালেই তিনি সেট অনুমান করেছিলেন । 
পুর্ঘদিন নরসিংহগড়ের তরুণ রাজা সশিষ্য সাধু মহারাজকে তার রাজধানীতে 
নিয়ে যাবার অন্ত গীড়াপীড়ি করেছিলেন, একথা] আগেই বল৷ হয়েছে । সেই 
সুত্রে বালানন্দজীর আশঙ্কা ছিল, রাজধানীতে ফিরে গিয়ে ব্যাপারটার কথা 
রাজা রাজবাড়ীতে নিশ্চয়ই বলবেন ; তখন রাজপুরীর ভক্তিমতাঁ মহিলাদের 
পক্ষে সাধু দর্শনে আসা অসম্ভব নয়। সে অনুমান এখন বাস্তব হয়েছে 
দেখা গেল। 

টা্গু পথে উপরে উঠতে" উঠতেই উপর থেকে নারীকণ্ের মিশ্রধনি 
ভিনজমকেই আক্ট্ট করল। বালানন্দজী ম্বত্ব হেসে বললেন : তাড়াতাড়ি 
চলো, অতিথির! আমাদেরই প্রতীক্ষা করছেন মনে হচ্ছে। শিশ্ত্গয়ের মুখ 
ছুখানি আমন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে! ংলীবাব! বললেন : রাবাড়'র 


যৌবনে ১২৯ 


পরিজনরা আসবেন জেনেই ত ধসবার আসন নিয়ে চলেছি_-এর জন্তে 
সাপের মুখে পড়োছিলাম ; ঘটনাটা! মনে থাকবে । 

উপরের প্রশস্ত স্বানটিতে রাজমাতাকে পরিবেষ্টন করে রাজপরিবাঙ্গের 
কতিপয় মহিল! ও পরিচারিকাগণ সাধুজীর সম্বন্ধেই আলোচন] করছিলেন | 
সাধুসন্তের বাবহার্য কিছু কিছু দ্রব্যাদি দেখে তারা অন্থমান করোছলেন, 
সাধুজীরা সম্ভবতঃ সন্নিহিত ঝরণার জলে মানাদির জন্ত গিয়েছেন, এখনই 
ফিরে আসবেন । 

পিছনে ছুই সাথী, বালাণন্নজী অগ্রবততী হয়ে উপরে উঠতেই রাণীও 
সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে মাটির উপর বসে মাথা নত করে সাধুজীকে প্রণতি 
জানালেন । গুরুর সঙ্গে শিত্দ্বয়ও সভক্তি অচিত হলেন । 

বালানন্দজী ভক্তমতী রাজমাতার মাথার উপর হাতখানি রেখে মিট্স্বরে 
বললেন : কল্যাণ হোক, ভক্তিমতী হও। কিন্ত রাজবাড়ী থেকে এত 
কষ্ট করে এই দুম বনের মধ্যে কেন এসেছ মা? 'ও$, ওঠ তোমাদের পরণের 
দামী বস্ত্র সব মাটির পরশে বিশ্রী হয়ে যাচ্ছে যে! 

রাজমাতাকে অন্থনরণ করে অন্যান্ত মহিলাগণও গুরুজী ও তার হই 
শিশ্তাকে মাটির উপর নত হয়ে একে একে প্রণাম করছিলেন এই সময় । 
রাজমাত] বললেন 5 কত বড় পুণ্যের জোরে সাধু মহারাজের চরণ ম্পর্শ 
করতে পেরেছি-_এর জন্তে দেহকেও তুচ্ছ মনে করি প্রভু, বস্ত্র কোন্‌ ছার। 

সকলের ভক্তি নিবেদনের পর বালানন্দনী তার আসনের দিকে এগিয়ে 
চললেন এবং তারই মধ্যে অংলীবাবার দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে ইলিত করতেই 
দুই শিস্ত আনারকলির বড় বড় পাভাগুলি তাড়াতাড়ি খুলে শ্বামীজীর আসনের 
সম্মুখ দিকে বিছিয়ে দিয়ে বসবার জ্ন্ত রাজমাতা ও স্তর সঙ্গিনীদিগকে 
অনুরোধ জানালেন । 

বালানন্দজী ভার ম্বভাবসিদ্ধ রসিকতার স্বরে বললেন : সাধুদর্শনের 
জন্ত ভাগোর প্রশংসা করছিলেন, এখন সাধুর স্থানে এসে গাছের পাতায় বসে 
কল্পনা করুন স্বর্ণাসনে বসেছেন । 

রাজমাত। যুক্ত করে বললেন : সাধুস্বানের মাটিই আমাদের সোন। , 
যহারাজজী সেই সোনার উপর তার আঁসন পেতে আমাদের মনে লজ্জা দিচ্ছেম। 
আমর] জমিনের উপরেই বসবে! ॥ 


১৩৩ ঝাড়খত্ডের খাষি 


বালানল্দজী বললেন * তাহলে আমার ছুই ভক্ত শিষ্যু বড়ই ব্যথা পাবে। 
গত কাল রাজাজীর শুভাগমন হলে আমরা তাকে এখানে বসাতে পারি নি 
আসনের অভাবে । আজ জঙ্গল পরিত্রযায় বেরিয়ে ওরা এই পাহাগুলে। 
দেখেই স্থির করে ফেলে--এব পর কোন অতিথি সজ্জন এলে যত্ব করে 
বসাবে । পাতাগুলি বধবার সময় সাপের মুখে পড়েছিল এর, পরমাত্ম।র 
ক্কপায় বেঁচে গেছে | রাজমাত। প্রনম্ন মনে এই পত্রাপন গ্রহণ করলে ওৰ' 
ধন্য হবে। সঙ্গে যারা এসেছেন" তাদেরও ঝসবার জন্য অন্থবোধ করছি। 

রাজমাতা সবনয়ে নিবেদন করলেন £ আমরা সণধুসন্তের আশ্রমে আপি 
সেবার সন্কর নিয়ে; তাদের চরণতলে বম যথাশ।ক্ত সেবা অর্চনার সুযোগ 
পেলেই নাধীজন্মকে সার্থক মনে করি। বপবার জন্য আসন পা'বার, কিন্বা 
অভিখিদের মত আদর আপ্যায়নের কোন আশা নিয়ে আমি না। সাধু 
মহারাজের করুণার অস্ত নেই, মহারাজের শ্্ুাবাও গুরুর মত সদাশয়, তাই 
আমাদের জন্তু পাতার আপন বিছিয়ে দিয়েছেন । 

যাই হোক, রাজমাত্াকে বাধ্য হয়ে পত্রাঘন গ্রহণ কবতে হল; তার 
সঙ্গিনীর1ও সঙ্কুচিতভাবে আন্তৃত পাতাগুলির কিনার ঘেষে বসলেন। প্রৌঢা 
রাঁজমাতা বালানন্দজীর পুবণবণিত তপোবনবাসী খাষিম্বলভ অপরূপ আকৃতি 
দেখে মাতৃক্ষেহে এমনি অভিভূত হয়ে পড়লেন যে, কথা বলতে বলতে কেঁদেই 
আকুল হয়ে ওঠেন। তার এই ব্যাকুলতার কারণ হচ্ছে_সাধু মহারাজের 
জননী কেমন করে সংসারে ভীবন ধারণ করে আছেন? তিনি বারবার বলতে 
লাগলেন-_'আমি মা হলে--কখনই এমন ছেলেকে সম্স্যামী হতে দিতাম না-_ 
পথ আগলে পড়ে থাকতাম।" 

বালানন্দজী মু হেসে বললেন ১ আমি জানি, সব মায়ের অন্তরে একই 
প্রকারের ত্বেহের উত্স থাকে । আমার মা'ও ছিলেন এমনি স্বেহশীলা। 
ষ্টার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসবার সামর্থ আমার ছিল না বলেই, আমি 
তাঁর অগোচরে গতীর রাত্রে উপনয়নেশ পর দণ্ডীঘর থেকে গোপনে পালিয়ে 
আলি । তবে আমার মনে এই সান্তনা, নর্দামায়ী আশার স্লেহাতুরা মায়ের 
মনে শান্তি দিয়েছেন ! আর একথাও ঞ্রুব মতা রাজমাতা, সম্মআসের আকুতি 
অন্তবে জাগলে সংসার" তাকে ধরে রাখতে পারে মা। পুরাণে এমন শত 
শত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়! 


যৌবনে ১৩১ 


ব্বাজমাত1 বললেন : জানি । পণ্ডিতরা যখন পুরাণ পাঠ করেন, এ সব 
ত্যাগী সম্ভীনদের কথা শুনতে শুনতে আমি কান্নার ভেঙে পড়ি । তখন আমার 
মনে এই কথাই ম্প্ট হয়ে ওঠে মহারাজ -সত্তানের জন্যে মায়ের মনে যে 
অগাধ ম্নেহ দিয়েছেন ভগবান, সন্তানের ধুকে তার একটু কণাও দেন নি। 
সেই জন্তেই তারা কঠিন হয়ে মায়ের স্বেহের বাধন ছিড়ে ফেলে পালাতে 
পারে। যখনি মনে আমার এ কথ। জেগে ওঠে মহারাজজী, আনি তখন 
ব্যাকুল হয়ে উঠি--চোখের ধার কিছুতেই থামে না, কেবলই ভাবি, সস্তান 
মায়ের স্মেহকে তুচ্ছ ভেবে বৈরাগ্যকেই বড় জেনে তারই কাছে যেতে চায় 
কেন? হায়রে - সংসার। 

বলানন্দজী গম্ভীর হয়ে বললেন ; বৈরাগ্য কি সামান্য বস্তু রাজমাভ1। 
মাতার গর্ভদাত সম্ভানই পুর্ব জন্মের সুক্কৃতির পুণ্যে শৈশবেই বৈরাগ্যের 
সন্ধান পান। সব বাসনার যখন শেষ হয়েছে, ভোগের কোন কামমাই থাকে 
মা, জীবনের সেই অবস্থাকেই বৈরাগা বলে । সেইজন্যই, একথাও মায়েদের 
যনে রাঁখা উচিত, বহুকাল তপস্যা করেও যে বৈরাগ্য লাড করা যায় না, 
শৈশব জীবনেই সন্তান তার স্ুকতিবলে সেই পরম পদার্থ পেয়েছেন। তখন 
সে সম্তানকে আর ধরে রাখবার চেষ্টা করা মহ! ভুল) মায়ের ন্নেহও সেখানে 
ঘার মানতে বাধা: বুদ্ধিনতী মারের উচিত, শ্সেহ দিযে সন্তানের সঙ্কল্লে বাধা 
না দেওয়া । 

রাজমাতা মন দিয়ে সাধু মহারাজের কথাগুলি শুনলেন। কথাগুলি 
তাকে যেন মুগ্ধ করল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ ভাবে নীরব থেকে তার পর ধীরে 
ধীরে জিভ্ঞাসা করলেন ; আচ্ছা মহারাজজী, মনের সঙ্কপ্পকি সিদ্ধ হয়? 

বালানন্দজী উত্তর করলেন £ 'সঙ্কল্প শুদ্ধ হোনেসে সিদ্ধ হোগা ।' যদি 
সৎ তৃদ্ধ ব| পবিত্র সঙ্কল্প হয়, তাহলে নিশ্চয়ই সিদ্ধ হবে। 

রাজমাতা পুনরায় প্রশ্ন করলেন £ মহারাজজী, অংসারে ত কতরকমই 
লোক দেখি, তার মধ্যে স্্রখী হুংখাঁ, ভাল মন্দ কত প্রকৃতির লোকই থাকে! 
কিন্ত অনেকেরই জীবন নিস্কপ হয়_-কেন হয় জানতে ইচ্ছা করে। 

বালানন্দজী বললেন : সংসারে সবার জীবনই যদি সফল ও সার্থক হত 
প্লাজমাতা, তাহলে সংসারটাই স্বর্গ হয়ে উঠত। শুধু সংসারের মাহষই বা 
বলি কেন- জীবজন্থ, প্রকৃতির যধ্যেও এই নিশ্কলতা দেখি। আর কি অতাবের 


১৩২ ঝাড়খণ্ডেয ধবি 


দরুণ এই নিস্কল ভাব, তারই বিচার করে খধিরা যে কথা বলে গেছেন, 
আমি তারই উল্লেখ করছি £ 
''রাজ। ধর্মাং বিন, ছবির ্তপে। বিনা, জ্ঞানং বিনা যোগিন: | 
লক্ষ ,দীনং বিনা, ব্রতং তপো। বিনা, কঠং বিন] গীতিকা | 
শুরো যুদ্ধং বিনা, গজো মদং বিনা, তেজং বিন দামিনী, 
নারীং পুকষং বিনা, পুকষে! ধনং নিনা।, শুন্য সদ! তিষ্ঠাতি।'। 
অর্থাৎ_-ধর্মহীন রাজা, তপোবিমুখ দ্বিজ, জ্ঞানহীন যোগী, দানবিহীন 
ধনসম্পদ, তপশ্যাহীন ব্রত, স্রকঠবিহীন সঙ্গীত, যুদ্ধবিমুখ শৌর্য, মদমত্ততা 
শুন্য হস্তী, তেজে|হার! বিদ্যুৎ, স্বামী বঞ্চিত] নাপী এবং ধনহীন পুরুষের জীবন 
সব সময়েই নিশ্ষল হয়ে থাকে । 
রাজমাতা ন্সিগ্ব স্বরে বললেন £ কি ্পুন্দর কথা, বিচার করলে মানতেই 
হবে। সাধুসক্ষে এইত লাভ, শুনলে জ্ঞাবলাভ হয়। সংসারে কত জ্বালা, 
কত ঝন্ঝাট, সেখানে এ সব ছুর্লভ | 
বালানদ্নজী সহাম্যে বললেন: পরম সাধক তুলসীদাসজী তার গৌোহাতে 
ও এই কথা বলেছেন £. 
*সাধুসঙ্গ, হরি কথা, তুলসী ছুলত দোয়, 
স্মুত, দার, লহুমী, পাপীকোভি হোয়।” 
অর্থাৎ_-তুলসীদাস বলছেন যে, সাধুঙ্গ আর হগবশ্প্রসঙ্গ এ দুটোই 
সংসারে তুলভ- _পুণ্যবাঁন সুক্কতিশালীদের ভাগ্যেই এ ছুটি ল্য হয়। আর 
যদি স্ত্রী পুত্র সম্পদের কথা বল, যার] পাপী, এগুলি ত তারাও পেয়ে থাকে | 
রাজমাতা সানন্দে বললেন : খুব খাটি কথা । গৌঁসাইজী তাই স্ত্রী পুত্র 
সম্পত্তির নাম না করে সৎসঙ্গ আব হরিকথাকেই তুলতত বলেছেন। আর এই 
তুর্লভ বস্ত আমবাও এখানে এসে লাভ করলাম । 
বালানন্দজী রাজমাতার সময়োচিত কথা শুনে সন্তষ্ট হয়ে বদলেন : দেখ 
রাজমাতা, সাধূনঙ্গ আর হরিকথা যেমন দুর্লভ বলার গুণে মুখের কথাও 
তেমনি অমূল্য হয়ে থাকে । তাই গৌসাইজী বলেছেন £ 
“বুলি বোল্‌ অমূন্য হ্যায় যো যানে বোল | 
বুলি য্যায়স| বোলিয়ে__কাটে অন্দর তৌল ॥'' 
অর্থাং-.কথা বগতে জানলে শমূল্য কথা হয়ে থাকে । তাই যা"তা ন] 


যৌবান ১৩৩ 


ব'লে বিচাঁর করে ভেবে চিত্তে কথা বল। চাই, তখন সে কথায় অনেক কাজ 
হয়। 

রাজমাভা বললেন ১ কিন্তু মহারাঁজভী মানুষের মন যে অনেক সঙ্গয় সব 
গুলিয়ে দেয়, শুভ ইচ্ছা তাতে উলটে যায়--উলটে| দিকে ফিরিয়ে দেয় । 
মনকে বাগে আনবার কি উপায় প্রভুজী ? 

প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই বালানন্দজী বললেন £ উপায় হচ্ছে উল্ট যাওয়া । 
অর্থাৎ--মন বিগড়ে গেলে তাকে ঘুরিয়ে অন্তমুবী করা। অন্তর্ুখী বলতে, 
যে সদ্‌ ইচ্ছার কথা বললে, সেই ই51 কিম্বা ভগবদৃচিন্তা- সেই দিকে নিয়ে 
যাওয়া | মনকে আনন্তে আনা সাধনার একটা অঙ্গ | তাই একটা কথা আছে- 
“মনকে হারে হারিয়ে, মনকে জিতে জিং।' অর্থাৎ মনেয় বশ হলেই হেরে 
যাওয়া, আর মনকে জয় করতে পারিলেই জ্ হয়। সঙ্গঙ্গ থেকেই মনকে 
সংযত কর! যাঁয়। সঙ্গের প্রভাব সহজ নয়; কুদক্ষ সাধু মানুষকেও নষ্ট 
করে, আবার সংসঙ্গ মানুষের স্বভাব বদলে দেয়_ নষ্টপ্রকৃতির মানুষও 
সংসল্গের ফলে সৎ হয়, এইজন্তই সৎসঙ্গ একান্ত প্রয়োজন | 

সত্প্রদঙ্গের আলোচনায় রাজমাত। অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে বালানন্দজীকে 
অনুরোধ করলেন £ অন্তত: ছুচার দিনের জনও মহারাঁজজী আমাদের 
গরীবখানায় চলুন, শিল্ঠদেরও সঙ্জে নিন, আমর] সেখানে ভগবদ্প্রনঙ্গ 
আলোচনার ব্যবস্থা করব । বিখ পঁচিশ গায়ের লোক জড় হবে, সাঁধু দর্শনে 
তাদের জীবন ধন্ত করবে, আমরাও পরম আনন্দ পাঁব। 

বালানন্দদী বললেন £ রাজবাড়ীতে গিয়ে আতিখাগ্রহণ করা আমার পক্ষে 
এখন সত্যই অগন্তব, রাজমাতা। একটু জাগেই সন্কল্পের কথা বলেছি। 
নঞদা পরিক্রমার জন্থা আমাকেও সঙ্ষল্প গ্রহণ করতে হয়েছে । এই পরিক্রমা 
শেষ হবার পুর্ধে কোন পুহীর ভবনে বাস করবার সামর্থ আমার নেই, 
বাজমাতা। ত'হ:ল আমাকে সফল্পত্রষ্ট হতে হবে। তবে আমি আপনাকে 
কথা দিচ্ছি, পরিক্রমার পথে নরসিংগড়ের কাছাকাছি গেলে, আমি সংবাদ 
দেব। গে জম্নয় আপনার] যদি অস্থায়ী আশ্রয়স্বানে আসেন, ভগবদ্‌ 
আলোচন] করে আনন্দ লাভ করা যাবে । 

বুদ্ধিমতী রাজমাতা সাধু মহারাজের মনোভাব বুঝেই আর যাবার অদ্য 
অন্ুরোধ করলেন না। তবে সবিনয়ে বললেন £ সাধুসেবার জন্ত আমর! 


১৩৪ ঝাড়খণ্ডের ধাি 


সামান্ত কিছু উপচার সঙ্গে করে এনেছি, এগুলি দয়! করে গ্রহণ করতে হবে, 
নতুবা আমরা বড়ই ব্যথ! পাব। 

বালানন্দী বললেন £ আগের দিন রাঙ্জা তীর পার্শ্দদের সঙ্গে এখানে 
এসেছিলেন । যাবার সময় তিনি যে সব উপচার দিয়ে গেছেন, 'এখনো 
আমার শি্করা সঞ্চয় করে রেখেছেন । আবার কেন এত সবখাছা বস্ত্র সঙ্গে 
করে এনেছ, রাজমাতা 1 

নাজমাতা সবিনয়ে বললেন £ সাধু মহারাজ নিশ্চয়ই জ্ঞাত আছেন, 
দেবতা, সাধু ও রাজদর্শনে রিক্ত হস্তে যেতে নেই--কিছু না কিছু উপচার 
নিয়ে যাওয়া উচিত । আর, এভাবে কিছু ব্যয় ছলে অর্থ সার্থক হয়, যে দেয় 
তারও অনেক পুণিয হয়। আপনারাই ত বলে থাকেন মহারাজজী--“যিস্‌ ক! 
চুণ্‌, তিস্কা পুণ্‌ 1” তবে? 

হো হে! করে এবার হেসে উঠলেন মহারাজজী | বঙ্গলেন : ব্লাজমাতা 
বচার করে কথা বলায় আমার যুক্তি ফাস হয়ে গেল; আমার আপত্তিও 
তাহলে টিকল না। বেশ, তোমাদের যা অভিরুচি তাই কর। সাধুসেবায় 
যখন এনেছ, আমি আর বাধ] দেৰ না। 

বেতের তৈয়ারী বৃহৎ একটি পাত্র ভরে নানাবিধ উপচার, ফল, মিষ্টাল্প 
প্রন্থতি সঙ্গে এনেছিলেন রাজমাতা। মেই বৃহৎ পাত্রটি সিধারপে 
পরিচারিকারা মহারাজ্জীর সাযনে উপস্থিত করল ভাব ইজিতে। সনক ও 
অ্ংলীবাবার গম্ভীর দুখানি মুখ এখন হাসি ও আনন্দে ঝলমল করে উঠল । 


ময় 

সেই টিলার আশ্রয়ে আও সাতটি অহোরাত্রি কাটিয়ে সশিষ্য বালানন্দজী 
স্থানটি ত্যাগ করে পুনরায় পরিক্রমায় বেরবার জন্য উদ্ভোগী হলেন । শিষ্যদ্বয় 
আর আপত্তি করতে বা মিনতি ও অনুরোধে তার সঞ্ছল্প ভঙ্গ করতে ভরসা 
পেলেন না। রাজবাড়ীর প্রচুব পরিমাণ খাছ্যসম্ভারে এখানকার অস্থায়ী 
ভাণ্ডার পুর্ণ থাকায়, এই কট! দিন ক্ষুধার নিগ্রহের কথা এরা ভুলেই 
গিয়েছিলেন। নঙ্গে আনা একখানা লোহার থালার উপর যখন রাশিকৃত 
আটা ঢেলে হাতের থাবা! ভতি ঘৃত সংযোগ করে পরিপাটি রূপে মিশিরে 
অল ঢেলে «প্রচণ্ড উৎসাহে সেগুগি দলাইমলাই করতেন, ভখন অদুরবতী 


যৌবনে ১৩৫ 


আসনে উপবিষ্ট গুরুজী শ্বেত পাথবের একখণ্ড চাঙড়ের মত সেই বৃহদায়তন 
বস্তটির পানে তাকিয়ে বিস্ময়ে খিউরে উঠতেন। আপন মনে ভাবতেন 
তিনি, আট দশজন সাধারণ গৃহীর উদব পুবণেব উপযুক্ত আহার্য একা ছজনে 
উদরসাৎ করবার ভন্য « রমোত্াছে কত তদ্ধিবই করছে। মনে পড়ে- শাস্ত্র 
নির্দেশ ও গুরুর তত্বকথা--সঞ্চয় করা গৃহীর কর্তব্য, সন্প্যাপীর নয়। 
আহার্য সঞ্চিত থাকলে আলস্য বাড়ে, ভগবদ্‌ চিন্তায় বিদ্ব ঘটায় । বৌদ্ধ যুগে 
সংঘারামগুলি সাতউ্'জ্যেব শ্রেঠ খাছ্যপন্তাবে সর্বন1 পরিপুর্ণ থাকত বলেই, যত 
সব নিক্র্ণা আলশ্যপরাযণ লোক 'বুদ্ধং শবণম্‌ গচ্ছাণি' মন্ত্রে ঝংকার তুলে 
সাংঘারামগুলিতে প্রবেশ করত এবং সুলভ রাজভোগে পবিপুই হয়ে অন্ায়া- 
চারের এক একটি প্রতিযূতি হয়ে উঠ্ঠত। পবমপুকস তখাগত বুদ্ধদেবের 
মহান আদর্শ থেকে পবিভ্রষ্ট হয়েই ধর্মান্ধ অশোকেব আহলেই তার বিশাল 
সাআজ্যব্যাপী সংঘাবামগুলিই নৌদ্ধপর্সেন পতন ঘটীযেছিল। এই অন্যই 
আধ থামিবা সংসারত্যাগী মন্নযাপীদেব প্রতি কঙঠোব বাধনিষেধ প্রত্যাগ করতে 
বাব্য হয়েহিলেন | দীর্ঘ পবিক্রমাঘ সাখী ছুই শ্ল্তক বালানন্দও এইজস্যই 
আহার সম্প/ক সংযমী হবার জন্য প্রযই উপদেশ দিতেন। কিন্তু শিপাদের 
ভোগম্পৃহা তখনো]! বার নশীর মত উদ্দাম, মধ্যে মধো বাবাপ্রাপ্ত হলেও 
আকস্মিক ভাবে বোন সুযোগ ঘীলে, পুনবায সেই স্পৃহা দ্ুদখনীয় হয়ে 
উঠত। বালানন্দদী 9 অবস্থা বুঝে ইদানীং ভুফিভাব অবলম্বন করতে অভাস্ত 
হয়েছেন | স্যয় হলে স্বাভাবিক ভাবেই ভোগে আকজ্জাৰ তাবসান হবে 
ভেবেই নীরৰ খাকেন। খিষাদ্ববকে মহোংনাহে তিশজ.নর উপযুদ্ আহার্ঘ 
প্রস্তুত করতে ব্যস্ত দেখেন বালানন্দ। এখানে তাব শিষেধ বাকাও শিষ) দয় 
বিশ্বত হন। অথচ, আহার্ম প্রস্তুত হলে গুকৰ অংশ তাকে নিবেদন কবত্তে 
গিয়ে প্রতিবারহ তাথা দেখেছেন বে, গুকঞ্চী মাত্র ছুইখানি রুট এবং কিছু 
ভাজি সহাম্তে গ্রহণ করে অবশিই সব কিছুই পবিতাণ কবেছেন। তথাপি 
স্থলবুদ্ধি শিষ/ছ্টর সংজ্ঞ। হয় না। গুকবী এর পর মুখে আর কিছু বলেন 
না, নীরবে একটু হাসেন মাত্র। শিশ্বান্বয প্র:ত)কেই রুটব এক একটি 
ক্ষার শ্ত.প নিজেদের মানে সাঞিয়ে অবাক বিস্মযে লক্ষা করেন--মাত্র 
দ্ুইখানি কুটিই গুরুজীর ক্ষুন্নবাবণেব পক্ষে যখেষ্ট, এমন কি- সেই সামাগ্ত 
আহার্ষ থেকেই কীটপতঙ্গ বা পাক-পক্ষীরাও অংশ পায়। সাত্বিক প্রকৃতি 


১৬৬ ঝাডখণ্ডেষ খষি 


নিলো ভ গুরুজীর আহার সম্পর্কে এই কঠোর সংযম শিষ্যম্থয়কে এক এক 
সময় অভিভুত করে তুলে। 

র/জমাত। সাধু দর্শনে এসে বিদাঁয় নেবার সময় যখন প্রচুর খাসন্তার 
দিয়ে যান, তদ্দুষ্টে ছুই শিষ্যের আননযুগল আনন্দে ঝলমল করে ওঠে | 
তাদের সেই উৎফুল্ল ভঙ্গি গুরুজীর দৃষ্টি আক্ক্ট করায়, তিনিও তৎক্ষণাৎ 
রাজমাতাকে সহাস্টে বলেন; দেখুন রাজমাতা, আমার এই শিশু দুটির 
ভোগ-স্পুহায় এখনো শান্তিগল পড়েনি--ভোগ বলতে আমি অবশ্য উপযুক্ত 
উপচার দিয়ে আত্মাকে তুষ্ট করবার কথা বলঙ্ছি। কিন্তু দুর্গম বনপথ 
পরিক্রমার সময় ক্ষুধার্ত আত্মাকে সব সময় তৃপ্র করবার মত কোন উপচার 
ব। উপাদান পাওয়া যাঁয় না। বেচারাদের তথনকার অবস্থা দেখে আমার 
আত্মাও ব্যথিত হযে ওঠে । তখন পরমাত্বাভীব কছে প্রার্থনা জানাতে হয় 
এদের আত্বতৃপ্তির জন্তে। সেইসন্য আমি আপনাকে বলছি--এ দ্বটিকে বরং 
আপনি বাজবানীতে নিয়ে যান। এরাও তৃপ্তি পাবেন, আপনারাও নাধু দর্শন 
করে ধন্যা হবেন। 

বাঁলানন্দজীর মুখে একথ! শুনে রাজমাতা আনন্দে অধীর! হয়ে সনক ও 
জংলীবাবাকে সবিনয়ে অন্ুঝোধ করতে থাকেন £ সাধু মহারাজের শ্রীমুখের 
কথান্তাঁপনার! শুনলেন ত1 আমাদের পক্ষেও পরম সৌভাগ্য__মহারাজের 
কথামত আপনারা তাহলে আমাদের সঙ্গে রাজধানীতে চলুন। কোনপ্রকার 
অস্বিধা আপনাদের যাতে না হয়, আমর] সে চেট্া করব। আপনারা 
উঠন। 

অন্য সময় হলে শি্তদ্ধয় হয়ত রাঁজমাভার আন্গরোধ উপেক্ষা করভেন না: 
কিন্তু তারা জেনেছেন যে, তাদের ভাওার তখন পুর্ণ, অন্ততঃ একটি অপ্তাহ 
আত্মাকে পরিতৃপ্ত করবার মত পধ্যাপ্ত উপাদান সঞ্চিত আছে। এ অবস্থায় 
গুরুজীর মত মহাত্ব ব্যক্তির সঙ্গত্যাগ কর! নিরুরদ্ধিতার পরিচায়ক । তাই 
ভারাও বেশ দৃঢ় হয়ে রাজমাতার অনুরোধ উপেক্ষা করে বিশীতভাবে 
জানিয়েছিলেন যে. গুরুজী তাদের সুবিধার দিকে চেয়ে রাজমাতাকে যে 
ব্যবস্থার অন্য বলেছেন, তাদের পক্ষে সেট! খুব দৌভাগ্যের বিষয় হলেও, এই 
দুর্গম জঙ্গলে তর! কিছুতেই গুরুজীকে ত্যাগ করে যেতে পারেন না। তবে, 
এর পর রাধানী ব! নদীর কাছাকাছি কোন জায়গায় গিয়ে যদি গুরুজী 


যৌঘনে ১৩৭ 


আশ্রয় নেন, বরং সেখান থেকে তার রাজধনীতে গিয়ে রাজমাতার নিমন্ত্রণ 
রক্ষ1 করবেন । 

শিষ্তদের কথা শুনে তাঁদের প্রতি রাজযাতার শ্রদ্ধাভক্তি আবও 
গভীর হয়ে উঠে। এর পর তার! স্বতশ্ব ভাবে তাদের উদ্দেশে 
রাজধানীতে পদার্পণ করবাব অন্য আমন্রণ ও অহ্ুরোধ জানিয়ে বিদায় গ্রহণ 
করেন। 

সদলবলে রাজমাতার প্রস্থানের পর বালানন্দজী উভয় শিষ্কে সকৌতুকে 
লক্ষ্য করে বলেন : ভোগীদের বিষয়বুদ্ধি অকাটা বলে যে কথা শুনেছিলাম, 
তোমর! দেখিয়ে দিলে-পেটা সত্য । তোমাদের হিতের দিকে চেয়েই আমি 
প্রস্তাবটা! রাজমাতার কছে তুলেছিলাম ৷ কিন্তু ু'দিনে তোমাদের ভাড়ারে যে 
হরেকরকমের রাজভোগ সঞ্চিত হয়ে আছে, মে কথাটা ভুলে গিয়েছিলাম । 
তোমাদের বিষয়বুদ্ধি তৎক্ষণাৎ আমার ভুলটা ভেঙে দিলে । তাইত, 
রাজমাতার সামলে আর কোন কথাই বলতে পারলাম ন1। 

এরপর প্রত্যহ অভ্যাসমত বালানন্দজী তার পরিক্রমা বজায় রাখতেন । 
কিন্তু এ সময় উভয় শিল্ের পক্ষে গুরুজীর অনুসরণ করা সম্ভব হত না। 
একলন যেতেন, আর একজন আশ্রমে থেকে খাগ্যভাগ্ডার রক্ষা করতেন। 
বালানম্লজী তাদের মনোভাব বুঝতে পেরে নীরব থাকতেন। কথা বাড়িয়ে 
আর ভক্তদের যনে ব্যথার স্থা্টি করতেন না । 

ক্রমে খাগ্পম্ভার শেষ হয়ে এল এবং দেখতে দেখতে সাতটি অহোরাত্র 
অতীত হয়ে গেল। এখন যাত্রার কথা তুলতে শিশ্তুপ্ধযম় আর কোন আপত্তি 
তুললেন না--শীরবেই গুরুজীর অনুসরণ করলেন । 

কিছুক্ষণ পরেই পরিচিত পার্ততা জঙ্গলভুমি অতিক্রম করে তারা 
অপরিচিত এক হ্র্গম জঙ্গল মধ্যে প্রবিষ্ট হলেন। 

জংলীবাবা সভ্য়ে বললেন : গুরুজী, কোথায় সেধুচ্ছেন? এ যে 
ভয়ঙ্কর জঙ্গল! 

সনকও কথাটা সমর্থন করলেন : এখনই এই, এর পর যতই এগুব-- 
জঙ্গলের মধ্যেই ডুবে যেতে হবে | 

গম্তীরভাবে বালামন্দ বললেন £ জঙ্গল কি এই প্রথম দেখছ--না, এট! 
নুতন কিছু বিরাট কাণ্ড? 


১৩1 বাঁড়খণ্ডের খষি 


সনক উত্তর দিলেন ₹ নডুন নয়, তবে এর আগে গোড়াতেই জঙ্গলের 
এমন ভয়ঙ্কর বূপ কোথাও দেখিনি । 

বালানন্দ বললেন £ গোড়াতেই ভয়ঙ্কর দেখে তোমর1 যেষন ভয় পেয়েছ, 
আমারও তেমনি প্রচুর আনন্দ হয়েছে । এখন এই ভয়ঙ্করের হাত থেকে 
তোমাদের নিষ্কৃতির একট] মাত্র উপায় আছে। 

উভয়েই জিজ্ঞাস দুটিতে গরুজীর দিকে তাকালেন। গুরুজীও 
এ অবস্থায় বিশেষ কোন ভুমিকা না করেই বলতে আরন্ত 
করলেন $ ভোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে--নরদিংহগড়ের রাজমাতা। তাঁদের 
বাড়ীতে যাবার ভন্ত যে পথের কথা সেদিন বলেছিলেন, সে পথ আমরা এইমাত্র 
ছেড়ে এসেছি | তোমর1] মনে করলে খানিকটা পথ ফিরে গিয়ে এখনি সে 
পথ ধরতে পার | আর, মনে করে দেখ--রাজমাঙ'র কাছে তোমরা দুজনেই 
কথ! দিয়েছ, স্রযোগ স্গুবিয়া হলেই রাজবাড়ীতে যাবে । আমিও বলছি, 
ছু দশ দিন সেথানে থেকে, রাজমাতার শ্রদ্ধার সঙ্গে সেবা ভক্তি নিয়ে, আবার 
ফিরে এস। আর, তোঁষদাও ভ জান, আমাকে এখন নর্রদীমায়ীর কোলে 
আশ্রয় নেবার জন্থেই যেতে হবে, পথের মাঝে কিন্বা জঙ্গলে কোথাও বিশ্রাম 
করবার ইচ্ছ। মেই_- অবিরাম যাত্রা, কেবলই-__হরদন | নর্শদামায়ীকে স্পর্শ 
ন।করে আমার আর নিব্বত্তি নেই। এভাবে আমার সঙ্গে ক্রমাগত জঙল 
ভেঙে চলতে তোমাদের ও কষ্ট হবে, তাই এ প্রস্তাব করেছি। 

প্রস্তাবটি উভয়ের মনে বীতিমত আনদের স্থটু খরল। গুরুজীর 
ক্ষপাতে যখন জঙ্গলে রাগার অঙ্গে জানাশোন।] হয়ে গেছে, বাজমাভাও 
আমন্ত্রণ করে গেছেণ , আর, ফেলে আসা পথের এ বাক থেকে রাজধানীর 
ঘুরত্বও যখন খুব বেশী নয়। এখনই যদি রওনা হওয়1যায়, দিনে দিনেই 
রাজধানীতে পৌছানো সন্তব হবে। কিন্তু পরক্ষণেই যেই গুরুজীর কথা 
মনে পড়ে যাঁয়__তাকে ছেড়ে যেতে হবে, অমনি ত্ুটো। মঘই এক শঙ্গে মুসড়ে 
পড়ে। সনকজী বললেন ১ আমর] বেশ বুঝতে পাবি, গুরুজীর আদেশ 
মাথায় করে রাজবাড়ীর দিকে গেলে, আরও দিন কতক শ্খে যত্বে সেখানে 
থাকতে পারব। কিন্তু তেমনি আপনার সঙ্গ হারাব। একদিকে সুখ, 
আনন্দ, আর একদিকে বিরহ হুশ্চিন্তা। আপনাকে কিন্তু ছেঁড়ে যেতে আমাদের 
মল চাইছে না গুরুজী ! 


যৌবলে ১৩৪ 


অংলীবাবাও সঙ্গে সঙ্গে অধুরোধ করলেন : হুদিকই বজায় থাকে গুরুজী, 
আপনিও যর্দি আমাদের সঙ্গে রাজধাশীতে যাবার ইচ্ছাটি প্রকাশ করেন। 
তাহলে আমরাও ধন্য হই। 

বালানন্দের প্রপন্ন মুখখানা পুনরায় গম্ভীর হয়ে উঠল জংলীবাবার অন্গচিত 
কথাগুলি গুনে । তৎক্ষণাৎ তিনি সংযতকঠে বললেন £ সব জেনে শুনেও 
তোমরা যদি আমাকে বিরক্ত কর তাহলে আমার অবস্থা কি হয় বলত? রাজা 
ও রাজযাতার অন্নরোধও যেখানে রাখতে পারি নি, এ কাজ আমার পক্ষে 
অনম্ভব বলেই জানবে | আমার সঙ্গ তোষযর1 আবার পাবে । রাজধানী থেকে 
নর্দার তীর লক্ষ্য করে এলেই আমার সঙ্গে তোমাদের সাক্ষাৎ হবে। আমি 
এবার নর্শদামায়ীর আল্তানায় গিয়েই আশ্রয় নেব। তোমরা আর সময় নষ্ট 
না করে, ফিরে গিয়ে এ পথ ধর, আমি আশীবাদ করছি, তোমাদের 
কল্যাণ হোক । 

এমন ম্েহাদ্র্বরে কথাগুপি বলে বালানদ্দভ্রী উভয়কে অভিভুত 
করলেন যে, তারা উভয়েই তার বচনে আকৃষ্ট হয়ে সাশ্রুলোচনে বিদায় নিয়ে 
সেই পথেই ফিরে যেতে বাধা হবেন । বালানন্দজী একাই প্রবেশ করলেন 
জনহীন সেই ভয়ঙ্কর অরণোর মধ্যে--পদাক্ষেপের যোগা মুক্ত স্বানটুকুর দিকে 
লক্ষা রেখে । 

যেসব অরণো সাধারণত মাঁহ্ষের গমনাগমন জনিত পদচিহ্ন পড়ে না, 
গেখানে পথের সন্ধান করে অগ্রপর হওয়াও কঠিন। কিন্তু দগর্ম হুর্ভেছ্ 
দিগন্তবিদারী অরণ্য অস্ভের পক্ষে যতই ভয়াবহ বিপজ্জনক বা বিভীষিকা স্বরূপ 
হউক না কেন, আশৈশব অরণ্য ভ্রমণে অভাম্ত অবাবসায়শীল পরিব্রাজকের 
পক্ষে সেই ভয়ঙ্কর অরণ্যই যেন অপরূপ রহশ্যময়ীর মত বহু অজ্ঞাত ও 
অদৃষ্টপূর্ব তথা প্রনর্শনে প্রনুদ্ধ করে তাকে হাতছানি দিয়ে আহ্বান করতে 
লাগল এবং তিনিও মে আহ্বাম স্বীকার করে কৌতুহলা্রাস্তচিত্তে ভার মধ্য 
ঝাপিয়ে পড়লেন। প্রথমে হয়ত অরণ্যের স্বাভাবিক গভীরতার মধ্যে 
পদক্ষেপ করবার মত ছিদ্রেরও সন্ধান মিলছিল না, কিন্ত ক্রয়ে ক্ুমে দেখতে 
পেলেন, মেই নিচ্ছিদ্্র অরণ্যাঞ্চলে স্বয়ং প্রক্কতিদেবীই যেন স্বহস্তে চলার পথ 
পচন] করতে করতে অগ্রবতিণী হয়ে চলেছেন ; তখন আর পথের অন্ত কোন 
চিন্তা চিত্তকে ক্ষুৰ করবার অবমর পেল ন1। 


১৪০ ঝাঁড়খণ্ডেব ধাধি 


সঙগীহপ্ন বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছেন, বাঁলালপ্দ এখন একাই এই নিবিড় 
ঘনমধো ধীয়ে ধীরে এগিয়ে চলেছেন | এক হাতে দীর্থ দণ্ড, অন্য হাতে 
কমগুলু ম্বদ্ধে একটা ঝোলা | নিভাঁক, নিশ্চিম্ত ও উদ্দেগহীন ফ্ভঠার ভ্গি। 
মধ্যে মধ্যে এক একটা বন্তজস্ত দণ্ডধাবী আগস্তকের দিকে একবার অপাজে 
তাকিয়ে পরক্ষণে কর্কশস্বরে অরণ্যের নিস্তন্ধত। ভেজে দিযে আঁরও গভীব ও 
নিরাপদ অংশ লক্ষ্য করে ধাবিত হচ্ছে। কোথাও বা কোন একটা বৃহৎ 
গাছের স্ুল শাখায় দেহেব অধিকাংশ পাক দিষে বেষ্টন কবে অজগর জাতীয় 
এক একটা সাপ শুধু করাল মুখখানা নীচে ঝুলিয়ে দোল খাচ্ছে। কিন 
নিভাঁক পবিব্রাজকেব পক্ষে এসবই পুর্বপবিচিত, স্ুতবাঁং অভ্যস্ত কৌশলে 
এদেব অতিক্রম করেই অগ্রসর হঙ্গেন। এই অবস্থায় সহসা! শিষ্যদ্বয়েব কথা 
প্ঠার মনে পড়ল | এ ধাবমান বন্য জন্ত ও বৃক্ষশাখায় দোছ্লামান সরিস্যপদের 
সম্পর্কে ভারা কতই শঞ্ষিত হয়ে উঠভ! ক্রমে ক্রমে বালানন্দ যতই অগ্রসর 
হন, অরণ্যের অংশ বিশেষও যেন ক্রমশঃ গভীরতখ হয়ে বাধার স্টি কষে। 
কিন্তু সেখানে স্থিরভাবে ছাড়িয়ে আকাশেব দিকে তাকিয়ে সময় নির্ণয় করবার 
কোন উপায়ই নাই | অথচ, সন্ধ্যার পুর্ব তাঁকে এই অধণ্য অতিক্রম করতেই 
হযে । অগত্যা তাকে আরও ছ্রুত পদচালন1 করতে হল | 

সহসা ভীষণ একট] গর্জনে সমগ্র বনভূমি যেন কেঁপে উঠল। এতদ্মণ 
কীট পতঙ্গের যে মিশ্র একটা একটানা সুর উঠেছিল, সেও অন্ধ হয়ে গেল | 
আবার সেইরূপ গর্জন, বালানন্দেৰ মনে হলো--গর্ভনেব ধবমি যেন ক্রমশ: 
নিকটতর হচ্ছে। সাধারণতঃ এ তর্জন বাঁধ ছড়া অপর কোন জত্তব যে 
নয়, বালানন্দ সেটা অনুমান করলেন । তখন তিনি দণ্ডটি হাতে করে এক 
স্বানে সোঁজ। হয়ে দাড়ালেন । এই সময় আবার সেই গর্জন, এবং এবারকার 
গর্জন যেন আরে] গন্ভীর ও কর্ণবিদারী | সহসা সামনের দিকে তাকাত্তেই 
তার চোখ ঘ্টো বিস্ফারিত হয়ে উঠল ' দেখলেন, বিরাঁটকায় একট! বাধ 
ধনসন্সিবিট্ট কতকগুলি বড় বড় গাছের তলদেশে বসে এ ভাবে গন করছে। 
বালানন্দজীও তৎক্ষণাৎ তার হাতের দণ্ডটি মাটির উপর গবলে ঠুকে বাঘের 
অলম্ত চোঁখঘুটোর সঙ্গে নিজের দৃষ্টি সংলগ্র করলেন | বাটা এ অবস্থায় আর 
একবার হষ্কার করে যেই ভুমির উপর পশধে তার লাঙ্গুলটি আছুড়াতে লাগল, 
অমনি মেই সময় গাছের উপর থেকে একি বাপর যেন পদ্থলিত হয়ে লীচে 


যৌবনে ১৪১ 


পড়ে শেল | বাধটাঁও বুঝি এই স্থযোগটিরই প্রতীক্ষা করছিল। বাঘের 
গর্জনে ত্রস্ত হয়ে বানরট] ভুপতিত হতেই বাঘটাও তার উপর লাফিয়ে পড়ে 
তাকে মুখে করে পলকের মধ্যে অদ্বশ্ট হয়ে গেল। সঙ্গে মলে ষাছের উপরে 
উপবিষ্ঠ বানরগ্লো সমস্বরে আর্ত চীৎকার তুলে গাছের পর গাছে লাফিয়ে 
লাফিয়ে বাঘট'র অন্ুসণে করে ধাবিত হলো । বালানন্দজী অবাক বিস্ময়ে 
এই অদ্ভুত দবশ্য দেখতে লাগলেন | তার বুঝতে বিলম্ব হলো না যে, নীচে বসে 
সগর্জনে উপরের কপিকুলকে ব্রস্ত করে আহার সংগ্রহ করাই ছিল বাধটার 
উদ্দেশ্য | সেইজন্তই সে তার মত দণ্ধারী দঁচচেতা নিভাঁক আগন্তকটির প্রতি 
বিশেষ মনোযোগ দেয় নাই। এ অবস্থায় বানরটার ছভোগের কথা ভেবে 
তিনি মনে মনে এত্যন্ত বেদনা পেলেন, কিন্তু হতভাগ্য লীবটিকে বাধের কবল 
থেকে রক্ষা ঘরবার তখন আর কোন উপায়ই ছিল না। 

এর পর তিনি ভাবতে লাগলেন, কোন্‌ পথটি ধরে বনভুমি অতিক্রমের চেষ্টা 
করবেন? যে দিকে বাঘটা ছুটে গেছে, সে পথ যে বিপজ্জনক, হিংঅ 
জীবজত্তর প্রাচুর্ধ্য সে দিকে, এটা অনুমান করেই, তিনি অন্ত কোন পথের 
সন্ধান করতে লাগলেন | বলা বাহুল্য, বনপথে প্রবেশ করে অবধি বালানন্দজী 
নর্মদাযায়ীকে স্মরণ করে, তারই শরণাপন্ন হন। তার দৃঁঢ ধারণা, দৈবী 
কপায় তিনি সকল বিপর্তি অতিঞ্ুম করে নর্শদার পবিত্র সৈকতে উপস্থিত 
হতে পারবেন | সকাতরে তণকেই আহ্বান করছেন বালানম্দজী, এমন সময় 
একটা প্রকাও সজারু ত।রই পাশ দিয়ে সেই গভীর বনের আর একট] দিক 
লক্ষ্য করে তীরের :বগে ছুটে চলে গেল বালানন্দ, আর কালবিলম্থ না 
করে, সেই সজারুটার অনুলরণ করে তারই গমন পথ লক্ষ্য করে এগিয়ে 
চললেন | তার মনে হলো, এই তীষণ কণ্টকাকীর্ণ জন্তটা তার সর্বাঙের 
তীক্ষ কণ্টকগুলি সংযত করে যে দিকে অনায়াসে ধাবিত হলো, সেখানে 
কোন বিদ্ব না ঘটাই সম্ভব এবং অভিষ্ট পথের সন্ধানও এদিকে মিলতে পারে | 


দশ 
বালানন্দজীর অন্থুমান বাস্তবে পরিণত হল | ধাবমান সজারুটির অহ্থগমন 
করে খানিকট এগিয়ে যেতেই ধনপন্লিবিষ্ট তরুরাজি-সমদ্বিত নিবিতি অরণ্যের 
এক অংশ তাকে চমৎকত করল | এদিকের বন-সম্পদ ক্রমশঃ যেন দেউলে 


১৪২ ঝাড়খণ্ডের ধষি 


হয়ে এসেছে ' বড় বড় বৃক্ষগুলির দিগম্তবিপারী পে সমারোহ নেই, মাঝে 
মাঝে এক একটা পাথরের স্ত.প যেন নিভাঁক ভাবে মাথা ছলে বনানীর নৈরন্তর্ধে 
বিদ্বের ত্ষ্টি করছে। স্থানে স্বানে কুর্ধাককৃতি উর্বর ভুমি। কোনপ্রকার 
উত্তিদের সংস্পর্শও নেই । সম্ভবত, স্বাস্ত্যরক্ষা তথা বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত আহার্ব 
প্রাপ্তির অভাবেই বনানীর অগ্রগতি এভাবে বিদ্বিত হয়েছে । বহক্ষণ ধরে 
বিবিধ বিস্বুদঙ্কুল অরণাভুমি পর্যটনে বালানন্দজী শ্রান্ত হয়েছিলেন ; এখানে 
এসেই একটা স্তপের তলদেশে একখানা পাথরের উপর আশ্রয় নিলেন । 
হাতের দণ্ড ও কাঁধের ঝুলিঝোলাগুলি হুইপাশে রেখে প্রন্কত্তির এই বিচিত্র 
লীলার কথা ভাবতে লাগলেন | মাত্র এক দণ্ডের পথ, তাব পরেই কি গভাঁর 
মহাবনের সমারোহ, পদে পদে দারুণ বিদ্ব, জাসন্ন মৃতার বিভীষিকা, অথচ 
অপরাংশে সেই বিরাট বিশাল অরণ্যানীব শোচনীয় অবস্থা | চিন্তার সঙ্গে 
সঙ্গে বালানন্দজী ধ্যানমগ্র হলেন-_দৈহিক শাস্তি, যাঁনসিক অবসাদ, 
সারাদিনের ক্ষুধা তৃষ্গ সবই নিশ্চিহা হয়ে গেল | 

একবার ধ্যানষগ্র হলে সমাধিগ্রাপ্তির যত ভার অবস্থা হয়। তাঁকে 
তখন দেখলে স্বভাবতই মান এই প্রশ্রের উদ্রেক হয় যে, কোম জীবস্ত 
বাক্তি এমন নিশ্চল ভাবে দণ্ডের পর দণ্ড ধরে কি করে ধ্যানমগ্র থাকেন। 
যখনই পথশ্রমজনিত ক্লান্তি অথবা ক্ষুধা ও তৃঞ্জা তিনি অনুভব করতেন, 
কোনও নিরাপদ স্বান বেছে নিয়ে সেইখানেই পরমাত্বাকে স্মরণ করে ধ্যানমগ্ন 
হতেন-- ঘণ্টার পর ঘণ্টা! সেই অবস্থায় অতিবাহিত হয়। আবার ঠিক সময়েই 
যেন পরমাত্বাই কোন কিছু ঘটনাকে উপলক্ষ করে আবার তাকে অচেতন করে 
দেন। এমন ঘটন।| বহু ক্ষেত্রেই ঘটেছে। 

এদিনও বালানন্প ধ্যানে বসেই গভীরভাবে সমাধিমগ্র হলেন । পারিপাশ্বক 
শাস্তি ও নিশ্চিন্ত পরিবেশ তাকে যেন অভয় দেয়; ক্ষুধা, বিশেষত: তৃষ্ণার 
প্রাচুর্যে তিনি ক্ষু হয়েই ধেন আত্বশীগপনের উৎসাহে পরমাত্বার চরণেই 
অবশেষে আত্মসমর্পণ করেন । অবিলম্বেই গভীর সমাধিব অবস্থা । মিকটে 
কেউ নেই, সম্পূর্ণ অজানা ও অপরিচিন স্বান, ভেননি নুতন পরিবেশ | সমাধি 
থেকে লাশ্রত করতে কেউ নেই! কিস্ত পরমাত্ার প্রতি একান্ত বিশ্বাসী ভাপল 
তার প্রতিই নির্ভর করে সমাধিমগ্র হলেন। দণ্ডের পর দণ্ড অভীত হতে 
থাকে, সুর্বকবোজ্বস উদ্ভাকাশের দীপ্তি শান হয়ে আসে, কিস্ত সাধু বালানন্দের 


যৌবনে ১৪৩ 


ছ'স নেই! বহক্ষণ এই অবস্থায় অতীত হল । এমন সময় ক্রোডদেশে তুহিন 
হ্বীতল একটা স্পর্শের সঙ্গে ভীষণ ভারক্রান্ত অবস্থা তাকে সচেতন করে দিল। 
সেই অবস্থায় উপলব্ধি করলেন, কে যেন কতগুলি বড় বড় তুষারের খণ্ড ক্রযাগত 
তার ক্রে!ডের উপর গুটিকার শত গড়িয়ে দিচ্ছে। ধ্যানভঙ্গ হতেই নিষীলিত 
ছুটি চোখও খুলে গেল। কিন্ত তৎক্ষণাৎ যে দৃশ্য তার চোখের উপর সুস্পষ্ট 
হল, তাতে যে কোন 'অসমসাহমী বীর পুরুষও বিল্ময়াতষ্কে বিহ্বল না হয়ে 
পারেন না। 

বালান'দজী নিষ্পলক নয়নে দেখলেন -দশ বারে! হাত দীর্ঘ ও সেই 
অনুপাতে স্থুপ এক ভীষণ অঞরগব তাব ক্রোড়ের উপব দিয়ে ধারে ধীরে তার 
সেই খিশাল দেহ নিণে পুর্বোক্ত মহাবন অভিযুখে চলেছে । শুধু মীরবে 
এইভ।বে যাওয়! ল্য, তার মুখর হিস্‌ হিন্‌ শক্রে সঙ্গে নিঃশ্বাসের শব্দ মিশে 
এমন একটা নৈকৃতিক ধ্বনির স্ষ্টি করেছে. তার সুর কানে প্রবিষ্ট হলেই 
আতঙ্কে সর্ধাঙ্গ হিম হয়ে যায়। স্থিবভাবে খসে সগ্ভোজাগ্রত সাধু তার 
ক্রোড়দেশ বাহিত সেই গাক্ষাৎ মৃত্রাতুল্য মহ] সগীস্থপের ভাবণ সুন্দর গতিভঙ্গি 
দেখতে লাগলেন। 

সর্পদেহের অর্দাংশ অতিক্রান্ত হয়েছে তাব দীর্ঘ দেহের নিন্নাঙ্গ অবলম্বন 
কবে। যদি সাপট] ভানতে পারত যে, কোন দৃঃসাহমা মানুষ এই নিন 
স্থানে স্তপেব সংস্পর্শে প্রস্তবের মত অসাড় অবস্থায় ধ্যানমপগ্র, যদি মানুষটির 
মুখশ্রী সেই ভীষণ ভীবখির জ্বলন্ত হুটি চোখের দৃট্র-পরিধির মধ্য ধর] পড়ত, 
তাহলে এতক্ষণ সাধুদেহ তার উদর মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে যহাঁসমাধি লাভ করত | 
এখনো যদি জাগ্রত স্পর্শের প্রভাব এই দুর্দান্ত জীবটি কোন প্রকারে উপলব্ধি 
কবে, তখশি বিসগশিত লম্বনান দেছটিকে ঘুবিয়ে নিয়ে মুখব্যাদন করাও আশ্চর্য 
নয় এই মছ1 অজগব ভাতীয় জীবটিত্ন পক্ষে । সর্পপ্রক্কতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও 
বিশেষন্ত সাধু এ অবস্থায় শ্বামপ্রশ্বাসপকেও বুঝি আয়ন্ত করে স্থিরভাবে বসে 
রইলেন | এই সময় তার ইচ্ছা করছিল, এই হুর্ণভদর্শন বিচিত্র অজগরটির 
সুচিত্রিত অপরূপ দেছটির উপর ধীরে ধীরে করম্পর্শে অঙ্গ সংবাহন করে 
পৌখ্যস্থাপনে সচেষ্ট হন । কিন্তু তার মুখনিঃস্থত তর্জন থেকে দারুণ একটা 
হিংসার আভায পেয়ে ত্(কে সেই প্রচেষ্টা থেকে নিরস্ত হতে হল। 

অবশেষে অজগরের সংস্পর্শ থেকে তিনি পেলেন অব্যাহতি । সমস্ত দেহ 


১৪৪ ঝাড়খণ্ডের গ্বাষি 


তখন সর্পদেহের তুহিন স্পর্শে যেন আড়ূষ্ট। তথাপি, তিনি সেইভাবে বসে 
সাপটির অগ্রগতির ভঙ্গি দেখতে লাগলেন । ক্রমে দুরবতাঁ বননধ্যে অজগরটি 
অন্শ্ঠ হতেই বালাননগও তার দও ও ঝুলি, কমণ্ুলু নিয়ে উঠে পড়লেন । 
আকাশের দিকে তাকিয়ে দুর্যের অবস্থাৃ্টে বুঝলেন, অপরাহ উপস্থিত । এই 
পথেই তাকে ক্রতগতিতে ধাবিত হতে হবে । হুর্গম বনানী মধ্যে যখন পথের 
স্জান পেয়েছেন, নর্দদামায়ীর ক্রোড়ের পরশও তিনি পাবেন, পাওয়া চাইই | 

যেমন সঙল্প, শঙ্গে সঙ্গে কাধ্যেষ্ঘম । আবার জ্রুতপদে চলল পরিক্রমা । 
তিনি যে পথে চলেছেন--নদীর অববাহিকা বলেই বুঝতে পারলেম। অর্থাৎ 
বর্ধায় নদীবক্ষে বন্তা এলে, এই স্বিস্তীর্ণ অঞ্চল যেমন প্লাবিত হয; অন্ত সময় 
স্বাভাবিক অবস্থায় আকাশ-বন্ায় সমপ্র অঞ্চল জলময় হলে, সমস্ত জলরাশি 
শ্রোতের বেগে নদীবক্ষে পড়ে তাকে পরিপুর্ণ করে তোলে । অমির উপব 
কান পেতে এবং পারিপাশিক লক্ষণগুলি দেখে ক্ষিপ্ত্যপতেজমরুৎব্যোয়ে অভিষ্ত 
পর্যটক বাঁল।নন্দ সত্য উপলব্ধি করেন। 

দিকদর্শন ও অনুভুক্তির প্রত্যক্ষ যন্ত্-দেবত! সুর্যের অস্তিত্ব যতক্ষণ আকাশে 
প্রকাশ পায়, বালানন্দের পক্ষে সময়াটর অবধারণ কর] অনেকট। সহজ হয়। 
ক্রমে সেই স্বর্ধ যন্ত্রিকাও আকাশ পথে আদৃশ্ন হতে থাকে । বালানন্প উদ্বিগ্নভাবে 
আরও ত্রত পদচালনা করেন--সন্ধ্যার পুবে ই তাকে নদীকুলে উপনীত হতে 
হবে। অবগাহন আঁনের আনন্দ ভাকে যেন হাতছানি দিয়ে আহবান করে | 

কিন্তু আরও অনেকখানি পথ অতিক্রমের পর তিনি অন্তরে অন্তরে 
দারুণ পিপাসা! অন্ত্রত্ব করে অস্থির হগে ওঠেন। কয়েক ঘণ্ট। পুধে আর 
এফবার এমনি তৃষ্ণার আগ্রহ তাকে ক্রিষ্ট করেছিল, তিনি তখন ধ্যানমণ্র 
হয়ে তৃষ্ঠাকে জয় করেছিলেন। কিন্ত এতক্ষণে সেই তৃষ্ণা পুনরায় প্রকট 
হয়ে বালনিন্দকেই আর্ত করে ঠুলেছে। তখনে] সন্ধ্যার বিলম্ব আছে, 
সুতরাং জলপানে বাধা নেই; কিন্তু জল কোথায়? তিনি তীক্ষ দৃষ্টিতে 
চতুদিক লক্ষ্য করে দেখেছেশ--কোথাও কোন ওলঙ্গাশয়ের অত্তিত্বও নেই। 
অথচ তিনি অন্তরে অন্তরে উপলদ্ধি করেছেন, আর বেশী দুর নাই-_তিনি 
যেন তার সত্বা উপলব্ধি করছেন, নর্মদামায়ীও যেন তার প্রতি প্রসঙ্ন হযে 
অয় পাগি উদ্ধত করে তাঁকে আহ্বান করছেন--ওরে ছেলে, আয়, আয়, 
জায়। আমি যে মায়ের ম্েহ দরদ নিয়ে তোর জন্চে প্রতীক্ষা করছি। 


'ঘোবদে ১৪৪ 


কিন্তু পক্ষান্তরে নর্মনামায়ীর আবার এ কি অভ্ভুত মায়া! বালানশ্দেন্ 

পথপর্যটনে চির অভ্যন্ত অক্রান্ত ছুটি পযে ক্রমশঃ অশক্ত হয়ে তার চিত্তের 
প্রমত্ত আগ্রহকে ও বাধা দিচ্ছে! সেই নলে তৃষ্ণাও ত্ণিবার হয়ে উঠেছে, 
অথচ কোথাও জলের কোন নিদর্শনই পাওয়া যাচ্ছে না _আর্ডকঠে 
একাস্ত অশক্ত ও অশান্ত পদযুগলকে কোন রকমে বাধ্য করে তিনি এগিয়ে 
চলেছেন ; এর পুর্ধে তার শল্তদেহ কোনদিন এভাষে ক্রিষ্ট বা বিকৃতি- 
ভাবাপয্ন হয় নলি। নিজের প্রতি নিজেই ক্ষু ও জ্ুুদ্ধ হয়ে তিনি আরও 
ক্রত্ত পদচালন। করলেন। আরও খানিক পথ অতিক্রম করতেই সহসা নিকট- 
তম কোন স্থান থেকে পয়স্বিনী গাভীর 'হাম্বা'ধৰনি তার কর্ণে ধ্বনিত হল। 
আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে তিনি আরও ভ্রত্ত এগিয়ে চললেন সেই ধ্বনি লক্ষ্য 
করে। সহসা এক মাধুর্ধময়ী দৃশ্য তাকে আশায় ও উল্লাসে বিহ্বল করে 
ভুলল। সেই অবস্থায় তুই চক্ষু বিস্কারিত করে তাকাতেই অদুরে বিভিন্ন 
শ্রেণীর কতকগুলি পরিচিত বৃক্ষ-বিটগীর ভিতর থেকে কয়েকখানি কুটিরের 
পর্ণচাল। তার দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করল। তিনি বুঝলেন, কোন পল্লী-অঞ্চলের 
সাল্সিধোই তিনি এসে পড়েছেন । সামনেই মন্ছুষা-গযনাগমনের পদচিহ্ন- 
শুলিও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে । সন্দিগ্ধভাবে ধীরে ধারে সামনের পথ ধরে 
কিছুটা যেতেই নারীকে পরিচিত একটি ভজনের মধুর স্ুধবনি তাকে 
বিস্ময়ানন্দে অভিভুভ করল। আপন মনেই প্ররপ্ন উঠল --কে এখানে এমন 
মিষ্ট গলায় তুলসীদাসের মধুর ভজন গাইছেন। যেষন গান ভেমনি কণঠ। 
গানের সুর অস্থসরণ করে কিন্তুদুর গিয়েই তিনি মুগ্ষের মত স্তর হয়ে 
দাড়ালেন । অদুরে কি অপরূপ দৃশ্য । গীতবসনা পরমা সুন্দরী এক তরুণী 
ভাঁর সুমধুর কণ্ঠে গানের ঝঙ্কার তুলে পয়স্থিনী গাভীর তুপগ্ধ দোহন করছেন। 
অপরূপ দৃশ্ব। তরুণীর কোমল করে আকধিত তুপ্ধধারা সশন্ষে দোহন।- 
পাত্রের হুপ্ধের সঙ্গে যিলিত হয়ে সঙ্গতের মত তাঁর কঠনি:স্ত গানকে 
মনোজ্ঞ করে তুলছে যেন! বালানন্দ নীরবে গানখানি শুনতে লাগলেন । 
তরুণীকে তখন গানের ঝংকার উঠেছে -- 

জীয়া যে! চাহে তো জীবকো রক্ষা করোয়ে, 

খন যো! চাহে তে] ধরমকে। বাঢাওয়ে । 

মাচা যো চাহে তে! লাচ গোবিন্দ আগে, 


১৪৬ ধাড়বণ্ডের খাধি 


গাওয়া যে! চাহে তো রামগ্ডণ গাওয়ে। 
ভাগ! যো চাহে তে, ভাগে বুরা করমসে, 
আয়া যে চাহে তো রাষ শরণমে আওরে। 
অর্থাৎ__দীর্থজীবী হতে চাও তো! জীবহত্যা না] করে জীবকে রক্ষা করতে 
সচেষ্ট হও । ধনের প্রাথী যদি হতে চাও ভবে ধর্ধবৃদ্ধি করতে চেষ্টা 
ফত্ু। নাচে আগ্রহ যদি থাকে তো গোবিদ্দের সামনে খ্বত্য কর। 
আর গানের ভক্ত হওতো। রাষচন্দ্রের গুনগান কর।' গায়িকার যেমন 
মধুর কঠ, তেমনি ভার রূপশ্রী-সর্ধাঙ্গে যেন নবযৌবনের জোয়ার বহে 
চলেছে । বালানন্দ তার তীব্র পিপাসা তাড়নাও বুঝি বিস্মৃত হয়ে সাগ্রহে 
সেই তরুণীর গানের যধ্যে নিমগ্র হলেন । 
তুগ্ধ দোহন শেষ হতেই তরুণীর গানের ঝংকারও থেয়ে গেল। বাছুবটি 
ধন্ধনহীন অবস্থাতেই তরুণীর পাশে দাড়িয়ে ছিল, তিনি এই সময় তাকে 
সাদরে ডে"ক বৎসমাতার কাছে সমর্পণ করে অন্ষেহে বললেন ; পির, পিয়, 
তোর ভাগ ঠিক আছে। 
দুগ্ধপান্র কক্ষে তুলে উঠডেই বালানন্দভীর সঙ্গে তবণীব চোখোচোখি হল, 
ক্ষপকাল ভীক্ষদৃষ্টিতে তার আপাদমস্তক দেখে নিয়েই তকণী কুক্ষস্ববে বলল £ 
তুমিও তে৷ দেখছি ভারী বেহাঁয়' মানুষ, সাড়া শব না দিয়ে চুরি করে আমার 
গান শুনে নিয়েছ ! 
নারীর সঙ্গে সংলাপে বালানন্দজী বরাবরই অপটু। এভাবে প্রশ্ন শুনে 
তিনি নিজেকে অপরাধী সাব্যস্ত করেই মৃদ্ব হেসে বললেন £ চোরেব মতন 
আমি গান শুনে হয়ত অপরাধ করেছি, 1কস্ত এই গান শুনিয়ে দিয়ে গায়িক। 
শ্রোতাকে ধন্থ করেছেন ; এর জন্তা যা কিছু পুন্ত সবই তার পরমাত্মাজীর 
ভাওারে জমা হয়েছে । 
এ ধরণের কথা শুনে সন্তষ্ঠট হবারই কথা, কিন্তু তরুণী কথাগুলি যেন গায়ে 
ম! মেখেই উপ্রকণ্ঠে বললেন: এঃ! চুপ রও! নিজের ত ভারি মুবদ, 
জোয়ান বয়সে ভিক্ষের ঝুলি সার, উনি আবার জাঁক করে আমার পরমাস্মাজীর 
ভাতার দেখাচ্ছেন । আসল মতলবখান। তোমার শুনি? 
বালানন্দ এতক্ষণে যেন অকুলে কুল পেলেন । নারীকণ্ের শেষের করা- 
গলির মধ্য সহামুভুতির আভাষ পেয়ে তার কক্ষস্থিত হুগ্ধপুর্ণ ভাগুটিকে লক্ষ্য 


যৌবনে ১৪৭ 


ক'রে আসল মতলবটিই বলবেন £ দীর্ঘপথ পর্যটন করে বড়ই ক্লান্ত হয়েছি, 
তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফাটবার অবস্থা হয়েছিল, তোমার গানই সে অবস্থায় 
বাচিয়েছে। এখন আর্ত আত্বীকে তৃপ্ত করবার মতলবে কিছু হুধ ভিক্ষা 
চাইছি ; এখন-- 

আর বলতে হপ না বাঁলানন্দকে | তরুণীর মধুর কঠ থেকে যে স্বর 
নির্গত হল, কাংসপাত্রে লৌহদণ্ডের তীত্র আঘাত করলে যেমন ঝন্ঝন্‌ শব্দ 
ওঠে- তেমনি নিদারুণ কর্কশ | ঝাঁঝয়ে সে বলে উঠল : ক্যা? পহলে 
তো চোরী করকে গান! শুন রছে খে, আবি বোল্‌ রহে হায়_ছুধ দিজীয়ে। 
জোয়ন আদনী হায়ি--খাঁটকে খানে নেহি সকত1-_ 

বালানন্দ নীরবে হুধওয়াশীর রূঢ় কথ(গুলি শুনলেন, তার পর ম্বহ হেসে 
বিনীভভাবে বললেন ? মারী পেটমে আউর কুছ তে নেহি হায়? যব কুহু 
রহে গিরা তব নিকাল দে। 

কিন্তু বালানন্দের কথাগ্ুপি যেন অগ্নিতে ঘ্বৃতাহছতি দিল। হৃধওয়ালী 
আবো উগ্রভাবে বাক বর্ণ করতে লাগল । তার কটুক্তি থেকে প্রকাশ 
পেল যে, চবি করে গান শোনার মত, তার কাছে কিছু দ্ধ পান করবার 
জন্যে ভিক্ষা চেয়ে আগন্তক গলদেব ওপর গলদ করেছে, শুধু তাই নয়-_ 
ছুধওয়াশীকে তার জন্তে অপশানও করা হয়েছে । 

ব!লানন্দ জীবনে কখনো! এমন অদ্ভুত ধরণের নারীর সংস্পর্শে আসেন নি 
এবং তরুণী নাগীর এমন মাব্মুখা মুক্তি এর আগে কখনো দেখেন নি, সুন্দর 
মুখ থেকে এমন কর্কশ কথাও বখনো শুনেছেন বলে মনে করতে পারলেন না। 

বাছুরটিকে ক্ষিপ্রহস্তে পুনবায় বেঁবে বেখে ছুধওয়ালী মুখ তুলে তাকাতেই 
ধালানন্দ তেমনি স্ব হেসে যিষ্ট স্বরে ভিড্ঞাপা করলেন ; মায়ী, সব তো 
নিকাল গিয়া, ইস্‌ কা বাদ কেয়া! করেগী? 

দুধওয়ালীও তার সুন্দর মুখখানা আবুক্ত ও বিকৃত করে তর্জনের সুয়ে 
বলে উঠুল £ আভি তোমারি শিরমে পাথর মারেজী | 

কথার সঙ্গে সঙ্গে প্রথর দ্বষ্টিতে বালানন্দের পানে একটিবার চেয়েই সে 
একরকম সবেগে ছুটে সম্িহিত একটা ক্ষুদ্র পর্ণকুটির মধ্যে প্রবেশ করল। 
বালানন্দ বুঝলেন যে, মায়ী যে ভাবে মারমুখা হয়ে কুটিরে দেধুলেন, নিশ্চয়ই 
সেখান থেকে পখর বা লাঠি সৌটা নিয়ে এখনি তেড়ে আসবেন এবং 


১৪৮ ঝাড়খণ্ডের খছি 


ঘষে ধকম এঁর কঠোর যেজাজ, হয়ত-_তায় তীত্র পরশ দিতেও কুঠ্িত হবেন 
না। লুতরাং তিনিও সভয়ে ক্রুত শ্বানত্যাগ করলেন | 

যেতে যেতে বালানন্দজীর মনে হল, দুধওয়ালীর সঙ্গে এভাবে বাকবিতগ্াার 
ফলে ভার সেই তুর্দমনীয় পিপাপার অবসান হয়েছে । একটা অগ্রীতিকর 
অবস্থার পর এইভাবে মানসিক শান্তি তার কাছে মঙ্গলময়ী নর্ধদামায়ীবই 
করণ! ধলে যনে হল। ঠিক এই সময় উর্ধাকাশে একট অুমিষ্ট শক শুনতে 
পেয়ে মুখখানা তুলে আফাশপানে তাকাতেই দেখলেন-_ অর্থচন্দ্রাকাবে 
প্রেণীবন্ধ হয়ে একদল লাক! পামনের দিকে পক্ষবিস্তার কবে উড়ে চলেছে; 
এফ যোগে পক্ষসঞ্কালনের সঙ্গে তাদের মধুর কুজন সঙ্গীতের মত তার কানে 
ঘেঘ অম্বভবণ করতে লাগল। সেইসঙ্গে একটা শুভ সম্ভাবনায়ও তর অস্ত 
উৎফুল্প হয়ে উঠল | আকাশপথে বলাকাশ্রেণীর এভাবে শোভাযাত্রা তাঁছে 
শ্বরণ ধরিয়ে দেয় যে, নিকটে নদীর সন্ধান পেলেই তার৷ এইভাবে শ্রেণীবদ্ধ 
হয়ে সানন্দে ধাবিত হয়ে থাকে । বলাকাশ্রেণীকে পথ প্রদর্শক ভেৰে 
বালানদ্দজী ভাদের উদোশে নমস্কার কবলেন ; সেই সঙ্গে স্িগ্ধ স্ববে বলে 
উঠলেন £ তোমাদের দেখে থাষিবাক্য মনে পড়েছে- চবৈৰতি, চ্রবতি , 
চলো, চলো; আমিও চুলেছি তোমাদেব পিছু পিছু । 


প্রগাবো 


আকাশপথে বলাকাশ্রেণীর মিছিল অনুসবণ করে বালানন্দজীও দ্রুত 
পদচালনা করলেন । দ্বধওয়ালীর সঙ্গে সংলাপন্ত্রে তার কট-ক্তি বালানর্দের 
দারুণ পিপাসা নিব্ৃত্তির উপলক্ষ হয। এজন্য তিনি পরমাঞ্জার উদ্দেশে 
হুধওয়ালীর কল্যাণ কামন! করলেন | সেই সঙ্গে মর্শব্যথাও জানালেন, তিনি 
ধাকে অকাতরে প্রচুর রূপ ও শ্বাস্বা দিয়েছেন, কি অপরাধে সে নারী 
স্বভাব-জাত করুণ] ও মধুর স্বর থেকে বঞ্চিত হয়েছে? এব আগে কোন 
ঘারীকে ভিনি এমন কঠিন হতে দেখেন নি, তাই নারীর মমতাময়ী প্রন্কতির 
এই দৈল্ত বা বৈষম্যভাব তাঁকে রীতিমত বেদন| দিল । 

কিন্ত পুর্বেধাক্ত হুধওয়ালী নারী তার স্বভাবসিদ্ধ বাহিক রূঢ় প্রকতিটাই 
অসন্কোচে প্রকাশ করে বালানন্দকে বিদ্রাস্ত করেছিল। তার সেই রুক্ষ 
ধঠোর বাধ প্রকৃতির ভিতরে প্রচ্ছন্ন ক্েহকোমল অস্তরটি যে অস্তঃমলিলা ক্র 


যৌবনে ১৪৯ 


মত অফুরস্ত মেহে সর্বদাই ভরপুর, বাপাঁনন্দ তো সে অন্ধান পাননি! ছুটি 
কজ্জলাভ্ড আয়ত চোখের রহস্যাতুর ঘ্টির বহি বর্ষণ করে সেও তৎকালে 
সংঘষটাকে চরমে তুলেই তার পর মধুরেণ সমাপয়েত করবার অন্ত ব্যস্ত হয়ে 
ওঠে। এ অঞ্চলের অধিবাপী-নযাজে এ তরুণী দুধওয়ালী যেমন স্ুুপরি চিতা, 
তার এই রহস্যময়ী প্রকৃতির বিচিত্র লীলাও তার! সকৌতুকে উপভোগ করতে 
অভ্যন্ত। বালানন্দজীর সমক্ষে তার বাহিক কর্কশ প্রকৃতিটাই পরিপুর্ণভাবে 
প্রকাশ পায়, কিন্ত পরক্ষণেই পট পরিবর্তনের যঙ্গে সঙ্গে উজ্বল দৃষ্ঠটা 
উপভোগ করবার সুযোগ ঘটেনি তার আ্ষ্টে। 

'আতি তোমারি শিরষে পাথর মাবেগি' কর্কশ কণ্ঠে কথাগুলি বলতে ঘলতে 
হুধওয়ালী কৃত্রিম কোপকটাক্ষে বালানন্দের দিকে একটিবার চেয়েই দ্রভবেগে 
সন্সিহিত একট। ক্ষুদ্র পর্ণশালায় প্রবেশ করে | তখন বালানন্দ ভাবেন যে, জুদ্ব। 
তরুণী বুঝি সত্য সত্যই পাথর ব। কোন প্রহরণ আনবার জন্যই এভাবে এন্ড 
ত্রত চলে গেল। সে অবস্বায় তিনি নারীর হাতে আরো! অধিক লাঞ্চিত হবার 
আশঙ্কায় তাঁডাতাড়ি পৃষ্টপ্রদর্শন করতে বাধ্য হন। 

হুধওয়ালী কিন্ত ্রতবেগে পর্ণশালায় ছুটেছিল পাথর বা ডাণ্ডা জাহরাণের 
জন্ত নয়-_সাধু অভিথিকে দুধ দেবার জন্য একট] পাত্রের সন্ধানে । যেমন 
তেমন পত্রে তে। আর সাধু মাগ্ুষকে দুধ পান করতে দিতে পারে না! 
তেমন শুদ্ধ পাত্র খোজাখুজি করতে কিছু বিলম্ব হল। শেষে কালে 
পাথরের বড় বাটিটাই তার মনে ধরল । এই পাত্রে সে নধ্দাযায়ীর পানি 
ভরে শিবের মাথায় ঢালে পাল-পারণের সময় । এখন এতে ছধ ভরে সাধু 
অতিথির হাতে দিতে বাধ! নেই । এরপর ধুয়ে মেজে নিলেই হবে। সাধু 
অতিথি আর ঠাকুর দেবতায় কি তফাঁৎ আছে ? ছোট খধরখানির ভিতরেই 
কুণ্ডায় ভর! জল ছিল, সেই জলে অত বড় বাটটা ভাল করে ধুয়ে নিল। 
তারপর কি ভেবে মুখের হাসিটুকু চেপে আবার পুর মত রাগের ভাবটাই 
জোর করে মুখে ফুটিয়ে সাধুর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে বেরিয়ে এল ঘর থেকে । 

কিন্ত কোথায় শাধু ? পলকে মুখের ভাব বদলে গেল তার , সার মুখে 
পড়ল বিষাদের গভীর একটা ছায়া | তার মুখের চড়া কথা শুনে সাধু ফি 
তবে চলে গেল! হায়রে, দুধওয়ালীর ভিভরট! ভার চোখে পড়ল মা? 
তখন মাটির ওপর বসে থড়ে তার কি কান্না । বিনিয়ে বিনিয়ে নিজের 


১৫৩ ধাড়খত্ডের খাষি 


এই খেয়ালী স্বডাবেব জন্য নিজেকেই তুষতে থাকে, কপালে বাব বাব 
করাধাত কবে কাম্াব স্রবে বলে ছৃধ ছুয়ে যখন দেখি অন্য দিনেব চো 
বেশী হয়েছে, তখনি ভেবেছিলাম ভাল কবে সাধুব পেব! কবব, সাধু তখনও 
দ্ধ চাননি, তাই তো শক্ত হযে যা তা বলছিলাম সাধুকে, কিন্তু সেগুলি 
কি আমাব অন্তরেব কথা? সাধুজী ভিভখটা না দেখেই চলে গেলেন”? এখন 
আমিকি করি? কোথায় গেলে সাধুব নাগাঁল পাই? 

হঠাৎকি ভেবে সে সোজা হযে বসল। বাছুবটা তখনো বাধা আছে 
দেখে তাড়াতাড়ি তাকে খুলে দিতেই আনন্দে লেজ নাডতে নাড”্ত মে মায়েব 
কাছে ছুটে গেল, মাও সহর্ষে বংসেব সর্ধাঙ্গ জিভ দিযে অবমর্ধণ কবতে 
লাগল | তুধওযাপীও ব্যস্তভাবে ব্পমাতাব জাব পাত্রে নিশ্র খাগ্ঠ ও পান-পাত্র 
লে পুর্ণ করে, সুপ্রপন্ন গোমাতাব পিঠে ক্েছেব পবশ দিযে বলল £ জাব 
দিলাম, পানি দিলাম, খাও, বাচ্চাকে নিয়ে মৌঙ্ব কখ মানী আমি সাধু 
মহারাজকে তোবই দেওয়া দ্ধ পিইয়ে আসি | ছা গিযাব, বাচ্চা 'যন-- 

কিন্তু বাচ্চাব ব্যাপাবে বোধ হয মনে ভবসা পেল না| তাই এমনভাবে 
তাঁকে দড়ি দিয়ে একটা খোঁটাব সলে বেঁধে বাখল, মাবেৰ বাট থেকে ছুগ্ধ 
পনের সুযোগটি বজায় থাকে, অথচ মাযেৰ কাছ থেকে সবে দুবে গিয়ে 
মাকেই আবাব অস্থির কবতে না পাবে । এই সব ব্যবস্থাব পব দুধে কেঁডেটি 
কাখে ও পাথবেব বাটিটা হাতে নিযেই বেবিষে পডল সাধুব সন্ধানে । সে 
আনে, সাধু-সম্ভ এদিকে এলে গাঁষেব মোহ কাটিষে নর্ধদামায়ীব কিনাবায় 
গিয়ে আস্তান! পাতেন দেইখালেই খুনি জালিয়ে জপ তপ ববেন, তাবাই তো 
বলেন--মায়ীর এমনি মাহাত্ম্য যে, ভার পবিত্র পরশ পেলেই ইহ-জন্মেব পাপ 
তাপ সব নষ্ট হয়, পরম আনন্দে দেহ মন ভবে ওঠে । 

অরণ্য-প্রাস্তবতাঁ এই স্বল্প বসতির অঞ্চল থেকে নর্মদাঁমাধীব দুবত্ব খুব 
বেশী নয়, সায়াহেৰ কিছু পুর্বেই দূব থেকে নদীৰ বেলাভুমি দেখেই সেটা 
বুঝতে পারলেন বালানদ্দগ । এখন মনে হতে লাগল, কি শুভক্ষণেই প্রভাতের 
শো! প্রথমেই তার চোখে পড়েছিল আজ ! যদিও এর আগে তুর্গমম বনভুমি 
অতিক্রম করতে বহু বিপত্তিব সম্বুখান হতে হয়েছিল তাঁকে_জীবন-সন্কট 
অবস্থাও বারবারি ধনিয়ে এসেছিল ; কিন্ত শেষ পর্যন্ত আশ্চর্যতাবে নিষ্কৃতি পেয়ে 
দিবাবসানে ভার পরমারাধ্াা মাতাজীর শ্মেহের আকর্ধণেই ঠিক স্থানটিতে 


যৌবনে ১৪৯ 


এনে পড়েছেন । যেতে যেতে সহসা নদীর অববাঁহিকারি আভাস পেয়েই, 
দ্রতপদে পেই সিক্ত স্থানের উপব শায়িত অরস্থায় সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে 
ভাবার্র স্ববে বললেন £ মাগো, বর্ধাকাল হলে এখানেই তোমার পুণাবারি 
স্পর্শ কবে উপকুলে আশ্রর নিতাম । তোয়াব দে দিখান্তবিসারী বিরাট রূপ 
কলনা কবে তোমার পুশ্য অববাহিকায অবলুষ্ঠিত হয়ে ভাবছি, ধন্য ত হলাম, 
সেই সঙ্গে শিষ্গাপ হযে পরিক্রয়াণ সন্কল্ পুর্ণ করবাঁণ নুতন শক্তিও পেলাম ।* 

নদীকুল থেকে অনেকখানি স্বান বর্ধাকালে নদীর জলের সঙ্গে হিশে 
একাকার হয়ে যায় বলেই চিছিভ বিস্তীর্ণ অংশ নদীর অববাহিকা বলে 
অভিহিত হয়ে থাঁকে। বালানন্দজী নিজের অভিজ্ঞতায় এ তথ্য জেনেই 
অববাহিকা-অংশ ম্পর্শনাব্রই এইভাবে অদ্ুববতিশী নর্নদার প্রতি ভক্তি নিবেদন 
করলেন। এ-থেকেই তার নর্রদামায়ার প্রতি অসাধারণ ভক্তির পরিচয় 
পাওয়। যায়। 

অনেকদিন পরে নদীতীরে উপস্থিত হয়ে বালুকাময় সৈকত থেকেই তিনি 
বিমুগ্ধ নেত্রে তার অপরূপ শোভা দেখতে লাগলেন । স্থানটি যেমন মনোরষ, 
তেমনি শান্তিময ও নির্ন| নর্মদা এখনও শান্ত, প্রপঙ্ন সলিলা | বর্ধীবসানে 
শরতের প্রশান্ত পরিবেশ_-আকাশ, বাতান, ভুমিভাত বৃক্ষরাজি, পুণ্য তটনী 
মর্শদার জলরাশি -যেদিকে বাষ্টু পড়ে, প্রতিটিই শান্ত, স্িগ্ধ, নির্মল। কিছুক্ষণ 
স্থির ভাবে সেই শুভ্র নম্র বালুকারাশির উপর ছড়িয়ে প্রকৃতির অনবদ্য সৌন্দর্য 
উপভোগ করলেন বালানন্দ। অন্তঃপর তার দণ্ড ঝুলি প্রভৃতি অপেক্ষাকত 
একটু উচু ও শু স্থানে বেখে শিশুর মত সরল ও নিল ভাবে অপরিসীম একট 
উল্লাসের আবেগে নদীর বারিরাশি লক্ষ্য করে ছুটলেন। 


স্পাই পাপা পা পালা | তি শপীশীপাপ আপার জাপা কে পপ সরি পপ সপ পাপন 


* আচার শঙ্কর, পরমভক্ত দবাব, সাধক কমলাকাস্ত প্রভৃতির গঙ্গ। ভক্তি 
প্রসঙ্গে অনেক অলৌকিক কাহিনীর কথা প্রচারিত আছে । সাধু বালানল- 
জীরও অদ্ভুত নর্নদা ভক্তি এবং নদীরবপা কল্যাণময়ী দেকীব প্রতি অথণ্ড 
বিশ্বাস সম্পর্কে দৈবী কৃপা! প্রাপ্তি__পুর্ধোন্ত সাধকদের অবদান স্মরণ করিয়ে 
দেয় । বালানন্দজীও যহাপরিক্রমায় দিদ্ধিলাভের পর ভজবন্ন সকাশে সাধনালন্ধ 
পরম বাণী প্রচার কালে নর্দামাধীর প্রতি নিজের ভক্ত ও বিশ্বীম এবং 
পরিক্রমাশীল ভক্তদের একান্ত সঙ্কটে বিভ্রান্তিকর মৃত্তি পরিগ্রহ করে দেবীরও 
লাহাযা দালের অনেক বিস্ময়কর কাহিনী বলতেন। তন্মধো ভার নিথর 
পরিক্রমা-ভজীবনেও সেই সব অলৌকিক ধটন! সম্ভব হয়েছিল। 


১৫২ ঝাড়ধণ্ডের গ্বাধি 


জলম্পর্শের সঙ্গে মাথায় ও সর্ধাঙ্ে সিঞ্চন করে, সেইসঙ্গে বার বার কদমাক্ত 

তটদেশে দীর্ঘ জটাময় পিরটি ঠুকে ঠুকে ভক্তি নিবেদন করতে লাগলেন। 
বালক যেন মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুরস্বানে গিঘ্বেছিল মায়েরই 
প্রয়ো্নে , এইমাত্র ফিবে এসেছেন; সম্যুথে জননী আনন্দময়ী মুভিতে 
বিরাজিত1। আকুল আগে পুত্র এসেছে জননীর চরণে লুটিয়ে পড়ে ভক্তি 
নিষেদন করে ধন্য হতে । এইভাবে প্রাথমিক বন্দনা! করেও মনে যেল তপ্ত 
এলো না তার! এতদিন পরে ছেলে এল ফিবে-_মায়ের কোল জুডে ন৷ ঘসলে 
ফি পশ্পুণ তৃপ্তি সম্ভব হতে পারে! তথাপি পরমাগ্রহে মায়ের লামে 
জয়ধবনি তুলে মেহরাশির আধার ম্বরূপ সুদুর প্রসাবী ন্সিগ্ধ বুকখানির উপর 
ঝাঁপিয়ে পড়ালন | কিআনন্দ, সেই সঙ্গে কি পরম তৃপ্তি। সাবাদিনেষ 
শ্লান্ত ও শ্রাস্ত দেহ অপরূপ এক আনন্দে ভরে গেল। অবগাহন ত্বানাস্তে 
নর্মদার বক্ষে থেকেই দেবীব উঁদেশ্ে স্তোত্রপাঠ ও অন্তান্ত প্রান্যহিক 
অনুষ্ঠানগুলি সম্পল্প কার তীবে উঠলেন। সিস্ত কৌপিন পরিবর্তন করে 
নুতন কৌপিন পরে যেখানে তার ঝুলি ও দণ্ড বেখেছিলেন পবমানদ্দে আসন 
ফারে বসলেন। ক্ষুধা তৃষ্ণা কোথায মিলিয়ে গেছে-_তাবু কথাঁও মনে নেই। 
আপন মনে গীতিতঙ্গিতে স্তোত্র পড়তে আবন্ত কবলেন £ 

অনগ্শ্চিস্তযস্তোমাং যে জনা পয়্যুপাসতে । 

তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেযং বহাম্যহং ॥ 

তদ্‌দুরে তদাত্তিকে__ 

তদস্তবস্য সর্ববন্য তহুসর্ধবস্যাস্য বাহতঃ॥ 

৬ সং র্‌ 
“আছেন লুকায়ে হৃদ্মাঝারে 
দুর বলে ভাবিস্‌ না ভাই। 
ভাকেব মত্ত ডাকলে পরে 
তার এক ডাকেতেই সাড়া পাই || 
বাগানন্দের উদাত্ত কৃঠস্বর ভেসে চলে বাতাসের বুকে । কিছুটা তফাত 

খেকে সেই সুললিত মিষ্ট স্বর দুধওয়ালীর শ্রাতিম্পর্শ করে। আরে! ত্র 
পদচালন। করে নিকটে এগিয়ে আসতেই সে দেখল--পলাতক যাধু সানন্দে 
চোখ মুছে গান ধরেছেন । হধের কেঁড়েটা! তৎক্ষণাৎ একখণ্ড পাথরের উপর 


যৌধনে ১৫৩ 


রেখে, পাথরের পাত্রটা হাতে করে মে বলল: বারে, সাধু মতলঘিয়। | 

ভীপ্ম স্বদ্বের থংকারে বালানন্দের গীতায়ন বিদ্বিত হল। ভাবমগ্ন ছুটি 
চোখের ছি স্বরের দিকে নিবদ্ধ করতেই সচকিত হয়ে সহান্যে বললেন £ কি 
ব্যাপার? পাথরের বাড়ি আমার মাথায় হানবার জন্ত এখানে পর্ষস্ত ধাওয়। 
করে এসে নাফি? তোমার রাগ আর রোখ্‌ ত সাধারণ নয় দেখছি । 

হাতের পাটি বালানন্দের দামনে উঁচু করে ছুধওয়ালী ঝাঁঝয়ে জবাঘ 
দিল: হাঁ, হাঁ, এমনি একটা কিছু খুঁজে পেতে আনবার জগ্ভই ডেয়ায় 
সেবিয়েছিলাম, তা_-তোমার আর সবুর সইল না! যেমন চোরী কনে 
আমার গান! শুনেছিলে, দুধ চেয়ে বাহাছ্ববী দেখিয়েছিলে, তেমনি আমাছে 
লুকিয়ে পালিয়ে এসেছিলে | কিন্ত তুষি ত তৃধিয়া ছুধউলিকে চেম না৷, তাত 
চোখের আড়ালে জুকিয়ে থাকবে--এমন ঠাই ছুনিয়ায় কোথাও নেই । দেখছ 
ত, সন্ধান করে ঠিক এসে কেমন ধরেছি? 

বালানদ্দ শ্মিতযুখে বললেন * সে ত দেখছি। কিন্ত ভাবছি, তোষাত্র 
চেহার] মিষ্টি, ভৃধিয়া নামাটিও যিটি, কিন্ত মুখের বুলি এমন তিরিক্ষি কেন ? 

কথাট] শুনেই তধিয়ার মুখে চোখে যেন দামিনীর একটা ঝিলিক বেরিয়ে 
গেল : সেইসঙ্গে হাসিরুও একটি ক্ষীণ বেখা ফুটিয়ে বলল : তুমি সাধু 
সন্প্যেলী মানুষ, বুলির মর্ম কিবুঝবে বল? এই বুলিই তো দুধওয়ালী 
তুধিয়ার হাতিয়ার ঠাকুরজী ! 

স্ব হেসে বালানল্প বললেন ; কিন্ত ভারি শক্ত হাতিয়ার, আমান তো 
জানা আছে । আর দেখ, হাতিয়ার কাছে থাকলেই রাগটাও চেপে ঘসে। 
এই দেখ ন।--পালিয়ে এসেও তোমার হাতিয়ারকে ঠেকাতে পারিনি, এখাঘে 
পর্ধস্ত ছুটে এসেছ ! এখন আমার কথ] শোন ছুধিয়া, তোমার শী বুলিক্ষে 
সামলাও। সাধুসন্তত্বাও এই বুলি সম্বন্ধে কি বলেছেন শোন- 

বুলি বোল্‌ অমূল্য স্থায় যো জানে বোল । 
বুলি য়্যায়সা বলিয়ে, কাটে অন্দর তৌল | 

ঢুধিয়া বলল : বারে সাধু, তুমি বুঝি আমাকে এই কটোর। হাতে হাজির 
দেখেই তেবেছ, তোমার মাথায় এর বাড়ি মারতে এসেছি ! আ, আমাগ 
পোড়া! কপাল! 

দিব্যি মিটি ভঙ্গি ও সুরে কথাগুলি বলেই তর তর ঘরে লে উপরের 


১৫৪ থাড়খণ্ডের ধবি 


দিকে উঠে গিয়ে ছধধের কেঁড়েটা কাকালে করে সাধুব সামনে এসেই 
মানিয়ে রেখে বলল £ দেখছ সাধুজী-_সেই দুধ | গানা গেষে ছুইভিলাম, 
তুমি পিছনে দরডড়িয়ে শুনছিলে, তার পর বললে পিযাশ লেগেছে, তুধ দাও। 
আমার এ স্বভ।ব বাদ সাধল সাধু, যে বুলি বলেহিন্ু- দিলের নয়, মুখের | 
তোমার মাথায় পাথর মারব বলে একটা লোটার সন্ধানে একছুটে ঘবে যাই, 
ধুঁজেপেতে শেষে পাথবের এই কটোরা নিয়ে বেরিযে আসি; নর্মদার জল 
এতে রাখি । তুমি সাধু মানুষ, যেমন তেমন লোটায তো তোমাকে দ্ধ দিতে 
পারি না। এর পর এসে দেখি, ও মা। তুমি উধাও । বুঝনু, পাথব পাছে 
মাথায় পড়ে-সেই ভয়ে পালিয়েছ। কিকষ্টযে হল দিলে, দিলেৰ ঠাকুব 
বই কে বুঝবে। বাগ হল নিজের ওপর, এই বুলির ওপর । তুমি সত্য 
ধলেছ সাধু--হিসেব করে, ওজন করে, মুখেব বুলি বলতে হয়। আমার 
কসুর আমি বুঝিছি সাধু! আমি এখন থেকে আমার জীভকে _-সামলে 
হিসেব করেই বুলি বলব | 

বালানন্দও প্রসন্ন হয়ে বললেন £ বাস্‌, ব্যস্‌, সব ঠিক হয়ে গেছে। 
এখন থেকে তোমার রপসলাকে সামলে বুলি ছেড়ে ছুধিয়া। সাধুসন্ত 
কি বলেছেন শোন-- 

ইয়ে রসনা বশ কর, ধর গরিবী বেশ। 
শীতল বুলি লেকে চলো, সবহি তুষহার] দেখ ॥ 

ছুধিয়া এই ঠৌহাটি শুনতে শুনতেই বালানন্দের পায়ের গোড়ায় নত হয়ে টিপ 
করে একটিবার মাথাটি কল । তারপবই তাড়াতাড়ি মাথা ভুলে উঠে হাতের 
লোটাটি বুধের কেঁড়ের কাছে রেখে হাভ দুখানি জোড় করে কোসল স্বরে বলল £ 
হঝুম হোক সাধুজী, দুধ ঢালি এই কটেরায়, খুশি মনে পান কর তুষি। 

বালানন্দ হে! হো করে হেসে বললেন £ তুমি ত দেখছি অদ্ভুত মেয়ে 
গুধিক়া, আমাকে হৃধ খাওয়াবার জন্তে গী ছেড়ে এতদুরে এসেছ! 

দুখিয়া' চোখে মুখে অভিমানের ভঙ্গি ও গার স্বরে আব্বারের ভাব 
ফুটিয়ে বলল ২ আনব 711 তুমি কি বুঝাবে আমার কষ্টের কথা--হুধ 
চাইতে মুখনাড়ী দিয়ে যা বলেছিছু, সে যদি দিলের আপন কাথা হত, তাহলে 
রি এ্রভ কট পাই এখন তুধিয়ার সব কষ্টের অবপান ফর, অবপান 
ফর গৌলাই ! | 


যৌধনে ১৪৫ 


এক নিংশ্বাসে দধিযা কথাগুলো বলেই কেঁডে থেকে ছুধ ঢেগে কটোরায় 
ভরল, তাবপব তুবভবতি সেই প্রকাণ্ড কটোবাটিব নিচেৰ দিকটা দুহাতে ধরে 
মিনতিব স্ববে বলল ; নাও সাধুজী, পান কব। 

বিচিত্র প্রক্কতিব এই গ্রাম্যভানাপন্না মেষেটিব মনেব প্রচ্ছ্ম ভাবধাবার 
সন্ধীন পেলেন মাঁনবদবদী বালানন্দদ্রী। আব কোন কথা বা কোনবপ 
আপত্তি না তুলেই “তিনি ছুগ্ধপুর্ণ পাত্রটি তাব হাত থেকে নিযে প্রসন্ন চিত্তে 
পাঁন কবতে লাগলেন | ছুবিযাব নিনিমেষ দৃষ্টি এখন সাধুব মুখে নিবদ্ধ ' 
তাব ব্যাকুল অন্তবেব আকাঁঙক্ষাটি এতক্ষণে পুর্ণতাব আনন্দে বিহ্বল 
হয়ে পড়ল । 


বারো 


পাত্রটি নিহশেষ কবে বালানন্দ বললেন £ হযেছে তো? সত্যই 'আমি 
থুব তৃপ্তি পেযেছি। এখন বুঝাতে পাবছি, সে-সময তোমাকে ভালো! করে 
বুঝবার চেষ্টা না কবে আমিই ভুল কবেছিলাম। মুখেব বটন তোমাব ছুরির 
মতন ধাবালো হলেও, দিলটি খুবই কোমল। নর্নদা-মাধীব কাছে প্রার্থনা 
কবি__তাব কৃপায় তোমাৰ বসনাও এমনি কোমল হোক, তুমি যেন তাকে 
আযত্ত কবতে পাব । 

ভুবিযা বলল £ মাধী আমাকে ক্কপা কৰেছে ঠাঁকুবজী | তার কপা না 
ছোঁলে কি তোমাকে দুধ খাওথাবাব কিসমৎ আমাব হন! 

বলতে বলতে বালানন্দেব হাত থেকে শুন্য পাত্রটি নিষেই সবেগে নদীর 
কিনান! লক্ষ্য কৰে ছুটল । সেখানে পাত্রট ধুষে নে তাড়াতাড়ি উপরে 
এসে দুধেব কেঁড়ে থেকে প্ুনবাঁয় পবমোতৎসাহে দুধ ঢালতে লাগল । 

বালানন্দ তাঁব উদ্দেশ্যাটি বুঝেই বাধা দিলেন; ওকি. আবার হৃধ 
ঢালছ যে। 

হাঁতেব কীঘ করতে কবতে ভ্রভঙ্গি ঝরে দুধিয়া বলল : কেন ঢালছি। 
পেকি মালুম হোচ্ছে না? 

কথার সঙ্গেই পুর্ণপাত্রটি পুর্ববৎ বালানন্দেব সামনে বাড়িয়ে দিয়ে তুধিয়া 
বলন ; এই নাও। 

নেবার উৎসাহ ন। দেখিয়ে বালানন্ন তাড়াতাড়ি উ্ে পড়লেন এবং একটু 


১৫৬ ধাড়খণ্ডের গ্ষি 


বিরক্তভাবেই বললেন : নিজের খেয়ালেই কাজ করে চলেছ, আমার খেয়ালেব 
দিকে হস নেই! আমার খাওয়া হয়ে গেছে । এ হুধ ঢেলে রাখ । 

ঝঙ্কার দিয়ে উঠল হুধিয়া £ বারে ঠাকুরজী | খুব তে! খেয়ালওয়াল 
মানুষ তুমি দেখছি ! সারাদিন খাওয়া হয়নি তোমার, সাঁঝেব পর খাবার 
সময় , নসিবে যখন পরমাত্বাজী খাবার জিনিষ মিলিয়ে দিয়েছে, খেতেই হবে । 
এ খেয়াল তোমাব লা থাকলেও আমাঘ আছে! খাও জলপ্দ | 

সেই অবস্থায় বালানন্দ মনে মনে ভাবেন, বন্ত। নারীর সামান্ত একটু 
আস্কারা পেলেই এমনি বে-পরোয়া হোয়েই ওঠে! ভিনি একটু শক্ত হয়েই 
কথাটাফে ঈষৎ তিজ কবে বললেন ; তুমি আমাকে ঠাওবেছ দি? আমবা 
্রক্মচারী মানুষ, বেশী কথ! ভালবাসি না, দিল্লাগীবও কোন তোয়ান্কা দাখি না। 
জামার যেটুকু খাবাব প্রয়োজন ছিল, আগেই হাত বাড়িয়ে নিয়েছি, আব 
৫লধার ইচ্ছা নেই । ও দুধ তুমিই খেষে ফেল 

দ্ধিয়াষ দীর্ঘায়ভ ছাটি চোখ বুঝি জলে উঠল, সেই সঙ্গে কণ্ঠম্ববও উত্তপ 
হয়ে নিগগভ হলো : একথা বলতে তামার দিলে সরম এল না ঠাকুরজী ? 
আমি দুধ থাব বলেই কি গাঁও থেকে নর্মদামায়ীর কিনাবায় ছুটে এসেছি সাধুঘ 
সন্ধানে? সোমার মত সাধুর সাষনে বসে আমি তাঁবিয়ে তাবিয়ে এই কটোবার 
ছুধ খাব। ছো। ছে! । এখন ভালে। চাও তে চুক্‌ চুক করে খেয়ে ফেলো, তা 
লা'ছলে মায়ের। বাচ্ছাকে যেষন রে হৃধ খাওয়ায় জোব করে, আমাকেও 
তেমনি শক হ'তে হবে। 

এঞ্ডাবে হুমকি দিয়েই হৃধিয়। দ্বধন্ধরা পাত্রটি আবো এগিয়ে একেবারে 
বালানন্দজীর মুখের কাছে নিয়ে গেল। বালানদ্দ অনুভব করলেন যে, 
অবস্থাটা তখন এমনি ফাড়িয়েছে এরপর ভ্ধের পাত্রটি বালাননের মুখের 
মধ্যে প্রবিষ্ট করবার দুশ্চে্টাও মেয়েটার পক্ষে বিচিত্র নয়। 

নিপ্চপায় হয়ে বালানন্দকে গখন এই তুবস্ত ভক্তের উপরোধটি পালন 
করবার অন্ঠ পুনরায় তার পুর্বাপনে বলেই হুধিয়ার এ জাঘদারও ব্ক্ষা করতে 
হলে । এভাবে হৃষ্ধ পালের, সক্ষে শৈশবে মায়ের শাসনের কথা মনে 
পুড়ল গার - হেগের আপত্তি সত্বেও মায়ের শাসন যেভাবে আপত্তি খওন 
করে দিঘের ভিদ রক্ষা! করে । পানান্তে পাত্রাটি হুধিয়ার সাফমে মাটির উপত্ষে 
'রখিতে থা্ছিলেদ বালানলগ। খণ করে ভারী হাত থেকে পার্টি নিয়েই সে 


যৌঘগে ১৪৭ 


পুর্ধের মস্ত পুনরায় নদীর জলের দিকে ছুটে গেল এবং ধুয়ে যেজে জল ভদ্ষে 
উপরে উঠে এল | 

বালানণ্দ বললেন £ জল ভরে আনলে কেন, কেঁড়েটা কিনারাঘ দিক্ষে মিয়ে 
গিয়ে ধাকি তুধটুকু থেয়ে ফেললেই পারতে | 

ছুধিয়ার ঝাজ তখনও নিঃশেষ হয় নি, একটু খর স্বরেই বলল: পাখি 
এনেছি তোমার ভরে-_হাত মুখ ধুয়ে নাও। আর, দুধ এখনো অনেক্ষ 
আছে, বল ত আবে দিই । তোমার সে আরো অনেক সাধুসম্ত জাছে 
ভেবে আমি কেঁড়ে ভরে দুধ এনেছি যে! আর, এ ফথাও মনে 
রেখো, সাধু-সজ্জনকে খাওয়াবো বলেই ও-ছুধ এনেছি, নিজের খাধার 
তবে নয়। 

বালানন্দ বললেন £ তুমি যখন নদীতে যাও, বমওলু থেকে জল নিয়ে 
হাত মুখ আমি ধুয়েছি। কিন্তু ভুমি যে এটা মনে করে জল এনেছ, সেন 
তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করি | এখন কথা হোচ্ছে, তুমি যখন এ হুধ থাঘে 
না, আমারও প্রয়োজন হবে না, তখন দুধটার গতি কি হবে? 

ছুধিয়া বলল * তোমার জন্যেই যখন এ দুধ বয়ে এনেছি--জোযারই 
ভোগে যাতে লাগে, ভার ফিকির বের করনে হথঘে বৈকি । ছুধওয়ালি 
ছৃধিয়াকে তুমি ঠাওরেছ্‌ কি ? 

বলতে বলতে হাতের পাত্রটি তুধের কেঁড়ের কাছে রেখে সন্ধানী দিতে 
আশে পাশে তাকাতে লাগল নুধিয়া। 

বালানন্ন মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করলেন: কি দেখছ অযন কর়ে-- 
খু'জছ কিছু? 

তুধিয়া গনীষ মুখে বলল : হু! আখা বানিয়ে আগ লাগিয়ে তার 
ওপরে বাসয়ে দেব কেঁড়েতুদ্ধ দুধ | ফুটে ফুটে ঘন হয়ে এলেক্ষীর কষে 
লাড়ুড়ু বানিয়ে ভোমার ঝুলিতে পাতায় মুড়ে রাখব, কাল পরত ছুটো দিন 
খাওয়। চলবে । 

হুধিয়ার কথ। ও ব্যবস্থা শুনে বালানন্দ স্তদ্ধভাঁবে চেয়ে থাকেন তার মুখের 
দিকে | সম্পর্কহীন অনাধ্বীয_-পর ভিন্ন তিনি এর কে! নিজ প্রয়োজনেই 
প্রার্থী হয়েছিলেন ভিনি। ভুল উপলব্ধি বশত; আতিথ্যসৎকারে বাধা পড়ে। 
সেই ধাধার অবসান ঘটিয়েও সে অভিথিকে অব্যাহতি দিতে প্রপ্তুত নয় 


১৮ ঝাড়খণ্ডের খাবি 


পুর্বের ত্রুটি কি ভাবে পুরণ করে তৃপ্তি পাবে, সেই চিস্তায় এখন অস্থির 
হয়ে উঠেছে। 

পুনরায় প্রশ্ন শুনে এ-অবস্যায় বালানন্দ চমকে উঠলেন ঠ তোমার এ ঝুলিতে 
আগুন জ্বালাবার পাথর আছে ঠাকুর ? 

পাথর | ও; চকমকি পাথবের কথা জিজ্ঞাসা করছে তুধিয়! | পথরে 
পাথরে ঠোকাওরকি করে এখন আগুন জ্বালতে চায় সে, সেই অগ্ঠিতে দুধ 
তাল দেবে, ক্ষীর করে লাডুডু পাকাবে--বালানন্দের জন্য | 

সহান্্রভুতির স্বরে বালানন্দ বললেন কি দরকার দুধিয়] ও-সব হাঙজ্গামা 
করবার? তাঁর চেয়ে দুধের কেঁড়ে নিয়ে তুমি বাড়ী ফিবে যাও। রাত 
বেশী হলে এর পর যেতে ভয় পাবে, হয়ত আমাকেই সঙ্গে গিযে পৌছে 
দিয়ে আসতে হবে| তাই বলছি, আগ রাত ক'ব না, আমাধ কখা শোনো 

বালানন্দের কথায় বাঁধ! দিয়ে ঝাঝালে স্ববে তুধিযা বলল : আমাব কথা কি 
তোমার কানে ঢোকেনি ঠাকুর আগুন কববান পাথব আছে তোমাব ঝুলিতে ? 
থাকে ত চটপট বার করে দাও, নৈলে আমাকেই খুজে নিতে হবে । আগে 
তে! দুধের গতি করি, তার পরে বাড়ী । 

বালানন্দ এবান সুবোধ বালকেব যত ভুধিয়াব প্র।খিত বস্ত্র _অগ্রি উৎপাদক 
পাথর ছুটি৫তার ঝুলির ভিতব থেকে বেব কবে দিলেন । চিলের মতন ছ্োঁ 
মেরে সেই দুটি বস্ত নিয়ে হুধিয়া নীচেব দিকে নেমে গেল । 

বালানন্দ ভাবলেন, দুধওয়ালীর যে ইচ্ছা হথেছে করুক সে। তিনি 
এখন ভার কাজ নিয়ে পড়বেন। সুতরাং আব কোন দিকে ন' চেয়েই তিনি 
ধ্যানে বদলেন। ওদিকে তুবিয়া কতকগুপি কাঠ-পাতা ও করেকখও্ড পাথর 
সংগ্রহ করে এনে নদী-সৈকতে সেগুলিব পাহায্যে উনান তৈধী কৰে ছুব জ্বালের 
বাবস্থা করে ফেলল । চকমকি পাথব-হুটে। এঁকে ঠুকে উনানে প্রদত্ত শুকনো 
কাঠপাতায় তার আগুন সংযোগ করে দিল। তিনটি পাখবরের মাথায় লোহার 
কেঁড়োটি বসালো! । দেখতে দেখতে উনানটি দিব্য সক্রিয় হয়ে উঠল। 

ভুধিয়ার মলে আনন্দ ধরে না তার হ্বধ আজ সতাই সার্থক হবে। সাধু 
মহারাজের ভোগে লাগবে, তার জীবনও আজ সার্থক। জ্বলস্ত উনানের 
. সাধে বসে কাঠ পাতাগুলি তাঁর মধ্যে যোগান দিতে লাগল হিয়া, আগুনের 
“জায় ডার গৌরবর্গ খানা অপর্ধপ হয়ে উঠল। 


ক্যীবনে ১৫৯ 


হঠাৎ হাওয়ায় হাওয়ায় মিলিত কঠের একট] ভজনের এর ভেসে এলো 
এই নদী সৈকতে । ছুধিয়া! সচকিত ভাবে একবার স্থানটির পরিবেশ দেখে 
নিল। তার চোখে পড়ল, একটু উপরে ঠাকুরের ধ্যানমগ্র দিব্য মুতি। 
ক্ষণকাল মুগ্ধ দ্বটিতে অপলক নয়নে তাকিয়ে রইল সেদিকে | তারপর হাত 
হু'খান! কাপড়ের আঁচলে মুছে নিয়ে যুক্ত করে নীরবে প্রণাম জানাল তাকে । 
আবার গানের সেই সুর এবং সেই সঙ্গে স্বরবদ্ধ কথাগুলিও স্পষ্টভাবে 
শোনা গেল : 
সর্ব রোগ কা ওষধ নাম। 
কলিয়ান ৰূপ মঙ্গল গুণগাম ॥ 
পবিত্র পবিত্র পবিত্র পুনীত। 
নাম জপৈ, নানক মন শ্রীত॥' 
ছুধিয়া ভাবে কে গান করে এই অসময়ে? শব্দ অনুভব করে সে বুঝতে 
পারল-- একের ক নয়, একাধিক কণ্ঠের মিলিত ধ্বনি নী-টসকতে রীতিমত 
প্রতিধ্বনি তুলেছে । তাৰ সামনে পাক-পাত্রের দুধ অগ্রির উত্তাপ পেয়ে স্ফীত 
হয়ে উঠেছে অদুবে ধ্যানমগ্র ঠাকুবটিবও নির্ধিবিকল্প অবস্থা, উপরে চলার পথে 
আগন্তক পাশ্বকঠেব দৌহা গানের ধবনি ক্রমশঃ নিকটতর হচ্ছে। এখন সে 
কিকরবে? যদি আগন্তকরা! এখানেই আসে! পরিব্রাজকদের পক্ষে এই 
তে! একান্ত বাঞ্ছিত স্বান। আর তার চুঙ্লীর আগুনের আকর্ষণী শক্তিও তো 
উপেক্ষা করবার মত নয়। এই ঠাকুবটির মতই অপর ঠাকুরদের শুভাগমন 
যদি হয় এখাঁনে, তৃধিয়কে দেখে তারা কি ঠাওরাবে ? এমন অসময়ে নদীর 
কিনারায় বসে ঠাকুরের সেবার জন্ম ইধ জ্বালে বসিয়ে ক্ষীর তৈরী করছে সে, 
শুনে যদি", 
এর পর আর চিন্তাও যোগায় ন। ভুধিয়ার মগজে | হঠাৎ মনে পড়ে যায় 
একটু আগে ঠাকুবের কথাগুলি £ 'কি দরকার ছুধিয়! ও-সব হাঙ্গামা করবার 
তার চেয়ে ঝাড়ী যাও, আমার কথা শোনে 1 কিন্তু হুধিয়া তো ঠাকুরের কথা 
শোনে নি! এখন তার মনে হয়, সাধু-সন্ত ঠাকুর -এ'রা দরকার বুর্ষেই কথ! 
ধলেন, এদের কথ ঠেলতে নেই । কিন্ত সে তো অন্যায় কিছু করে নি। 
নর্মদামায়ী তো সবই জানেন-_-তার দিলের অন্দরটাও। তবুও যদি কেউ 
ভাকে দোষ দেয়, এ!কুরের ওপর 


১৬৬ ঘাড়ের ধাষি 


মনে মনে ভজ ন রে ওঠে ত্বধিয়া, পেকি তাহলে চুপ করেই থাকবে-_ 
চুলী থেফে তখন ভলত্ত কাঠ নিয়ে ভার মুখে ছ্রকা দেবে না। 

ওদিকে দুব থেকে অগ্নির আলোকে নদীসৈকতে নারীমূতি লক্ষ্য করে 
আতাঙ্তকন্ধয়ও আলন্তে আন্তে সেদিকে এগিয়ে এসে একসঙ্গে উভয়েই বিস্ময়ে 
এতই অভিভু্ত হয়ে পড়ল যে, তাদের শ্বর পর্যন্ত স্তব্ধ হয়ে গেল। অনেফট। 
উফ থেকেই এর! চুল্লীর অগ্নির প্রথর আলোকে নারীমুখের শোছা লক্ষ্য 
করেছিল, এবং সেই সুত্রে নদীতীরে এভাবে নিঃসঙ্গ রূপসী নারীর উপস্থিতিতে 
বিস্মখাপল্প হয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে আসে । এই সময় উপরে উপবিষ্ট ধ্যানমপ্র 
পরিচিত সাধু মুভির দিকে এদের ছুঁট্টি পড়তেই দারুণ বিস্ময়ের সঙ্গে প্রচণ্ড 
একটা উল্লাস উভয়কে একসঙ্গে চমত্কৃত করল। তাদের মনে হল, কে যেন 
তাদের হব তনফেই অদ্ধকারের দারুণ খুণিপাক থেকে উদ্ধার করে উজ্ছর্ল একটা 
আলোক মাঞখানে ঠেলে ছ্ুকিয়ে দিয়েছে । 

ক্ষরণকাল নীরবে ও নিঃশৰে এখানকার পবিস্থিতিটা দেখে নিয়ে সনকজী 
ও জংলীবাব। পরম্পর মুখোযুখী দীড়িয়ে ইন্ষিতে অপরিচিতা নারীমুতিটিফে 
নির্দেশ ফরে জানতে চাইল--এ কি কাণ্ড ? 

প্রশ্নটা উদ্য়েই একই সঙ্গে করল নীরধে অর্থাত্বক ভজিতে। 

চাপ] গলায় সমক ঘলল ৫ নর্শদার কিনারায় গুরুজীকে পাবার কথা যা 
বলেছিলাম, ঠিক মিলে গেছে কিস্ত এর 'মায়িজী” মানুষটিকে দেখে যে 
অবাক হয়ে গেছি । কখনে! তো! এভাবে চুলী জ্বেলে কোলে মেয়েফে রাল্সা 
কষধতে দেখি নি। 

₹লীবাষ! বলল : তাইত, কাণ্ড দেখে যেন আকাশ থেকে আহ্াড় খেকে 

পড়ছি! আমষ়া সঙ্গ ছাড়! হোতেই গুরুজী শেষে শিশ্তা যোগাড় দে 
সিয়েছেল । ভাও যেমন ভেষন নয়_-পরীর মত ব্পসী | 

গ্রে মণে কি (তবে সন বলল: আগে জানা দরফাধ ব্যাপারট। ফি-- 
ভাক্ষপপ্ন ওপব ক্ষথা। গুরুজী তে ধ্যানে বসেছেন দেখছি! ভাহলে হকং 
টপ চুপি চুপি হ'জনে আতর্মক। হ্র' পাশ থেকে গ্র মায়িজীফেই ছিজ্ঞাসা 
হয়! হাকৃ। 

অংলীখাধ! বলল £ মন্দ নয় একথা--.তাই চলো। ফিস্তু খুখ সাখধানে-. 
হঠাৎ গিয়ে চমকে দেওয়া ঢাই। 


ঘোৌষমে ১৬১ 


ছুধিয়া ভ্তখন পাত্রে ফুটন্ত দুধের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে ক্রমাগতই কাঠি 
দিচ্ছিল | একটা বেলগাছের কাচ৷ ডাল ভেঙ্গে নিয়ে পাথরে ঘষে ছুধ জ্বাল 
দেবার কাঠি তৈরী করে নিয়েছিল দ্বধিয়া। সেই কাঠি দিয়ে দুধ ঘন করছিল; 
সেই দিকেই ছিল তার লক্ষ্য । 

সনক ও জংলীবাবা এই সুযোগে আন্তে আস্তে নীচু হোয়ে মাটি ধরে ধরে 
পিছন দিয়ে ছুধিয়ার হু' পাশে জে'কে ব'সে মুখ হৃ'খানা বিকৃত করে একসঙ্গে 
নাকি সুরে বলে উঠল : ভুখা হা ভুখা হ' 

এ অবস্থায় মেয়ে তে! দুরের কথা, সাহসী পুরুষেরই ভয় পাবার কথা। 
হৃধিয়াও অবিশ্মি প্রথমে চমকে ওঠে : কিন্তু পরক্ষণে আগন্তকছয়ের কত্রিম 
বিকত মুখ হু'খানা এক নজরে দেখেই ঝা কৰে চুল্লী থেকে জবলস্ত একখান? 
কাঠ টেনে নিষে দ্বিযূতির দিকে তুলে ধরলো । অমনি ছুই বীরপুরুষ সভয়ে 
পিছিয়ে পড়ে জোড়হাতে মাপ চাইতে লাগল £ মাপ কীজিয়ে মায়িজী-_ 
মাপ কীজিয়ে। 

দৃধিয়! ভখন জ্বলন্ত কাঠখানি যথাস্থানে রেখে জণ্তঙ্গি করে বলল ; বাহারে 
ফল্দীবাজ | সাধু সেজে দিল্লাগী করতে সরম লাগেনি? কি মতলব নিয়ে 
এখানে এসেছ শুনি? 

সনক বলল : গুরুজীর সঙ্গে ভোট করতে এসেছি আমরা । উনি এখন 
সমাধিতে আছেন, ভোমাকে এখানে দেখেই মনে চমক লাগে। 

চোখ তটে। পুনরায় পাকিয়ে দুধিয়া সনকের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা 
করল : চমক লাগল কেন - দ্বধিয়ার রূপ আর যৌবন দেখে ? 

ঠ্টাতে জিভটা চেপে সনক বলল £ উচছ-_-তা কেন! আমর! সাধু সঙ্গযাসী, 
মেয়ে মাত্রকেই মায়ের জাত মনে করি । চমকাবার কারণ হোচ্ছে _ গুরুজী 
যেখানে আসন পাতেন, কোন মেয়ে কখনো সেখানে আমল পায় নি। 

একটু হেসে তুধিয়। বলল : আর এই মেয়েটাই সেখানে জে'কে বসে গেছে 
দেখে বুঝি ভাবলে, গুরুজী অষ্ট হোয়ে গেছেম- এই তো? 

জংলীবাবা এতক্ষণ চুপ করে এদের সংলাপ শুনছিল, এই সময় ঝাঁ কয়ে 
বলল : ভার চেয়ে বলেই ফেল ন! মায়ী, গুরুজীর কপা কেমন করে পেয়েছ? 
উনি তে! কোম স্ত্রীলোককে আস্তানায় থাকতে দেন না। তুমি কি করে স্থান 
পেলে এখামে 

১৯ 


১৬২ খাড়খত্ডের খছি 


পাকৃ-পান্রের দিকে সতক লক্ষা রেখে দুধিযা প্লেষের স্ুরেই জংলীবাবার 
কথাটার উত্তর দিল ; নর্ধদামায়ীব কিনারায় স্থানেব অভাব আছে নাকি--যে 
একথা জিজ্ঞাসা করছ? আর, গুরুজী তো রাহী মানুষ , আজ এখানে-_কাল 
ওখানে ;: গতর আবাব আন্তান1! কোথায -সবাই এখানে স্থান পেতে পারে । 

জংলীবাবাও একটু খোঁচ। দিয়ে পুনরায় জিজ্ঞাসা কবল : তাহলে বলতো 
মাজী-_ নর্দামায়ীর কিনাবাফ কত জায়গাই ত পড়ে আছে, তুমিই বা এই 
স্বানটিতে এসে জমে গে কেন? বলতে চাঁও বুঝি--কোনও মত্তলব তোমার 
এখানে নেই ! 

দ্ধে এ সময ঘন ঘন কাঠি দিতে দিতেই আড় চোখে বক্তাকে একবাব 
দেখে নিল হুধিষা, তাবপব তেমনি তীক্ষস্ববেই বলল : আমাব কাঁজ দেখে 
বুঝতে পাবছ না মতলবখানা কি? ঠাকুবজীর তবে মেওয়া পাকাচ্ছি লাড়ড় 
বানাবার তবে। 

উভয় সাধুই সবিশ্ময়ে একসঙ্গে বলে উঠল : লাড়ৃড়ু ? 

ভুধিয়াও উভয়েব দিকে বিদ্যৎশ্ুবণেব মত দ্লষ্টির একটা ঝলক দিয়ে 
বলল : অন্ধ নাকি, দেখছ ন1 -জুধ ঘন কবছি। এ থেকেই লাডড়ু বানিষে 
ঠাঝুরজীকে দেব, ভাহলেই আমাৰ ছুটি । 

মেয়েটিব রূপের জলুস অপরূপ হোলেও, মুখের কথায পরুষ ভাব, ও 
তার সঙ্গে হেয়ালীব আলেপন কেমন যেন কানে লাগে। এখানে গুরুজীর 
জন্ত এভাবে কায়িক শ্রম, মনে শ্রদ্ধা, অথচ মুখে উপ্রতাব বহস্যটি ঠিক উপলব্ধি 
করতে ন] পেরে উভযেই নীববে পবস্পবেব মুখের পানে ভাকাতে থাকে | 

আড়-চোখে এদেব মুখভাব দেখে দুধিাও তাৰ বুদ্ধিব প্রথব আলোকে 
এদের অবস্থাটা! জানবার চেষ্টা করে। পরিক্রমাকাবী সাধু-সম্তর] এ-অঞ্চলে 
এলে তুধিয়া৷ তাদেব সন্ধান রেখে হুধ যোগান দেয়। এতেই তার তত্তি। 
সাবত্যাগী সাধু মহাত্মাদে সেবা কল্পে তার একমাত্র সন্থল পয়স্থিনী ধেকুর 
চুধটুকু উপলক্ষ স্বরূপ হল্লেই সে নিজেকে ধন্য ভাবে । কিন্তু এই সেবাব সঙ্গে 
স্বাথিক সম্বন্ধ না থাকলেও, হুধিয়া কিন্ত তার জিন্তকে সংযত করতে পারে 
না। যেন, গ্রধেব সঙ্গে তার মুখের ছু চারটে চোখাচোখ। কথাও যোগান 
ন! দিলে তার দৈওয়াটাই বুঝি সরর্ঘক হলো! না মনে করে। এমনও হয়েছে, 
হয়তো! মাসাধিকফালি ধরে ফোনও সাধু পরিজ্রাফের শুভাগমন ছয় মি 


যোখালে ১৬৬ 


এদিকে, অথচ ছুধিয়াও সন্ধানী দৃষ্টিতে খবর রেখে চলেছে প্রতিদিন-_-কফেউ 
এলেন কিনা; এবং না এলে তার অন্তর্ধেদনা সে ভিন্ন আর কে জানবে? 

আঁজ তার অর্নষ্টে যেন সেই আুযোগ স্ৃবিধার বন্তা এসে গেছে। এখন 
সে সুখা, সত্যই স্ুখা। কর্ণলিপ্ত অবস্থায় মনে মনে এই সব কথাই 
আগাগোড়া ভাবতে থাকে দুধিয। । 

কিছুক্ষণ নীরবে নিজেব মনে চিন্তা কবে সহস৷ সে বেশ সহজ ভাবেই 
বলল ; আমি বুঝতে পারছি তোমবা খুবই ভাবনায় পড়েন, আমাকে এখানে 
দেখে । তাই আমি আজকের দব কথাই বলছি গো,-_-তোমবা শোনো, 
তাহলেই তোমাদের মনের সংশয সব কেটে যাবে । 

দুধিয়া৷ গোড়া থেকে সব কথাই একটি একটি কবে বলে যায়। বলার 
সঙ্গে সঙ্গে পাক-পাত্রে তার হাতথানাও অবিরাম গতিতে চলতে থাকল । সেই 
দুগ্ধ দোহন থেকে আরন্ত কবে ঠাকুরজীকে পান কবানে। এবং অবশিষ্ট 
প্রচুর পরিমাণ তুপ্ধও তাব ভোগে লাগাবাব জন্তই তাকে যে কা করতে 
হয়েছে, সবই বলে ফেলে যেন সে শাস্তি পেল। 

দুধের প্রপঙ্গে অংলীবাবা বলে উঠল : যদি আব খানিক আগে এসে পড়তাম-_ 

দুধিয়! সোৎ্নাহে জানাল ; ঠাকুবজীর যখন চেল তোমরা, ত্কাব সঙ্গে 
তোমরাও তাহলে পেট ভবে খেতে | বেশ ত, ক্ষীর হতে আব বেশী দেরীও নেই । 
লাডুড়ু পাকিয়ে রেখে যাব। তোমরা] ঠাকুরজীর সঙ্গে ত তিন দিন ধরে খাবে। 

সনক বলল : আর, আজ কি শুধু গল্প শুনেই ক্ষুধ(কে ঠেকিয়ে রাখব মায়ী ? 

জংলীবাবাও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল: ক্ষীরে বোধ হয় পাক ধরে 
এসেছে - কি গন্ধই না বেরিয়েছে । 

ম্বতূ হেসে দুধিয়! বলল; ত! ব'লে দেবতার ভোগের আগে প্রসাদ 
মিলবে না। ঠাকুরজীকে ভোগ দিয়ে তারপর চেলাদের কথা । হা তবে 
বলে রাখছি, হতাশ হবার ভয় নেই । 

সনক বলল: সে ত' জান কথা-_অল্পপুর্ণা মায়ী যখন পাকপাত্র নিয়ে 
বসেছেন । 

ছুধিয়া এই সময় পাকপাত্রাটি উনান থেকে নামিয়ে নিয়ে কাঠি দিতে 
দিতে জিজ্ঞাসা করল : থালা বা বড়সড় পাত্র কিছু আছে, তাহলে এটা ঢেলে 


দত লাড্ডু তৈরী করতে সুবিধা হবে। 


১৬৪ ঝাডখণ্ডেষ ঝখখি 


জংলীবাধা বলল : আছে বৈকি | সন্স্যাসী মানুষ হলেও ক্ষুধা তৃষ্থা 
যখন ছাড়তে পারিনি, তখন কূটিব আট! মাখবার জন্য পরাত, চাটু আর লোট। 
সঙ্গে রাখতে হয় বৈকি । 

উপরেব দিকে - বালানন্দ যেখানে আসন পেতে বসেছিলেন, তারই কাছে 
এর] নিজেদের ঝুলি রেখেছিল । তাড়াতাডি গিয়ে ঝুলি থেকে বেশ বড়সড় 
লোহার একখান পরাত বের করে এনে দুধিযার সামনে বাখল | ছুধিয়াও 
পাত্রের পদার্থটকু সমস্তই প্রশস্ত পরাতের উপর ঢেলে দিল। একটু ঠা 
হলেই লাড়ুড়ু পাকাবে। 

এই অবস্থায় পবিক্রমা সম্বন্ধে কথা চলল ! হুধিয়ার বড় আগ্রহ, ভালো 
করে শোনে _সাধুরা কেমন করে এই দারুণ কষ্টকব পরিক্রমায় ব্রতী থাকেন 
বছরের পর বছর ধরে। সহসা সে জিজ্ঞাসা করল: তোমরাও তো 
অলেক বন পাহাড় ভেঙে কত জায়গা ঘুবেছ, সে সব কথা বলবে আমাকে ? 
আমার শুনতে খুব ইচ্ছা হয়। 

সনক ও জংলীবাবা ছুজনেই জানাল যে, তাদের পরিক্রমা খুব সাধারণ 
ব্যাপার--তবে গুরুজীব সঙ্গে যে সব পবিক্রম! করেছ, সেগুলো! ববং বলবার 
মত। এমন ঘটনাও অনেক ঘটেছে--প্রাণ নিয়ে টানাটানি কাণ্ড; কিন্তু 
গুরুজীব জন্তেই উদ্ধার পেয়েছিল ভাবা । ণ 

শুনেই দুধিয়া ধরে বসল : আমাকে তাহলে বল, আমি শুনব । 
ঠাকুরজীর কথা যখন, শুনে নিশ্চয়ই আনন্দ পাব । 

তখন সনক ও জংলী তুজনেই ভাগাভাগি কবে বলতে লাগল--বালানন্দজীর 
সঙ্গে পরিচয় হওয়া থেকে তার সঙ্গে নানা দুর্গম স্থান পরিক্রমাৰ বড় বড় 
ধঘটনাগুলোর রোমাঞ্চকর গল্প | ছু'হাতে লাড়, তৈরী করতে করতে দুখিয়' 
আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে শুনতে থাকে, সেই সঙ্গে : ঠাকুরজীর প্রতি তার বিশ্বাস 
ও ভক্তি আরও নিবিড় হয়ে ওঠে । তার মনে এই ধারণাই ঘৃঁট হয় যে, 
ঠাকুরজী তার অন্ভুত ভপোবলে বনের যত হিংস্র পশ্, বিষধর সাপ গ্রভৃতিকে 
যাহ করে রাখেন, তার লামনে তাদের কোন জারিছুরি খাটে না। 

ঠাকুরজীর সে এদের পরিক্রমার গল্প শেষ হলে হুধিয়া। হঠাৎ জিজ্তাস' 
করা; আচ্ছা, 'ঠাকুরজী কেমন করে সিদ্ধ হদ--ভিনি যে সব জায়গ! 
স্বুরেছেন, তার গল্প বলেছেন? তোমরা শুনেছ? 


যৌধনে ১৬৫ 


উভয়েই জানালেন যে, তারা শুনেছেন--গুরুজী উপনয়নের পরই 
দণ্তীঘর থেকে সন্্যাসী হয়ে বেরিয়ে পড়েন । সেই থেকেই তার পরিক্রমা 
চলেছে। 

দুধিয়! বলল £ বারে চেলা লোক । ঠাকুরজীর সঙ্গে মেলামেশ। করছ, 
সাথে সাথে ঘুরছ, আর কিছুই তার কাছে জেনে নাও নি? আচ্ছা, সমাধি 
ভাঙলেই আমি ঠাকুরজীকে লাড্ডু খাইয়ে সব কিছু জেনে নেব। 

জংলীবাবা বললেন £ সত আমাদের জানা উচিত ছিল। নিজে 
থেকেই তিনি কিছু কিছু বলেছিলেন ; কিন্তু আমরা এমনি বোকা ছিলুম যে, 
কিছুই আদায় করে নিতে পারি নি। দেখ মাধী, তুমি যদি পার-_-সে সব কথা 
উর মুখ থেকে বের করে নিতে ! 

সনক বলল ১ আমি ভেবে ঠিক করতে পারছিনে মায়ী, গোয়ালার 
মেয়ে তুমি, হুধ আর গাই নিয়ে তোমার কারবার, তুমি সাধু সম্ভদের সঙ্গে 
মিশলে কি করে? আর এই-যে ধ্যান, সমাধি, পরিক্রমা এসব শিখলে 
কোথা থেকে? 

দুধিয়া বলল £ শোননি__সহবৎ বলে একটা কথা আছে? আমিযে 
ছোটকাল থেকে সাধু সম্তদের সঙ্গে মেলামেশা করে আসছি । তাই না, ওসব 
কথ। শিখিছি। আর, ঠাকুরজী আমার উপরে যে প্রসম্ম হয়েছেন, সে আমারই 
হিন্বতের জোরে । জানে, তিনি যখন বলেন-_ছুধ খাবো না আমি, তখন 
আমাকেও শক্ত হয়ে বলতে হয়েছিল__তাহলে মায়ী যেমন করে বাচ্ছাকে ছুধ 
খিলায়, তেমনি করে তোমাকেও খাওয়াব আমি ঠাকুরজী | বাস, ঠাকুরজীও 
ঠাণ্ডা হয়ে যায়। শোননি, সবাই শক্তের ভক্ত-__ঠাঁকুর দেবতা পর্যন্ত! 

ইতিমধ্যে বালানন্দের সমাধি ভঙ্গ হলে দুধিয়াই সবার আগে আনন্দে 
করতালি দিয়ে বলে উঠল : ঠাকুরজীর জয় হোক। চোখ মেলে দেখ 
ঠাকুর- তোমার ছু*ছুটো জবর গোছের সাবেক শিস্ত এসে হাজির--ঠিক যেন 
'মানিক জোড়' ! আমার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেছে । এখন দেখ ঠাকুরজী 
বিলকুল দুধ ক্ষীর হয়ে গেছে, তা থেকে কত লাড্ডু বানিয়েছি । আগে ছটো 
খাও তো-_ 

এক নিশ্বাসে সব কথাগুলি বলে মনটাকে হান্কা করে ফেলে হুধিয়া। সনক 
ও জংলীবাব] এই সময় এগিয়ে গিয়ে বালানন্দকে অভিবাদন কংর বলে যে। 


১৬৬" ধাড়খণ্ডের ধাধি 


তাদের আর শহবের রাজবাড়িতে যাওয়া হয নি। বনের মধ্যে তারা পথ 
হারিয়ে ফেলে দারণ সক্কটে পড়েছিল : গুরুজী সাথে না থাকায় কি যুস্ষিলই 
তাদের ধিরেছিল। শেষকালে নর্মদামায়ীই কপা কবে কোলের কাছে টেনে 
আনেন--এখানে এসেই যেন আবার হাত বাড়িয়ে শ্বর্গ পেয়েছে । গুকজীকে 
ছেড়ে আর কোথাও ভাবা যাচ্ছে না। 

তাদের কথ] শুনে এবং ছু" একটি প্রশ্ন কবে বালানন্দ জানতে পারেন যে, 
সারাদিন তার। অভুক্ত আছে । 

তৎক্ষণাৎ তিনি স্মিতযুখে তুধিয়াকে লক্ষ্য করে বললেন : দেখছ তো 
মায়ীর কি বিচিত্র লীল] ! তুমি তখন দেদাব তুধ নিয়ে ব্যন্ত হযেছিলে, সবটুকু 
আমার পেটে ঢেলে দিয়ে পেটটাকে জয়ঢাক করে তুলতে । এখন দেখ, হ্ু' ছুটে 
অভুক্ত সাধুকে মায়ী টেনে এনেছেন তোমার সেই হুধকে সার্থক করতে! 

দধিয়। তৎক্ষণাৎ সহান্যে উত্তর করল £ কিন্তু ঠাকুব্জী, সবটুকু তুধই 
যেক্ষীর হয়ে গেছে৷ তাবপর সেই ক্ষীব ভেঙে কত লাড পাকিয়েছি দেখ । 
এখন তুমি তো আগে ভোগ লাগিয়ে প্রসাদ করে দাও । 

বালানন্দ এরই মধ্যে ছুধিয়াকে ভালো কবেই চিনেছেন | জানেন দধিয়াৰ 
কথা লগ রাখলে এখনি সে খণ্ড প্রলয় বাধিযে বসবে । তখন তাকে তাড়াতাড়ি 
ছুটি লাড়, দিতে হল এবং মুখে দিয়ে বললেন : সত্যই দুধিয়া, এ যেন অমৃত 
খেলাম । এখন এই তুই উপবাসী ভক্তকে তৃথ্থ কব, নিজেও প্রসাদ নাও । 

দুধিয়া। তখন আবদারেব স্বরে বলল: কথা তোমার বাখব ঠাকুরজী । 
কিস্তু তুমিও কথ দাঁও -যখন থেকে তুমি ঘর গৃহস্থালী ছেডে সাধু হয়েছ, 
তখন থেকে তুমি যেদিন যেখানে গেছ, যে সব কাও দেখেছ, যে যে বনজঙ্গল 
পাহাড় পর্বত পার হয়েছ- সব শোনাবে এই ছুধিয়া হুধওয়ালীকে । আর, 
যদি রাজী না হও, সারারাত ধরে তোমাকে লাড্ডু খেতে হবে আমাদেব 
চোখের সামনে বসে । 

বালাদদ্দ হেসে বললেন £ খাস। ব্যবস্থা ভোঁমার ভুধিয়া!। বেশ, তোমার 
আবদারই রাখব আমি-_সারা রাত ধরে আমি গল্পই বলব । সেই রাত্রে পুণ্যতোয়া 
নেবার তীরে ছৃটী কৌতুহলী শ্রোতা ও একমাত্র শ্রোত্রীকে উপলক্ষ করে 
বলে গেল গাঁয়ের এক অপূর্ব আসর | তার কাছিনীও আর এক বিচিত্র গল্প । 


গং 874২২ 
০ এ 
1 7৮ পু চি ্